ইন্নাল্লা-হা ইউদা-ফি‘উ ‘আনিল্লাযীনা আ-মানূ ইন্নাল্লা-হা লা-ইউহিব্বুকুল্লা খাওওয়ানিন কাফূর।উচ্চারণ
নিশ্চয়ই ৭৫ আল্লাহ ঈমানদারদের সংরক্ষণ করেন, ৭৬ নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো বিশ্বাসঘাতক কৃতঘ্নকে পছন্দ করেন না। ৭৭ তাফহীমুল কুরআন
নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের প্রতিরক্ষা করেন, যারা ঈমান এনেছে। #%২৪%# জেনে রেখ, আল্লাহ কোন বিশ্বাসঘাতক, অকৃতজ্ঞকে পছন্দ করেন না।মুফতী তাকী উসমানী
আল্লাহ রক্ষা করেন মু’মিনদেরকে। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোন বিশ্বাসঘাতক, অকৃতজ্ঞকে পছন্দ করেননা।মুজিবুর রহমান
আল্লাহ মুমিনদের থেকে শত্রুদেরকে হটিয়ে দেবেন। আল্লাহ কোন বিশ্বাসঘাতক অকৃতজ্ঞকে পছন্দ করেন না।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
অবশ্যই আল্লাহ্ রক্ষা করেন মু’মিনদেরকে, তিনি কোন বিশ্বাসঘাতক, অকৃতজ্ঞকে পছন্দ করেন না।ইসলামিক ফাউন্ডেশন
নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদেরকে রক্ষা করেন এবং কোন বিশ্বাসঘাতক, অকৃতজ্ঞকে পছন্দ করেন না।আল-বায়ান
আল্লাহ মু’মিনদেরকে রক্ষা করেন (যাবতীয় মন্দ হতে)। আল্লাহ কোন খিয়ানাতকারী, অকৃতজ্ঞকে পছন্দ করেন না।তাইসিরুল
নিঃসন্দেহ আল্লাহ্ দফা রফা করে দেবেন তাদের থেকে যারা ঈমান এনেছে। নিঃসন্দেহ আল্লাহ ভালবাসেন না প্রত্যেক বিশ্বাসঘাতককে, অকৃতজ্ঞকে।মাওলানা জহুরুল হক
৭৫
এখান থেকে অন্য একটি বিষয়বস্তুর দিকে ভাষণটির মোড় ফিরে গেছে। প্রাসঙ্গিক বক্তব্য অনুধাবন করার জন্য একথা স্মরণ করা দরকার যে, এটি এমন এক সময়ের ভাষণ যখন হিজরাতের পর প্রথমবার হজ্জের মওসুম এসেছিল। সে সময় একদিকে মুহাজির ও মদীনার আনসারদের কাছে এ বিষয়টি বড়ই কঠিন মনে হচ্ছিল যে, তাদেরকে হজ্জের নিয়ামত থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে এবং হারাম শরীফের যিয়ারতের পথ জোরপূর্বক তাদের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে মক্কায় মুসলমানদের ওপর যেসব জুলুম করা হয়েছিল শুধুমাত্র সেগুলোর আঘাতই তাদের মনে দগদগ করছিল তাই নয় বরং এ ব্যাপারেও তারা অত্যন্ত শোকাহত ছিল যে, ঘরবাড়ী ছেড়ে তারা মক্কা থেকে বের হয়ে এসেছে এরপর এখন মদীনাতেও তাদেরকে নিশ্চিন্তে বাস করতে দেয়া হচ্ছে না। এ সময় যে ভাষণ দেয়া হয় তার প্রথম অংশে কাবাগৃহ নির্মাণ, হজ্জ পালন ও কুরবানীর পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করে একথা বলা হয় যে, এসব বিষয়ের আসল উদ্দেশ্য কি ছিল এবং