আন্নাবিইয়ুআওলা-বিলমু’মিনীনা মিন আনফুছিহিম ওয়া আঝওয়া-জুহূ উম্মাহা-তুহুম ওয়া উলুল আরহা-মি বাদুহুম আওলা-ব্বিা‘দিন ফী কিতা-বিল্লা-হি মিনাল মু’মিনীনা ওয়াল মুহা-জিরীনা ইল্লাআন তাফ‘আলূ ইলাআওলিয়াইকুম মা‘রূফান ক-না যা-লিকা ফিল কিতা-বি মাছতূর-।উচ্চারণ
নিঃসন্দেহে নবী ঈমানদারদের কাছে তাদের নিজেদের তুলনায় অগ্রাধিকারী, ১২ আর নবীদের স্ত্রীগণ তাদের মা। ১৩ কিন্তু আল্লাহর কিতাবের দৃষ্টিতে সাধারণ মু’মিন ও মুহাজিরদের তুলনায় আত্মীয়রা পরস্পরের বেশি হকদার। তবে নিজেদের বন্ধু-বান্ধবদের সাথে কোন সদ্ব্যবহার (করতে চাইলে তা) তোমরা করতে পারো। ১৪ আল্লাহর কিতাবে এ বিধান লেখা আছে। তাফহীমুল কুরআন
মুমিনদের পক্ষে নবী তাদের নিজেদের প্রাণ অপেক্ষাও বেশি ঘনিষ্ঠ। আর তাদের স্ত্রীগণ তাদের মা। তথাপি আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী অন্যান্য মুমিন ও মুহাজিরগণ অপেক্ষা গর্ভ-সূত্রের আত্মীয়গণ (মীরাছের ব্যাপারে) একে অন্যের উপর অগ্রাধিকার রাখে। তবে তোমরা যদি তোমাদের বন্ধু-বান্ধবের (পক্ষে কোন অসিয়ত করে তাদের) প্রতি সৌজন্য প্রদর্শন কর সেটা ভিন্ন কথা। একথা কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে।মুফতী তাকী উসমানী
নাবী মু’মিনদের নিকট তাদের নিজেদের অপেক্ষা ঘনিষ্টতর এবং তার স্ত্রীরা তাদের মা। আল্লাহর বিধান অনুসারে মু’মিন মুহাজির অপেক্ষা যারা আত্মীয় তারা পরস্পরের নিকটতম। তবে তোমরা যদি তোমাদের বন্ধু-বান্ধবদের প্রতি দাক্ষিণ্য প্রদর্শন করতে চাও তাহলে করতে পার। এটা কিতাবে লিপিবদ্ধ।মুজিবুর রহমান
নবী মুমিনদের নিকট তাদের নিজেদের অপেক্ষা অধিক ঘনিষ্ঠ এবং তাঁর স্ত্রীগণ তাদের মাতা। আল্লাহর বিধান অনুযায়ী মুমিন ও মুহাজিরগণের মধ্যে যারা আত্নীয়, তারা পরস্পরে অধিক ঘনিষ্ঠ। তবে তোমরা যদি তোমাদের বন্ধুদের প্রতি দয়া-দাক্ষিণ্য করতে চাও, করতে পার। এটা লওহে-মাহফুযে লিখিত আছে।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
নবী মু’মিনদের নিকট তাদের নিজেদের অপেক্ষা ঘনিষ্ঠতর এবং তার পত্নীগণ তাদের মাতা। আল্লাহ্ র বিধান অনুসারে মু’মিন ও মুহাজিরগণ অপেক্ষা-যারা আত্মীয় তারা পরস্পরের নিকটতর। তবে তোমরা যদি তোমাদের বন্ধু-বান্ধবের প্রতি আনুক‚ল্য প্রদর্শন করতে চাও- তা করতে পার। এটা কিতাবে লিপিবদ্ধ। ইসলামিক ফাউন্ডেশন
নবী মুমিনদের কাছে তাদের নিজদের চেয়ে ঘনিষ্ঠতর। আর তার স্ত্রীগণ তাদের মাতাস্বরূপ। আর আল্লাহর বিধান অনুসারে মুমিন ও মুহাজিরদের তুলনায় আত্নীয় স্বজনরা একে অপরের নিকটতর। তবে তোমরা যদি বন্ধু-বান্ধবদের সাথে ভাল কিছু করতে চাও (তা করতে পার)। এটা কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে।আল-বায়ান
