وَلَقَدۡ صَرَّفۡنَٰهُ بَيۡنَهُمۡ لِيَذَّكَّرُواْ فَأَبَىٰٓ أَكۡثَرُ ٱلنَّاسِ إِلَّا كُفُورٗا

ওয়া লাকাদ সাররফনা-হু বাইনাহুম লিয়াযযাক্কারূ ফাআবা আকছারুন্না-ছি ইল্লাকুফূর-।উচ্চারণ

এ বিস্ময়কর কার্যকলাপ আমি বার বার তাদের সামনে আনি ৬৪ যাতে তারা কিছু শিক্ষা গ্রহণ করে কিন্তু অধিকাংশ লোক কুফরী ও অকৃতজ্ঞতা ছাড়া অন্য কোন মনোভাব পোষণ করতে অস্বীকার করে। ৬৫ তাফহীমুল কুরআন

আমি মানুষের কল্যাণার্থে তাকে (অর্থাৎ পানিকে) আবর্তমান করে রেখেছি, #%২৪%# যাতে তারা শিক্ষা গ্রহণ করে, কিন্তু অধিকাংশ লোক অকৃতজ্ঞতা ছাড়া কোন কিছুতে সম্মত নয়।মুফতী তাকী উসমানী

আর আমি এটা তাদের মধ্যে বিতরণ করি যাতে তারা স্মরণ করে; কিন্তু অধিকাংশ লোক শুধু অকৃতজ্ঞতাই প্রকাশ করে।মুজিবুর রহমান

এবং আমি তা তাদের মধ্যে বিভিন্নভাবে বিতরণ করি, যাতে তারা স্মরণ করে। কিন্তু অধিকাংশ লোক অকৃতজ্ঞতা ছাড়া কিছুই করে না।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

এবং আমি তো এই পানি এদের মধ্যে বিতরণ করি যাতে এরা স্মরণ করে। কিন্তু অধিকাংশ লোক কেবল অকৃতজ্ঞতাই প্রকাশ করে।ইসলামিক ফাউন্ডেশন

আর আমি তা তাদের মধ্যে বণ্টন করি, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করতে পারে; তারপর অধিকাংশ লোক শুধু অকৃতজ্ঞতাই প্রকাশ করে।আল-বায়ান

আমি পানিকে (সকলের প্রয়োজন মেটানোর জন্য) তাদের মাঝে বণ্টন করি যাতে তারা (আল্লাহর অনুগ্রহের কথা) স্মরণ করে, কিন্তু মানুষদের অধিকাংশই ঈমান গ্রহণ করতে অস্বীকার ক’রে কেবল কুফরিই করল।তাইসিরুল

আর আমরা নিশ্চয়ই এটিকে বিতরণ করি তাদের মধ্যে যেন তারা স্মরণ করতে পারে, কিন্ত অধিকাংশ লোকেই প্রত্যাখ্যান করা ছাড়া আর কিছুতে একমত হয় না।মাওলানা জহুরুল হক

তাফহীমুল কুরআন

৬৪

মূল শব্দগুলো হচ্ছে لَقَدْ صَرَّفْنَاهُ ---এর তিনটি অর্থ হতে পারে। এক, বারিধারা বর্ষণের এ বিষয়বস্তুটি আমি কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় বারবার বর্ণনা করে প্রকৃত সত্য বুঝাবার চেষ্টা করেছি। দুই, আমি বারবার গ্রীষ্ম ও খরা, মওসূমী বায়ু, মেঘ, বৃষ্টি এবং তা থেকে সৃষ্ট বিচিত্র জিবন-উপকরণসমূহ তাদের দেখাতে থেকেছি। তিন, আমি বৃষ্টিকে আবর্তিত করতে থাকি। অর্থাৎ সব সময় সব জায়গায় সমান বৃষ্টিপাত হয় না। বরং কখনো কোথাও চলে একদম খরা, কোথাও কম বৃষ্টিপাত হয়, কোথাও চাহিদা অনুযায়ী বৃষ্টিপাত হয়, কোথাও ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার আবির্ভাব হয় এবং এসব অবস্থায় বিভিন্ন বিচিত্র ফলাফল সামনে আসতে থাকে।