জাহেলীয়াত এগুলোকে বিকৃত করে কোথা থেকে কোথায় নিয়ে গেছে। এভাবে মুসলমানদের মধ্যে প্রতিশোধ নেবার সংকল্প নিয়ে নয় বরং সংস্কারের সংকল্প নিয়ে এ অবস্থা পরিবর্তন করার জন্য এগিয়ে আসার প্রেরণা সৃষ্টি করা হয়। তাছাড়া এ সঙ্গে মদীনায় কুরবানীর পদ্ধতি জারি করে মুসলমানদেরকে এ সুযোগ দেয়া হয় যে, হজ্জের সময় নিজ নিজ গৃহেই কুরবানী করে শত্রুরা তাদেরকে যে সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করেছে তাতে তারা অংশ গ্রহণ করতে পারবে। আবার হজ্জ থেকে আলাদাভাবে কুরবানীকে একটি স্বতন্ত্র সুন্নাত হিসেবে জারী করে। এর ফলে যারা হজ্জ করার সুযোগ পাবে না তারাও আল্লাহর এ নিয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং তাঁর শেষ্ঠত্ব ঘোষণার হক আদায় করতে পারবে। এরপর এখন দ্বিতীয় অংশে মুসলমানদেরকে তাদের ওপর যে জুলুম করা হয়েছিল এবং যে জুলুমের ধারা অব্যাহত ছিল তার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করার অনুমতি দেয়া হচ্ছে।
৭৬
মূলে مدَافِعَت শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এর উৎপত্তি হয়েছে دفع থেকে। এ শব্দটির আসল মানে হচ্ছে, কোন জিনিসকে হটিয়ে দেয়া ও সরিয়ে দেয়া। কিন্তু যখন “দফা” করার পরিবর্তে “মুদাফা’আত” করার কথা বলা হবে তখন এর মধ্যে আরো দু’টি অর্থ শামিল হয়ে যাবে। এক কোন শত্রুশক্তি আক্রমণ চালাচ্ছে এবং প্রতিরক্ষাকারী তার মোকাবিলা করছে। দুই, এ মোকাবিলা শুধুমাত্র একবারেই শেষ হয়ে যায়নি বরং যখনই আক্রমণকারী আক্রমণ করে তখনই এ প্রতিরক্ষাকারী তার মোকাবিলা করে। এ দু’টি অর্থ সামনে রেখে বিচার করলে মু’মিনদের পক্ষ থেকে আল্লাহর ‘মুদাফা’আত’ করার অর্থ এই বুঝা যায় যে, কুফর ও ঈমানের সংঘাতে মু’মিনরা একা ও নিসঙ্গ হয় না বরং আল্লাহ নিজেই তাদের সাথে এক পক্ষ হয়ে দাঁড়ান। তিনি তাদেরকে সমর্থন দান করেন। তাদের বিরুদ্ধে শত্রুদের কৌশল ব্যর্থ করে দেন। অনিষ্টকারকদের অনিষ্টকে তাদের থেকে দূরে সরিয়ে দিতে থাকেন। কাজেই এ আয়াতটি আসলে হক পন্থীদের জন্য একটি বড় রকমের সুসংবাদ। তাদের মনকে সুদৃঢ় ও শক্তিশালী করার জন্য এর চেয়ে বড় আর কোন জিনিস হতে পারে না।
৭৭
এ সংঘাতে আল্লাহ কেন হকপন্থীদের সাথে একটি পক্ষ হন এটি হচ্ছে তার কারণ। এর কারণ হচ্ছে, হকের বিরুদ্ধে সংঘর্ষে লিপ্ত দ্বিতীয় পক্ষটি বিশ্বাসঘাতক, অকৃতজ্ঞ এবং নিয়ামত অস্বীকারকারী। আল্লাহ তার কাছে যেসব আমানত সোপর্দ করেছেন তার প্রত্যেকটিতে সে খেয়ানত করেছে এবং তাকে যেসব নিয়ামত দান করেছেন অকৃতজ্ঞতা, অস্বীকৃতি ও নেমকহারামির মাধ্যমে তার প্রত্যেকটির জবাব দিয়ে চলছে। কাজেই আল্লাহ তাকে অপছন্দ করেন এবং তার বিরুদ্ধে সংগ্রামরত হকপন্থীদেরকে সাহায্য-সহায়তা দান করেন।