নবী (সাঃ) মু’মিনদের নিকট তাদের নিজেদের চেয়ে ঘনিষ্ঠ, আর তার স্ত্রীগণ তাদের মাতা। আল্লাহর বিধানে মু’মিন ও মুহাজিরদের (দ্বীনী সম্পর্ক) অপেক্ষা আত্মীয়-স্বজনগণ পরস্পর পরস্পরের নিকট ঘনিষ্ঠতর। তবে তোমরা তোমাদের বন্ধু বান্ধবদের প্রতি দয়া-দাক্ষিণ্য প্রদর্শন করতে চাইলে, করতে পার। (আল্লাহর) কিতাবে এটাই লিখিত।তাইসিরুল
এই নবী মুমিনদের কাছে তাদের নিজেদের চেয়েও অধিক অন্তরঙ্গ, আর তাঁর পত্নীগণ হচ্ছেন তাদের মাতা। আর গর্ভজাত সম্পর্কধারীরা -- তারা আল্লাহ্র বিধানে একে অন্যে অধিকতর নিকটবর্তী মুমিনদের ও মুহাজিরদের চাইতে, তবে তোমরা যেন তোমাদের বন্ধুবর্গের প্রতি সদাচার করো। এমনটাই গ্রন্থে লিপিবদ্ধ রয়েছে।মাওলানা জহুরুল হক
১২
অর্থাৎ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে মুসলমানদের এবং মুসলমানদের সাথে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যে সম্পর্ক তা অন্যান্য সমস্ত মানবিক সম্পর্কের উর্ধ্বে এক বিশেষ ধরনের সম্পর্ক। নবী ও মু’মিনদের মধ্যে যে সম্পর্ক বিরাজিত, অন্য কোন আত্মীয়তা ও সম্পর্ক তার সাথে কোন দিক দিয়ে সামান্যতমও তুলনীয় নয়। নবী ﷺ মুসলমানদের জন্য তাদের বাপ-মায়ের, চাইতেও বেশী স্নেহশীল ও দয়াদ্র হৃদয় এবং তাদের নিজেদের চাইতেও কল্যাণকামী। তাদের বাপ-মা, স্ত্রী ও ছেলেমেয়েরা তাদের ক্ষতি করতে পারে, তাদের সাথে স্বার্থপরের মতো ব্যবহার করতে পারে, তাদেরকে বিপথে পরিচালিত করতে পারে, তাদেরকে দিয়ে অন্যায় কাজ করাতে পারে, তাদেরকে জাহান্নামে ঠেলে দিতে পারে, কিন্তু নবী ﷺ তাদের পক্ষে কেবলমাত্র এমন কাজই করতে পারেন যাতে তাদের সত্যিকারের সাফল্য অর্জিত হয়। তারা নিজেরাই নিজেদের পায়ে কুড়াল মারতে পারে, বোকামি করে নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি করতে পারে কিন্তু নবী ﷺ তাদের জন্য তাই করবেন যা তাদের জন্য লাভজনক হয়। আসল ব্যাপার যখন এই তখন মুসলমানদের ওপরও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ অধিকার আছে যে, তারা তাঁকে নিজেদের বাপ-মা ও সন্তানদের এবং নিজেদের প্রাণের চেয়েও বেশী প্রিয় মনে করবে। দুনিয়ার সকল জিনিসের চেয়ে তাঁকে বেশী ভালোবাসবে। নিজেদের মতামতের ওপর তাঁর মতামতকে এবং নিজেদের ফায়সালার ওপর তাঁর ফায়সালাকে প্রাধান্য দেবে। তাঁর প্রত্যেকটি হুকুমের সামনে মাথা নত করে দেবে। বুখারী ও মুসলিম প্রমুখ মুহাদ্দিসগণ তাদের হাদীস গ্রন্থে সামান্য শাব্দিক পরিবর্তন সহকারে এ বিষয়বস্তু সম্বলিত একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাতে বলা হয়েছেঃ
لاَ يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَلَدِهِ وَوَالِدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ
