আলাম তার ইলাল্লাযীনা খারজূ মিন দিয়া-রিহিম ওয়া হুম উলূফুন হাযারল মাওতি ফাক-লা লাহুমুল্লা-হু মূতূ ছু ম্মা আহইয়া-হুম; ইন্নাল্লা-হা লাযূ ফাদলিন ‘আলান্নাছি ওয়ালা-কিন্না আকছারন্না-ছি লা-ইয়াশকুরূন।উচ্চারণ
তুমি ২৬৫ কি তাদের অবস্থা সম্পর্কে কিছু চিন্তা করেছো, যারা মৃত্যুর ভয়ে নিজেদের বাড়ি-ঘর ছেড়ে বের হয়ে পড়েছিল এবং তারা সংখ্যায়ও ছিল হাজার হাজার? আল্লাহ তাদের বলেছিলেনঃ মরে যাও, তারপর তিনি তাদের পুনর্বার জীবন দান করেছিলেন। ২৬৬ আসলে আল্লাহ মানুষের ওপর বড়ই অনুগ্রহকারী কিন্তু অধিকাংশ লোক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। তাফহীমুল কুরআন
তুমি কি তাদের অবস্থা জান না, যারা মৃত্যু হতে বাঁচার জন্য নিজেদের ঘর-বাড়ি থেকে বের হয়ে গিয়েছিল এবং তারা সংখ্যায় ছিল হাজার-হাজার? অতঃপর আল্লাহ তাদের বললেন, মরে যাও। তারপর তিনি তাদের জীবিত করলেন। #%১৮২%# প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ মানুষের প্রতি অতি অনুগ্রহশীল, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।মুফতী তাকী উসমানী
তুমি কি তাদের প্রতি লক্ষ্য করনি, মৃত্যুর বিভীষিকাকে এড়ানোর জন্য যারা নিজেদের গৃহ হতে বহির্গত হয়েছিল? অথচ তারা ছিল বহু সহস্র; তখন আল্লাহ তাদেরকে বললেনঃ তোমরা মর; পুনরায় তিনি তাদেরকে জীবন দান করলেন; নিশ্চয়ই মানবগণের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহশীল, কিন্তু অধিকাংশ লোক কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেনা।মুজিবুর রহমান
তুমি কি তাদেরকে দেখনি, যারা মৃত্যুর ভয়ে নিজেদের ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন? অথচ তারা ছিল হাজার হাজার। তারপর আল্লাহ তাদেরকে বললেন মরে যাও। তারপর তাদেরকে জীবিত করে দিলেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষের উপর অনুগ্রহকারী। কিন্তু অধিকাংশ লোক শুকরিয়া প্রকাশ করে না।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
তুমি কি তাদেরকে দেখ নাই যারা মৃত্যুভয়ে হাজারে হাজারে স্বীয় আবাসভূমি পরিত্যাগ করেছিল ? এরপর আল্লাহ্ তাদেরকে বলেছিলেন, ‘তোমাদের মৃত্যু হোক।’ তারপর আল্লাহ্ তাদের জীবিত করেছিলেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ মানুষের প্রতি অনুগ্রহশীল; কিন্তু অধিকাংশ লোক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। ইসলামিক ফাউন্ডেশন
তুমি কি তাদেরকে দেখনি, যারা তাদের গৃহসমূহ থেকে বের হয়েছে মৃত্যুর ভয়ে এবং তারা ছিল হাজার-হাজার? অতঃপর আল্লাহ তাদেরকে বললেন, ‘তোমরা মরে যাও’! তারপর তিনি তাদেরকে জীবিত করলেন। নিশ্চয় আল্লাহ তো মানুষের উপর অনুগ্রহশীল। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ শুকরিয়া আদায় করে না।আল-বায়ান
