أَلَمۡ تَرَ إِلَى ٱلَّذِي حَآجَّ إِبۡرَٰهِـۧمَ فِي رَبِّهِۦٓ أَنۡ ءَاتَىٰهُ ٱللَّهُ ٱلۡمُلۡكَ إِذۡ قَالَ إِبۡرَٰهِـۧمُ رَبِّيَ ٱلَّذِي يُحۡيِۦ وَيُمِيتُ قَالَ أَنَا۠ أُحۡيِۦ وَأُمِيتُۖ قَالَ إِبۡرَٰهِـۧمُ فَإِنَّ ٱللَّهَ يَأۡتِي بِٱلشَّمۡسِ مِنَ ٱلۡمَشۡرِقِ فَأۡتِ بِهَا مِنَ ٱلۡمَغۡرِبِ فَبُهِتَ ٱلَّذِي كَفَرَۗ وَٱللَّهُ لَا يَهۡدِي ٱلۡقَوۡمَ ٱلظَّـٰلِمِينَ

আলাম তার ইলাল্লাযী হাজ্জা ইবর-হীমা ফী রব্বিহীআন আ-তা-হুল্লা-হুল মুলক । ইযক-লা ইবর-হীমু রব্বিইয়াল্লাযী ইউহয়ী ওয়া ইউমীতু ক-লা আনা উহঈ ওয়াউমীতু ক-লা ইবর-হীমু ফাইন্নাল্লা-হা ইয়া’তী বিশশামছি মিনাল মাশরিকি ফা’তি বিহা- মিনাল মাগরিবি ফাবুহিতাল্লাযী কাফার ওয়াল্লা-হু লা ইয়াহদিল কাওমাজ্জা-লিমীন।উচ্চারণ

তুমি ২৮৯ সেই ব্যক্তির অবস্থা সম্পর্কে চিন্তা করোনি, যে ইবরাহীমের সাথে তর্ক করেছিল? ২৯০ তর্ক করেছিল এই কথা নিয়ে যে, ইবরাহীমের রব কে? এবং তর্ক এ জন্য করেছিল যে, আল্লাহ‌ তাকে রাষ্ট্রক্ষমতা দান করেছিলেন। ২৯১ যখন ইবরাহীম বললোঃযার হাতে জীবন ও মৃত্যু তিনিই আমার রব। জবাবে সে বললোঃ জীবন ও মৃত্যু আমার হাতে। ইবরাহীম বললোঃ তাই যদি সত্য হয়ে থাকে তাহলে, আল্লাহ‌ পূর্ব দিক থেকে সূর্য উঠান, দেখি তুমি তাকে পশ্চিম দিক থেকে উঠাও। একথা শুনে সেই সত্য অস্বীকারকারী হতবুদ্ধি হয়ে গেলো ২৯২ কিন্তু আল্লাহ‌ জালেমদের সঠিক পথ দেখান না। তাফহীমুল কুরআন

তুমি কি সেই ব্যক্তির অবস্থা চিন্তা করেছ, যাকে আল্লাহ রাজত্ব দান করার কারণে সে নিজ প্রতিপালকের (অস্তিত্ব) সম্পর্কে ইবরাহীমের সঙ্গে বিতর্কে লিপ্ত হয়? যখন ইবরাহীম বলল, আমার প্রতিপালক তিনিই, যিনি জীবনও দান করেন এবং মৃত্যুও! তখন সে বলতে লাগল, আমিও জীবন দেই এবং মৃত্যু #%১৯৫%# ঘটাই! ইবরাহীম বলল, আচ্ছা! তা আল্লাহ তো সূর্যকে পূর্ব থেকে উদিত করেন, তুমি তা পশ্চিম থেকে উদিত কর তো! এ কথায় সে কাফির নিরুত্তর হয়ে গেল। আর আল্লাহ (এরূপ) জালিমদেরকে হিদায়াত করেন না।মুফতী তাকী উসমানী

