وَلَقَدۡ أَرۡسَلۡنَا نُوحًا إِلَىٰ قَوۡمِهِۦ فَلَبِثَ فِيهِمۡ أَلۡفَ سَنَةٍ إِلَّا خَمۡسِينَ عَامٗا فَأَخَذَهُمُ ٱلطُّوفَانُ وَهُمۡ ظَٰلِمُونَ

ওয়া লাকাদ আরছালনা-নূহান ইলা-কাওমিহী ফালাবিছা ফীহিম আলফা ছানাতিন ইল্লাখামছীনা ‘আ-মান ফাআখাযা হুমুততূফা-নুওয়াহুম জা-লিমূন।উচ্চারণ

আমি নূহকে তাদের সম্প্রদায়ের কাছে পাঠাই ২১ এবং সে তাদের মধ্যে থাকে পঞ্চাশ কম এক হাজার বছর। ২২ শেষ পর্যন্ত তুফান তাদেরকে ঘিরে ফেলে এমন অবস্থায় যখন তারা জালেম ছিল। ২৩ তাফহীমুল কুরআন

আমি নূহকে তার সম্প্রদায়ের কাছে পাঠিয়েছিলাম। সে তাদের মধ্যে অবস্থান করেছিল পঞ্চাশ কম হাজার বছর। অতঃপর প্লাবন তাদেরকে গ্রাস করল, যেহেতু তারা ছিল জালেম।মুফতী তাকী উসমানী

আমিতো নূহকে তার সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরণ করেছিলাম এবং সে তাদের মধ্যে পঞ্চাশ কম হাজার বছর অবস্থান করেছিল। অতঃপর প্লাবন তাদেরকে গ্রাস করে। কারণ তারা ছিল সীমালংঘনকারী।মুজিবুর রহমান

আমি নূহ (আঃ) কে তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে প্রেরণ করেছিলাম। তিনি তাদের মধ্যে পঞ্চাশ কম এক হাজার বছর অবস্থান করেছিলেন। অতঃপর তাদেরকে মহাপ্লাবণ গ্রাস করেছিল। তারা ছিল পাপী।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

আমি তো নূহ্কে তার সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরণ করেছিলাম। সে এদের মধ্যে অবস্থান করেছিল পঞ্চাশ কম হাজার বৎসর। এরপর প্লাবন এদেরকে গ্রাস করে ; কারণ এরা ছিল সীমালংঘনকারী। ইসলামিক ফাউন্ডেশন

আর আমি অবশ্যই নূহকে তার কওমের নিকট প্রেরণ করেছিলাম। সে তাদের মধ্যে পঞ্চাশ কম এক হাজার বছর অবস্থান করেছিল। অতঃপর মহা-প্লাবন তাদের গ্রাস করল, এমতাবস্থায় যে তারা ছিল যালিম।আল-বায়ান

আমি নূহকে তার সম্প্রদায়ের কাছে পাঠিয়েছিলাম, অতঃপর সে পঞ্চাশ বছর কম হাজার বছর তাদের মাঝে অবস্থান করেছিল। অতঃপর মহাপ্লাবন তাদেরকে গ্রাস করল কারণ তারা ছিল সীমালঙ্ঘনকারী।তাইসিরুল

আর ইতিপূর্বে আমরা অবশ্যই নূহ্‌কে পাঠিয়েছিলাম তাঁর লোকদের কাছে, তিনি তখন তাদের মধ্যে অবস্থান করেছিলেন পঞ্চাশ বছর কম এক হাজার বৎসর। তখন মহাপ্লাবন তাদের পাকড়াও করল, যেহেতু তারা ছিল অত্যাচারী।মাওলানা জহুরুল হক

তাফহীমুল কুরআন

২১

তুলনামূলক অধ্যয়নের জন্য দেখুন সূরা আলে ইমরানঃ ৩৩-৩৪, আন নিসাঃ ১৬৩, আল আনআমঃ ৮৪, আল আ’রাফঃ ৫৯-৬৪, ইউনুসঃ ৭১ ও ৭৩, হূদঃ ২৫ ও ৪৮, আল আম্বিয়াঃ ৭৬-৭৭, আল মু’মিনুনঃ ২৩ ও ৩০, আল ফুরকানঃ ৩৭, আশ শুআরাঃ ১০৫-১২৩ আস সফ্‌ফাতঃ ৭৫ ও ৮২, আল কামারঃ ৯০, আল হাককাহঃ ১১-১২ আয়াত এবং সূরা নূহ সম্পূর্ণ।