“তোমাদের কোন ব্যক্তি মু’মিন হতে পারে না যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, তার সন্তান-সন্ততি ও সমস্ত মানুষের চাইতে বেশী প্রিয় হই।”
১৩
ওপরে বর্ণিত এ একই বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এও একটি বৈশিষ্ট্য ছিল যে, মুসলমানদের নিজেদের পালক মাতা কখনো কোন অর্থেই তাদের মা নয় কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীগণ ঠিক তেমনিভাবে তাদের জন্য হারাম যেমন তাদের আসল মা তাদের জন্য হারাম। এ বিশেষ বিধানটি নবী ﷺ ছাড়া দুনিয়ার আর কোন মানুষের জন্য প্রযোজ্য নয়।
এ প্রসঙ্গে এ কথাও জেনে নেয়া প্রয়োজন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীগণ শুধু মাত্র এ অর্থে মু’মিনদের মাতা যে, তাঁদেরকে সম্মান করা মুসলমানদের জন্য ওয়াজিব এবং তাঁদের সাথে কোন মুসলমানের বিয়ে হতে পারে না। বাদবাকি অন্যান্য বিষয়ে তাঁরা মায়ের মতো নন। যেমন তাদের প্রকৃত আত্মীয়গণ ছাড়া বাকি সমস্ত মুসলমান তাদের জন্য গায়ের মাহরাম ছিল এবং তাঁদের থেকে পর্দা করা ছিল ওয়াজিব। তাঁদের মেয়েরা মুসলমানদের জন্য বৈপিত্রেয় বোন ছিলেন না, যার ফলে তাদের সাথে মুসলমানদের বিয়ে নিষিদ্ধ হয়ে পড়ে। তাঁদের ভাই ও বোনেরা মুসলমানদের জন্য মামা ও খালার পর্যায়ভুক্ত ছিলেন না। কোন ব্যক্তি নিজের মায়ের তরফ থেকে যে মীরাস লাভ করে তাঁদের তরফ থেকে কোন অনাত্মীয় মুসলমান সে ধরনের কোন মীরাস লাভ করে না।
এখানে আর একটি কথাও উল্লেখযোগ্য। কুরআন মজীদের দৃষ্টিতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সকল স্ত্রীই এই মর্যাদার অধিকারী। হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাও এর অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু একটি দল যখন হযরত আলী ও ফাতেমা রাদিয়াল্লাহ আনহা এবং তাঁর সন্তানদেরকে দ্বীনের কেন্দ্রে পরিণত করে সমগ্র ইসলামী জীবন ব্যবস্থাকে তাঁদের চারপাশে ঘোরাতে থাকে এবং এরই ভিত্তিতে অন্যান্য বহু সাহাবার সাথে হযরত আয়েশাকেও নিন্দাবাদ ও গালাগালির লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে তখন কুরআন মজীদের এ আয়াত তাদের পথে প্রতিরোধ দাঁড় করায়। কারণ এ আয়াতের প্রেক্ষিতে যে ব্যক্তিই ঈমানের দাবীদার হবে সে-ই তাঁকে মা বলে স্বীকার করে নিতে বাধ্য। শেষমেষ এ সংকট থেকে রেহাই পাওয়ার উদ্দেশ্যে এ অদ্ভুত দাবী করা হয়েছে যে, নবী করীম ﷺ হযরত আলীকে এ ইখতিয়ার দিয়েছিলেন যে, তাঁর ইন্তিকালের পর তিনি তাঁর পবিত্র স্ত্রীদের মধ্য থেকে যাঁকে চান তাঁর স্ত্রীর মর্যাদায় টিকিয়ে রাখতে পারেন এবং যাঁকে চান তাঁর পক্ষ থেকে তালাক দিতে পারেন। আবু মনসুর আহমাদ ইবনে আবু তালেব তাবরাসী কিতাবুল ইহ্তিজাজে যে কথা লিখেছেন এবং সুলাইমান ইবনে আবদুল্লাহ আলজিরানী যা উদ্ধৃত করেছেন তা হচ্ছে এই যে, নবী ﷺ হযরত আলীকে বলেনঃ