তুমি কি সেই লোকদের প্রতি লক্ষ্য করনি, যারা মৃত্যুকে এড়াবার জন্য নিজেদের ঘর থেকে হাজারে হাজারে বের হয়ে গিয়েছিল, তখন আল্লাহ তাদেরকে বললেন, ‘তোমাদের মৃত্যু হোক’। তৎপর তাদেরকে জীবিত করে উঠালেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ লোকেদের প্রতি দয়াশীল কিন্তু অধিকাংশ লোক শোকর করে না।তাইসিরুল
তুমি কি তাদের বিষয়ে ভাব নি যারা তাদের বাড়িঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল মৃত্যুর ভয়ে, আর তারা হাজারে হাজারে ছিল? তারপর আল্লাহ্ তাদের বললেন -- "তোমরা মরো" এরপর তিনি তাদের জীবনদান করলেন। নিঃসন্দেহ আল্লাহ্ অবশ্যই মানুষের প্রতি অশেষ করুণাময়, কিন্তু অধিকাংশ লোকেই শুকুরানা আদায় করে না।মাওলানা জহুরুল হক
২৬৫
এখান থেকে আর একটি ধারাবাহিক ভাষণ শুরু হচ্ছে। এই ভাষণে মুসলমানদের আল্লাহর পথে জিহাদ ও অর্থ-সম্পদ দান করতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। যেসব দুর্বলতার কারণে বনী ইসরাঈলরা অবশেষে অবনতি ও পতনের শিকার হয় সেগুলো থেকে মুসলমানদের দূরে থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এখানে আলোচিত বিষয়টি অনুধাবন করার জন্য এ বিষয়টি সামনে রাখতে হবে যে, মুসলমানরা সে সময় মক্কা থেকে বহিস্কৃত হয়েছিল, এক দেড় বছর থেকে তারা মদীনায় আশ্রয় নিয়েছিল এবং কাফেরদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে নিজেরাই বারবার যুদ্ধ করার অনুমতি চাইছিল। কিন্তু যুদ্ধের অনুমতি দেয়ার পর এখন তাদের মধ্যে কিছু লোক ইতস্তত করছিল, যেমন ২৬ রুকু’র শেষ অংশে বলা হয়েছে। তাই এখানে বনী ইসরাঈলের ইতিহাসের দু’টি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা থেকে মুসলমানদের শিক্ষা দেয়া হয়েছে।
২৬৬
এখানে বনী ইসরাঈলদের মিসর ত্যাগের ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। সূরা মা-য়েদাহর চতুর্থ রুকূ’তে এর বিস্তারিত বিবরণ এসেছে। বিপুল সংখ্যক বনী ইসরাঈল মিসর থেকে বের হয়ে গৃহ ও সহায় সম্বলহীন অবস্থায় বিস্তীর্ণ ধূঁ ধূঁ প্রান্তরে ঘুরে ফিরছিল। তারা একটি নির্দিষ্ট আবাস লাভের জন্য অস্থির হয়ে পড়েছিল কিন্তু যখন আল্লাহর ইঙ্গিতে হযরত মূসা আলাইহিস সালাম তাদের জালেম কেনানীদেরকে ফিলিস্তিন থেকে উৎখাত করে ঐ এলাকাটি জয় করে নেয়ার নির্দেশ দিলেন তখন তারা কাপুরুষতার পরিচয় দিল এবং সামনে এগিয়ে যেতে অস্বীকার করলো। অবশেষে আল্লাহ তাদের চল্লিশ বছর পর্যন্ত পৃথিবীতে হয়রান-পেরেশান-বিপন্ন অবস্থার মধ্যে দিন কাটাবার জন্য ছেড়ে দিলেন। এভাবে তাদের এক পুরুষ শেষ হয়ে গেলো। নতুন বংশধররা মরুভূমির কোলে লালিত হয়ে বড় হলো। এবার আল্লাহ কেনানীদের ওপর তাদের বিজয় দান করলেন। মনে হচ্ছে, এই ব্যাপারটিকেই এখানে ‘মরে যাওয়া ও পুনর্বার জীবন দান করা’ বলা হয়েছে।
