ইন্নাল্লাযীনা জাঊ বিলইফকি ‘উসবাতুম মিনকুম লা তাহছাবূহু শাররল্লাকুম বাল হুওয়া খাইরুল লাকুম লিকুল্লিমরিয়িম মিনহুম মাকতাছাবা মিনাল ইছমি ওয়াল্লাযী তাওয়াল্লা-কিবরহূমিনহুম লাহূ‘আযা-বুন ‘আজীম।উচ্চারণ
যারা এ মিথ্যা অপবাদ তৈরী করে এনেছে ৮ তারা তোমাদেরই ভিতরের একটি অংশ। ৯ এ ঘটনাকে নিজেদের পক্ষে খারাপ মনে করো না বরং এও তোমাদের জন্য ভালই। ১০ যে এর মধ্যে যতটা অংশ নিয়েছে সে ততটাই গোনাহ কামাই করেছে আর যে ব্যক্তি এর দায়-দায়িত্বের বড় অংশ নিজের মাথায় নিয়েছে ১১ তার জন্য তো রয়েছে মহাশাস্তি। তাফহীমুল কুরআন
নিশ্চয়ই, যারা এই মিথ্যা অপবাদ রচনা করে এনেছে তারা তোমাদেরই মধ্যকার একটি দল। তোমরা একে তোমাদের জন্য অনিষ্টকর মনে করো না; বরং এটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। #%১০%# তাদের প্রত্যেকের ভাগে রয়েছে নিজ কৃতকর্মের গুনাহ। তাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এর (অর্থাৎ এ অপবাদের) ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা নিয়েছে, তার জন্য আছে কঠিন শাস্তি। #%১১%#মুফতী তাকী উসমানী
যারা এই অপবাদ রচনা করেছে তারাতো তোমাদেরই একটি দল; এটাকে তোমরা তোমাদের জন্য অনিষ্টকর মনে করনা; বরং এটাতো তোমাদের জন্য কল্যাণকর; তাদের প্রত্যেকের জন্য রয়েছে তাদের কৃত পাপ কাজের ফল, এবং তাদের মধ্যে যে এ ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে তার জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।মুজিবুর রহমান
যারা মিথ্যা অপবাদ রটনা করেছে, তারা তোমাদেরই একটি দল। তোমরা একে নিজেদের জন্যে খারাপ মনে করো না; বরং এটা তোমাদের জন্যে মঙ্গলজনক। তাদের প্রত্যেকের জন্যে ততটুকু আছে যতটুকু সে গোনাহ করেছে এবং তাদের মধ্যে যে এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে, তার জন্যে রয়েছে বিরাট শাস্তি।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
যারা এই অপবাদ রচনা করেছে তারা তো তোমাদেরই একটি দল; এটাকে তোমরা তোমাদের জন্যে অনিষ্টকর মনে কর না; বরং এটা তো তোমাদের জন্যে কল্যাণকর; এদের প্রত্যেকের জন্যে আছে এদের কৃত পাপকর্মের ফল এবং এদের মধ্যে যে এই ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেছে, তার জন্যে আছে মহাশাস্তি। ইসলামিক ফাউন্ডেশন
নিশ্চয়ই যারা এ অপবাদ* রটনা করেছে, তারা তোমাদেরই একটি দল। এটাকে তোমরা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর মনে করো না, বরং এটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। তাদের থেকে প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য রয়েছে, যতটুকু পাপ সে অর্জন করেছে। আর তাদের থেকে যে ব্যক্তি এ ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে, তার জন্য রয়েছে মহাআযাব।আল-বায়ান
যারা এ অপবাদ উত্থাপন করেছে তারা তোমাদেরই একটি দল, এটাকে তোমাদের জন্য ক্ষতিকর মনে কর না, বরং তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। তাদের প্রত্যেকের জন্য আছে প্রতিফল যতটুকু পাপ সে করেছে। আর এ ব্যাপারে যে নেতৃত্ব দিয়েছে তার জন্য আছে মহা শাস্তি।তাইসিরুল
যারা কুৎসা রটনা করেছিল তারা তো তোমাদেরই মধ্যেকার একটি দল। এটিকে তোমাদের জন্য অনিষ্টকর মনে করো না, বরং এটি তোমাদের জন্য কল্যাণকর। তাদের প্রত্যেক লোকের জন্য রয়েছে পাপের যা সে অর্জন করেছে, আর তদের মধ্যের যে এ ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা নিয়েছিল তার জন্য রইছে কঠোর শাস্তি।মাওলানা জহুরুল হক
৮
হযরত আয়েশার (রাঃ) বিরুদ্ধে যে অপবাদ রটানো হয়েছিল সেদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। এ অপবাদকে “ইফ্ক” শব্দের মাধ্যমে উল্লেখ করে স্বয়ং আল্লাহর পক্ষ থেকেই এ অপরাধকে পুরোপুরি খণ্ডন করা হয়েছে। ‘ইফ্ক’ শব্দের অর্থ হচ্ছে, কথা উল্টে দেয়া, বাস্তব ঘটনাকে বিকৃত করে দেয়া। এ অর্থের দিক দিয়ে এ শব্দটিকে ডাহা মিথ্যা ও অপবাদ দেয়া অর্থে ব্যবহার করা হয়। আর কোন দোষারোপ অর্থে শব্দটি ব্যবহার করলে তখন এর অর্থ হয় সুস্পষ্ট মিথ্যা অপবাদ।