মক্কা মুকাররমায় কাফেরদের পক্ষ হতে মুসলিমদের প্রতি যে জুলুম-নির্যাতন চালানো হত, শুরুতে কুরআন মাজীদ সেক্ষেত্রে তাদেরকে বারবার সবর অবলম্বনের হুকুম দিয়েছে। অতঃপর এ আয়াতে তাদেরকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, সবরের যে পরীক্ষা এ যাবৎকাল তারা দিয়ে এসেছে তার পালা এখন শেষ হতে যাচ্ছে। জালেমদেরকে তাদের জুলুমের জবাব দেওয়ার সময় এসে গেছে। সুতরাং পরবর্তী আয়াতে মুসলিমদেরকে জিহাদের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তার আগে সুসংবাদ শোনানো হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা নিজেই মুসলিমদের প্রতিরক্ষা করবেন, তাদের পক্ষ থেকে শত্রুদের প্রতিরোধ ও দমন করবেন। কাজেই তারা নির্ভয়ে নিঃসঙ্কচিত্তে যুদ্ধ করুক। কেননা যাদের সঙ্গে তাদের লড়াই হবে, তারা হচ্ছে শঠ ও প্রতারক এবং ঘোর অকৃতজ্ঞ। এরূপ লোককে আল্লাহ তাআলা পছন্দ করেন না। কাজেই তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহ তাআলা মুসলিমদেরকেই সাহায্য করবেন।
৩৮. নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদের পক্ষ থেকে প্রতিরোধ করেন(১), তিনি কোন বিশ্বাসঘাতক, অকৃতজ্ঞকে পছন্দ করেন না।(২)
(১) আয়াতে মুমিনদের জন্য সুসংবাদ রয়েছে যে, আল্লাহ্ তা'আলা তাদের যাবতীয় ক্ষতি দূরিভূত করবেন। এটা শুধু তাদের ঈমানের কারণে। তিনি কাফেরদের ক্ষতি, শয়তানের কুমন্ত্রণার ক্ষতি, নাফসের কুমন্ত্রণার ক্ষতি, তাদের খারাপ আমলের পরিণতি সংক্রান্ত ক্ষতি, এসব কিছুই প্রতিহত করবেন। কোন অপছন্দ কিছু সংঘটিত হলে তিনি তারা যা বহন করার ক্ষমতা নেই সেটা বহন করে নিবেন, ফলে মুমিনদের জন্য সেটা হাল্কা হয়ে যাবে। প্রত্যেক মুমিনই তার ঈমান অনুসারে এ প্রতিহত ও প্রতিরোধ প্ৰাপ্ত হবে। কারও বেশী ও কারও কম। (সা’দী) অন্য আয়াতেও আল্লাহ তা'আলা তা বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, “আর যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর তাওয়াকুল করে তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।” (সূরা আত-তালাকঃ ৩) “আল্লাহ কি তাঁর বান্দার জন্য যথেষ্ট নন? অথচ তারা আপনাকে আল্লাহর পরিবর্তে অন্যের ভয় দেখায়।” (সূরা আয-যুমার: ৩৬) আরও বলেন, “তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করবে। তোমাদের হাতে আল্লাহ তাদেরকে শাস্তি দেবেন, তাদেরকে অপদস্থ করবেন, তাদের উপর তোমাদেরকে বিজয়ী করবেন এবং করবেন এবং আল্লাহ যাকে ইচ্ছে তার তাওবা কবুল করবেন। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।” (সূরা আত-তাওবাহঃ ১৪–১৫)