যে পটভূমিতে এখানে এ কাহিনী বর্ণনা করা হচ্ছে তা অনুধাবন করতে হলে সূরার প্রথম দিকের আয়াতগুলোর সামনে রাখতে হবে। সেখানে একদিকে মু’মিনদেরকে বলা হয়েছে, তোমাদের আগে যেসব মু’মিন অতিক্রান্ত হয়েছে তাদেরকে আমি পরীক্ষার সম্মুখীন করেছি। অন্যদিকে জালেম কাফেরদেরকে বলা হয়েছে, তোমরা আমাকে ছাড়িয়ে চলে যাবে এবং আমার পাকড়াও থেকে বেঁচে যাবে, এ ভুল ধারণা পোষণ করো না। এ দু’টি কথা উপলব্ধি করার জন্য এ ঐতিহাসিক ঘটনা বর্ণনা করা হচ্ছে।

২২

এর অর্থ এই নয় যে, হযরত নূহের বয়স ছিল সাড়ে ন’ শ বছর। বরং এর অর্থ হচ্ছে নবুয়তের দায়িত্বলাভ করার পর থেকে মহাপ্লাবন পর্যন্ত সাড়ে ন’শ বছর হযরত নূহ এই জালেম ও গোমরাহ জাতির সংশোধনের প্রচেষ্টা চালাতে থাকেন এবং এ দীর্ঘ সময় পর্যন্ত তাদের জুলুম-নির্যাতন বরদাশত করার পরও তিনি হিম্মতহারা হননি। এখানে এ জিনিসটি বর্ণনা করাই উদ্দেশ্য যে, মু’মিনদেরকে বলা হচ্ছে, তোমরাতো মাত্র পাঁচ বছর থেকে জুলুম-নির্যাতন সহ্য করছো এবং একটি গোমরাহ জাতির হঠকারিতা বরদাশত করে চলছো কিন্তু আমার এ বান্দা যে অনবরত সাড়ে ন’শ বছর ধরে এসবের মোকাবিলা করেছে তার সবর ও দৃঢ়তার কথা ভেবে দেখো।

হযরত নূহের বয়সের ব্যাপারে কুরআন মাজীদ ও বাইবেলের বর্ণনায় পার্থক্য রয়েছে। বাইবেল বলে তার বয়স ছিল সাড়ে ন’শ বছর। তার বয়স যখন ছ’শ বছর তখন প্লাবন আসে। এরপর তিনি আর সাড়ে তিনশো বছর জীবিত থাকেন। (আদি পুস্তক ৭: ৬, ৯: ২৮-২৯) কিন্তু কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী তার বয়স এক হাজার বছর হওয়া উচিত। কারণ সাড়ে ন’শ বছর তো হচ্ছে শুধুমাত্র নবুয়তের দায়িত্বে আসীন হবার পর থেকে নিয়ে প্লাবন শুরু হওয়া পর্যন্তকার সময়টি। এ সময়-কালটি তিনি ব্যয় করেন দ্বীনের দাওয়াত দেবার ও তার প্রচারের কাজে। একথা সুস্পষ্ট, জ্ঞান ও বুদ্ধিও ক্ষেত্রে তিনি পরিপক্কতা অর্জন করেছেন এমন এক বয়সেই তিনি নবুয়ত লাভ করেন এবং প্লাবনের পরও তিনি কিছুকাল জীবিত থেকে থাকবেন। এত দীর্ঘকাল বেঁচে থাকা অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়। কিন্তু আল্লাহর এ বিশ্বে বিস্ময়কর ঘটনাবলীর অভাব নেই। যেদিকেই তাকানো যাবে তার অসীম ক্ষমতার নিদর্শনই অস্বাভাবিক ঘটনাবলীর আকারে দৃষ্টিগোচর হবে। কিছু ঘটনা ও অবস্থার প্রথমত একটি বিশেষ আকারে আত্মপ্রকাশ করে যেতে থাকাটা এমন কোন যুক্তি পেশ করে না ফলে একথা মনে করা যেতে পারে যে, অন্য কোন অস্বাভাবিক অবস্থায় ভিন্নধর্মী কোন ঘটনা আত্মপ্রকাশ করতে পারে না। এ পর্যায়ের ধারণাগুলোর ভিত ধসিয়ে দেবার জন্য বিশ্ব-জাহানের বিভিন্ন স্থানে এবং সৃষ্টির প্রত্যেকটি প্রজাতির মধ্যে অস্বাভাবিক অবস্থা ও ঘটনাবলীর একটি দীর্ঘ তালিকা রয়েছে। বিশেষ করে যে ব্যক্তির মনে আল্লাহর অসীম শক্তিশালী হবার সুস্পষ্ট ধারণা রয়েছে সে কখনো জীবন মৃত্যুও স্রষ্টা আল্লাহর পক্ষে কোন মানুষকে এক হাজার বছর বা তার চেয়ে কম-বেশি বয়স দান করা সম্ভব নয়, এ ধরনের কোন ভুল ধারণা পোষণ করতে পারে না। আসলে মানুষ নিজে চাইলেও এক মুহূর্তের জন্যও জীবিত থাকতে পারে না। কিন্তু আল্লাহ‌ চাইলে যতদিন যত বছর চান তাকে জীবিত রাখতে পারেন।

