بَلۡ قَالُوٓاْ أَضۡغَٰثُ أَحۡلَٰمِۭ بَلِ ٱفۡتَرَىٰهُ بَلۡ هُوَ شَاعِرٞ فَلۡيَأۡتِنَا بِـَٔايَةٖ كَمَآ أُرۡسِلَ ٱلۡأَوَّلُونَ

বাল ক-লূআদগা-ছু আহলা-মিম বালিফ তার-হু বাল হুওয়া শা-‘ইরুন ফালইয়া’তিনা-বিআ-য়াতিন কামাউরছিলাল আওওয়ালূন।উচ্চারণ

তারা বলে, “বরং এসব বিক্ষিপ্ত স্বপ্ন, বরং এসব তার মনগড়া বরং এ ব্যক্তি কবি। নয়তো সে আনুক একটি নিদর্শন যেমন পূর্ববর্তীকালের নবীদেরকে পাঠানো হয়েছিল নিদর্শন সহকারে।” তাফহীমুল কুরআন

এতটুকুই নয়; বরং তারা একথাও বলে যে, এটা (অর্থাৎ কুরআন) অসংলগ্ন স্বপ্ন সম্ভার; বরং সে নিজে এটা রচনা করেছে। কিংবা সে একজন কবি। তা সে আমাদের সামনে কোন নিদর্শন নিয়ে আসুক না, যেমন পূর্ববর্তী নবীগণ (নিদর্শনসহ) প্রেরিত হয়েছিল! মুফতী তাকী উসমানী

তারা এটাও বলেঃ এ সব অলীক কল্পনা হয় সে উদ্ভাবন করেছে, না হয় সে একজন কবি; অতএব সে আনয়ন করুক আমাদের নিকট এক নিদর্শন যেরূপ নিদর্শনসহ প্রেরিত হয়েছিল পূর্ববর্তীগণ।মুজিবুর রহমান

এছাড়া তারা আরও বলেঃ অলীক স্বপ্ন; না সে মিথ্যা উদ্ভাবন করেছে, না সে একজন কবি। অতএব সে আমাদের কাছে কোন নিদর্শন আনয়ন করুক, যেমন নিদর্শন সহ আগমন করেছিলেন পূর্ববর্তীগন।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

এরা এটাও বলে, ‘এই সমস্ত অলীক কল্পনা, হয় সে তা উদ্ভাবন করেছে, না হয় সে একজন কবি। অতএব সে আনয়ন করুক আমাদের নিকট এক নিদর্শন যেরূপ নিদর্শনসহ প্রেরিত হয়েছিল পূর্ববর্তীগণ।’ ইসলামিক ফাউন্ডেশন

বরং তারা বলে, ‘এগুলো অলীক কল্পনা, হয় সে এটি মন থেকে বানিয়েছে নয়তো সে একজন কবি। অতএব সে আমাদের কাছে এমন নিদর্শন নিয়ে আসুক যেরূপ নিদর্শনসহ প্রেরিত হয়েছিল পূর্ববর্তীগণ’।আল-বায়ান

তারা এও বলে, ‘এসব অলীক স্বপ্ন, না হয় সে মিথ্যে উদ্ভাবন করেছে, না হয় সে একজন কবি। কাজেই সে আমাদের কাছে এমন নিদর্শন নিয়ে আসুক যেমন পূর্ববর্তী (নবী)-গণের কাছে পাঠানো হয়েছিল।তাইসিরুল

তারা বলে -- "না, এলোমেলো স্বপ্ন! না, সে এটি তৈরি করেছে! না, সে একজন কবি। সে বরং আমাদের কাছে এক নিদর্শন নিয়ে আসুক যেমন পূর্ববর্তীদের পাঠানো হয়েছিল।"মাওলানা জহুরুল হক

