ٱلَّذِينَ يَنقُضُونَ عَهۡدَ ٱللَّهِ مِنۢ بَعۡدِ مِيثَٰقِهِۦ وَيَقۡطَعُونَ مَآ أَمَرَ ٱللَّهُ بِهِۦٓ أَن يُوصَلَ وَيُفۡسِدُونَ فِي ٱلۡأَرۡضِۚ أُوْلَـٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡخَٰسِرُونَ

আল্লাযীনা ইয়ানকুদূ না ‘আহদাল্লা-হি মিম বা‘দি মীছা-কিহী ওয়া ইয়াকতা‘ঊনা মা আমারল্লাহু বিহীআইঁ ইউসালা ওয়া ইউফছিদূ না ফিল আরদিউলাইকা হুমুল খাছিরূন।উচ্চারণ

আর তিনি গোমরাহীর মধ্যে তাদেরকেই নিক্ষেপ করেন যারা ফাসেক, ৩০ যারা আল্লাহর সাথে মজবুতভাবে অঙ্গীকার করার পর আবার তা ভেঙ্গে ফেলে, ৩১ আল্লাহ যাকে জোড়ার হুকুম দিয়েছেন তাকে কেটে ফেলে ৩২ এবং যমীনে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করে চলে। ৩৩ আসলে এরাই হবে ক্ষতিগ্রস্ত। তাফহীমুল কুরআন

সেই সকল লোক, যারা আল্লাহর সঙ্গে কৃত প্রতিশ্রুতিকে পরিপক্ক করার পরও ভেঙ্গে ফেলে #%২৬%# এবং আল্লাহ যেই সম্পর্ককে যুক্ত রাখতে আদেশ করেছেন তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে অশান্তি বিস্তার করে। #%২৭%# বস্তুত এমন সব লোকই অতি ক্ষতিগ্রস্ত।মুফতী তাকী উসমানী

যারা আল্লাহর সঙ্গে দৃঢ়ভাবে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে এবং ঐ সব সম্বন্ধ ছিন্ন করে যা অবিচ্ছিন্ন রাখতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন এবং যারা ভূপৃষ্ঠে বিবাদ সৃষ্টি করে তারাই পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত।মুজিবুর রহমান

(বিপথগামী ওরাই) যারা আল্লাহর সঙ্গে অঙ্গীকারাবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে এবং আল্লাহ পাক যা অবিচ্ছিন্ন রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন, তা ছিন্ন করে, আর পৃথিবীর বুকে অশান্তি সৃষ্টি করে। ওরা যথার্থই ক্ষতিগ্রস্ত।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

যারা আল্লাহ্ র সঙ্গে দৃঢ় অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে, যে সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখতে আল্লাহ্ আদেশ করেছেন তা ছিন্ন করে আর দুনিয়ায় অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায়, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত। ইসলামিক ফাউন্ডেশন

যারা আল্লাহর দৃঢ়কৃত অঙ্গীকার ভঙ্গ করে এবং আল্লাহ যা জোড়া লাগানোর নির্দেশ দিয়েছেন তা ছিন্ন করে এবং যমীনে ফাসাদ করে। তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।আল-বায়ান

যারা আল্লাহর সঙ্গে সুদৃঢ় অঙ্গীকার করার পর তা ভঙ্গ করে এবং যে সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখার নির্দেশ আল্লাহ করেছেন, তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।তাইসিরুল

যারা আল্লাহ্‌র চুক্তি ভঙ্গ করে এর সুদৃঢ়ীকরণ হবার পরেও, আর কেটে দেয় যা এর দ্বারা বহাল রাখার জন্য আল্লাহ্ আদেশ করেছিলেন, আর পৃথিবীতে ফসাদ সৃষ্টি করে। তারা নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।মাওলানা জহুরুল হক

তাফহীমুল কুরআন

৩০

ফাসেক তাকে বলে যে নাফরমান এবং আল্লাহর আনুগত্যের সীমা অতিক্রম করে যায়।

৩১

বাদশাহ নিজের কর্মচারী ও প্রজাদের নামে যে ফরমান বা নির্দেশনামা জারী করেন আরবী ভাষায় প্রচলিত কথ্যরীতিতে তাকে বলা হয় ‘আহদ’ বা অঙ্গীকার। কারণ এই অঙ্গীকার মেনে চলা হয় প্রজাদের অপরিহার্য কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত। এখানে অঙ্গীকার শব্দটি এ অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। আল্লাহর অঙ্গীকার অর্থ হচ্ছে, তাঁর স্থায়ী ফরমান। এই ফরমানের দৃষ্টিতে বলা যায়, সমগ্র মানবজাতি একমাত্র তাঁরই বন্দেগী, আনুগত্য ও পূজা-উপাসনা করার জন্য আদিষ্ট ও নিযুক্ত হয়েছে। ‘মজবুতভাবে অঙ্গীকার করার পর’—কথাটি বলে আসলে হযরত আদম আলাইহিস সালামের সৃষ্টির সময় সমগ্র মানবাত্মার নিকট থেকে এ ফরমানটির আনুগত্য করার যে অঙ্গীকার নেয়া হয়েছিল সেদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। সূরা আ'রাফ-এর ১৭২ আয়াতে এই অঙ্গীকারের ওপর তুলনামূলকভাবে অনেক বেশী বিস্তারিত আলোকপাত করা হয়েছে।