তুমি কি তার প্রতি লক্ষ্য করনি যে ইবরাহীমের সাথে তার রাব্ব সম্বন্ধে বিতর্ক করেছিল, যেহেতু আল্লাহ তাকে রাজত্ব প্রদান করেছিলেন। ইবরাহীম বলেছিলঃ আমার রাব্ব তিনিই যিনি জীবিত করেন ও মৃত্যু দান করেন। সে বলেছিলঃ আমিই জীবন ও মৃত্যু দান করি। ইবরাহীম বলেছিলঃ নিশ্চয়ই আল্লাহ সূর্যকে পূর্ব দিক হতে আনয়ন করেন, কিন্তু তুমি ওকে পশ্চিম দিক হতে আনয়ন কর; এতে সেই অবিশ্বাসকারী হতবুদ্ধি হয়েছিল; এবং আল্লাহ অত্যাচারী সম্প্রদায়কে পথ প্রদর্শন করেননা।মুজিবুর রহমান

তুমি কি সে লোককে দেখনি, যে পালনকর্তার ব্যাপারে বাদানুবাদ করেছিল ইব্রাহীমের সাথে এ কারণে যে, আল্লাহ সে ব্যাক্তিকে রাজ্য দান করেছিলেন? ইব্রাহীম যখন বললেন, আমার পালনকর্তা হলেন তিনি, যিনি জীবন দান করেন এবং মৃত্যু ঘটান। সে বলল, আমি জীবন দান করি এবং মৃত্যু ঘটিয়ে থাকি। ইব্রাহীম বললেন, নিশ্চয়ই তিনি সুর্যকে উদিত করেন পূর্ব দিক থেকে এবার তুমি তাকে পশ্চিম দিক থেকে উদিত কর। তখন সে কাফের হতভম্ব হয়ে গেল। আর আল্লাহ সীমালংঘণকারী সম্প্রদায়কে সরল পথ প্রদর্শন করেন না।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

তুমি কি ঐ ব্যক্তিকে দেখ নাই, যে ইব্রাহীমের সঙ্গে তার প্রতিপালক সম্বন্ধে বিতর্কে লিপ্ত হয়েছিল, যেহেতু আল্লাহ্ তাকে কর্তৃত্ব দিয়েছিলেন। যখন ইব্রাহীম বলল, ‘তিনি আমার প্রতিপালক যিনি জীবন দান করেন ও মৃত্যু ঘটান’, সে বলল, ‘আমিও তো জীবন দান করি ও মৃত্যু ঘটাই।’ ইব্রাহীম বলল, ‘আল্লাহ্ সূর্যকে পূর্ব দিক হতে উদিত করান, তুমি একে পশ্চিম দিক হতে উদিত করাও তো।’ এরপর যে কুফরী করেছিল সে হতবুদ্ধি হয়ে গেল। আল্লাহ্ জালিম সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না। ইসলামিক ফাউন্ডেশন

তুমি কি সে ব্যক্তিকে দেখনি, যে ইবরাহীমের সাথে তার রবের ব্যাপারে বিতর্ক করেছে যে, আল্লাহ তাকে রাজত্ব দিয়েছেন? যখন ইবরাহীম বলল, ‘আমার রব তিনিই’ যিনি জীবন দান করেন এবং মৃত্যু ঘটান। সে বলল, আমিই জীবন দান করি এবং মৃত্যু ঘটাই। ইবরাহীম বলল, নিশ্চয় আল্লাহ পূর্বদিক থেকে সূর্য আনেন। অতএব তুমি তা পশ্চিম দিক থেকে আন। ফলে কাফির ব্যক্তি হতভম্ব হয়ে গেল। আর আল্লাহ যালিম সম্প্রদায়কে হিদায়াত দেন না।আল-বায়ান

তুমি কি সেই ব্যক্তির ঘটনা সম্পর্কে চিন্তা কর নি, যে ইবরাহীমের সঙ্গে তার প্রতিপালক সম্বন্ধে তর্ক করেছিল, যেহেতু আল্লাহ তাকে রাজত্ব দান করেছিলেন। ইবরাহীম তাকে যখন বলল, ‘আমার প্রতিপালক তিনিই, যিনি জীবিত করেন এবং মৃত্যু ঘটান’। সে বলল, ‘আমিও জীবিত করি এবং মৃত্যু ঘটাই’। ইবরাহীম বলল, ‘আল্লাহ সূর্যকে পূর্ব দিক থেকে উদিত করেন, তুমি তাকে পশ্চিম দিক থেকে উদিত কর’। তখন সেই কাফিরটি হতভম্ব হয়ে গেল। বস্তুতঃ আল্লাহ যালিমদেরকে সুপথ দেখান না।তাইসিরুল