এখান থেকে ২৬০ আয়াত পর্যন্ত দু’টি বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে জিহাদের প্রতি উৎসাহিত করা। কিন্তু মুনাফিক ও ভীরু প্রকৃতির লোক যেহতু মৃত্যুকে বড় ভয় পেত তাই তারা যুদ্ধে যেতে গড়িমসি করত, যে কারণে একই সঙ্গে দ্বিতীয় বিষয়টিও আলোচিত হয়েছে। তার সারমর্ম এই যে, জীবন ও মৃত্যু আল্লাহ তাআলারই হাতে। তিনি চাইলে যুদ্ধ ছাড়াও মৃত্যু দিতে পারেন এবং চাইলে ঘোরতর লড়াইয়ের ভেতরও প্রাণ রক্ষা করতে পারেন। বরং তার এ ক্ষমতাও রয়েছে যে, মৃত্যুর পরও তিনি মানুষকে জীবিত করতে পারেন। তাঁর এ ক্ষমতার সাধারণ প্রকাশ তো আখিরাতেই ঘটবে, কিন্তু এ দুনিয়াতেও তিনি জগতকে এমন কিছু নমুনা দেখিয়ে দিয়েছেন, যাতে মৃত লোককে আবার জীবিত করে তোলা হয়েছে। তার একটি দৃষ্টান্ত দেখানো হয়েছে এ আয়াতে (২৪৩)। তাছাড়া ২৫৩নং আয়াতে ইশারা করা হয়েছে যে, হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের হাতে আল্লাহ তাআলা কয়েকজন মৃত লোককে জীবন দান করেছেন। এমনিভাবে ২৫৮নং আয়াতে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ও নমরূদের কথোপকথন তুলে ধরা হয়েছে, যাতে দেখানো হয়েছে মৃত্যু ও জীবন দানের বিষয়টি সম্পূর্ণ আল্লাহর হাতে। চতুর্থ ঘটনা বর্ণিত হয়েছে ২৫৯নং আয়াতে। তাতে হযরত উযায়র (আ.)-এর ঘটনা দেখানো হয়েছে। তারপরে ২৬০নং আয়াতে পঞ্চম ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। তাতে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম আল্লাহ তাআলার কাছে আরজ করেছেন যে, আল্লাহ তাআলা মৃতকে কিভাবে জীবিত করেন তা তিনি দেখতে চান। বর্তমান আয়াত (নং ২৪৩)-এ যে ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, কুরআন মাজীদে তার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় না। কেবল এতটুকু বলা হয়েছে যে, কোনও এক কালে একটি সম্প্রদায় মৃত্যু থেকে বাঁচার লক্ষ্যে নিজেদের ঘর-বাড়ি ছেড়ে বের হয়ে পড়েছিল। তাদের সংখ্যা ছিল হাজার-হাজার। কিন্তু আল্লাহ তাআলা ঠিকই তাদের মৃত্যু ঘটান। তারপর আবার তাদেরকে জীবিত করে দেখিয়ে দেন, মৃত্যু থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কোনও ব্যক্তি যদি আল্লাহ তাআলার হুকুম অমান্য করে কোনও কৌশলের আশ্রয় নেয়, তবে এর কোনও নিশ্চয়তা নেই যে, ঠিকই সে মৃত্যু থেকে রক্ষা পেয়ে যাবে। যত বড় কৌশলই গ্রহণ করুক, তারপরও আল্লাহ তাআলা তাকে মৃত্যুর স্বাদ চাখাতে পারেন। এসব লোক কারা ছিল? কোন কালের ছিল? সেটা কি ছিল যে কারণে তারা মৃত্যু ভয়ে পালাচ্ছিল? এসব বিষয়ে কুরআন মাজীদে কিছু বলা হয়নি। বলা হয়নি এ কারণে যে, কুরআন মাজীদ তো কোন ইতিহাসগ্রন্থ নয়। এতে যেসব ঘটনা বর্ণিত হয়েছে তার উদ্দেশ্য কেবল কোন বিষয়ে সবক দেওয়া। তাই আকছার ঘটনার সেই অংশই বর্ণিত হয়, যার দ্বারা সেই সবক লাভ হয়। এ ঘটনার যতটুকু বর্ণিত হয়েছে তা দ্বারা উপরে বর্ণিত সবক লাভ হয়ে যায়। অবশ্য কুরআন মাজীদ যে ভঙ্গিতে ঘটনার প্রতি ইশারা