এ সূরাটি নাযিলের মূলে যে ঘটনাটি আসল কারণ হিসেবে কাজ করেছিল এখান থেকে তার ওপর আলোচনা শুরু হয়েছে। ভূমিকায় এ সম্পর্কিত প্রারম্ভিক ঘটনা আমি হযরত আয়েশার বর্ণনার মাধ্যমে উদ্ধৃত করেছি। পরবর্তী ঘটনাও তাঁরই মুখে শুনুন। তিনি বলেনঃ “এ মিথ্যা অপবাদের গুজব কমবেশি এক মাস ধরে সারা শহরে ছড়াতে থাকে। নবী ﷺ মারাত্মক ধরনের মানসিক কষ্টে ভুগতে থাকেন। আমি কাঁদতে থাকি। আমার বাপ-মা চরম পেরেশানী ও দুঃখে-শোকে ভুগতে থাকেন। শেষে একদিন রসূলুল্লাহ্ ﷺ আসেন এবং আমার কাছে বসেন। এ সমগ্র সময়-কালে তিনি কখনো আমার কাছে বসেননি। হযরত আবু বকর (রাঃ) ও উম্মে রুমান (হযরত আয়েশার মা) অনুভব করেন আজ কোন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তকর কথা হবে। তাই তাঁরা দু’জনেও কাছে এসে বসেন। রসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেন, আয়েশা! তোমার সম্পর্কে আমার কাছে এই খবর পৌঁছেছে। যদি তুমি নিরপরাধ হয়ে থাকো তাহলে আশা করা যায় আল্লাহ তোমার অপরাধ মুক্তির কথা প্রকাশ করে দেবেন। আর যদি তুমি সত্যিই গোনাহে লিপ্ত হয়ে থাকো তাহলে আল্লাহর কাছে তাওবা করো এবং ক্ষমা চাও। বান্দা যখন তার গোনাহ স্বীকার করে নিয়ে তাওবা করে তখন আল্লাহ তা মাফ করে দেন। একথা শুনে আমার চোখের পানি শুকিয়ে যায়। আমি আমার পিতাকে বলি, আপনি রসূলুল্লাহ্র কথার জবাব দিন। তিনি বলেনঃ “মা, আমি কিছু বুঝতে পারছিনা, কি বলবো।” আমি আমার মাকে বললাম, “তুমিই কিছু বলো” তিনিও একই কথা বলেন, “আমি কি বলবো বুঝতে পারছি না।” একথায় আমি বলি, আপনাদের কানে একটা কথা এসেছে এবং তা মনের মধ্যে জমে বসে গেছে। এখন আমি যদি বলি, আমি নিরপরাধ এবং আল্লাহ সাক্ষী আছেন আমি নিরপরাধ--- তাহলে আপনারা তা মেনে নেবেন না। আর যদি এমন একটি কথা আমি স্বীকার করে নিই যা আমি করিনি--- আর আল্লাহ জানেন আমি করিনি--- তাহলে আপনারা তা মেনে নেবেন। আমি সে সময় হযরত ইয়াকুবের (আঃ) নাম স্মরণ করার চেষ্টা করি কিন্তু নামটি মনে করতে পারিনি। শেষে আমি বলি, এ অবস্থায় আমার জন্য এছাড়া আর কি উপায় থাকে যে, আমি সেই একই কথা বলি যা হযরত ইউসুফের বাপ বলেছিলেন فَصَبْرٌ جَمِيلٌ (এখানে সে ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে যখন হযরত ইয়াকুবের সামনে তার ছেলে বিন ইয়াইমিনের বিরুদ্ধে চুরির অপবাদের কথা বর্ণনা করা হয়েছিলঃ সূরা ইউসুফ ১০ রুকূ’তে একথা আলোচিত হয়েছে)। একথা বলে আমি শুয়ে পড়ি এবং অন্যদিকে পাশ ফিরি। সে সময় আমি মনে মনে বলছিলাম, আল্লাহ জানেন আমি গোনাহ করিনি, তিনি নিশ্চয়ই সত্য প্রকাশ করে দেবেন। যদিও একথা আমি কল্পনাও করিনি যে, আমার স্বপক্ষে অহী নাযিল হবে এবং তা কিয়ামত পর্যন্ত পঠিত হতে থাকবে। আল্লাহ নিজেই আমার পক্ষ সমর্থন করবেন। এ থেকে নিজেকে আমি অনেক নিম্নতর মনে করতাম। কিন্তু আমার ধারণা ছিল, রসূলুল্লাহ ﷺ কোন স্বপ্ন দেখবেন, যার মাধ্যমে আল্লাহ আমার নির্দোষিতার কথা জানিয়ে দেবেন। এরই মধ্যে রসূলুল্লাহ্র ﷺ ওপর এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়ে গেলো যা অহী নাযিল হবার সময় হতো, এমন কি ভীষণ শীতের দিনেও তাঁর মুবারক চেহারা থেকে মুক্তোর মতো স্বেদবিন্দু টপকে পড়তে থাকতো। আমরা সবাই চুপ করে গেলাম। আমি তো ছিলাম একদম নির্ভীক। কিন্তু আমার বাপ-মার অবস্থা ছিল যেন কাটলে শরীর থেকে এক ফোঁটা রক্তও পড়বে না। তারা ভয় পাচ্ছিল, না জানি আল্লাহ কি সত্য প্রকাশ করেন। যখন সে অবস্থা খতম হয়ে গেলো তখন রসূলুল্লাহ্ ﷺ ছিলেন অত্যন্ত আনন্দিত। তিনি হেসে প্রথমে যে কথাটি বলেন, সেটি ছিলঃ মুবারক হোক আয়েশা! আল্লাহ তোমার নির্দোষিতার কথা নাযিল করেছেন এবং এরপর নবী ﷺ দশটি আয়াত শুনান (অর্থাৎ ১১ নম্বর আয়াত থেকে ২০ নম্বর পর্যন্ত)। আমার মা বলেন ওঠো এবং রসূলুল্লাহ্র ﷺ প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো। আমি বললাম, “আমি তাঁর প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবো না, তোমাদের দু’জনের প্রতিও না। বরং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি, যিনি আমার নির্দোষিতার কথা নাযিল করেছেন। তোমরা তো এ মিথ্যা অপবাদ অস্বীকারও করোনি।” (উল্লেখ্য, এটি কোন একটি বিশেষ হাদীসের অনুবাদ নয় বরং হাদীস ও সীরাতের কিতাবগুলোতে এ সম্পর্কিত যতগুলো বর্ণনা হযরত আয়েশার (রাঃ) উদ্ধৃত হয়েছে সবগুলোর সার নির্যাস আমি এখানে পরিবেশন করেছি)।