তুমি কি তার কথা ভেবে দেখো নি যে ইব্রাহীমের সাথে তাঁর প্রভুর সন্বন্ধে ঝগড়া করছিল যেহেতু আল্লাহ্ তাঁকে রাজত্ব দিয়েছিলেন? স্মরণ করো! ইব্রাহীম বলেছিলেন -- "আমার প্রভু তিনি যিনি জীবনদান করেন এবং মৃত্যু ঘটান।" সে বলল -- "আমি জীবন দিয়ে রাখতে পারি এবং মৃত্যু ঘটাতে পারি।" ইব্রাহীম বলেছিলেন -- "আল্লাহ্ কিন্তু সূর্যকে পূর্বদিক থেকে নিয়ে আসেন তুমি তাহলে তাকে পশ্চিমদিক থেকে নিয়ে এস।" এইভাবে সে হেরে গেল যে অবিশ্বাস পোষণ করেছিল। আর আল্লাহ্ জুলুমকারী জাতিকে হেদায়ত করেন না।মাওলানা জহুরুল হক

তাফহীমুল কুরআন

২৮৯

ওপরে দাবী করা হয়েছিল, মু’মিনের সহায় ও সাহায্যকারী হচ্ছে আল্লাহ‌ তিনি মানুষকে অন্ধকার থেকে বের করে আলোর মধ্যে নিয়ে যান আর কাফেরের সাহায্যকারী হচ্ছে, তাগুত, সে তাকে আলোকের মুখ থেকে টেনে অন্ধকারের মধ্যে নিয়ে যায়। এখানে এ বিষয়টির ওপর বিস্তারিত আলোকপাত করার জন্য দৃষ্টান্ত স্বরূপ তিনটি ঘটনার উল্লখে করা হয়েছে। প্রথম দৃষ্টান্তটি এমন এক ব্যক্তির যার সামনে সুস্পষ্ট দলীল প্রমাণ সহকারে সত্যকে পেশ করা হয় এবং সে তার সামনে নিরুত্তর হয়ে পড়ে। কিন্তু যেহেতু সে আগে থেকেই নিজের লাগাম তাগুতের হাতে সঁপে দিয়েছিল তাই সত্যের উলংগ প্রকাশের পরও সে আলোর রাজ্যে পা দিতে পারেনি। অন্ধকারের অথৈ সমুদ্রে আগের মতোই সে হাবুডুবু খেতে থাকে। পরবর্তী দৃষ্টান্ত দু’টি এমন দুই ব্যক্তির যারা আল্লাহর সাহায্যের দিকে হাত বাড়ান। ফলে আল্লাহ‌ তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর রাজ্যে এমনভাবে টেনে আনেন যে, অদৃশ্য গোপন সত্যের সাথে তাদের চাক্ষুষ সাক্ষাত ঘটেও যায়।

২৯০

সেই ব্যক্তিটি হচ্ছে নমরুদ। হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের স্বদেশভূমি ইরাকের বাদশাহ ছিল এই নমরুদ। এখানে যে ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে বাইবেলে তার প্রতি কোন ইঙ্গিত নেই। তবে তালমূদে এই সমগ্র ঘটনাটিই বিবৃত হয়েছে। কুরআনের সাথে তার ব্যাপক মিলও রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছেঃ হযরত ইবরাহীমের (আ) পিতা নমরুদের দরবারে প্রধান রাষ্ট্রীয় কর্মচারীর (Chief officer of the state) পদে অধিষ্ঠিত ছিল। হযরত ইবরাহীম (আ) যখন প্রকাশ্যে শিরকের বিরোধিতা ও তাওহীদের প্রচার শুরু করেন এবং দেব-মন্দিরে প্রবেশ করে প্রতিমাগুলো ভেঙে দেন তখন তাঁর পিতা নিজেই বাদশাহর দরবারে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা পেশ করে তারপর বাদশাহর সাথে তাঁর যে বিতর্কালাপ হয় তাই এখানে উল্লেখিত হয়েছে।

২৯১

অর্থাৎ যে বিষয়টি নিয়ে এ বিতর্ক চলছিল সেটি ছিল এই যে ইবরাহীম (আ) কাকে নিজের রব বলে মানেন? আর এ বিতর্কটি সৃষ্টি হবার কারণ ছিল এই যে, বিতর্ককারী ব্যক্তি অর্থাৎ নমরুদকে আল্লাহ রাষ্ট্র ক্ষমতা দান করেছিলেন। এই দু’টি বাক্যের মধ্যে বিতর্কের ধরনের প্রতি যে ইঙ্গিত করা হয়েছে তা বুঝবার জন্য নিম্নলিখিত বাস্তব বিষয়গুলো সামনে রাখা প্রয়োজন।