করেছে তা দ্বারা অনুমান করা যায়, সে কালে এ ঘটনা মানুষের মধ্যে বিখ্যাত ও সুবিদিত ছিল। আয়াতের শুরুতে শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে ‘তুমি কি তাদের অবস্থা জান না”? এটা নির্দেশ করে, ঘটনাটি তখন প্রসিদ্ধ ছিল। সুতরাং হাফেজ ইবনে জারীর তাবারী (রহ.) এস্থলে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযি.) ও কয়েকজন তাবিঈ থেকে কয়েকটি রিওয়ায়াত উদ্ধৃত করেছেন, যা দ্বারা জানা যায়, এটা বনী ইসরাঈলের ঘটনা। তারা সংখ্যায় হাজার-হাজার হওয়া সত্ত্বেও শত্রুর মুকাবিলা করতে সাহস পায়নি। উল্টো তারা প্রাণ ভয়ে ঘর-বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিল। অথবা তারা প্লেগে আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে এলাকা ছেড়েছিল। তারা যে স্থানকে নিরাপদ ভূমি মনে করেছিল, সেখানে পৌঁছামাত্র আল্লাহ তাআলার হুকুমে তাদের মৃত্যু এসে যায়। অনেক পরে যখন তাদের অস্থিরাজি জ্বরাজীর্ণ হয়ে যায় তখন হযরত হিযকীল আলাইহিস সালাম সেখান দিয়ে যাচ্ছিলেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে আদেশ করলেন, তিনি যেন সে অস্থিরাজিকে লক্ষ্য করে ডাক দেন। তিনি ডাক দেওয়া মাত্র অস্থিসমূহে প্রাণ সঞ্চার হয় এবং পূর্ণ মানব আকৃতিতে তারা জীবিত হয়ে ওঠে। হযরত হিযকীল আলাইহিস সালামের এ ঘটনা বর্তমান বাইবেলেও বর্ণিত রয়েছে (দেখুন হিযকীল ৩৭:১-১৫)। কাজেই অসম্ভব নয় যে, মদীনায় এ ঘটনা ইয়াহুদীদের মাধ্যমে প্রচার লাভ করেছিল। ঘটনার উপরিউক্ত বিবরণ নির্ভরযোগ্য হোক বা না হোক, এতটুকু কথা তো কুরআন মাজীদের আয়াত দ্বারা সরাসরি ও সুস্পষ্টরূপে জানা যায় যে, তাদেরকে সত্যিকারের মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত করা হয়েছিল। আমাদের এ যুগের কোনও কোনও গ্রন্থকার মৃত লোকের জীবিত হওয়াকে অযৌক্তিক মনে করত এ আয়াতের ব্যাখ্যা করেছেন যে, আয়াতে মৃত্যু দ্বারা রাজনৈতিক ও চারিত্রিক মৃত্যু বোঝানো হয়েছে আর দ্বিতীয়বার জীবিত করার অর্থ হচ্ছে রাজনৈতিক বিজয়। কিন্তু এ জাতীয় ব্যাখ্যা এক তো কুরআন মাজীদের সুস্পষ্ট শব্দাবলীর সাথে খাপ খায় না, দ্বিতীয়ত এটা আরবী ভাষাশৈলী ও কুরআনী বর্ণনাভঙ্গীর সঙ্গেও সঙ্গতিপূর্ণ নয়। সোজা-সাপ্টা কথা এই যে, আল্লাহ তাআলার অপার শক্তির উপর ঈমান থাকলে এ জাতীয় ঘটনায় বিস্মিত হওয়ার কিছুই নেই। সুতরাং এ রকম দূর-দূরান্তের ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন কি? বিশেষত এখান থেকে ২৬০নং আয়াত পর্যন্ত যে আলোচনা পরম্পরা চলছে, যার সারমর্ম পূর্বে বলা হয়েছে, সে আলোকে এস্থলে মৃত্যু ও জীবনের প্রকৃত অর্থই উদ্দিষ্ট হওয়া বেশি যুক্তিযুক্ত।