এ প্রসঙ্গে আরও একটি সূক্ষ্ম কথা অনুধাবন করতে হবে। হযরত আয়েশার (রাঃ) নিরপরাধ হবার কথা বর্ণনা করার আগে পুরো একটি রুকূ’তে যিনা, কাযাফ ও লি’আনের বিধান বর্ণনা করে মহান আল্লাহ প্রকৃতপক্ষে এ সত্যটির ব্যাপারে সবাইকে সচেতন করে দিয়েছেন যে, যিনার অপবাদ দেবার ব্যাপারটি কোন ছেলেখেলা নয়, নিছক কোন মাহফিলে হাস্যরস সৃষ্টি করার জন্য একে ব্যবহার করা যাবে না। এটি একটি মারাত্মক ব্যাপার। অপবাদদাতার অপবাদ যদি সত্য হয় তাহলে তাকে সাক্ষী আনতে হবে। যিনাকারী ও যিনাকারীনীকে ভয়াবহ শাস্তি দেয়া হবে। আর অপবাদ যদি মিথ্যা হয় তাহলে অপবাদদাতা ৮০ ঘা বেত্রাঘাত লাভের যোগ্য, যাতে ভবিষ্যতে সে আর এ ধরনের কোন কাজ করার দুঃসাহস না করে। এ অভিযোগ যদি স্বামী দিয়ে থাকে তাহলে আদালতে লি’আন করে তাকে ব্যাপারটি পরিষ্কার করে নিতে হবে। একথাটি একবার মুখে উচ্চারণ করে কোন ব্যক্তি ঘরে নিশ্চিন্তে বসে থাকতে পারে না। কারণ এটা হচ্ছে একটা মুসলিম সমাজ। সারা দুনিয়ায় কল্যাণ ব্যবস্থা কায়েম করার জন্য এ সমাজ প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। এখানে যিনা কোন আনন্দদায়ক বিষয়ে পরিণত হতে পারে না এবং এর আলোচনাও হাস্য রসালাপের বিষয়বস্তুতে পরিণত হতে পারে না।
৯
হাদীসে মাত্র কয়েকজন লোকের নাম পাওয়া যায়। তারা এ গুজবটি ছড়াচ্ছিল। তারা হচ্ছে আবদুল্লাহ্ ইবনে উবাই, যায়েদ ইবনে রিফা’আহ (এ ব্যক্তি সম্ভবত রিফা’আ ইবনে যায়েদ ইহুদী মুনাফিকের ছেলে), মিস্তাহ ইবনে উসামাহ, হাস্সান ইবনে সাবেত ও হামনা বিনতে জাহশ। এর মধ্যে প্রথম দু’জন ছিল মুনাফিক এবং বাকি তিনজন মু’মিন। মু’মিন তিন জন বিভ্রান্তি ও দুর্বলতার কারণে এ চক্রান্তের ফাঁদে জড়িয়ে পড়েছিলেন। এরা ছাড়া আর যারা কমবেশী এ গোনাহে জড়িয়ে পড়েছিলেন তাদের নাম হাদীস ও সীরাতের কিতাবগুলোতে আমার নজরে পড়েনি।
১০
এর অর্থ হচ্ছে ভয় পেয়ো না। মুনাফিকরা মনে করছে তারা তোমাদের ওপর একটা বিরাট আঘাত হেনেছে। কিন্তু ইনশাআল্লাহ্ এটি উল্টো তাদের ওপরই পড়বে এবং তোমাদের জন্য ভালো প্রমাণিত হবে। যেমন আমি ইতিপূর্বে ভূমিকায় বর্ণনা করে এসেছি, মুসলমানদের শ্রেষ্ঠত্বের যে আসল ময়দান ছিল মুনাফিকরা সেখানেই তাদেরকে পরাস্ত করার জন্য এ প্রপাগাণ্ডা শুরু করে। অর্থাৎ নৈতিকতার ময়দান। এখানে শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করার কারণে তারা প্রত্যেকটি ময়দানে নিজেদের প্রতিপক্ষের ওপর বিজয় লাভ করে চলছিল। আল্লাহ তাকেও মুসলমানদের কল্যাণের উপকরণে পরিণত করে দিলেন। এ সময় একদিকে নবী ﷺ , অন্যদিকে হযরত আবু বকর ও তাঁর পরিবারবর্গ এবং তৃতীয় দিকে সাধারণ মু’মিনগন যে কর্মপদ্ধতি অবলম্বন করেন তা থেকে একথা দিবালোকের মতো সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়ে গেছে যে, তাঁরা অসৎকর্ম থেকে কত দূরে অবস্থান করেন, কতটা সংযম ও সহিষ্ণুতার অধিকারী, কেমন ন্যায়নিষ্ঠ ও কি পরিমাণ ভদ্র ও রুচিশীল মানসিকতার ধারক। নবী ﷺ এর ইজ্জতের ওপর যারা আক্রমণ চালিয়েছিল তাঁর একটি মাত্র ইঙ্গিতই তাদের শিরচ্ছেদের জন্য যথেষ্ট ছিল, কিন্তু এক মাস ধরে তিনি সবরের সাথে সবকিছু বরদাশ্ত করতে থাকেন এবং আল্লাহর হুকুম এসে যাবার পর কেবলমাত্র যে তিনজন মুসলমানের বিরুদ্ধে কাযাফ তথা যিনার মিথ্যা অপবাদের অপরাধ প্রমাণিত ছিল তাদের ওপর ‘হদ’ জারি করেন। এরপরও তিনি মুনাফিকদেরকে কিছুই বলেননি। হযরত আবু বকরের নিজের আত্মীয়, যার নিজের ও পরিবারের ভরণপোষন তিনি করতেন, সেও তাঁদের কলিজায় তীর বিঁধিয়ে দিতে থাকে কিন্তু এর জবাবে আল্লাহর এ নেক বান্দাটি না তার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করেন, না তার পরিবার-পরিজনকে সাহায্য-সহায়তা দেয়া বন্ধ করেন। নবীর পবিত্র স্ত্রীগণের একজনও সতীনের দুর্নাম ছড়াবার কাজে একটুও অংশ নেননি। বরং কেউ এ অপবাদের প্রতি নিজের সামান্যতমও সন্তোষ, পছন্দ অথবা মেনে নেয়ার মনোভাবও প্রকাশ করেননি। এমনিক হযরত যয়নবের সহোদর বোন হাম্না বিনতে জাহ্শ নিছক নিজের বোনের জন্য তার সতীনের দুর্নাম রটাচ্ছিলেন কিন্তু তিনি স্বয়ং সতীনের পক্ষে ভালো কথাই বলেন। হযরত আয়েশার নিজের বর্ণনা, রসূলের স্ত্রীগণের মধ্যে সবচেয়ে বেশী আড়ি চলতো আমার যয়নবের সাথে। কিন্তু “ইফ্ক”-এর ঘটনা প্রসঙ্গে রসূলুল্লাহ্ ﷺ যখন তাকে জিজ্ঞেস করেন, আয়েশা সম্পর্কে তুমি কি জানো? তখন এর জবাবে তিনি বলেন, হে আল্লাহর রসূল! আল্লাহর কসম, আমি তার মধ্যে ভালো ছাড়া আর কিছুই জানি না। হযরত আয়েশার নিজের ভদ্রতা ও