হুওয়াল্লাযী খালাকালাকুম মা-ফিল আরদিজামী‘আন ছু ম্মাছ তাওয়াইলাছছামাই ফাছাওওয়া-হুন্না ছাব‘আ ছামা-ওয়া-তিওঁ ওয়া হুওয়া বিকুল্লি শাইয়িন ‘আলীম।উচ্চারণ
তিনিই পৃথিবীতে তোমাদের জন্য সমস্ত জিনিস সৃষ্টি করলেন। তারপর ওপরের দিকে লক্ষ করলেন এবং সাত আকাশ বিন্যস্ত করলেন ৩৪ তিনি সব জিনিসের জ্ঞান রাখেন। ৩৫ তাফহীমুল কুরআন
তিনিই সেই সত্তা, যিনি পৃথিবীতে যা-কিছু আছে তা তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন। #%২৮%# তারপর তিনি আকাশের প্রতি লক্ষ্য করেন এবং তাকে সাত আকাশরূপে সুষ্ঠুভাবে নির্মাণ করেন। আর তিনি প্রত্যেক জিনিসের পরিপূর্ণ জ্ঞান রাখেন।মুফতী তাকী উসমানী
পৃথিবীতে যা কিছু আছে সমস্তই তিনি তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন; অতঃপর তিনি আকাশের প্রতি মনঃসংযোগ করেন, অতঃপর সপ্ত আকাশ সুবিন্যস্ত করেন এবং তিনি সর্ব বিষয়ে মহাজ্ঞানী।মুজিবুর রহমান
তিনিই সে সত্ত্বা যিনি সৃষ্টি করেছেন তোমাদের জন্য যা কিছু জমীনে রয়েছে সে সমস্ত। তারপর তিনি মনোসংযোগ করেছেন আকাশের প্রতি। বস্তুতঃ তিনি তৈরী করেছেন সাত আসমান। আর আল্লাহ সর্ববিষয়ে অবহিত।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
তিনি পৃথিবীর সবকিছু তোমাদের জন্যে সৃষ্টি করেছেন, তৎপর তিনি আকাশের দিকে মনোসংযোগ করেন এবং একে সপ্তাকাশে বিন্যস্ত করেন; তিনি সর্ববিষয়ে সবিশেষ অবহিত। ইসলামিক ফাউন্ডেশন
তিনিই যমীনে যা আছে সব তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তারপর আসমানের প্রতি খেয়াল করলেন এবং তাকে সাত আসমানে সুবিন্যস্ত করলেন। আর সব কিছু সম্পর্কে তিনি সম্যক জ্ঞাত।আল-বায়ান
পৃথিবীর সবকিছু তিনি তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন, তারপর তিনি আকাশের দিকে মনোসংযোগ করেন এবং তা সপ্তাকাশে বিন্যস্ত করেন, তিনি সকল বিষয়ে বিশেষভাবে অবহিত।তাইসিরুল
তিনিই সেইজন যিনি ঘূর্ণায়মান-পৃথিবীতে যা-কিছু আছে সবই তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন, তাছাড়া তিনি মহাকাশের প্রতি খেয়াল করলেন, তাই তাদের তিনি সাত আসমানে পরিপূর্ণ করলেন। আর তিনি সব-কিছু সন্বন্ধে সর্বজ্ঞাতা।মাওলানা জহুরুল হক
৩৪
সাত আকাশের তাৎপর্য কি? সাত আকাশ বলতে কি বুঝায়? এ সম্পর্কে সঠিক ধারণা দেয়া কঠিন। মানুষ প্রতি যুগে আকাশ বা অন্য কথায় পৃথিবীর বাইরের জগত সম্পর্কে নিজের পর্যবেক্ষণ ও ধারণা-বিশ্লেষণ অনুযায়ী বিভিন্ন চিন্তা ও মতবাদের অনুসারী হয়েছে। এ চিন্তা ও মতবাদগুলো বিভিন্ন সময় বার বার পরিবর্তিত হয়েছে। কাজেই এর মধ্য থেকে কোন একটি মতবাদ নির্দেশ করে তার ভিত্তিতে কুরআনের এই শব্দগুলোর অর্থ নির্ণয় করা ঠিক হবে না। তবে সংক্ষেপে এতটুকু বুঝে নিতে হবে যে, সম্ভবত পৃথিবীর বাইরে যতগুলো জগত আছে সবগুলোকেই আল্লাহ সাতটি সুদৃঢ় স্তরে বিভক্ত করে রেখেছেন অথবা এই বিশ্ব-জাহানের যে স্তরে পৃথিবীর অবস্থিতি সেটি সাতটি স্তর সমন্বিত।
৩৫
এই বাক্যটিতে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ সত্য সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে। এক, যে আল্লাহ তোমাদের সমস্ত গতিবিধি ও কর্মকান্ডের খবর রাখেন এবং যার দৃষ্টি থেকে তোমাদের কোন গতিবিধিই গোপন থাকতে পারে না তাঁর মোকাবিলায় তোমরা কুফরী ও বিদ্রোহের পথ অবলম্বন করার সাহস কর কেমন করে? দুই, যে আল্লাহ যাবতীয় সত্য জ্ঞানের অধিকারী, যিনি আসলে সমস্ত জ্ঞানের উৎস তাঁর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে অজ্ঞতার অন্ধকারে মাথা কুটে মরা ছাড়া তোমাদের আর কি লাভ হতে পারে! তিনি ছাড়া যখন জ্ঞানের আর কোন উৎস নেই, তোমাদের জীবনের পথ সুস্পষ্টভাবে দেখার জন্য যখন তাঁর কাছ থেকে ছাড়া আর কোথাও থেকে আলো পাওয়ার সম্ভাবনা নেই তখন তাঁর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়ার মধ্যে তোমরা নিজেদের জন্য এমন কি কল্যাণ দেখতে পেলে?