৬৫

যদি প্রথম দিক থেকে (অর্থাৎ তাওহীদের যুক্তির দৃষ্টিতে) দেখা যায়, তাহলে আয়াতের অর্থ দাঁড়ায়ঃ লোকেরা যদি চোখ মেলে তাকায় তাহলে নিছক বৃষ্টির ব্যবস্থপনারই মধ্যে আল্লাহর অস্তিত্ব, তাঁর গুণাবলী এবং তাঁর একক রব্বুল আলামীন হবার প্রমাণ স্বরূপ এত বিপুল সংখ্যক নিদর্শন দেখতে পাবে যে, একমাত্র সেটিই নবীর তাওহীদের শিক্ষা সত্য হবার পক্ষে তাদের নিশ্চিন্ত করতে পারে। কিন্তু আমি বারবার এ বিষয়বস্তুর প্রতি তাদের দৃষ্টি আর্কষণ করা সত্ত্বেও এবং দুনিয়ায় পানি বণ্টনের এ কার্যকলাপ নিত্য-নতুনভাবে একের পর এক তাদের সামনে আসতে থাকলেও এ জালেমরা কোন শিক্ষা গ্রহণ করে না। তারা সত্য ও ন্যায়নীতিকে মেনে নেয় না। তাদের আমি বুদ্ধি ও চিন্তার যে নিয়ামত দান করেছি তার জন্য কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করে না। এমন কি তারা নিজেরা যা কিছু বুঝতো না তা তাদের বুঝাবার জন্য কুরআনে বার বার প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে--এ অনুগ্রহের জন্য শোকর গুজারীও করে না।

দ্বিতীয় দিক থেকে (অর্থাৎ আখেরাতের যুক্তির দৃষ্টিতে) দেখলে এর অর্থ দাঁড়ায়ঃ প্রতি বছর তাদের সামনে গ্রীষ্ম ও খরায় অসংখ্য সৃষ্টির মৃত্যুমুখে পতিত হবার এবং তারপর বর্ষার বদৌলতে মৃত উদ্ভিদ ও কীটপতঙ্গের জীবিত হয়ে উঠার নাটক অভিনীত হতে থাকে। কিন্তু সবকিছু দেখেও এ নির্বোধের দল মৃত্যুর পরের জীবনকে অসম্ভব বলে চলছে। বারবার সত্যের এ দ্ব্যর্থহীন নিদর্শনের প্রতি তাদের দৃষ্টি আর্কষণ করা হয় কিন্তু কুফরী ও অস্বীকৃতির অচলায়তন কোনক্রমেই টলে না। তাদের বুদ্ধি ও দৃষ্টিশক্তির যে অতুলনীয় নিয়ামত দান করা হয়েছে তার অস্বীকৃতির ধারা কোনক্রমে খতমই হয় না। শিক্ষা ও উপদেশ দানের যে অনুগ্রহ তাদের প্রতি করা হয়েছে তার প্রতি অকৃতজ্ঞ মনোভাব তাদের চিরকাল অব্যাহত রয়েছে।

যদি তৃতীয় দিকটি (অর্থাৎ খরার সাথে জাহেলীয়াতের এবং রহমতের বারিধারার সাথে অহী ও নবুওয়াতের তুলনাকে) সামনে রেখে দেখা হয় তাহলে আয়াতের অর্থ দাঁড়ায়ঃ মানবজাতির ইতিহাসে এ দৃশ্য বার বার সামনে এসেছে যে যখনই এ দুনিয়া নবী ও আল্লাহর কিতাবের কল্যাণসুধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে তখনই মানবতা বন্ধ্যা হয়ে গেছে এবং চিন্তা ও নৈতিকতার ভূমিতে কাঁটাগুল্ম ছাড়া আর কিছুই উৎপন্ন হয়নি। আর যখনই অহী ও রিসালাতের জীবন বারি এ পৃথিবীতে পৌঁছে গেছে তখনই মানবতার উদ্যান ফলে-ফুলে সুশোভিত হয়েছে। জ্ঞান-বিজ্ঞান মূর্খতা ও জাহেলীয়াতের স্থান দখল করেছে। জুলুম-নিপীড়নের জায়গায় ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফাসেকী ও অশ্লীলতার জায়গায় নৈতিক ও চারিত্রিক মাহাত্মের ফুল ফুটেছে। যেদিকে তার দান যতটুকু পৌঁছেছে সেদিকেই অসদাচার কমে গেছে এবং সদাচার বেড়ে গেছে। নবীদের আগমন সবসময় একটি শুভ ও কল্যাণকর চিন্তা ও নৈতিক বিপ্লবের সূচনা করেছে। কখনো এর ফল খারাপ হয়নি। আর নবীদের বিধান ও নির্দেশাবলী প্রত্যাখ্যান করে বা তা থেকে বঞ্চিত হয়ে মানবজাতি সব সময় ক্ষতিগ্রস্তই হয়েছে। কখনো এর ফল ভালো হয়নি। ইতিহাস এ দৃশ্য বারবার দেখিয়েছে এবং কুরআনও বার বার এদিকে ইশারা করেছে। কিন্তু এরপরও লোকেরা শিক্ষা নেয় না। এটি একটি অমোঘ সত্য। হাজার বছরের মানবিক অভিজ্ঞতার ছাপ এর গায়ে লেগে আছে। কিন্তু একে অস্বীকার করা হচ্ছে। আর আজ নবী ও কিতাবের নিয়ামত দান করে আল্লাহর যে জনপদকে ধন্য করেছেন সে এর শোকর গুজারী করার পরিবর্তে উল্টো অকৃতজ্ঞ মনোভাব প্রকাশের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

