ওয়া ইযা-গাশিয়াহুম মাওজুন কাজ্জুলালি দা‘আউল্লা-হা মুখলিসীনা লাহুদ্দীনা ফালাম্মানাজ্জা-হুম ইলাল বাররি ফামিনহুম মুকতাসিদুওঁ ওয়ামা-ইয়াজহাদুবিআ-য়া-তিনা-ইল্লাকুল্লুখাত্তা-রিন কাফূর।উচ্চারণ
আর যখন (সমুদ্রে) একটি তরঙ্গ তাদেরকে ছেয়ে ফেলে ছাউনির মতো তখন তারা আল্লাহকে ডাকে নিজেদের আনুগত্যকে একদম তাঁর জন্য একান্ত করে নিয়ে। তারপর যখন তিনি তাদেরকে উদ্ধার করে স্থলদেশে পৌঁছিয়ে দেন তখন তাদের কেউ কেউ মাঝপথ বেছে নেয়, ৫৭ আর প্রত্যেক বিশ্বাসঘাতক ও অকৃতজ্ঞ ছাড়া আর কেউ আমার নিদর্শনাবলী অস্বীকার করে না। ৫৮ তাফহীমুল কুরআন
তরঙ্গমালা যখন মেঘচ্ছায়ার মত তাদেরকে আচ্ছন্ন করে তখন তারা আল্লাহকে ডাকে ভক্তি-বিশ্বাসকে তাঁরই জন্য খালেস করে। অতঃপর তিনি যখন তাদেরকে উদ্ধার করে স্থলে নিয়ে আসেন, তখন তাদের কিছু সংখ্যক সরল পথে থাকে। (অবশিষ্ট সকলে পুনরায় শিরকে লিপ্ত হয়) আমার আয়াতসমূহ অস্বীকার করে কেবল প্রত্যেক এমন লোক, যে ঘোর বিশ্বাসঘাতক, চরম অকৃতজ্ঞ।মুফতী তাকী উসমানী
যখন তরঙ্গ তাদেরকে আচ্ছন্ন করে মেঘচ্ছায়ার মত তখন তারা আল্লাহকে ডাকে বিশুদ্ধ চিত্তে। কিন্তু যখন তিনি তাদেরকে উদ্ধার করে স্থলে পৌঁছান তখন তাদের কেহ কেহ সরল পথে থাকে। শুধু বিশ্বাসঘাতক, অকৃতজ্ঞ ব্যক্তিই তাঁর নির্দেশাবলী অস্বীকার করে।মুজিবুর রহমান
যখন তাদেরকে মেঘমালা সদৃশ তরংগ আচ্ছাদিত করে নেয়, তখন তারা খাঁটি মনে আল্লাহকে ডাকতে থাকে। অতঃপর তিনি যখন তাদেরকে স্থলভাগের দিকে উদ্ধার করে আনেন, তখন তাদের কেউ কেউ সরল পথে চলে। কেবল মিথ্যাচারী, অকৃতজ্ঞ ব্যক্তিই আমার নিদর্শনাবলী অস্বীকার করে।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
যখন তরংগ এদেরকে আচ্ছন্ন করে মেঘচ্ছায়ার মত তখন এরা আল্লাহ্কে ডাকে তার আনুগত্যে বিশুদ্ধচিত্ত হয়ে। কিন্তু যখন তিনি এদেরকে উদ্ধার করে স্থলে পৌঁছান তখন এদের কেউ কেউ সরল পথে থাকে ; কেবল বিশ্বাসঘাতক, অকৃতজ্ঞ ব্যক্তিই আমার নিদর্শনাবলী অস্বীকার করে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন
আর যখন ঢেউ তাদেরকে ছায়ার মত আচ্ছন্ন করে নেয়, তখন তারা একনিষ্ঠ অবস্থায় আনুগত্যভরে আল্লাহকে ডাকে। অতঃপর যখন তিনি তাদেরকে উদ্ধার করে স্থলে পৌঁছে দেন, তখন তাদের কেউ কেউ (ঈমান ও কুফরীর) মধ্যপথে থাকে। আর বিশ্বাসঘাতক ও কাফির ব্যক্তি ছাড়া কেউ আমার নিদর্শনাবলী অস্বীকার করে না।আল-বায়ান