২৩

অর্থাৎ তারা নিজেদের জুলুম-নিপীড়ন চালিয়ে যেতে থাকা অবস্থায় মহাপ্লাবনের গ্রাসে পরিণত হয়। অন্য কথায়, যদি মহাপ্লাবন আসার আগে তারা নিজেদের জুলুম-নিপীড়ন থেকে বিরত হতো তাহলে আল্লাহ‌ তাদের ওপর এ আযাব পাঠাতেন না।

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

তাফসীরে জাকারিয়া

১৪. আর আমরা তো নুহকে তার সস্প্রদায়ের কাছে পাঠিয়েছিলাম।(১) তিনি তাদের মধ্যে অবস্থান করেছিলেন পঞ্চাশ কম হাজার বছর। অতঃপর প্লাবন তাদেরকে গ্ৰাস করে; এমতাবস্থায় যে তারা ছিল যালিম।(২)

(১) পূর্ববর্তী আয়াতসমূহে কাফেরদের বিরোধিতা ও মুসলিমদের উপর নির্যাতনমূলক অবস্থা বর্ণিত হয়েছিল। আলোচ্য আয়াতসমূহে নির্যাতনমূলক ঘটনাবলীর পরিপ্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে সান্তনা দেয়ার জন্যে পূর্ববর্তী নবীগণ ও তাদের উম্মতের কিছু অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে। (দেখুন: ইবন কাসীর) উদ্দেশ্য এই যে, প্রাচীনকাল থেকেই সত্যপন্থীদের উপর কাফেরদের তরফ থেকে নির্যাতনের ধারা অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু এসব-উৎপীড়নের কারণে তারা কোন সময় সাহস হারাননি। মুমিনদের উচিত কাফেরদের উৎপীড়নের পরওয়া না করা। পূর্ববর্তী নবীগণের মধ্যে সর্বপ্রথম নূহ আলাইহিস সালাম-এর কাহিনী উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথমত: এর কারণ এই যে, তিনিই প্রথম নবী, যিনি কুফর ও শিরকের মোকাবেলা করেছেন। দ্বিতীয়ত: তার সম্প্রদায়ের তরফ থেকে তিনি যতটুকু নির্যাতিত হয়েছিলেন, অন্য কোন নবী ততটুকু হননি। কেননা, আল্লাহ্ তা'আলা তাকে বিশেষভাবে সুদীর্ঘ জীবন দান করেছিলেন এবং তার সমস্ত জীবন কাফেরদের নিপীড়নের মধ্যে অতিবাহিত হয়।