يا ابا الحسن ان هذا الشرف باق مادمنا على طاعة الله تعالى فايتهن عصت الله تعالى بعدى بالخروج عليك فطلقها من الازواج واسقطها من شرف امهات الؤمنين-
“হে আবুল হাসান! এ মর্যাদা ততক্ষণ অক্ষুণ্ন থাকবে যতক্ষণ আমরা আল্লাহর আনুগত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবো। কাজেই আমার স্ত্রীদের মধ্য থেকে যে কেউ আমার পরে তোমার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে আল্লাহর নাফরমানি করবে তাকে তুমি তালাক দিয়ে দেবে এবং তাদেরকে মু’মিনদের মায়ের মর্যাদা থেকে বহিস্কার করবে।”
হাদীস বর্ণনার রীতি ও মূলনীতির দিক দিয়ে তো এ রেওয়ায়াতটি সম্পুর্ন ভিত্তিহীন। কিন্তু কোন ব্যক্তি যদি এ সূরার ২৮-২৯ এবং ৫১ ও ৫২ আয়াত ৪টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন তাহলে তিনি জানতে পারবেন যে, এ রেওয়ায়াতটি কুরআনেরও বিরোধী। কারণ ইখ্তিয়ার সম্পর্কিত আয়াতের পর রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যে সকল স্ত্রী সর্বাবস্থায় তাঁর সাথে থাকা পছন্দ করেছিলেন তাঁদেরকে তালাক দেবার ইখ্তিয়ার আর রসুলের ﷺ হাতে ছিল না। সামনের দিকে ৪২ ও ৯৩ টীকায় এ বিষয়ের বিস্তারিত আলোচনা আসছে।
এছাড়াও একজন নিরপেক্ষ ব্যক্তি যদি শুধুমাত্র বুদ্ধিবৃত্তিই ব্যবহার করে এ রেওয়ায়াতটির বিষয়বস্তু সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করেন তাহলেও তিনি পরিষ্কার দেখতে পাবেন এটি একটি চরম ভিত্তিহীন এবং রসূলে পাকের বিরুদ্ধে অত্যন্ত অবমাননাকর মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছুই নয়। রসূল তো অতি উন্নত ও শ্রেষ্ঠতম মর্যাদার অধিকারী, তাঁর কথাই আলাদা, এমন কি একজন সাধারণ ভদ্রলোকের কাছেও এ আশা করা যেতে পারে না যে, তিনি মারা যাবার পর তাঁর স্ত্রীকে তালাক দেবার কথা চিন্তা করবেন এবং দুনিয়া থেকে বিদায় নেবার সময় নিজের জামাতাকে এই ইখ্তিয়ার দিয়ে যাবেন যে, যদি কখনো তার সাথে তোমার ঝগড়া হয় তাহলে তুমি আমার পক্ষ থেকে তাকে তালাক দিয়ে দেবে। এ থেকে জানা যায়, যারা আহ্লে বায়তের প্রেমের দাবীদার তারা গৃহস্বামীর (সাহেবে বায়েত) ইজ্জত ও আবরুর কতোটা পরোয়া করেন। আর এরপর তারা মহান আল্লাহর বাণীর প্রতিও কতটুকু মর্যাদা প্রদর্শন করেন সেটিও দেখার বিষয়।
১৪