ঢেউ যখন তাদেরকে (মেঘের) ছায়ার মত ঢেকে নেয়, তখন তারা আল্লাহকে ডাকতে থাকে তাঁর প্রতি একনিষ্ঠ আনুগত্যে। অতঃপর আমি যখন তাদেরকে উদ্ধার ক’রে স্থলে এনে দেই, তখন তাদের কতক ন্যায়পূর্ণ আচরণ করে। কেবল মিথ্যাচারী অকৃতজ্ঞ ব্যক্তিই আমার নিদর্শনাবলী অস্বীকার করে।তাইসিরুল
আর যখন কোনো ঢেউ তাদের ঢেকে ফেলে ঢাকনার ন্যায় তখন তারা আল্লাহ্কে ডাকে তাঁর প্রতি আনুগত্যে বিশুদ্ধাচিত্ত হয়ে। কিন্তু যখন তিনি তাদের উদ্ধার করেন তীরের দিকে, তখন তাদের মধ্যে কেউ কেউ মধ্যম পন্থায় থাকে। আর আমাদের নিদর্শনাবলী নিয়ে কেউ বচসা করে না প্রত্যেক বিশ্বাসঘাতক অকৃতজ্ঞ ব্যতীত।মাওলানা জহুরুল হক
৫৭
এর কয়েকটি অর্থ হতে পারে। মাঝপথকে যদি সরল ও সঠিক পথের অর্থে গ্রহণ করা হয় তাহলে এর অর্থ হবে, তাদের মধ্যে এমন লোক খুব কমই হয় যারা তুফানে ঘেরাও হবার পর যে তাওহীদের স্বীকৃতি দিয়েছিল সে সময় অতিক্রান্ত হবার পরও তার ওপর অবিচল থাকে এবং এ শিক্ষাটি তাদেরকে চিরকালের জন্য সত্য ও সঠিক পথযাত্রীতে পরিণত করে। আর যদি মাঝপথের অর্থ করা হয় মধ্যমপন্থা ও ভারসাম্য, তাহলে এর অর্থ হবে, তাদের মধ্যে থেকে কিছু লোক এ অভিজ্ঞতা লাভের আগের সময়ের মতো নিজেদের শিরক ও নাস্তিক্যবাদী চিন্তা-বিশ্বাসে আর তেমন একনিষ্ঠ ও শক্তভাবে টিকে থাকে না। এর দ্বিতীয় অর্থ হবে, সে সময় অতিক্রান্ত হবার পর তাদের মধ্য থেকে কিছু লোকের মধ্যে আন্তরিকতার যে অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল তা স্তিমিত হয়ে পড়ে। আল্লাহ এখানে এ দ্ব্যর্থক বাক্যাংশটি এ তিনটি অবস্থার প্রতি ইঙ্গিত করার জন্যই ব্যবহার করেছেন, এটারই সম্ভাবনা বেশি। তবে উদ্দেশ্য সম্ভবত একথা বলা যে, সামুদ্রিক ঝড়ের সময় সবার টনক নড়ে যায় এবং বুদ্ধি ঠিকমত কাজ করে। তখন তারা শিরক ও নাস্তিক্যবাদ পরিহার করে সবাই এক আল্লাহকে ডাকতে থাকে সাহায্যের জন্য। কিন্তু নিরাপদে উপকূলে পৌঁছে যাবার পর স্বল্প সংখ্যক লোকই এ অভিজ্ঞতা থেকে কোন স্থায়ী শিক্ষা লাভ করে। আবার এ স্বল্প সংখ্যক লোকেরাও তিনভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। একদল, যারা চিরকালের জন্য শুধরে যায়। দ্বিতীয় দলের কুফরীর মধ্যে কিছুটা সমতা আসে। তৃতীয় দলটি এমন পর্যায়ের যাদের মধ্যে উক্ত সাময়িক ও জরুরী সময়কালীন আন্তরিকতার কিছু না কিছু বাকি থাকে।
৫৮