৩২

অর্থাৎ যেসব সম্পর্ককে শক্তিশালী ও প্রতিষ্ঠিত করার ওপর মানুষের ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক কল্যাণ নির্ভর করে এবং আল্লাহ‌ যেগুলোকে ত্রুটিমুক্ত রাখার হুকুম দিয়েছেন, তার ওপর এরা অস্ত্র চালায়। এই সংক্ষিপ্ত বাক্যটির মধ্যে রয়েছে অর্থের অশেষ ব্যাপকতা। ফলে দু’টি মানুষের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক থেকে শুরু করে সমগ্র বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে যে মানবিক সভ্যতা, সংস্কৃতি ও নৈতিকতার বিশাল জগত তার সমগ্র অবয়বও এই অর্থের আওতাধীন এসে যায়। সম্পর্ক কেটে ফেলার অর্থ নিছক মানবিক সম্পর্কচ্ছেদ নয় বরং সঠিক ও বৈধ সম্পর্ক ছাড়া অন্য যত প্রকারের সম্পর্ক কায়েম করা হবে তা সবই এর অন্তর্ভুক্ত হবে। কারণ অবৈধ ও ভুল সম্পর্কের পরিণতি এবং সম্পর্কচ্ছেদের পরিণতি একই। অর্থাৎ এর পরিণতিতে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক খারাপ হয় এবং নৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা হয় ধ্বংসের মুখোমুখি।

৩৩

এই তিনটি বাক্যের মধ্যে ফাসেকী ও ফাসেকের চেহারা পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে। আল্লাহ‌ ও বান্দার মধ্যকার সম্পর্ক এবং মানুষ ও মানুষের মধ্যকার সম্পর্ক ছিন্ন বা বিকৃত করার অনিবার্য পরিণতি হচ্ছে বিপর্যয়। আর যে ব্যক্তি এ বিপর্যয় সৃষ্টি করে সেই হচ্ছে ফাসেক।

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে এ প্রতিশ্রুতি দ্বারা ‘আলাস্তু’-এর প্রতিশ্রুতি বোঝানো হয়েছে, অর্থাৎ ‘আমি কি তোমাদের রব্ব নই’- যা সূরা আরাফে বর্ণিত হয়েছে (৭ : ১৭২)। সেখানেই এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা হবে। এখানে এতটুকু বুঝে নেওয়াই যথেষ্ট যে, আল্লাহ তাআলা মানুষকে সৃষ্টি করার বহু আগে সমস্ত রূহকে একত্র করেন। তারপর তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই? তখন সকলেই আল্লাহ তাআলার প্রতিপালকত্বের কথা স্বীকার করে নিয়ে এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, তারা তাঁর আনুগত্য করবে। এ আয়াতে যে প্রতিশ্রুতিকে পরিপক্ক করার কথা বলা হয়েছে, তার অর্থ এই যে, প্রতি যুগে আল্লাহ তাআলার রাসূলগণ আসতে থাকেন এবং তারা মানুষকে সেই আদি প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আল্লাহ তাআলাই যে সকলের স্রষ্টা ও মালিক তার অনুকূলে দলীল-প্রমাণ প্রদর্শন করতে থাকেন। ফলে সে প্রতিশ্রুতি আরও দৃঢ় ও পরিপক্ক হয়ে ওঠে। এই প্রতিশ্রুতির আরও একটি ব্যাখ্যা করা সম্ভব। তা এই যে, এর দ্বারা সেই কর্মগত ও নীরব প্রতিশ্রুতি (Lacit Covenant) বোঝানো হয়েছে, যা প্রতিটি মানুষ তার জন্ম মাত্রই নিজ প্রতিপালকের সঙ্গে করে থাকে। এর উদাহরণ- যে ব্যক্তি যেই দেশে জন্মগ্রহণ করে, সে সেই দেশের নাগরিক হওয়ার সুবাদে এই নীরব প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকে যে, সে সে দেশের সকল আইন মেনে চলবে। সে মুখে কিছু না বললেও কোনও দেশে তার জন্মগ্রহণ করাটাই এ প্রতিশ্রুতির স্থলাভিষিক্ত। এভাবেই যে ব্যক্তি পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করে, সে আপনা আপনিই তার প্রতিপালকের সঙ্গে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে যায় যে, সে তার হিদায়াত অনুসারে জীবন যাপন করবে। এ প্রতিশ্রুতির জন্য মুখে কিছু বলার প্রয়োজন নেই। খুব সম্ভব এ কারণেই এর পরপরই আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, তোমরা কি করেই বা আল্লাহ তাআলার সাথে কুফরী কর্মপন্থা অবলম্বন কর, অথচ তোমরা ছিলে নিষ্প্রাণ, তারপর তিনিই তোমাদেরকে জীবন দান করেছেন’? অর্থাৎ যদি সামান্য একটু চিন্তা কর, তবে ‘কেউ তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন’, এই এতটুকু বিষয়ই তোমাদের পক্ষ হতে একটা প্রতিশ্রুতির মর্যাদা রাখে এবং এর ফলে তাঁর নিয়ামতের স্বীকারোক্তি প্রদান এবং তাঁর প্রদত্ত পথ অবলম্বন তোমাদের জন্য অপরিহার্য হয়ে যায়। অন্যথায় এটা কেমন বুদ্ধিমত্তা ও কেমন বিচার-বিবেচনার কাজ যে, সৃষ্টি তো করলেন আল্লাহ তাআলা আর আনুগত্য করা হবে অন্য কারও? এই নীরব অঙ্গীকারকে ‘পাকাপোক্ত করা’র দ্বারা বোঝানো হচ্ছে যে, আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী-রাসূলগণের মাধ্যমে তোমাদেরকে অবিরত এই প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিতে থাকেন। নবীগণ তোমাদের সামনে এমন মজবুত দলীল-প্রমাণ পেশ করেছেন, যা দ্বারা এ প্রতিশ্রুতি আরও পাকাপোক্ত হয়ে গেছে যে, সকল ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার আনুগত্য করাই মানুষের কর্তব্য।