একঃ প্রাচীনকাল থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত মুশরিক সমাজগুলোর এই সম্মিলিত বৈশিষ্ট্য দেখা গেছে যে, তারা আল্লাহকে সকল খোদার প্রধান খোদা, প্রধান উপাস্য ও পরমেশ্বর হিসেবে মেনে নেয় কিন্তু একমাত্র তাঁকেই আরাধ্য, উপাস্য, মাবুদ ও খোদা হিসেবে মানতে প্রস্তুত হয় না।

দুইঃ আল্লাহর ক্ষমতা ও কর্তৃত্বকে মুশরিকরা চিরকাল দু’ভাগে বিভক্ত করে এসেছে। একটি হচ্ছে, অতি প্রাকৃতিক (Super natural) খোদায়ী ক্ষমতা। কার্যকারণ পরম্পরার ওপর এর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত এবং মুশরিকরা নিজেদের প্রয়োজন পূর্ণ করার সংকট উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য এর দোহাই দেয়। এই খোদায়ীর ক্ষেত্রে তারা আল্লাহর সাথে অতীতের পুণ্যবান লোকদের আত্মা, ফেরেশতা (দেবতা), জিন, নক্ষত্র এবং আরো অসংখ্য সত্তাকে শরীক করে। তাদের কাছে প্রার্থনা করে। পূজা ও উপাসনার অনুষ্ঠানাদি তাদের সামনে সম্পাদন করে। তাদের আস্তানায় ভেট ও নজরানা দেয়। দ্বিতীয়টি হচ্ছে তামাদ্দুনিক ও রাজনৈতিক বিষয়ের খোদায়ী (অর্থাৎ শাসন কর্তৃত্ব) ক্ষমতা। জীবন বিধান নির্ধারণ করার ও নির্দেশের আনুগত্য লাভ করার অধিকার তার আয়ত্বাধীন থাকে। পার্থিব বিষয়াবলীর ওপর শাসন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পূর্ণ ক্ষমতা তার থাকে। দুনিয়ার সকল মুশরিক সম্প্রদায় প্রায় প্রতি যুগে এই দ্বিতীয় প্রকারের খোদায়ী কর্তৃত্বকে আল্লাহর কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে অথবা তার সাথে রাজপরিবার, ধর্মীয় পুরোহিত ও সমাজের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী কালের মনীষীদের মধ্যে বণ্টন করে দিয়েছে। বেশীর ভাগ রাজপরিবার এই দ্বিতীয় অর্থে খোদায়ীর দাবীদার হয়েছে। তাদের এই দাবীকে শক্তিশালী করার জন্য আবার তারা সাধারণভাবে প্রথম অর্থের খোদাদের সন্তান হবার দাবী করেছে। এ ব্যাপারে ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলো তাদের ষড়যন্ত্রে অংশীদার হয়েছে।

তিনঃ নমরুদের খোদায়ী দাবীও এই দ্বিতীয় ধরনের ছিল। সে আল্লাহর অস্তিত্ব অস্বীকার করতো না। নিজেকে পৃথিবী ও আকাশের স্রষ্টা ও পরিচালক বলে সে দাবী করতো না। সে একথা বলতো না যে, বিশ্ব-জগতের সমস্ত কার্যাকারণ পরম্পরার ওপর তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। বরং তার দাবী ছিল, আমি এই ইরাক দেশ এবং এর অধিবাসীদের একচ্ছত্র অধিপতি। আমার মুখের কথাই এ দেশের আইন। আমার ওপর আর কারো কর্তৃত্ব নেই। কারো সামনেই আমাকে জবাবদিহি করতে হবে না। ইরাকের যেকোন ব্যক্তি এসব দিক দিয়ে আমাকে রব বলে মেনে নেবে না অথবা আমাকে বাদ দিয়ে আর কাউকে রব বলে মেনে নেবে, সে বিদ্রোহী ও বিশ্বাসঘাতক।