রুচিশীলতার অবস্থা এই ছিল যে, হযরত হাস্সান ইবনে সাবেত তাঁর দূর্নাম রটাবার ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ করেন কিন্তু এতদসত্ত্বেও তিনি সবসময় তাঁর প্রতি সম্মান ও বিনয়পূর্ণ ব্যবহার করেছেন। লোকেরা স্মরণ করিয়ে দেয়, ইনি তো সেই ব্যক্তি যিনি আপনার বিরুদ্ধে দুর্নাম রটিয়েছিলেন। কিন্তু এ জবাব দিয়ে তিনি তাদের মুখ বন্ধ করে দেন যে, এ ব্যক্তি ইসলামের শত্রু কবি গোষ্ঠীকে রসূলুল্লাহ্ ﷺ ও ইসলামের পক্ষ থেকে দাঁতভাঙ্গা জবাব দিতেন। এ ঘটনার সাথে যাদের সরাসরি সম্পর্ক ছিল এ ছিল তাদের অবস্থা। আর সাধারণ মুসলমানদের মানসিকতা কতদূর পরিচ্ছন্ন ছিল তা এ ঘটনা থেকে অনুমান করা যেতে পারে যে, হযরত আবু আইয়ুব আনসারীর স্ত্রী যখন তাঁর কাছে এ গুজবগুলোর কথা বললেন তখন তিনি বলেন, “আইয়ুবের মা! যদি সে সময় আয়েশার জায়গায় তুমি হতে, তাহলে তুমি কি এমন কাজ করতে?” তিনি বলেন, “আল্লাহ্র কসম, আমি কখনো এমন কাজ করতাম না।” হযরত আবু আইয়ুব বলেন, “তাহলে আয়েশা তোমার চেয়ে অনেক বেশী ভাল। আর আমি বলি কি, যদি সাফওয়ানের জায়গায় আমি হতাম, তাহলে এ ধরনের কথা কল্পনাই করতে পারতাম না। সফওয়ান তো আমার চেয়ে ভালো মুসলমান।” এভাবে মুনাফিকরা যা কিছু চেয়েছিল ফল হলো তার একেবারে উল্টো এবং মুসলমানদের নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব আগের তুলনায় আরো বেশী সুস্পষ্ট হয়ে গেল।
এছাড়া এ ঘটনার মধ্যে কল্যাণের আর একটি দিকও ছিল। সেটি ছিল এই যে, এ ঘটনাটি ইসলামের আইন-কানুন, বিধি-বিধান ও তামাদ্দুনিক নীতি-নিয়মের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজনের উপলক্ষ্যে পরিণত হয়। এর বদৌলতে মুসলমানরা আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন সব নির্দেশ লাভ করে যেগুলো কার্যকর করে মুসলিম সমাজকে চিরকালের জন্য অসৎকর্মের উৎপাদন ও সেগুলোর সম্প্রসারণ থেকে সংরক্ষিত রাখা যেতে পারে আর অসৎকর্ম উৎপাদিত হয়ে গেলেও যথাসময়ে তার পথ রোধ করা যেতে পারে।
এছাড়াও এর মধ্যে কল্যাণের আর একটি দিকও ছিল। মুসলমানরা সকলেই একথা ভালোভাবে জেনে যায় যে, নবী ﷺ অদৃশ্য জ্ঞানের অধিকারী নন। যা কিছু আল্লাহ জানান তাই তিনি জানেন। এর বাইরে তাঁর জ্ঞান ততটুকুই যতটুকু জ্ঞান একজন মানুষের থাকতে পারে। একমাস পর্যন্ত হযরত আয়েশার (রাঃ) ব্যাপারে তিনি ভীষণ পেরেশান থাকেন। কখনো চাকরানীকে জিজ্ঞেস করতেন, কখনো পবিত্র স্ত্রীগণকে, কখনো হযরত আলীকে (রাঃ), কখনো হযরত উসামাকে (রাঃ)। শেষ পর্যন্ত হযরত আয়েশাকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেও এভাবে জিজ্ঞেস করেন যে, যদি তুমি এ গোনাহটি করে থাকো, তাহলে তাওবা করো আর না করে থাকলে আশা করা যায় আল্লাহ তোমার নিরপরাধ হওয়া প্রমাণ করে দেবেন। যদি তিনি অদৃশ্য জ্ঞানের অধিকারী হতেন তাহলে এ পেরেশানী, এ জিজ্ঞাসাবাদ এবং এ তাওবার উপদেশ কেন? তবে আল্লাহর অহী যখন সত্য কথা জানিয়ে দেয় তখন সারা মাসে তিনি যা জানতেন না তা জানতে পারেন। এভাবে আকীদার অন্ধ আবেগের বশবর্তী হয়ে সাধারণত লোকেরা নিজেদের নেতৃবর্গের ব্যাপারে যে বাড়াবাড়ি ও আতিশয্যের শিকার হয়ে থাকে তা থেকে আল্লাহ সরাসরি অভিজ্ঞতা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে মুসলমানদেরকে বাঁচার ব্যবস্থা করেন। বিচিত্র নয়, এক মাস পর্যন্ত অহী না পাঠাবার পেছনে আল্লাহর এ উদ্দেশ্যটাও থেকে থাকবে। প্রথম দিনেই অহী এসে গেলে এ ফায়দা লাভ করা যেতে পারতো না। (আরো বেশী বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন তাফহীমুল কুরআন, আন্ নাম্ল, ৮৩ টীকা)।
১১
অর্থাৎ আবদুল্লাহ্ ইবনে উবাই। সে ছিল এ অপবাদটির মূল রচয়িতা এবং এ কদর্য প্রচারাভিযানের আসল নায়ক। কোন কোন হাদীসে ভুলক্রমে হযরত হাস্সান ইবনে সাবেতকে (রাঃ) এ আয়াতের লক্ষ্য বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু এটা মূলত বর্ণনাকারীদের নিজেদেরই বিভ্রান্তির ফল। নয়তো হযরত হাস্সানের (রাঃ) দুর্বলতা এর চেয়ে বেশী কিছু ছিল না যে, তিনি মুনাফিকদের ছড়ানো এ ফিত্নায় জড়িয়ে পড়েন। হাফেয ইবনে কাসীর যথার্থ বলেছেন, এ হাদীসটি যদি বুখারী শরীফে উদ্ধৃত না হতো, তাহলে এ প্রসঙ্গটি আলোচনাযোগ্যই হতো না। এ প্রসঙ্গে সবচেয়ে বড় মিথ্যা অপবাদ হচ্ছে এই যে, বনী উমাইয়াহ হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে এ আয়াতের লক্ষ্য মনে করে। বুখারী, তাবারানী ও বাইহাকীতে হিশাম ইবনে আবদুল মালিক উমুবীর উক্তি উদ্ধৃত হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে الَّذِى تَوَلَّى كِبْرَهُ অর্থ হচ্ছে আলী ইবনে আবু তালেব। অথচ এ ফিত্নায় হযরত আলীর (রাঃ) গোড়া থেকেই কোন অংশ ছিল না। ব্যাপার শুধু এতটুকু ছিল, যখন তিনি নবী ﷺ কে খুব বেশী পেরেশান দেখেন, তখন নবী ﷺ তাঁর কাছে পরামর্শ চাওয়ায় তিনি বলেন, আল্লাহ এ ব্যাপারে আপনাকে কোন সংকীর্ণ পরিসরে আবদ্ধ রাখেননি, বহু মেয়ে আছে, আপনি চাইলে আয়েশাকে তালাক দিয়ে আর একটি বিয়ে করতে পারেন। এর অর্থ কখনোই এটা ছিল না যে, হযরত আয়েশার বিরুদ্ধে যে মিথ্যা অপবাদ দেয়া হচ্ছিল হযরত আলী তাকে সত্য বলেছিলেন। বরং শুধুমাত্র নবী ﷺ এর পেরেশানী দূর করাই ছিল এর উদ্দেশ্য।
এখান থেকে ২৬ নং পর্যন্ত আয়াতসমূহে যে ঘটনার প্রতি ইশারা, তার সারসংক্ষেপ নিম্নরূপ, মদীনা মুনাওয়ারায় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শুভাগমনের পর ইসলামের ক্রমবিস্তারে যে গতি সঞ্চার হয়, তা দেখে কুফরী শক্তি ক্ষোভে-আক্রোশে দাঁত কিড়মিড় করছিল। কাফেরদের মধ্যে একদল ছিল মুনাফেক, যারা মুখে মুখে ইসলাম গ্রহণ করেছিল, কিন্তু তাদের অন্তর ছিল মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহিস ওয়াসাল্লামের প্রতি বিদ্বেষে ভরা। তাদের সার্বক্ষণিক চেষ্টা ছিল কিভাবে মুসলিমদের বদনাম করা যায় এবং কি উপায়ে তাদেরকে উত্যক্ত করা যায়। খোদ মদীনা মুনাওয়ারার ভেতরই তাদের একটি বড়সড় দল বাস করত। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বনুল মুস্তালিকের বিরুদ্ধে অভিযান চালান তখন তাদের একটি দলও সে অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিল। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহা এ যুদ্ধে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে ছিলেন। অভিযান থেকে ফেরার পথে এক জায়গায় শিবির ফেলা হয়েছিল। সেখানে হযরত আয়েশা রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহার হার হারিয়ে যায়। তিনি তার খোঁজে শিবিরের বাইরে চলে গিয়েছিলেন। বিষয়টি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জানা ছিল না। তিনি সৈন্যদেরকে রওয়ানা হওয়ার হুকুম দিলেন। হযরত আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা ফিরে এসে দেখেন কাফেলা চলে গেছে। আল্লাহ তাআলা তাঁকে প্রখর বুদ্ধিমত্তা ও অসাধারণ সংযম শক্তি দিয়েছিলেন। তিনি অস্থির হয়ে এদিক ওদিক ছোটাছুটি না করে সেখানেই বসে থাকলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন টের পাবেন তিনি কাফেলায় নেই, তখন হয় নিজেই তাঁর খোঁজে এখানে আসবেন অথবা অন্য কাউকে পাঠাবেন। তাছাড়া মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিয়ম ছিল এক ব্যক্তিকে কাফেলার পিছনে রেখে আসা। কাফেলা চলে যাওয়ার পর কোন কিছু থেকে গেল কি না তা সেই ব্যক্তি দেখে আসত। এ কাফেলায় এ কাজের জন্য নিযুক্ত করা হয়েছিল হযরত সাফওয়ান ইবন মুআত্তাল রাযিয়াল্লাহু আনহুকে। তিনি খোঁজ নিতে গিয়ে যখন হযরত আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা যেখানে ছিলেন, সেখানে পৌঁছলেন তখন কী দুর্ঘটনা ঘটে গেছে তা বুঝে ফেললেন। কালবিলম্ব না করে নিজের উটটি হযরত উম্মুল মুমিনীনের সামনে পেশ করলেন। তাতে সওয়ার হয়ে তিনি মদীনা মুনাওয়ারায় পৌঁছলেন। মুনাফিকদের সর্দার আবদুল্লাহ ইবন উবাই যখন এ ঘটনা জানতে পারল সে তিলকে তাল করে প্রচার করতে লাগল এবং আমাদের প্রাণের চেয়েও প্রিয় এ মায়ের প্রতি এমন ন্যাক্কারজনক অপবাদ দিল, যা কোন আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন মুসলিমের পক্ষে উচ্চারণ করাও কঠিন। আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এ অপবাদকে এতটাই প্রসিদ্ধ করে তুলল যে, জনা কয়েক সরলমতি মুসলিমও তার প্রচারণার ফাঁদে পড়ে গেল। মুনাফিক শ্রেণী বেশ কিছুদিন এই মাথামু-হীন বিষয় নিয়ে মেতে রইল এবং মদীনা মুনাওয়ারার শান্তিময় পরিবেশকে বিষাক্ত করে তুলল। পরিশেষে আল্লাহ তাআলা সূরা নূরের এ আয়াতসমূহ নাযিল করলেন। এর দ্বারা এক দিকে হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রাযিয়াল্লাহু আনহার চারিত্রিক নির্মলতার পক্ষে ঐশী সনদ দিয়ে দেওয়া হল, অন্যদিকে যারা চক্রান্তটির রুই-কাতলা ছিল তাদেরকে জানানো হল কঠোর শাস্তির হুঁশিয়ারী বার্তা।