কুরআনের এ সূরায় বর্ণিত তার বয়স সাড়ে নয়শ' বছর তো অকাট্য ও নিশ্চিতই। কোন কোন বর্ণনায় আছে যে, এটা তার প্রচার ও দাওয়াতের বয়স। এর আগে এবং প্লাবনের পরেও তার আরও বয়স আছে। (ফাতহুল কাদীর) মোটকথা, এই অসাধারণ সুদীর্ঘ বয়স অবিরাম দাওয়াত ও তাবলীগে ব্যয় করা এবং প্রতিক্ষেত্রেই কাফেরদের তরফ থেকে নানারকম উৎপীড়ন সহ্য করা সত্বেও কোন সময় সাহস না হারানো—এগুলো সব নূহ আলাইহিস সালাম-এরই বৈশিষ্ট্য। এখানে এ জিনিসটি বর্ণনা করাই উদ্দেশ্য যে, হে মুহাম্মাদ! আপনি কাফের মুশরিকদের অবাধ্যতায় আফসোস করে নিজেকে ক্ষতিগ্ৰস্ত করবেন না। কারণ হেদায়াত আল্লাহর হাতে তিনি যাকে ইচ্ছা হেদায়াত করবেন আর যাকে ইচ্ছে হেদায়াত থেকে দূরে রাখবেন। আপনার দায়িত্ব তো তাবলীগের মাধ্যমেই সমাপ্ত হবে। তবে এটা জেনে রাখুন যে, আল্লাহ আপনার দ্বীনকে জয়ী করবেন। আপনার শক্ৰদের বিনাশ করবেন। (ইবন কাসীর)

আর আয়াতের মাধ্যমে মুমিনদের হেদায়াত দেয়া হচ্ছে যে, তোমরা তো মাত্ৰ পাঁচ বছর থেকে জুলুম-নির্যাতন সহ্য করছো এবং একটি গোমরাহ জাতির হঠকারিতা বরদাশত করে চলছো। কিন্তু আমার এ বান্দা যে অনবরত সাড়ে নয়শ’ বছর ধরে এসবের মোকাবিলা করেছে তার সবর ও দৃঢ়তার কথা ভেবে দেখো। তুলনামূলক অধ্যয়নের জন্য দেখুন সূরা আলে ইমরান: ৩৩–৩৪; সূরা আন নিসা: ১৬৩; সূরা আল আন’আম: ৮৪; সূরা আল-আ’রাফ: ৫৯ থেকে ৬৪; সূরা ইউনুস: ৭১ ও ৭৩; সূরা হূদ: ২৫ ও ৪৮; সূরা আল আম্বিয়া: ৭৬ ও ৭৭; সূরা আল মুমিনুন: ২৩ ও ৩০; সূরা আল ফুরকান: ৩৭; সূরা আশ শো'আরা: ১০৫ থেকে ১২৩; সূরা আস সাফ্‌ফাত: ৭৫ ও ৮২; সূরা আল কামার: ৯০; সূরা আল হাক্কাহ: ১১ ও ১২ আয়াত এবং সূরা নূহ সম্পূর্ণ।

(২) অর্থাৎ তারা নিজেদের যুলুম-নিপীড়ন চালিয়ে যেতে থাকা অবস্থায় মহাপ্লাবনের গ্রাসে পরিণত হয়। যদি মহাপ্লাবন আসার আগে তারা নিজেদের যুলুম-নিপীড়ন থেকে বিরত হতো তাহলে আল্লাহ তাদের ওপর এ আযাব পাঠাতেন না। কিন্তু তারা নূহের কথা না শুনে যুলুম ও শির্কেই নিপতিত ছিল। (ফাতহুল কাদীর)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

(১৪) আমি অবশ্যই নূহকে তার সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরণ করেছিলাম; সে ওদের মধ্যে অবস্থান করেছিল সাড়ে ন’শ বছর।(1) অতঃপর বন্যা ওদেরকে গ্রাস করল; কারণ ওরা ছিল সীমালংঘনকারী।

(1) কুরআনের শব্দাবলীতে এ কথা জানা যায় যে, এটি ছিল তাঁর দাওয়াত ও তাবলীগের বয়স। তাঁর পূর্ণ বয়স কত ছিল তা পরিষ্কার নয়। কেউ কেউ বলেন, নবুঅতের পূর্বে ৪০ বছর ও বন্যার পর ৬০ বছর ঐ সংখ্যায় পরিগণিত। এছাড়া আরো অন্য উক্তিও আছে। এ ব্যাপারে আল্লাহই ভাল জানেন।