চারঃ ইবরাহীম আল্লাইহিস সালাম যখন বললেন, আমি একমাত্র রব্বুল আলামীনকে খোদা, মাবুদ ও রব বলে মানি, তাঁর ছাড়া আর সবার খোদায়ী, প্রভুত্ব ও কর্তৃত্ব অস্বীকার করি, তখন কেবল এতটুকু প্রশ্ন সেখানে দেখা দেয়নি যে, জাতীয় ধর্ম ও ধর্মীয় মাবুদদের ব্যাপারে তাঁর এই নতুন আকীদা ও বিশ্বাস কতটুকু সহনীয়, বরং এই প্রশ্নও দেখা দিয়েছে যে, জাতীয় রাষ্ট্র ও তার কেন্দ্রীয় ক্ষমতা-কর্তৃত্বের ওপর এই বিশ্বাস যে আঘাত হানছে তাকে উপেক্ষা করা যায় কেমন করে? এ কারণেই হযরত ইবরাহীম (আ) বিদ্রোহের অপরাধে নমরুদের সামনে আনীত হন।

২৯২

যদিও হযরত ইবরাহীমের (আ) প্রথম বাক্যের একথা সুস্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, আল্লাহ‌ ছাড়া দ্বিতীয় আর কেউ রব হতে পারে না তবুও নমরুদ হঠধর্মিতার পরিচয় দিয়ে নির্লজ্জের মতো তার জবাব দিয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয় বাক্যের পর তার জন্য আবার হঠধর্মী হবার আর কোন সুযোগই ছিল না। সে নিজেও জানতো, চন্দ্র-সূর্য সেই আল্লাহরই হুকুমের অধীন যাকে ইবরাহীম রব বলে মেনে নিয়েছে। এরপর তার কাছে আর কি জবাব থাকতে পারে? কিন্তু এভাবে তার সামনে যে দ্ব্যর্থহীন সত্য আত্মপ্রকাশ করেছিল তাকে মেনে নেয়ার মানেই ছিল নিজের স্বাধীন সার্বভৌম প্রভুত্ব ও শাসন কর্তৃত্ব পরিহার করা। আর এই কর্তৃত্ব পরিহার করতে তার নফসের তাগুত মোটেই প্রস্তুত ছিল না। কাজেই তার পক্ষে নিরুত্তর ও হতবুদ্ধি হওয়াই স্বাভাবিক ছিল। আত্মপূজার অন্ধকার ভেদ করে সত্য প্রিয়তার আলোকে প্রবেশ করা তার পক্ষে সম্ভবপর হলো না। যদি এই তাগুতের পরিবর্তে আল্লাহকে সে নিজের সাহায্যকারী ও পৃষ্ঠপোষক হিসেব মেনে নিতো, তাহলে হযরত ইবরাহীমের প্রচার ও নসিহত প্রদানের পর তার জন্য সঠিক পথের দ্বার উন্মুক্ত হয়ে যেতো।

তালমূদের বর্ণনা মতে, তারপর সেই বাদশাহর নির্দেশে হযরত ইবরাহীমকে বন্দী করা হয়। দশ দিন তিনি কারাগারে অবস্থান করেন। অতঃপর বাদশাহর কাউন্সিল তাকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তাঁকে আগুনে নিক্ষেপ করার যে ঘটনা ঘটে তা সূরা আম্বিয়ার ৫ম রুকূ’, আনকাবুতের ২য় ও ৩য় রুকূ’ এবং আস সাফ্‌ফাতের ৪র্থ রুকূ’তে বর্ণিত হয়েছে।

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

বাবেলের বাদশাহ নমরূদের কথা বলা হচ্ছে। সে নিজেকে খোদা বলে দাবী করত। তার দাবী ‘আমি জীবন ও মৃত্যু দান করি’-এর অর্থ ছিল, আমি বাদশাহ হওয়ার কারণে যাকে ইচ্ছা করি তার প্রাণনাশ করতে পারি এবং যাকে ইচ্ছা করি মৃত্যুদণ্ডের উপযুক্ত হওয়া সত্ত্বেও তাকে ক্ষমা করে দেই ও তাকে মুক্তি দান করি। আর এভাবে আমি তার জীবন দান করি। বলাবাহুল্য, তার এ জবাব মোটেই সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না। কেননা আলোচনা জীবন ও মৃত্যুর উপকরণ সম্পর্কে নয়, বরং তার সৃষ্টি সম্পর্কে হচ্ছিল। কিন্তু হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম দেখলেন, সে মৃত্যু ও জীবনের সৃষ্টি কাকে বলে সেটাই বুঝতে পারছে না অথবা সে কূটতর্কে লিপ্ত হয়েছে। অগত্যা তিনি এমন একটা কথা বললেন, যার কোনও উত্তর নমরূদের কাছে ছিল না। কিন্তু লা জওয়াব হয়ে যে সত্য কবুল করে নেবে তা নয়; বরং উল্টো সে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে প্রথমে বন্দী করল, তারপর তাঁকে আগুনে নিক্ষেপ করার নির্দেশ দিল, যা সূরা আম্বিয়া (২১ : ৬৮-৭১), সূরা আনকাবূত (২৯ : ২৪) ও সূরা সাফফাত (৩৭ : ৯৭)- এ বর্ণিত হয়েছে।