এ আয়াতে বলা হয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে তো মুসলমানদের সম্পর্কের ধরন ছিল সবকিছু থেকে আলাদা। কিন্তু সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক এমন নীতির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হবে যার ফলে আত্মীয়দের অধিকার পরস্পরের ওপর সাধারণ লোকদের তুলনায় অগ্রগণ্য হয়। নিজের মা-বাপ, সন্তান-সন্ততি ও ভাইবোনদের প্রয়োজন পূর্ণ না করে বাইরে দান-খয়রাত করে বেড়ালে তা সঠিক গণ্য হবে না। যাকাতের মাধ্যমে প্রথমে নিজের গরীব আত্বীয় স্বজনদেরকে সাহায্য করতে হবে এবং তারপর অন্যান্য হকদারকে দিতে হবে। মীরাস অপরিহার্যভাবে তারাই লাভ করবে যারা হবে মৃত ব্যক্তির নিকটতম আত্মীয়। অন্যদেরকে সে চাইলে (জীবিতাবস্থায়) হেবা, ওয়াকফ বা অসিয়াতের মাধ্যমে নিজের সম্পদ দান করতে পারে। কিন্তু এও ওয়ারিসদেরকে বঞ্চিত করে সে সবকিছু অন্যদেরকে দিয়ে যেতে পারে না। হিজরাতের পর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃ সম্পর্ক স্থাপন করার জন্য যে পদ্ধতি অবলম্বিত হয়েছিল, যার প্রেক্ষিতে নিছক দ্বীনী ভ্রাতৃত্বের সম্পর্কের ভিত্তিতে মুহাজির ও আনসারগণ পরস্পরের ওয়ারিস হতেন, এ হুকুমের মাধ্যমে তাও রহিত হয়ে যায়। আল্লাহ পরিষ্কার বলে দেন, মীরাস বণ্টন হবে আত্মীয়তার ভিত্তিতে। তবে হ্যাঁ কোন ব্যক্তি চাইলে হাদীয়া, তোহ্ফা, উপঢৌকন বা অসিয়াতের মাধ্যমে নিজের কোন দ্বীনী ভাইকে সাহায্য করতে পারেন।
এখানে আল্লাহ তাআলা এই বাস্তবতা তুলে ধরছেন যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদিও সমস্ত মুসলিমের কাছে তাদের নিজ প্রাণ অপেক্ষাও বেশি প্রিয় এবং তাঁর পবিত্র স্ত্রীগণকে তারা নিজেদের মা’ গণ্য করে, কিন্তু তাই বলে মীরাছের ব্যাপারে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর স্ত্রীগণ কোন মুসলিমের কাছে তার আত্মীয়বর্গের উপর অগ্রাধিকার রাখেন না। কাজেই কারও ইন্তিকাল হয়ে গেলে তার মীরাছ তার নিকটাত্মীয়দের মধ্যেই বণ্টন করা হয়ে থাকে; মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বা তাঁর পবিত্র স্ত্রীগণকে তা থেকে কোন অংশ দেওয়া হয় না, অথচ দীনী দৃষ্টিকোণ থেকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও উম্মুল মুমিনীনগণের হক সমস্ত আত্মীয়-স্বজনের উপরে। তো যখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও উম্মুল মুমিনীনগণকে তাদের দীনী সম্পর্ক সত্ত্বেও কারও মীরাছে শরীক রাখা হয়নি, তখন পোষ্যপুত্রকে কেবল মুখে পুত্র বলে দেওয়ার অজুহাতে কী করে মীরাছে অংশীদার বানানো যেতে পারে? হাঁ, তাদের প্রতি যদি সৌজন্য প্রদর্শনের ইচ্ছা হয়, তবে নিজের রেখে যাওয়া সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশের ভেতর তাদের পক্ষে অসিয়ত করার সুযোগ আছে।
৬. নবী মুমিনদের কাছে তাদের নিজেদের চেয়েও ঘনিষ্টতর(১) এবং তার স্ত্রীগণ তাদের মা।(২) আর আল্লাহর বিধান অনুসারে মুমিন ও মুহাজিরগণের চেয়ে—যারা আত্মীয় তারা পরস্পর কাছাকাছি।(৩) তবে তোমরা তোমাদের বন্ধু-বান্ধবের প্রতি কল্যাণকর কিছু করার কথা আলাদা।(৪) এটা কিতাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে।