২৪৩. আপনি কি তাদেরকে দেখেননি যারা মৃত্যুভয়ে হাজারে হাজারে স্বীয় আবাসভূমি পরিত্যাগ করেছিল(১) অতঃপর আল্লাহ তাদেরকে বলেছিলেন, ‘তোমরা মরে যাও’। তারপর আল্লাহ তাদেরকে জীবিত করেছিলেন। নিশ্চয় আল্লাহ মানুষের প্রতি অনুগ্রহশীল; কিন্তু অধিকাং লোক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না(২)।
(১) বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে, কোন এক শহরে ইসরাঈল-বংশধরের কিছু লোক বাস করত। তাদের সংখ্যা ছিল প্রায় দশ হাজার। সেখানে এক মারাত্মক সংক্রামক ব্যাধির প্রাদুর্ভাব হয়। তারা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে সে শহর ত্যাগ করে দুটি পাহাড়ের মধ্যবর্তী এক প্রশস্ত ময়দানে গিয়ে বসবাস করতে লাগল। আল্লাহ্ তা'আলা তাদের কাছে দু’জন ফেরেশতা পাঠালেন তাদেরকে এবং দুনিয়ার অন্যান্য জাতিকে একথা অবগত করানোর জন্য যে, মৃত্যুর ভয়ে পালিয়ে গিয়ে কেউ রক্ষা পেতে পারে না। ফেরেশতা দু'জন ময়দানের দু’ধারে দাঁড়িয়ে এমন এক বিকট শব্দ করলেন যে, তাদের সবাই একসাথে মরে গেল। দীর্ঘকাল পর ইসরাঈল-বংশধরদের একজন নবী সেখান দিয়ে যাওয়ার পথে সেই বন্ধ জায়গায় বিক্ষিপ্ত অবস্থায় হাড়-গোড় পড়ে থাকতে দেখে বিস্মিত হলেন। তখন ওহীর মাধ্যমে তাকে মৃত লোকদের সমস্ত ঘটনা অবগত করানো হল। তখন তিনি দোআ করলেন এবং আল্লাহ তাদেরকে জীবিত করে দিলেন। (ইবনে কাসীর)
এ ঘটনাটি দুনিয়ার সমস্ত চিন্তাশীল বুদ্ধিজীবীকে সৃষ্টিবলয় সম্পর্কিত চিন্তা-ভাবনার ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের সন্ধান দেয়। তদুপরি এটা কেয়ামত অস্বীকারকারীদের জন্য একটা অকাট্য প্রমাণ হওয়ার সাথে সাথে এ বাস্তব সত্য উপলব্ধি করার পক্ষেও বিশেষ সহায়ক যে, মৃত্যুর ভয়ে পালিয়ে থাকা তা জিহাদ হোক বা প্লেগ মহামারীই হোক, আল্লাহ এবং তার নির্ধারিত নিয়তি বা তাকদীরের প্রতি যারা বিশ্বাসী তাদের পক্ষে সমীচীন নয়। যার এ বিশ্বাস রয়েছে যে, মৃত্যুর একটা নির্ধারিত সময় রয়েছে, নির্ধারিত সময়ের এক মুহুর্ত পূর্বেও তা হবে না এবং এক মূহুর্ত পরেও তা আসবে না, তাদের পক্ষে এরূপ পলায়ন অর্থহীন এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ।
(২) এ আয়াত কয়েকটি বিষয়ের সমাধান করে দিয়েছে। প্রথমতঃ আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীরের উপর কোন তদবীর কার্যকর হতে পারে না। জিহাদ বা মহামারীর ভয়ে পালিয়ে গিয়ে প্রাণ বাচানো যায় না, আর মহামারীগ্রস্ত স্থানে অবস্থান করাও মৃত্যুর কারণ হতে পারে না। মৃত্যুর একটি সুনির্দিষ্ট সময় রয়েছে, যার কোন ব্যতিক্রম হওয়ার নয়। দ্বিতীয়তঃ কোনখানে কোন মহামারী কিংবা কোন মারাত্মক রোগ-ব্যাধি দেখা দিলে সেখান থেকে পালিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নেয়া বৈধও নয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এরশাদ মোতাবেক অন্য এলাকার লোকের পক্ষেও মহামারীগ্রস্ত এলাকায় যাওয়া বৈধ নয়। হাদীসে বলা হয়েছেঃ ‘সে রোগের মাধ্যমে আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের পূর্ববতী বিভিন্ন উম্মতের উপর আযাব নাযিল করেছেন। সুতরাং যখন তোমরা শুনবে যে, কোন শহরে প্লেগ প্রভৃতি মহামারী দেখা দিয়েছে, তখন সেখানে যেও না। আর যদি কোন এলাকাতে এ রোগ দেখা দেয় এবং তুমি সেখানেই থাক, তবে সেখান থেকে পলায়ন করবে না।‘ (বুখারী ৩৪৭৩, মুসলিম: ২২১৮)
ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস হচ্ছে এই যে, কোথাও যাওয়া মৃত্যুর কারণ হতে পারে না, আবার কোনখান থেকে পালিয়ে যাওয়াও মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পাওয়ার উপায় নয়’! এ মৌলিক বিশ্বাসের পাশাপাশি আলোচ্য নির্দেশটি নিঃসন্দেহে বিশেষ তাৎপর্যপূৰ্ণ।
প্রথমতঃ মহামারীগ্রস্ত এলাকার বাইরের লোককে আসতে নিষেধ করার একটি তাৎপর্য এই যে, এমনও হতে পারে যে, সেখানে গমন করার পর তার হায়াত শেষ হওয়ার দরুনই এ রোগে আক্রান্ত হয়ে সে মৃত্যুবরণ করলঃ এতদসত্ত্বেও আক্রান্ত ব্যক্তির মনে এমন ধারণা হতে পারে যে, সেখানে না গেলে হয়ত সে মারা যেত না। তাছাড়া অন্যান্য লোকেরও হয়ত এ ধারণাই হবে যে, এখানে না এলে মৃত্যু হত না। অথচ যা ঘটেছে তা পূর্বেই নির্ধারিত ছিল। যেখানেই থাকত, তার মৃত্যু এ সময়েই হত! এ আদেশের মাধ্যমে মুসলিমদেরকে ঈমানের ব্যাপারে সন্দেহসংশয় থেকে রক্ষা করা হয়েছে। যাতে করে তারা কোন ভুল বোঝাবুঝির শিকার না হয়।
দ্বিতীয়তঃ এতে আল্লাহ তা'আলা মানুষকে উপদেশ দিয়েছেন যে, যেখানে কষ্ট হওয়ার বা মৃত্যুর আশংকা থাকে, সেখানে যাওয়া উচিত নয়; বরং সাধ্যমত ঐসব বস্তু থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করা কর্তব্য, যা তার জন্য ধ্বংস বা ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাছাড়া নিজের জানের হেফাযত করা প্রত্যেক মানুষের জন্য ওয়াজিব ঘোষণা করা হয়েছে। এ নিয়মের চাহিদাও তাই যে, আল্লাহর দেয়া তাকদীরে পূর্ণ বিশ্বাস রেখে যথাসাধ্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থা অবলম্বন করতে হবে। যেসব স্থানে প্রাণ নাশের আশংকা থাকে, সেসব স্থানে না যাওয়াও এক প্রকার সতর্কতামূলক তদবীর। এমনিভাবে সংশ্লিষ্ট এলাকার লোকদেরকে সে স্থান থেকে পলায়ন করতে নিষেধ করার মাঝেও বহু তাৎপর্য নিহিতঃ একটি হচ্ছে এই যে, যদি এ পলায়নের প্রথা চলতে থাকে, তবে সাধারণভাবে ও সমষ্টিগতভাবে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যারা সক্ষম ও সবল তারা তো সহজেই পালাতে পারে, কিন্তু যারা দুর্বল তাদের কি অবস্থা হবে? আর যারা রোগাক্রান্ত, তাদের সেবা-শুশ্রুষা কিংবা মরে গেলে দাফন-কাফনেরই বা কি ব্যবস্থা হবে? দ্বিতীয়তঃ যারা সেখানে ছিল, তাদের মধ্যে হয়ত রোগের জীবাণু প্রবেশ করে থাকবে। এমতাবস্থায় তারা যদি বাড়ী-ঘর থেকে বের হয়ে থাকে, তবে তাদের দুঃখ-দুর্দশা আরও বেড়ে যাবে। কারণ প্রবাস জীবনে রোগাক্রান্ত হলে যে কি অবস্থা তা সবারই জানা।