এখানে এ বিষয়ের প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হচ্ছে যে, সে জগতের যা-কিছু দ্বারা উপকার লাভ করে তা সবই আল্লাহ তাআলার দান। এর প্রত্যেকটি জিনিস আল্লাহ তাআলার তাওহীদ ও একত্বের সাক্ষ্য দেয়। এতদসত্ত্বেও তাঁর সাথে কুফরী কর্মপন্থা অবলম্বন করা কত বড়ই না অকৃতজ্ঞতা! এ আয়াত থেকে ফুকাহায়ে কিরাম মূলনীতি আহরণ করেছেন যে, দুনিয়ার প্রতিটি বস্তু মৌলিকভাবে হালাল। যতক্ষণ পর্যন্ত কোনও বস্তুর হারাম হওয়ার পক্ষে কোনও দলীল না পাওয়া যাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে হালাল মনে করা হবে।
২৯. তিনিই যমীনে যা আছে সব তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তারপর(১) তিনি আসমানের প্রতি মনোনিবেশ(২) করে সেটাকে সাত আসমানে বিন্যস্ত করেছেন; আর তিনি সবকিছু সম্পর্কে সবিশেষ অবগত।
১. এখানে যমীন সৃষ্টির পরে আসমান সৃষ্টি করা হয়েছে বলে বর্ণিত হয়েছে। অথচ সূরা আন-নাযিআতের ৩০ নং আয়াত বাহ্যতঃ এর বিপরীত মনে হয়। এ ব্যাপারে পবিত্র কুরআনের সূরা ফুসসিলাতের ১০ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। এখানে শুধু এটা জানাই যথেষ্ট যে, সহীহ সনদে ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন, “আল্লাহ্ তা'আলা যমীনকে আসমানের আগেই সৃষ্টি করেছিলেন এবং তার মধ্যে খাবার জাতীয় সবকিছুর ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু সেটাকে আসমান সৃষ্টির পূর্বে প্রসারিত ও সামঞ্জস্যবিধান করেন নি। তারপর তিনি আকাশের প্রতি মনোযোগী হয়ে সেটাকে সাত আসমানে বিন্যস্ত করেন। তারপর তিনি যমীনকে সুন্দরভাবে প্রসারিত ও বিস্তৃত করেছেন। এটাই এ আয়াত এবং সূরা আন-নাযি’আতের ৩০ নং আয়াতের মধ্যে বাহ্যতঃ উত্থাপিত প্রশ্নের উত্তর। (আত-তাফসীরুস সহীহ) মুজাহিদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আল্লাহ্ তা'আলা আসমান সৃষ্টি করার আগেই যমীন সৃষ্টি করেন। যমীন সৃষ্টির পর তা থেকে এক ধোয়া বা বাষ্প উপরের দিকে উঠতে থাকে। আর সেটাই আল্লাহর বাণীঃ “তারপর তিনি আসমান সৃষ্টির দিকে মনোনিবেশ করলেন এমতাবস্থায় যে, সেটা ছিল ধুম্রাকার” (সূরা ফুসসিলাত: ১১) (ইবনে কাসীর)
২. পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে اسْتَوٰى শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, স্থান বিশেষে বিভিন্ন প্রকার অর্থে সংক্ষিপ্তভাবে বলা যায় তা তিনভাবে ব্যবহৃত হয়েছে:
(১) اسْتَوٰى শব্দটি যেখানে পূর্ণ ক্রিয়া হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে অর্থাৎ তার পরে على বা إلى কিছুই না আসে তখন তার অর্থ হবে, সম্পূর্ণ হওয়া বা পূর্ণতা লাভ করা। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা মূসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে বলেনঃ (وَلَمَّا بَلَغَ أَشُدَّهُ وَاسْتَوَىٰ) অর্থাৎ আর যখন মূসা যৌবনে পদার্পণ করলেন এবং পূর্ণতা লাভ করলেন। (সূরা আল-কাসাসঃ ১৪)