এর আগের আয়াতে যে দু’টি গুণের বর্ণনা এসেছে তার মোকাবিলায় এখানে এ দু’টি দোষের উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্বাসঘাতক এমন এক ব্যক্তি যে মারাত্মক রকমের বেঈমানী করে এবং নিজের প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার পালন করে না। আর অকৃতজ্ঞ হচ্ছে এমন এক ব্যক্তি যার প্রতি যতই অনুগ্রহ করা হোক না কেন সে তা কখনোই স্বীকার করে না এবং নিজের অনুগ্রহকারীর প্রতি আগ্রাসী আচরণ করে। এসব দোষ যাদের মধ্যে পাওয়া যায় তারা বিপদ উত্তীর্ণ হবার পর নিঃসংকোচে নিজেদের কুফরী, নাস্তিকতা ও শিরকের দিকে ফিরে যায়। ঝড়-তুফানের সময় তারা আল্লাহর অস্তিত্বের এবং একক আল্লাহর অস্তিত্বের কিছু চিহ্ন ও নিদর্শন বাইরে ও নিজেদের মনের মধ্যেও পেয়েছিল এবং এ সত্যের স্বতঃস্ফুর্ত অনুভূতিই তাদেরকে আল্লাহর শরণাপন্ন হতে উদ্বুদ্ধ করেছিল একথা তারা মানতে চায় না। তাদের মধ্যে যারা নাস্তিক তারা তাদের এ কাজের যে ব্যাখ্যা দিয়ে থাকে তা হচ্ছে এই যে, এ তো ছিল একটা দুর্বলতা। কঠিন বিপদের সময় অস্বাভাবিক অবস্থায় আমরা এ দুর্বলতার শিকার হয়েছিলাম। নয়তো আসলে আল্লাহ বলতে কিছুই নেই। ঝড়-তুফানের মুখ থেকে কোন আল্লাহ আমাদের বাঁচায়নি। অমুক অমুক কারণে ও উপায়ে আমরা বেঁচে গেছি। আর মুশরিকরা তো সাধারণভাবেই বলে থাকে, অমুক অমুক সাধুবাবা অথবা দেবী ও দেবতার ছায়া আমাদের মাথার ওপর ছিল। তাদের কল্যাণেই আমরা এ যাত্রায় রক্ষা পেয়েছি। কাজেই তীরে পৌঁছেই তারা নিজেদের মিথ্যা উপাস্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে থাকে এবং তাদের দরজায় গিয়ে শিন্নী চড়াতে থাকে। তাদের মনে এ চিন্তার উদয়ই হয় না যে, যখন সবদিকের সব আশা-ভরসা-সহায় ছিন্ন ও নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল তখন একমাত্র এক লা-শরীক আল্লাহ ছাড়া আর কেউ ছিল না এবং তারই শরণাপন্ন তারা হয়েছিল।
৩২. আর যখন তরঙ্গ তাদেরকে আচ্ছন্ন করে ছায়ার মত(১), তখন তারা আল্লাহকে ডাকে তাঁর আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে। অতঃপর যখন তিনি তাদেরকে উদ্ধার করে স্থলে পৌছান। তখন তাদের কেউ কেউ মাঝামাঝি অবস্থানে থাকে(২); আর শুধু বিশ্বাসঘাতক, কাফির ব্যক্তিই আমাদের নিদর্শনাবলীকে অস্বীকার করে।(৩)
(১) এখানে মেঘের ছায়া উদ্দেশ্য হতে পারে, আবার পাহাড় বা অনুরূপ বড় কিছুর ছায়াও উদ্দেশ্য হতে পারে। (কুরতুবী, মুয়াস্সার)