তাফহীমুল কুরআন

এর পটভূমি হচ্ছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাওয়াতের প্রভাব যখন ছড়িয়ে পড়তে লাগলো, মক্কার সরদাররা পরস্পর পরামর্শ করে এ সিদ্দান্তে পৌঁছলো যে, তাঁকে মোকাবিলা করার জন্য একটি জোরদার প্রচারাভিযান চালাতে হবে। মক্কায় যিয়ারত করার জন্য যে ব্যক্তিই আসবে তার মনে পূর্বাহ্ণেই তাঁর বিরুদ্ধে এত বেশী কুধারণা সৃষ্টি করে দিতে হবে যার ফলে সে তার কোন কথায় কান দিতে রাজিই হবে না। এমনিতে এ অভিযান বছরের বারো মাসই জারি থাকতো কিন্তু বিশেষ করে হজ্জের মওসুমে বিপুল সংখ্যক লোক চারদিকে ছড়িয়ে দেয়া হতো, তারা বাইর থেকে আগত সকল যিয়ারতকারীর তাঁবুতে গিয়ে তাদেরকে এই বলে সতর্ক করে দিতো যে, এখানে এমন এমন ধরনের একজন লোক আছে, তার ব্যাপারে সাবধান থেকো। এসব আলোচনার সময় নানান ধরনের কথা বলা হতো। কখনো বলা হতো, এ ব্যক্তি যাদুকর। কখনো বলা হতো, সে নিজেই একটা বাণী রচনা করে বলছে এটা আল্লাহর বাণী। কখনো বলা হতো, আরে হ্যাঁ তা আবার এমন কি বাণী! ডাহা পাগলের প্রলাপ এবং অগোছালো চিন্তার একটা আবর্জনা স্তূপ ছাড়া আর কিছুই নয়। কখনো বলা হতো, কিছু কবিত্বমূলক ভাব-কল্পনা ও ছন্দ-গাঁথাকে সে আল্লাহর বাণী নাম দিয়ে রেখেছে। যেনতেনভাবে লোকদেরকে প্রতারিত করাই ছিল উদ্দেশ্য। কোন একটি কথার ওপর অবিচল থেকে একটি মাপাজোকা ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তারা পেশ করছিল না। কারণ সত্যের কোন প্রশ্নই তাদের সামনে ছিল না। কিন্তু এ মিথ্যা প্রচারণার ফল যা হলো তা হচ্ছে এই যে, তারা নিজেরাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নাম দেশের সবর্ত্র ছড়িয়ে দিল। মুসলমানদের বছরের পর বছরের প্রচেষ্টায় তার যে প্রচার ও পরিচিত হওয়া সম্ভবপর ছিল না কুরাইশদের এ বিরোধিতার অভিযানে তা মাত্র সামান্য কিছু সময়ের মধ্যেই হয়ে গেলো। প্রত্যেক ব্যক্তির মনে একটি প্রশ্ন জাগলো, যার বিরুদ্ধে এ বিরাট অভিযান, এ মারাত্মক অভিযোগ, কে সেই ব্যক্তি? আবার অনেকে ভাবলো, তার কথা তো শোনা উচিত। আমরা তো আর দুধের শিশু নই যে, অযথা তার কথায় পথভ্রষ্ট হবো।

এর একটি মজার দৃষ্টান্ত হচ্ছে তোফাইল ইবনে আমর দাওসীর ঘটনা। ইবনে ইসহাক বিস্তারিত আকারে তাঁর নিজের মুখেই এ ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন। তিনি বলছেনঃ আমি দাওস গোত্রের একজন কবি ছিলাম। কোন কাজে মক্কায় গিয়েছিলাম। সেখানে পৌঁছতেই কুরাইশদের কয়েকজন লোক আমাকে ঘিরে ফেললো এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধে আমাকে অনেক কথা বললো। ফলে তাঁর সম্পর্কে আমার মনে খারাপ ধারণা জন্মালো। আমি স্থির করলাম, তাঁর কাছ থেকে দূরে থাকবো। পরদিন আমি হারাম শরীফে গেলাম। দেখলাম তিনি কা’বা গৃহের কাছে নামায পড়ছেন। তাঁর মুখ নিঃসৃত কয়েকটি বাক্য আমার কানে পড়লো। আমি অনুভব করলাম, বড় চমৎকার বাণী। মনে মনে বললাম, আমি কবি, যুবক, বুদ্ধিমান। আমি কোন শিশু নই যে, ঠিক ও বেঠিকের মধ্যে পার্থক্য করতে পারবো না। তাহলে এ ব্যক্তি কি বলেন, এঁর সঙ্গে কথা বলে জানার চেষ্টা করি না কেন। তাই নবী ﷺ যখন নামায শেষ করে চলে যেতে লাগলেন তখন আমি তাঁর পিছু নিলাম। তাঁর গৃহে পৌঁছে তাঁকে বললাম, আপনার সম্প্রদায়ের লোকেরা আপনার সম্পর্কে আমাকে এসব কথা বলেছিল, ফলে আমি আপনার ব্যাপারে এতই খারাপ ধারণা পোষণ করেছিলাম যে, নিজের কানে তুলো ঠেসে দিয়েছিলাম, যাতে আপনার কথা শুনতে না পাই। কিন্তু এখনই যে কয়েকটি বাক্য আমি আপনার মুখ থেকে শুনেছি তা আমার কাছে বড়ই চমৎকার মনে হয়েছে। আপনি কি বলেন, আমাকে একটু বিস্তারিতভাবে জানান। জবাবে নবী ﷺ আমাকে কুরআনের একটি অংশ শুনালেন। তাতে আমি এত বেশী প্রভাবিত হয়ে পড়লাম যে, তখনই ইসলাম গ্রহণ করে ফেললাম। সেখান থেকে ফিরে গিয়ে আমি নিজের পিতা ও স্ত্রীকে মুসলমান করলাম। এরপর নিজের গোত্রের মধ্যে অবিরাম ইসলাম প্রচারের কাজ করতে লাগলাম। এমন কি খন্দকের যুদ্ধের সময় পর্যন্ত আমার গোত্রের সত্তর আশিটি পরিবার ইসলাম গ্রহণ করে ফেললো। (ইবনে হিশাম, ২ খণ্ড, ২২-২৪ পৃঃ)