আরও বলেন, “আর আমাদের দায়িত্ব তো মুমিনদের সাহায্য করা।” (সূরা আর-রূম: ৪৭) আরও বলেন, “আর আমাদের বাহিনীই হবে বিজয়ী।” (সূরা আস-সাফফাত: ১৭৩) অনুরূপ আরও আয়াত। এর দ্বারা এটাই উদ্দেশ্য যে, আল্লাহ তা’আলা মুমিনদের থেকে যাবতীয় খারাপ ও বিপদাপদ প্রতিরোধ করবেন। কেননা আল্লাহর উপর ঈমান বিপদাপদ থেকে বাঁচার সবচেয়ে বড় কারণ। অথবা আয়াতের অর্থ, তিনি মুমিনদের পক্ষ থেকে বেশী বেশী প্রতিরোধ ও মোকাবিলা করবেন। যখনই আক্রমণকারী আক্রমণ করে তখনই তিনি তাদের পক্ষ থেকে মোকাবিলা করবেন। তারা যত বেশীই ষড়যন্ত্র ও আক্রমনের সমাবেশ করুক না কেন, তিনি তত বেশীই তাদের পক্ষ থেকে তা প্রতিহত করবেন। (আদওয়াউল বায়ান) সুতরাং কুফর ও ঈমানের সংঘাতে মুমিনরা একা ও নিঃসঙ্গ নয় বরং আল্লাহ নিজেই তাদের সাথে এক পক্ষ হয়ে দাঁড়ান। তিনি তাদেরকে সমর্থন দান করেন। তাদের বিরুদ্ধে শত্রুদের কৌশল ব্যৰ্থ করে দেন। অনিষ্টকারকদের অনিষ্টকে তাদের থেকে দূরে সরিয়ে দিতে থাকেন। কাজেই এ আয়াতটি আসলে হক পন্থীদের জন্য একটি বড় রকমের সুসংবাদ। তাদের মনকে সুদৃঢ় ও শক্তিশালী করার জন্য এর চেয়ে বড় আর কোন জিনিস হতে পারে না।
(২) যারাই আল্লাহ্র অর্পিত আমানতের খেয়ানত করে, আল্লাহ্র হক নষ্ট করে, মানুষের হক নষ্ট করে এমন বিশ্বাসঘাতক, অকৃতজ্ঞ এবং নিয়ামত অস্বীকারকারীকে আল্লাহ কখনও ভালবাসেন না। কারণ, আল্লাহ তার কাছে যেসব আমানত সোপর্দ করেছেন সেগুলোতে সে খেয়ানত করেছে এবং তাকে যেসব নিয়ামত দান করেছেন অকৃতজ্ঞতা, অস্বীকৃতি ও নেমকহারামির মাধ্যমে তার জবাব দিয়ে চলছে। কাজেই আল্লাহ তাকে অপছন্দ করেন। আল্লাহ তার প্রতি দয়া ও ইহসান করেন, আর সে আল্লাহর প্রতি কুফৱী ও অবাধ্যতা করে যাচ্ছে। সুতরাং আল্লাহ এটা পছন্দ করতে পারেন না। বরং তিনি সেটা ঘৃণা করেন। ক্রোধান্বিত হন। তিনি তাদের কুফারী ও খেয়ানতের শাস্তি তাদেরকে প্ৰদান করবেন। (সা’দী)
(৩৮) নিশ্চয়ই আল্লাহ বিশ্বাসীদেরকে রক্ষা করেন (তাদের দুশমন হতে)।(1) নিশ্চয় তিনি কোন বিশ্বাসঘাতক অকৃতজ্ঞকে পছন্দ করেন না।
(1) যেমন সন ৬ হিজরীতে কাফেররা শক্তির জোরে মুসলিমদেরকে উমরাহ করার জন্য মক্কায় প্রবেশ করতে দিল না। মহান আল্লাহ দু’ বছর পরেই কাফেরদের সেই শক্তি চূর্ণ করে মুসলিমদের শত্রুমুক্ত করলেন; তাঁদের উপর মুসলিমদেরকে জয়ী করলেন।