তাফসীরে জাকারিয়া

২৫৮. আপনি কি ঐ ব্যক্তিকে দেখেননি, যে ইবরাহীমের সাথে তার রব সম্বন্ধে বিতর্কে লিপ্ত হয়েছিল, যেহেতু আল্লাহ তাকে রাজত্ব(১) দিয়েছিলেন। যখন ইবরাহীম বললেন, “আমার রব তিনিই যিনি জীবনদান করেন ও মৃত্যু ঘটান, সে বলল, আমিও তো জীবন দান করি ও মৃত্যু ঘটাই। ইবরাহীম বললেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ সূর্যকে পূর্ব দিক থেকে উদয় করান, তুমি সেটাকে পশ্চিম দিক থেকে উদয় করাও তো(২)। তারপর যে কুফরী করেছিল সে হতবুদ্ধি হয়ে গেল। আর আল্লাহ যালিম সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না।

(১) এ আয়াত দ্বারা বোঝা গেল যে, যখন আল্লাহ্ তা'আলা কোন কাফের ব্যক্তিকে দুনিয়াতে মান-সম্মান এবং রাজত্ব দান করেন, তখন তাকে সে নামে অভিহিত করা জায়েয। এতে একথাও বোঝা যাচ্ছে যে, প্রয়োজন বোধে তার সাথে তর্ক-বিতর্ক করাও জায়েয, যাতে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য প্রকাশ হয়ে যেতে পারে।

(২) কেউ কেউ এরূপ সন্দেহ পোষণ করেছেন যে, সে হয়ত বলতে পারত যে, যদি আল্লাহ বলে কেউ থাকেন, তবে তিনিই পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত করুন। এর উত্তর হচ্ছে এই যে, তার অন্তরে অনিচ্ছা সত্বেও একথা জেগে উঠল যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ আছেন এবং পূর্বদিক হতে সূর্য উদয় করা তার কাজ এবং তিনি পশ্চিম দিক হতেও উদয় করতে পারেন। আর এ ব্যক্তি নবী হয়ে থাকলে অবশ্যই এমন হবে। আর এমন হলে বিশ্বময় এক বিরাট পরিবর্তন সৃষ্টি হয়ে যাবে। তাতে না আবার লাভের পরিবর্তে ক্ষতি বেড়ে যায়। যেমন, মানুষ এ মু'জিযা দেখে যদি আমার দিক থেকে ফিরে তার দিকে ঝুঁকে যায়। সামান্য বাড়াবাড়িতে না আবার রাজত্বই চলে যায়। কাজেই সে উত্তরই দেয় নি। অথবা তার কাছে এ প্রশ্নের কোন উত্তরই ছিল না। এ জন্য সে হতভম্ব হয়ে পড়ে। (বয়ানুল কুরআন)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

(২৫৮) তুমি কি সে ব্যক্তির (নমরূদের) কথা ভেবে দেখনি, যে ইব্রাহীমের সাথে তার প্রতিপালক সম্বন্ধে বিতর্কে লিপ্ত হয়েছিল? যেহেতু আল্লাহ তাকে রাজত্ব দিয়েছিলেন। যখন ইব্রাহীম বলল, ‘তিনি আমার প্রতিপালক যিনি জীবন দান করেন ও মৃত্যু ঘটান।’ সে বলল, ‘আমিও জীবন দান করি ও মৃত্যু ঘটাই।’ ইব্রাহীম বলল, ‘নিশ্চয় আল্লাহ সূর্যকে পূর্ব দিক থেকে উদিত করেন, তুমি তাকে পশ্চিম দিক থেকে উদিত কর।’ তখন সে (নমরূদ) হতবুদ্ধি হয়ে গেল। আর আল্লাহ অত্যাচারী সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না।