তাফসীরে জাকারিয়া

২৭. যারা আল্লাহর সাথে দৃঢ় অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে, আর যে সম্পর্ক অক্ষুন্ন রাখতে আল্লাহ আদেশ করেছেন তা ছিন্ন করে এবং যমীনের উপর ফাসাদ সৃষ্টি করে বেড়ায়(১), তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।

১. আবুল আলীয়া বলেন, এটি মুনাফিকদের ছয়টি স্বভাবের অন্তর্গত। তারা কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে খেলাফ করে, আমানত রাখলে খিয়ানত করে, সাথে সাথে আয়াতে বর্ণিত তিনটি কাজ, অর্থাৎ আল্লাহর সাথে দৃঢ় অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে, আর আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং যমীনের উপর ফাসাদ সৃষ্টি করে বেড়ায়। (আত-তাফসীরুস সহীহ)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

২৭। যারা আল্লাহর সাথে দৃঢ় অঙ্গীকারে (1) আবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে, যে সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখতে আল্লাহ আদেশ করেছেন তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায়, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত। (2)

(1) মুফাসসিরীনগণ عَهد (অঙ্গীকার) শব্দের বিভিন্ন অর্থ বর্ণনা করেছেন। যেমন, (ক) আল্লাহ তাআলার সেই অসিয়ত যা তিনি তাঁর সকল আদেশ পালন এবং নিষিদ্ধ বর্জন করার ব্যাপারে আম্বিয়া (আলাইহিমুসসালাম)-দের মাধ্যমে সৃষ্টিকুলকে করেছেন। (খ) আহলে কিতাবের নিকট থেকে তাওরাতে নেওয়া অঙ্গীকার। আর তা হল, শেষ নবী (সাঃ)-এর আগমনের পর তাঁর সত্যায়ন করা এবং তাঁর নবুঅতের উপর ঈমান আনা তোমাদের জন্য অত্যাবশ্যক হবে। (গ) যে অঙ্গীকার আদমের পৃষ্ঠদেশ থেকে বের করার পর সকল আদম-সন্তানদের নিকট থেকে নেওয়া হয়েছে এবং যার উল্লেখ ক্বুরআন মাজীদে করা হয়েছে। {وَإِذْ أَخَذَ رَبُّكَ مِنْ بَنِي آَدَمَ مِنْ ظُهُورِهِمْ} (আর যখন তোমার পালনকর্তা আদমের পৃষ্ঠদেশ থেকে বের করলেন---সূরা আ’রাফ ১৭২ আয়াত) আর অঙ্গীকার ভঙ্গের অর্থ তার কোন পরোয়া না করা। (ইবনে কাসীর)

(2) এটা তো পরিষ্কার কথা যে, ক্ষতি আল্লাহর অবাধ্যজনদেরই হবে। এতে আল্লাহর, তাঁর নবীদের এবং দ্বীনের প্রতি আহবানকারীদের কিছুই হবে না।