তৃতীয়তঃ যদি তাদের মধ্যে রোগের জীবাণু ক্রিয়া করে থাকে, তবে তা বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়বে। আর যদি নিজের জায়গায় আল্লাহর উপর ভরসা করে পড়ে থাকে, তবে হয়ত নাজাত পেতে পারে। আর যদি এ রোগে মারা যাওয়াই তার ভাগ্যে থাকে, তবে ধৈর্য ও স্থিরতা অবলম্বনের বদলায় শহীদের মর্যাদা লাভ করবে। প্লেগ মহামারী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেছেন, ‘এ রোগটি আসলে শাস্তিরূপে নাযিল হয়েছিল এবং যে জাতিকে শাস্তি দেয়া উদ্দেশ্য হত তাদের ভেতর পাঠানো হত। অতঃপর আল্লাহ্ তাআলা একে মুমিনদের জন্য রহমতে পরিবর্তিত করে দিয়েছেন। আল্লাহর যেসব বান্দা এ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়া সত্বেও নিজ এলাকায়ই ধৈর্য সহকারে বসবাস করে এবং এ বিশ্বাস রাখে যে, তার শুধু সে বিপদই হতে পারে, যা আল্লাহ তা'আলা তার জন্য লিখে রেখেছেন, তবে এমন ব্যক্তি শহীদের মত সওয়াব পাবে। (বুখারীঃ ৫৭৩৪) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ প্লেগ শাহাদাত এবং প্লেগ আক্রান্ত ব্যক্তি শহীদ (বুখারীঃ ৫৭৩২) এর ব্যাখ্যাও তাই। (মাআরিফুল কুরআন থেকে সংক্ষেপিত ও পরিমার্জিত)
(২৪৩) তুমি কি তাদের দেখনি, যারা মৃত্যু-ভয়ে হাজারে হাজারে আপন ঘর-বাড়ি পরিত্যাগ করেছিল? অতঃপর আল্লাহ তাদেরকে বলেছিলেন, ‘তোমাদের মৃত্যু হোক।’ পরে তাদেরকে জীবিত করলেন।(1) নিশ্চয়, আল্লাহ মানুষের প্রতি অনুগ্রহশীল; কিন্তু অধিকাংশ লোক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।
(1) এ ঘটনা বিগত কোন জাতির। কোন সহীহ হাদীসে এর বিস্তারিত আলোচনা আসেনি। তফসীরের বর্ণনায় এটাকে বনী-ইস্রাঈলদের যুগের ঘটনা বলা হয়েছে এবং যে নবীর দু’আয় তাদেরকে মহান আল্লাহ পুনরায় জীবিত করেছিলেন, তাঁর নাম ‘হিযক্বীল’ বলা হয়েছে। এরা জিহাদে নিহত হয়ে যাওয়ার ভয়ে অথবা মহামারী রোগের ভয়ে নিজেদের ঘর থেকে বের হয়ে গিয়েছিল; যাতে মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যায়। কিন্তু মহান আল্লাহ তাদেরকে মৃত্যু দিয়ে প্রথমতঃ এ কথা জানিয়ে দিলেন যে, আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত ভাগ্য থেকে বেঁচে তোমরা কোথাও যেতে পারবে না। দ্বিতীয়তঃ এও জানিয়ে দিলেন যে, মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল হলেন মহান আল্লাহ। তৃতীয়তঃ আল্লাহ তাআলা পুনরায় সৃষ্টি করার উপর ক্ষমতাবান। তিনি সমস্ত মানুষকে ঐভাবেই জীবিত করবেন, যেভাবে তাদেরকে মৃত্যু দিয়ে জীবিত করে দিলেন। পরের আয়াতে মুসলিমদেরকে জিহাদ করার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। জিহাদের পূর্বে এই ঘটনা বর্ণনা করার যৌক্তিকতা হল, জিহাদ থেকে পিছপা হয়ো না। জীবন ও মরণ তো আল্লাহর হাতে এবং এই মরণের সময়ও নির্ধারিত। অতএব জিহাদ থেকে পালিয়ে তা রোধ করতে পারবে না।