১১. নিশ্চয় যারা এ অপবাদ(১) রচনা করেছে, তারা তো তোমাদেরই একটি দল(২); এটাকে তোমরা তোমাদের জন্য অনিষ্টকর মনে করো না; বরং এটা তো তোমাদের জন্য কল্যাণকর; তাদের প্রত্যেকের জন্য আছে তাদের পাপকাজের ফল(৩) এবং তাদের মধ্যে যে এ ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেছে, তার জন্য আছে মহা শাস্তি।(৪)
(১) পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে যে, সূরা আন-নূরের অধিকাংশ আয়াত চারিত্রিক নিষ্কলুষতা ও পবিত্ৰতা সংরক্ষণের জন্য প্রবর্তিত বিধানাবলীর সাথে সম্পর্কযুক্ত। এর বিপরীতে চারিত্রিক নিষ্কলুষতা ও পবিত্রতার উপর অবৈধ হস্তক্ষেপ ও এর বিরুদ্ধাচরণের জাগতিক শাস্তি ও আখেরাতের মহা বিপদের কথা আলোচনা করা হয়েছে। তাই পরম্পরায় প্রথমে ব্যভিচারের শাস্তি, তারপর অপবাদের শাস্তি ও পরে লি’আনের কথা বর্ণিত হয়েছে। অপবাদের শাস্তি সম্পর্কে চার জন সাক্ষীর অবর্তমানে কোন পবিত্ৰা নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করাকে মহাপাপ সাব্যস্ত করা হয়েছে। এরূপ অপবাদ আরোপকারীর শাস্তি আশিটি বেত্ৰাঘাত প্রবর্তন করা হয়েছে। এ বিষয়টি সাধারণ মুসলিম পবিত্ৰা নারীদের সাথে সম্পৃক্ত ছিল।
ষষ্ট হিজরীতে কতিপয় মুনাফেক উম্মুল মু'মিনীন আয়েশা সিদ্দীকা রাদিয়াল্লাহু আনহার প্রতি এমনি ধরণের অপবাদ আরোপ করেছিল এবং তাদের অনুসরণ করে কয়েকজন মুসলিমও এ আলোচনায় জড়িত হয়ে পড়েছিলেন। ব্যাপারটি সাধারণ মুসলিম সচ্চরিত্রা নারীদের পক্ষে অত্যাধিক গুরুতর ছিল। তাই কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তা'আলা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহার পবিত্রতা বর্ণনা করে এ স্থলে উপরোক্ত দশটি আয়াত নাযিল করেছেন। (ইবন কাসীর)
এসব আয়াতে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার পবিত্ৰতা ঘোষণা করতঃ তার ব্যাপারে যারা কুৎসা রটনা ও অপপ্রচারে অংশগ্রহণ করেছিল, তাদের সবাইকে হুশিয়ার করা হয়েছে এবং দুনিয়া ও আখেরাতে তাদের বিপদ বর্ণনা করা হয়েছে। এই অপবাদ রটনার ঘটনাটি কুরআন ও হাদীসে ‘ইফকের ঘটনা’ নামে খ্যাত। ইফক শব্দের অর্থ জঘন্য মিথ্যা অপবাদ। (বাগভী)এসব আয়াতের তাফসীর বুঝার জন্য অপবাদের কাহিনীটি জেনে নেয়া অত্যন্ত জরুরী। তাই প্রথমে সংক্ষেপে কাহিনীটি বর্ণনা করা হচ্ছে।
বিভিন্ন হাদীস গ্রন্থে এই ঘটনাটি অসাধারণ দীর্ঘ ও বিস্তারিত আকারে উল্লেখ করা হয়েছে। এর সংক্ষিপ্ত বর্ণনা এই যে, ষষ্ঠ হিজরীতে যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনী মুস্তালিক নামান্তরে মুরাইসী যুদ্ধে গমন করেন, তখন স্ত্রীদের মধ্য থেকে আয়েশা সিদ্দীকা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা সাথে ছিলেন। ইতিপূর্বে নারীদের পর্দার বিধান নাযিল হয়েছিল। তাই আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহার উটের পিঠে পর্দাবিশিষ্ট আসনের ব্যবস্থা করা হয়। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা প্ৰথমে পর্দাবিশিষ্ট আসনে সওয়ার হয়ে যেতেন। এরপর লোকেরা আসনটিকে উটের পিঠে বসিয়ে দিত। এটাই ছিল নিত্যকার নিয়ম।
যুদ্ধ সমাপ্তির পর মদীনায় ফেরার পথে একদিন একটি ঘটনা ঘটল। এক মনযিলে কাফেলা অবস্থান করার পর শেষ রাতে প্রস্থানের কিছু পূর্বে ঘোষণা করা হল যে, কাফেলা কিছুক্ষণের মধ্যেই এখান থেকে রওয়ানা হয়ে যাবে। তাই প্ৰত্যেকেই যেন নিজ নিজ প্রয়োজন চলে গেলেন। সেখানে ঘটনাক্রমে তার গলার হার ছিড়ে কোথাও হারিয়ে গেল। তিনি সেখানে হারটি খুঁজতে লাগলেন। এতে বেশ কিছু সময় অতিবাহিত হয়ে গেল। অতঃপর স্বস্থানে ফিরে এসে দেখলেন যে, কাফেলা রওয়ানা হয়ে গেছে। রওয়ানা হওয়ার সময় আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার আসনটি যথারীতি উটের পিঠে সওয়ার করিয়ে দেয়া হয়েছে এবং বাহকরা মনে করেছে যে, তিনি ভেতরেই আছেন। এমনকি উঠানোর সময়ও সন্দেহ হল না।