‘পানিকে আবর্তমান করে রাখা’এর এক অর্থ, আল্লাহ তাআলা মানুষের মধ্যে নিজ হেকমত অনুযায়ী এক বিশেষ অনুপাত ও সঙ্গতির সাথে পানি বণ্টন করে থাকেন। সেই সঙ্গে এ অর্থও হতে পারে যে, পানির মূল উৎস হল সাগর। সেখান থেকে আল্লাহ তাআলা মেঘের মাধ্যমে তা উপরে তুলে আনেন এবং বরফ আকারে পাহাড়-পর্বতে জমা করেন। তারপর সে পানি গলে গলে নদ-নদীতে পরিণত হয়। নদীর প্রবাহিত জলধারা দ্বারা মানুষ তাদের প্রয়োজন সমাধা করে। ফলে স্বচ্ছ ও পবিত্র পানি নষ্ট ও দূষিত হয়ে যায়। তারপর আবার তাদের ব্যবহৃত পানি নদী-নালা হয়ে সাগরে পতিত হয় এবং সাগরের পবিত্র জলরাশির সাথে মিশে তার সমস্ত ক্লেদ খতম হয়ে যায়। ফের সেই পানি মেঘের মাধ্যমে উপরে তুলে আনা হয়।

তাফসীরে জাকারিয়া

৫০. আর আমরা তো তা তাদের মধ্যে বিতরণ করি যাতে তারা স্মরণ করে। অতঃপর অধিকাংশ লোক শুধু অকৃতজ্ঞতাই প্রকাশ করে।(১)

(১) ইকরিম রাহেমাহুল্লাহ এ আয়াতের তাফসীরে বলেন, অর্থাৎ তারা বলে আমরা অমুক নক্ষত্র এবং অমুক নক্ষত্রের কাছাকাছি হওয়ার কারণে বৃষ্টিপ্রাপ্ত হয়েছি। ইকরিমা রাহেমাহুল্লাহর এ তাফসীরের সপক্ষে আমরা হাদীস থেকে প্রমাণ দেখতে পাই। একবার রাত্রিকালে বৃষ্টি হওয়ার পর ভোরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদেরকে বললেন, তোমরা কি জান তোমাদের প্রভু কি বলেছেন? তারা বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সবচেয়ে ভাল জানেন। তিনি বললেনঃ আল্লাহ বলেন, আমার বান্দাদের কতক লোক আমার উপর ঈমানদার এবং কতক লোক কাফেরে পরিণত হয়েছে। যারা বলে, আমরা আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়ায় বৃষ্টিপ্রাপ্ত হয়েছি তারা আমার উপর ঈমান এনেছে এবং নক্ষত্ররাজির উপর কুফরী করেছে। আর যারা বলে, আমরা অমুক অমুক নক্ষত্রের কাছাকাছি হওয়ার কারণে বৃষ্টি পেয়েছি তারা আমার সাথে কুফরী করেছে এবং নক্ষত্ররাজির উপর ঈমান এনেছে। (মুসলিমঃ ১২৫)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

(৫০) আমি তা ওদের মধ্যে বিভিন্নভাবে বিবৃত করেছি;(1) যাতে ওরা উপদেশ গ্রহণ করে। কিন্তু অধিকাংশ লোক কেবল অবিশ্বাসই প্রকাশ করে। (2)

(1) অর্থাৎ, কুরআন কারীমকে। আবার কেউ কেউ মনে করেন, صرفناه এর ه (তা) সর্বনাম দ্বারা পানি বা বৃষ্টির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। যার অর্থ, আমি বৃষ্টিকে ফিরিয়ে ফিরিয়ে বর্ষণ করি। অর্থাৎ, কখনো এক এলাকায় আবার কখনো অন্য এলাকায়। এমনকি কখনো দেখা যায় যে একই শহরের এক জায়গায় বৃষ্টি হয়, অন্য জায়গায় হয় না। এটি আল্লাহর হিকমত ও ইচ্ছা। তিনি যেভাবে ইচ্ছা কখনো বৃষ্টি বর্ষণ করেন, কখনো করেন না। আবার কখনো এক এলাকায় করেন, আবার কখনো অন্য এলাকায়।

(2) এটিও এক প্রকার কুফরী ও অকৃতজ্ঞতা যে, বৃষ্টিকে আল্লাহর ইচ্ছাধীন না মনে করে নক্ষত্রের আসা-যাওয়ার পরিণাম মনে করা। যেমন জাহেলী যুগের লোকেরা মনে করত। যেমন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।