(১) অর্থাৎ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে মুসলিমদের এবং মুসলিমদের সাথে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যে সম্পর্ক তা অন্যান্য সমস্ত মানবিক সম্পর্কের ঊর্ধ্বের এক বিশেষ ধরনের সম্পর্ক। নবী ও মুমিনদের মধ্যে যে সম্পর্ক বিরাজিত, অন্য কোন আত্মীয়তা ও সম্পর্ক তার সাথে কোন দিক দিয়ে সামান্যতমও তুলনীয় নয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলিমদের জন্য তাদের বাপমায়ের চাইতেও বেশী স্নেহশীল ও দয়ার্দ্র হৃদয় এবং তাদের নিজেদের চাইতেও কল্যাণকামী। তাদের বাপ-মা, স্ত্রী ও ছেলেমেয়েরা তাদের ক্ষতি করতে পারে, তাদের সাথে স্বার্থপরের মতো ব্যবহার করতে পারে, তাদেরকে জাহান্নামে ঠেলে দিতে পারে, কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের পক্ষে কেবলমাত্র এমন কাজই করতে পারেন যাতে তাদের সত্যিকার সাফল্য অর্জিত হয়। তারা নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি করতে পারে।
কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহ্ আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের জন্য তাই করবেন যা তাদের জন্য লাভজনক হয়। আসল ব্যাপার যখন এই মুসলিমদের ওপরও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ অধিকার আছে তখন তারা তাকে নিজেদের বাপ-মা ও সন্তানদের এবং নিজেদের প্রাণের চেয়েও বেশী প্রিয় মনে করবে। দুনিয়ার সকল জিনিসের চেয়ে তাকে বেশী ভালোবাসবে। নিজেদের মতামতের ওপর তার মতামতকে এবং নিজেদের ফায়সালার ওপর তার ফায়সালাকে প্রাধান্য দেবে। তার প্রত্যেকটি হুকুমের সামনে মাথা নত করে দেবে। তাই হাদীসে এসেছে, “তোমাদের কোন ব্যক্তি মুমিন হতে পারে না যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, তার সন্তানসন্ততি ও সমস্ত মানুষের চাইতে বেশী প্রিয় হই।” (বুখারী: ১৪, মুসলিম: ৪৪)
সুতরাং প্রত্যেক মুসলমানের পক্ষে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ পালন করা স্বীয় পিতা-মাতার নির্দেশের চাইতেও অধিক আবশ্যকীয়। যদি পিতা-মাতার হুকুম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হুকুমের পরিপন্থী হয়, তবে তা পালন করা জায়েয নয়। এমনকি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশকে নিজের সকল আশা-আকাংক্ষার চাইতেও অগ্ৰাধিকার দিতে হবে। হাদীসে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ “এমন কোন মুমিনই নেই যার পক্ষে আমি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুনিয়া ও আখেরাতে সমস্ত মানবকুলের চাইতে অধিক হিতাকাঙ্ক্ষী ও আপনজন নই। যদি তোমাদের মন চায়, তবে এর সমর্থন ও সত্যতা প্রমাণের জন্য কুরআনের আয়াত পাঠ করতে পার।” (বুখারী: ২৩৯৯)