কারণ, তিনি তখন অল্পবয়স্কা ক্ষীণাঙ্গিণী ছিলেন। ফলে আসনটি যে শূণ্য এরূপ ধারণাও কারো মনে উদয় হল না। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা ফিরে এসে যখন কাফেলাকে পেলেন না, তখন অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তা ও স্থিরচিত্ততার পরিচয় দিলেন এবং কাফেলার পশ্চাতে দৌড়াদৌড়ি করা কিংবা এদিক-ওদিক খুঁজে দেখার পরিবর্তে স্বস্থানে চাদর গায়ে জড়িয়ে বসে রইলেন। তিনি মনে করলেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সঙ্গীগণ যখন জানতে পারবেন যে, আমি আসনে অনুপস্থিত তখন আমার খোঁজে তারা এখানে আসবেন। কাজেই আমি এদিক-সেদিক চলে গেলে তাদের জন্য আমাকে খুঁজে বের করা মুশকিল হয়ে যাবে। সময় ছিল শেষ রাত, তাই তিনি কিছুক্ষণের মধ্যেই নিদ্রার কোলে ঢলে পড়লেন।
অপরদিকে সফওয়ান ইবনে মুয়াত্তাল রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কাজের জন্য নিযুক্ত করেছিলেন যে, তিনি কাফেলার পশ্চাতে সফর করবেন এবং কাফেলা রওয়ানা হয়ে যাওয়ার পর কোন কিছু পড়ে থাকলে তা কুড়িয়ে নেবেন। তিনি সকাল বেলায় এখানে পৌছলেন। তখন পর্যন্ত প্রভাত-রশ্মি ততটুকু উজ্জ্বল ছিল না। তিনি শুধু একজন মানুষকে নিদ্রামগ্ন দেখতে পেলেন। কাছে এসে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহাকে চিনে ফেললেন। কারণ, পর্দা সংক্রান্ত আয়াত নাযিল হওয়ার পূর্বে তিনি তাকে দেখেছিলেন। চেনার পর অত্যন্ত বিচলিত কণ্ঠে তার মুখ থেকে “ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন” উচ্চারিত হয়ে গেল।
এই বাক্য আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহার কানে পৌঁছার সাথে সাথে তিনি জাগ্রত হয়ে গেলেন এবং মুখমণ্ডল ঢেকে ফেললেন। সফওয়ান নিজের উট কাছে এনে বসিয়ে দিলেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা তাতে সওয়ার হয়ে গেলেন এবং সফওয়ান রাদিয়াল্লাহু আনহু নিজে উটের নাকের রশি ধরে পায়ে হেঁটে চলতে লাগলেন। অবশেষে তিনি কাফেলার সাথে মিলিত হয়ে গেলেন। আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ছিল দুশ্চরিত্র, মুনাফেক ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের শত্রু। সে একটা সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে গেল। এই হতভাগা আবোলতাবোল বকতে শুরু করল। কিছুসংখ্যক সরল-প্রাণ মুসলিমও কানকথায় সাড়া দিয়ে এ আলোচনায় মেতে উঠল। পুরুষদের মধ্যে হাসসান ইবনে সাবিত, মিস্তাহ ইবনে আসাল এবং নারীদের মধ্যে হামনাহ বিনতে জাহাশ ছিল এ শ্রেণীভুক্ত।
যখন এই মুনাফেক-রটিত অপবাদের চর্চা হতে লাগল, তখন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতে খুবই মর্মাহত হলেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহার তো দুঃখের সীমাই ছিল না। সাধারণ মুসলিমগণও তীব্ৰভাবে বেদানাহত হলেন। একমাস পর্যন্ত এই আলোচনা চলতে লাগল। অবশেষে আল্লাহ্ তা'আলা উম্মুল মু'মিনীন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহার পবিত্রতা বর্ণনা এবং অপবাদ রটনাকারী ও এতে অংশগ্রহণকারীদের নিন্দা করে উপরোক্ত আয়াতসমূহ নাযিল করলেন। অপবাদের হদ-এ বর্ণিত কুরআনী-বিধান অনুযায়ী অপবাদ আরোপকারীদের কাছ থেকে সাক্ষ্য তলব করা হল। তারা এই ভিত্তিহীন খবরের সাক্ষ্য কোথা থেকে আনবে? ফলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম শরীয়তের নিয়মানুযায়ী তাদের প্রতি অপবাদের হদ প্রয়োগ করলেন। প্রত্যেককে আশিটি বেত্ৰাঘাত করা হল। আবু দাউদের বর্ণনায়, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিন জন মুসলিম মিসতাহ, হামানাহ ও হাসসানের প্রতি হদ প্রয়োগ করেন। (আবু দাউদঃ ৪৪৭৪)
অতঃপর মুসলিমরা তাওবাহ করে নেয় এবং মুনাফেকরা তাদের অবস্থানে কায়েম থাকে। তবে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম শাস্তি দিয়েছেন প্রমাণিত হয়নি। যদিও তাবরানী কয়েকজন সাহাবী থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে শাস্তি দিয়েছেন। (দেখুন: মু'জামুল কাবীর ২১/১৪৬ (২১৪), ২৩/১৩৭ (১৮১), ২৩/১২৫ (১৬৪), ২৩/১২৪ (১৬৩))
(২) عُصْبَةٌ শব্দের অর্থ দশ থেকে চল্লিশ জন পর্যন্ত লোকের দল। এর কমবেশীর জন্যও এই শব্দ ব্যবহৃত হয়। (দেখুন-ইবন কাসীর, কুরতুবী, ফাতহুল কাদীর)
(৩) অর্থাৎ যারা এই অপবাদে যতটুকু অংশ নিয়েছে, তাদের জন্য সে পরিমাণ গোনাহ লেখা হয়েছে এবং সে অনুপাতেই তাদের শাস্তি হবে। (বাগভী)
(৪) উদ্দেশ্য এই যে, যে ব্যক্তি অপবাদে বড় ভূমিকা নিয়েছে অর্থাৎ একে রচনা করে চালু করেছে, তার জন্য গুরুতর আযাব রয়েছে। বলাবাহুল্য, এ ব্যক্তি হচ্ছে মুনাফেক আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই। (মুয়াস্সার)