(২) অর্থাৎ তখন তাদের মধ্যে একদল মাঝামাঝি অবস্থানে থাকে, আল্লাহর সত্যিকার শোকর আদায় করে না। আর তাদের মধ্যে আরেক দল সম্পূর্ণভাবে শির্ক ও কুফরি করে। তারা আল্লাহর নেয়ামতকে অস্বীকার করে। (জালালাইন; সা’দী; মুয়াস্সার) আয়াতে আল্লাহ তা'আলা প্ৰথম দলের বর্ণনার পর দ্বিতীয় দলের বর্ণনা করেননি। কারণ, পরবর্তী বাক্য থেকে অপর দলটির অবস্থান বোঝা যাচ্ছে।
(৩) বিশ্বাসঘাতক এমন এক ব্যক্তি যে মারাত্মক রকমের বেঈমানী করে এবং নিজের প্রতিশ্রুতি ও অংগীকার পালন করে না। (ইবন কাসীর)
(৩২) পর্বত (বা মেঘ)মালা সম তরঙ্গমালা যখন ওদেরকে ঢেকে নিতে চায়, তখন ওরা আল্লাহর আনুগত্যে বিশুদ্ধ-চিত্ত হয়ে তাঁকে ডাকে।(1) কিন্তু তিনি যখন ওদেরকে কূলে ভিড়িয়ে উদ্ধার করেন, তখন ওদের কেউ কেউ সরল পথে থাকে।(2) কেবল বিশ্বাসঘাতক অকৃতজ্ঞ ব্যক্তিই নিদর্শনাবলী অস্বীকার করে।(3)
(1) অর্থাৎ, যখন তাদের জলজাহাজকে মেঘ ও পাহাড়ের মত ঢেউ এসে ঘিরে নেয় এবং মৃত্যুর পঞ্জা তাদেরকে গ্রাস করে ফেলছে মনে হয়, তখন পৃথিবীর সকল উপাস্য তাদের মন থেকে মুছে যায় এবং একমাত্র আসমানী উপাস্যকে তারা ডাকতে শুরু করে, যিনি প্রকৃত ও বাস্তব উপাস্য।
(2) কেউ কেউ (مقتصدٌ) এর অর্থ ‘অঙ্গীকার পালনকারী’ বলেছেন। অর্থাৎ অনেকে ঈমান, তাওহীদ ও আনুগত্যের যে অঙ্গীকার সামুদ্রিক তুফানী ঢেউয়ের সময় করেছিল তার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে। তাদের নিকট উক্ত বাক্যে কিছু শব্দ ঊহ্য আছে, আর তা হল, (فمنهم مقتصدٌ ومنهم كافرٌ) অর্থাৎ, তখন ওদের মধ্যে কেউ বিশ্বাসী হয় এবং কেউ অবিশ্বাসী হয়। (ফাতহুল ক্বাদীর) অন্য মুফাসসিরদের নিকট এর অর্থ হল ‘মধ্যম পন্থা অবলম্বনকারী’ আর তা আপত্তি স্বরূপ বলা হয়েছে। অর্থাৎ এমন সঙ্কটময় অবস্থা ও আল্লাহর এমন বৃহৎ নিদর্শন চাক্ষুষ দর্শন করে এবং পরিত্রাণরূপ আল্লাহর অনুগ্রহ পাওয়ার পরেও মানুষ এখনো আল্লাহর পরিপূর্ণ ইবাদত ও আনুগত্য করে না; বরং মধ্যবর্তী পথ অবলম্বন করে? অথচ যে পরিস্থিতির সম্মুখীন সে হয়েছিল, তাতে পরিপূর্ণ ইবাদতে রত হওয়ার কথা ছিল; মধ্যবর্তী ইবাদতে রত হওয়ার কথা নয়। (ইবনে কাসীর) তবে প্রথমোক্ত অর্থটিই পূর্বাপর বাগধারার সাথে অধিক সামঞ্জস্যশীল।
(3) ختاَّر এর অর্থ হল বিশ্বাসঘাতক, চুক্তি ভঙ্গকারী, كَفُوْر অকৃতজ্ঞ ব্যক্তি।