(২) রাসূলের পূণ্যবতী স্ত্রীগণকে সকল মুসলিমের মা বলে আখ্যায়িত করার অর্থ-সম্মান ও শ্রদ্ধার ক্ষেত্রে মায়ের পর্যায়ভুক্ত হওয়া। মা-ছেলের সম্পর্ক-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আহকাম, যথা-পরস্পর বিয়ে-শাদী হারাম হওয়া, মুহরিম হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে পরস্পর পর্দা না করা এবং মীরাসে অংশীদারিত্ব প্রভৃতি এক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। যেমন, আয়াতের শেষে স্পষ্টভাবে বলে দেয়া হয়েছে। আর রাসূলের পত্নীগণের সাথে উম্মতের বিয়ে অনুষ্ঠান হারাম হওয়ার কথা অন্য এক আয়াতে ভিন্নভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। সুতরাং এক্ষেত্রে বিয়ে অনুষ্ঠান হারাম মা হওয়ার কারণেই ছিল, এমনটি হওয়া জরুরী নয়। মোটকথা: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীগণ শুধুমাত্র এ অর্থে মুমিনদের মাতা যে, তাদেরকে সম্মান করা মুসলিমদের জন্য ওয়াজিব। বাদবাকি অন্যান্য বিষয়ে তারা মায়ের মতো নন। যেমন তাদের প্রকৃত আত্মীয়গণ ছাড়া বাকি সমস্ত মুসলিম তাদের জন্য গায়ের মাহরাম ছিল এবং তাদের থেকে পর্দা করা ছিল ওয়াজিব। তাদের মেয়েরা মুসলিমদের জন্য বৈপিত্ৰেয় বোন ছিলেন না, যার ফলে তাদের সাথে মুসলিমদের বিয়ে নিষিদ্ধ হতে পারে। তাদের ভাই ও বোনেরা মুসলিমদের জন্য মামা ও খালার পর্যায়ভুক্ত ছিলেন না। কোন ব্যক্তি নিজের মায়ের তরফ থেকে যে মীরাস লাভ করে তাদের তরফ থেকে কোন অনাত্মীয় মুসলিম সে ধরনের কোন মীরাস লাভ করে না। (দেখুন: ফাতহুল কাদীর; মুয়াস্সার, বাগভী)
(৩) এ আয়াতের মাধ্যমে একটি ঐতিহাসিক চুক্তির বিধান পরিবর্তন করা হয়েছে। হিজরতের পর পরই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুমিন মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করেন। যার কারণে তাদের একজন অপরজনের ওয়ারিশ হতো। এটা ছিল ঐতিহাসিক প্রয়োজনে। তারপর যখন প্রত্যেকের অবস্থারই পরিবর্তন হলো তখন এ নীতির কার্যকারিতা রহিত করে যাবিল আরহামদেরকে তাদের স্থলাভিষিক্ত করা হলো। (তাবারী, ইবন কাসীর, ফাতহুল কাদীর; কুরতুবী, মুয়াস্সার)
(৪) এ আয়াতে বলা হয়েছে, কোন ব্যক্তি চাইলে হাদীয়া, তোহফা, উপঢৌকন বা আসিয়াতের মাধ্যমে নিজের কোন দ্বীনী ভাইকে সাহায্য করতে পারে। (ফাতহুল কাদীর)