(১১) যারা মিথ্যা অপবাদ রটনা করেছে(1) তারা তো তোমাদেরই একটি দল;(2) এই অপবাদকে তোমরা তোমাদের জন্য অনিষ্টকর মনে করো না; বরং এ তো তোমাদের জন্য কল্যাণকর(3) ওদের প্রত্যেকের জন্য নিজ নিজ কৃত পাপকর্মের প্রতিফল আছে আর ওদের মধ্যে যে এ ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেছে তার জন্য আছে মহাশাস্তি।(4)
(1) إِفْك বলতে সেই মিথ্যা অপবাদ রটনার ঘটনাকে বুঝানো হয়েছে, যে ঘটনায় মুনাফিকরা মা আয়েশা (রাঃ) -এর চরিত্রে ও সতীত্বে কলঙ্ক ও কালিমা লেপন করতে চেয়েছিল। কিন্তু মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে মা আয়েশার পবিত্রতার স্বপক্ষে আয়াত অবতীর্ণ করে তাঁর সতীত্বকে অধিক উজ্জ্বল করে দিয়েছেন। সংক্ষেপে সেই ঘটনা হল এইরূপঃ পর্দার আদেশ অবতীর্ণ হওয়ার পর বানু মুস্তালিক (মুরাইসী’) যুদ্ধ হতে ফিরে আসার পথে আল্লাহর নবী (সাঃ) ও সাহাবা (রাঃ) গণ মদীনার নিকটবর্তী এক স্থানে রাত্রে বিশ্রাম নিলেন। প্রত্যূষে আয়েশা (রাঃ) নিজের প্রয়োজনে একটু দূরে গেলেন। ফিরার পথে দেখলেন তাঁর গলার হার হারিয়ে গেছে। খোঁজাখুঁজি করতে গিয়ে ঠিকানায় ফিরতে দেরী হল। এদিকে মহানবী (সাঃ)-এর আদেশে তাঁরা সেখান হতে কুচ করলেন। মা আয়েশার হাওদাজ (উটের পিঠে রাখা পালকির মত মেয়েদের বসার ঘর) লোকেরা উটের উপর রেখে নিয়ে সেখান হতে বিদায় নিলেন। আয়েশা (রাঃ) পাতলা গড়নের হাল্কা মহিলা ছিলেন। তাঁরা ভাবলেন, তিনি ভিতরেই আছেন। যখন তিনি ফিরে এলেন, তখন দেখলেন যে, কাফেলা রওনা দিয়েছে। তিনি সেখানেই শুয়ে গেলেন এই আশায় যে, তাঁরা আমার অনুপস্থিতির কথা টের পেতেই আমার খোঁজে ফিরে আসবেন। কিছুক্ষণ পর স্বাফওয়ান বিন মুআত্তাল সুলামী (রাঃ) সেখানে এলেন। তাঁর দায়িত্ব ছিল, কাফেলা কোন জিনিস-পত্র ফেলে গেলে পিছন থেকে তা তুলে নেওয়া। তিনি মা আয়েশা (রাঃ) -কে পর্দার আগে দেখেছিলেন। তিনি দেখার সঙ্গে সঙ্গে ‘ইন্না লিল্লাহি অইন্না ইলাইহি রাজিঊন’ পড়লেন এবং তিনি বুঝে নিলেন যে, কাফেলা ভুল করে বা অজানা অবস্থায় তাঁকে এখানে ফেলে কুচ করে গেছে। অতঃপর তিনি নিজের উট বসিয়ে তাঁকে চড়তে ইঙ্গিত করলেন ও নিজে উটের লাগাম ধরে পায়ে হেঁটে কাফেলার সাথে মিলিত হলেন। মুনাফিকরা যখন মা আয়েশা (রাঃ) -কে এ অবস্থায় একাকিনী স্বাফওয়ান (রাঃ)-এর সাথে আসতে দেখল, তখন তারা সুযোগ বুঝে তার সদ্ব্যবহার করতে চাইল। মুনাফিকদের নেতা আব্দুল্লাহ বিন উবাই বলেই ফেলল যে, একাকিনী ও সবার থেকে আলাদা থাকার নিশ্চয় কোন কারণ আছে! আর এভাবে তারা মা আয়েশাকে স্বাফওয়ানের সঙ্গে জড়িয়ে কলঙ্ক রচনা করল। অথচ তাঁরা দু’জনে এসব থেকে একেবারে উদাসীন ছিলেন। কিছু নিষ্ঠাবান মুসলমানও মুনাফিকদের ঐ রটনার ফাঁদে ফেঁসে গেলেন। যেমন, হাসসান বিন সাবেত, মিসত্বাহ বিন উসাসাহ, হামনাহ বিনতে জাহাশ। এই ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা সহীহ হাদীসসমূহে রয়েছে। নবী (সাঃ) একমাস (মতান্তরে ৫০/৫৫ দিন) পর্যন্ত যতক্ষণ না আল্লাহর পক্ষ থেকে আয়েশা (রাঃ) -র সতীত্বের আয়াত অবতীর্ণ হল, ততক্ষণ অত্যন্ত ব্যাকুল ছিলেন এবং আয়েশা (রাঃ) ও কিছু না জানার ফলে নিজের জায়গায় অস্থির অবস্থায় দিন-রাত্রি কাটিয়েছেন। এই আয়াতগুলোতে মহান আল্লাহ সেই ঘটনার সংক্ষিপ্ত ও ব্যাপক বর্ণনা দিয়েছেন। إِفْك শব্দের মূল অর্থ হল কোন জিনিসকে উল্টে দেওয়া। এই ঘটনায় যেহেতু মুনাফিকরা আসল ব্যাপারকে উল্টে দিয়েছিল, সেহেতু এই ঘটনা ইতিহাসে ‘ইফকে আয়েশা’ নামে প্রসিদ্ধ; মা আয়েশা (রাঃ) যিনি ছিলেন সতী-সাধ্বী, প্রশংসার পাত্রী, উচ্চবংশীয়া ও মহান চরিত্রের অধিকারিণী, তাঁর সবকিছু তারা উল্টে দিয়ে তাঁর সতীত্বে ও চরিত্রে অপবাদ ও কলঙ্কের কালিমা লেপন করে দিয়েছিল!
(2) একটি দল ও জামাআতকে عُصبَة বলা হয়। কারণ তারা এক অপরের সাথে মিলে শক্তি বৃদ্ধি ও পক্ষপাতিত্ব করে থাকে।
(3) কারণ, এতে দুঃখ-কষ্টের ফলে তোমাদের অতিশয় সওয়াব লাভ হবে, অন্য দিকে আসমান হতে আয়েশা (রাঃ) -র পবিত্রতা অবতীর্ণ হওয়ায় তাঁর মাহাত্ম্য ও বংশ-গৌরব ও মর্যাদা আরো স্পষ্ট হল। এ ছাড়া ঈমানদারদের জন্য এতে রয়েছে অনেক শিক্ষণীয় বিষয়।
(4) এ থেকে আব্দুল্লাহ বিন উবাই মুনাফিককে বুঝানো হয়েছে; যে এই অপবাদের মূল হর্তাকর্তা ছিল।