(২) اسْتَوٰى শব্দটির সাথে যদি على আসে তখন তার অর্থ হবে- উপরে উঠা, আরোহণ করা। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা তার নিজের সম্পর্কে বলেনঃ (ثُمَّ اسْتَوَىٰ عَلَى الْعَرْشِ) (আ’রাফ ৫৪, ইউনুস ৩, রা’দ ২, ফিরকান ৫৯, সাজদা ৪, হাদীদ ৪) অর্থাৎ তারপর তিনি আরশের উপর উঠলেন। অনুরূপভাবে সূরা ত্ব-হা-তে এসেছেঃ (الرَّحْمَٰنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَىٰ) অর্থাৎ দয়াময় (রহমান) আরশের উপর উঠলেন।
اسْتَوٰى শব্দটির সাথে যদি إلى আসে তখন তার অর্থ হবে- ইচ্ছা করা, সংকল্প করা, মনোনিবেশ করা। আর সে অর্থই এ আয়াতে ব্যবহৃত (ثُمَّ اسْتَوَى إِلَى السَّمَاءِ) এর অর্থ করা হবে- আকাশ সৃষ্টির ইচ্ছা করলেন। তবে মুজাহিদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এখানেও উপরে উঠার অর্থ হবে।
শেষোক্ত দু'অবস্থায় اسْتَوَى শব্দটি যখন আল্লাহ্ তা'আলার সাথে সম্পৃক্ত হবে তখন তা তার একটি সিফাত বা গুণ হিসেবে গণ্য হবে। আর আল্লাহর জন্য সে সিফাত বা গুণ কোন প্রকার অপব্যাখ্যা, পরিবর্তন, সদৃশ নির্ধারণ ছাড়াই সাব্যস্ত করা ওয়াজিব।
২৯। তিনি পৃথিবীর সব কিছু তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন, (1) তারপর তিনি আকাশের দিকে মনোসংযোগ করেন (2) এবং তাকে (আকাশকে) সপ্তাকাশে (3) বিন্যস্ত করেন, তিনি সকল বিষয়ে সবিশেষ অবহিত।
(1) এ থেকে সাব্যস্ত করা হয়েছে যে, যমীনে সৃষ্ট প্রত্যেক জিনিস মূলতঃ হালাল, যতক্ষণ না কোন জিনিসের হারাম হওয়ার কথা দলীল দ্বারা প্রমাণিত হবে। (ফাতহুল ক্বাদীর)
(2) সালাফদের কেউ কেউ এর তর্জমা করেছেন, অতঃপর আসমানের দিকে আরোহণ করেন। (সহীহ বুখারী) মহান আল্লাহর আসমানের উপর আরশে আরোহণ করা এবং বিশেষ বিশেষ সময়ে নিকটের আসমানে অবতরণ করা তাঁর গুণবিশেষ। কোন অপব্যাখ্যা ছাড়াই এর উপর ঐভাবেই ঈমান আনা আমাদের উপর ওয়াজিব, যেভাবে তা ক্বুরআন ও হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।
(3) এ থেকে প্রথমতঃ জানা গেল যে, আসমান (আকাশ) এক অনুভূত বস্তু এবং বাস্তব জিনিস। কেবল উচ্চতা (মহাশূন্য)-কে আসমান বলে আখ্যায়িত করা হয়নি। দ্বিতীয়তঃ জানা গেল যে, আসমানের সংখ্যা হল সাত। আর হাদীস অনুযায়ী দুই আসমানের মধ্যেকার দূরত্ব হল পাঁচ শত বছরের পথ। আর যমীন সম্পর্কে ক্বুরআনে কারীমে এসেছে, {وَمِنَ الْأَرْضِ مِثْلَهُنَّ} এবং পৃথিবীও সেই পরিমাণে। (ত্বালাক্ব ১২ আয়াত) এ থেকে যমীনের সংখ্যাও সাত বলে জানা যায়। নবী (সাঃ)-এর হাদীস দ্বারা এ কথা আরো বলিষ্ঠ হয়। বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে এক বিঘত যমীনও আত্মসাৎ করবে, কিয়ামতের দিন সাত তবক যমীনকে তার গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া হবে। (সহীহ বুখারী ২৯৫৯নং) উক্ত আয়াত থেকে এ কথাও জানা যায় যে, আসমানের পূর্বে যমীন সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু সূরা নাযিআত (৩০ আয়াতে) আসমানের উল্লেখ করে বলা হয়েছে, {وَالْأَرْضَ بَعْدَ ذَلِكَ دَحَاهاَ} যমীনকে এর পর বিস্তৃত করেছেন। এর ব্যাখ্যা এই করা হয়েছে যে, প্রথমে যমীনই সৃষ্টি হয়েছে, তবে পরিষ্কার ও সমতল করে বিছানো হল সৃষ্টি থেকে ভিন্ন ব্যাপার, যেটা আসমান সৃষ্টির পর সম্পাদিত হয়েছে। (ফাতহুল ক্বাদীর)