(৬) নবী, বিশ্বাসীদের নিকট তাদের প্রাণ অপেক্ষাও অধিক প্রিয়(1) এবং তার স্ত্রীগণ তাদের মা-স্বরূপ।(2) আল্লাহর বিধান অনুসারে বিশ্বাসী ও মুহাজিরগণ অপেক্ষা যারা আত্মীয় তারাই পরস্পরের নিকটতর।(3) তবে তোমরা যদি তোমাদের বন্ধু-বান্ধবদের প্রতি দাক্ষিণ্য প্রদর্শন করতে চাও (তাহলে তা করতে পার)। (4) এ কথা গ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে।(5)
(1) নবী (সাঃ) নিজ উম্মতের জন্য যত মঙ্গলকামী ও দয়ালু ছিলেন, তা বর্ণনার মুখাপেক্ষী নয়। আল্লাহ তাআলা নবী (সাঃ)-এর দয়া ও হিতাকাঙ্ক্ষা দেখে এই আয়াতে নবী (সাঃ)-কে মু’মিনদের প্রাণ অপেক্ষাও অধিক প্রিয়, নবী (সাঃ)-এর ভালোবাসাকে অন্য সকলের ভালোবাসা অপেক্ষা উচ্চতর এবং নবী (সাঃ)-এর আদেশকে তাদের সকল ইচ্ছা ও এখতিয়ার অপেক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ বলে ঘোষণা করেছেন। এই জন্য মু’মিনদের জরুরী কর্তব্য যে, নবী (সাঃ) আল্লাহর জন্য তাদের নিকট যে মাল-ধন চাইবেন তারা তাঁকে তা সত্বর প্রদান করবে; যদিও তাদের ঐ মালের আশু প্রয়োজন থাকে। নিজেদের জীবন থেকেও নবী (সাঃ)-এর মহববত অধিক রাখতে হবে। (যেমন উমার (রাঃ)-এর ঘটনা) নবী (সাঃ)-এর আদেশকে অন্য সবার আদেশের উপর প্রাধান্য দিতে হবে এবং তাঁর আনুগত্যকে অন্য সবার আনুগত্য অপেক্ষা বেশী গুরুত্বপূর্ণ ভাবতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত (فلا وربك لا يؤمنون...) (সূরা নিসাঃ ৬৫ আয়াত)এর নির্দেশ মত নিজেকে গড়ে না তুলতে পারবে, ততক্ষণ কোন মুসলিম প্রকৃত মুসলিম হতে পারবে না। অনুরূপ যতক্ষণ তাঁর মহব্বত অন্য সকল মহব্বতের উপর বিজয়ী না হবে, ততক্ষণ (لاََيؤُمِنُ أَحْدُكُمْ حُتىَّ أُكُوْنَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِن وَّالِدِهِ وَوَلَِدِهِ...) এর নির্দেশ অনুযায়ী কেউ প্রকৃত মু’মিন হবে না। ঠিক অনুরূপ রসূল (সাঃ)-এর আনুগত্যে আলস্য, অবজ্ঞা, অবহেলা বা ত্রুটি প্রদর্শন করলেও সঠিক অর্থে মুসলিম হওয়া যায় না।
(2) অর্থাৎ, শ্রদ্ধা ও সম্মানে এবং তাঁদেরকে বিবাহ না করার ব্যাপারে তাঁরা ‘উম্মুল মু’মিনীন’ বা মু’মিন নারী-পুরুষদের মাতা।
(3) অর্থাৎ, এখন হিজরত, ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্বের বন্ধনের কারণে একে অন্যের ওয়ারেস হবে না; শুধু নিকট আত্মীয়তার কারণেই ওয়ারেস হবে।
(4) অর্থাৎ, আত্মীয় ছাড়া অন্যদের সাথে সদ্ব্যবহার ও সৌজন্য প্রদর্শন করতে পারো। তাছাড়া তাদের জন্য নিজ সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ অসিয়ত করতে পারো।
(5) অর্থাৎ, লাওহে মাহফূযে আসল হুকুম এটাই লিপিবদ্ধ আছে; যদিও কারণবশতঃ সাময়িকভাবে অন্যদেরকেও ওয়ারিস করা হয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ তাআলার ইলমে ছিল যে, তা তিনি মনসূখ (রহিত) করে দেবেন। সুতরাং তা মনসূখ করে দিয়ে পূর্ব আদেশ চালু রাখা হল।