ইবনে ইসহাক যে আর একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন তা থেকে জানা যায় যে, কুরাইশ সরদাররা নিজেদের মাহফিলগুলোতে নিজেরাই একথা স্বীকার করতো যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধে তারা যেসব কথা তৈরী করে সেগুলো নিছক মিথ্যা ছাড়া আর কিছুই নয়। তিনি লিখেছেনঃ একটি মজলিসে নযর ইবনে হারেস বক্তৃতা প্রসঙ্গে বলে, “তোমরা যেভাবে মুহাম্মাদের মোকাবিলা করছো তাতে কোন কাজ হবে না। সে যখন যুবক ছিল তখন তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী সদাচারী ব্যক্তি ছিল। সবচেয়ে বড় সত্যনিষ্ঠ ও সবচেয়ে বেশী বিশ্বস্ত হিসেবে পরিচিত ছিল। আর এখন তার চুল সাদা হতে যাচ্ছে, এখন তোমরা বল কিনা সে যাদুকর, গণক, কবি, পাগল। আল্লাহর কসম সে যাদুকর নয়। আমি যাদুকরদের দেখেছি এবং তাদের ঝাড়ফুঁক সম্পর্কেও জানি। আল্লাহর কসম, সে গণক নয়। আমি গণকদের তন্ত্রমন্ত্র শুনেছি, তারা যেসব রহস্যময় ও বহুমুখী কথা বলে থাকে তা আমি জানি। আল্লাহর কসম, সে কবিও নয়। কবিতার বিভিন্ন প্রকারের সাথে আমি পরিচিত। তাঁর বাণী এর কোন প্রকারের মধ্যেই পড়ে না। আল্লাহর কসম, সে পাগলও নয়। পাগল যে অবস্থায় থাকে এবং সে যে প্রলাপ বকে সে ব্যাপারে কি আমরা কেউ অনভিজ্ঞ? হে কুরাইশ সরদাররা! অন্য কিছু চিন্তা করো। তোমরা যে বিষয়ের মুখোমুখি হয়েছো এসব ঠুনকো কথায় তাঁকে পরাজিত করবে, ব্যাপারটা অতটা সহজ নয়।” এরপর সে এই প্রস্তাব পেশ করলো, আরবের বাহির থেকে রুস্তম ও ইসফিনদিয়ারের কাহিনী এনে ছড়াতে হবে। লোকেরা সেদিকে আকৃষ্ট হবে এবং তা তাদের কাছে কুরআনের চাইতেও বেশী বিস্ময়কর মনে হবে। সেই অনুসারে কিছুদিন এই পরিকল্পনা কার্যকর করার কাজ চলতে লাগলো এবং নযর নিজেই গল্প বলার কাজ শুরু করে দিল। (ইবনে হিশাম, ১ খণ্ড, ৩২০-৩২১পৃঃ)

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

‘নিদর্শন’ দ্বারা মুজিযা (অলৌকিক বিষয়) বোঝানো হয়েছে। কাফেরদের সামনে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বহু মুজিযাই প্রকাশ পেয়েছিল, কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা নিত্য-নতুন মুজিযার দাবি করত। আল্লাহ তাআলা এ আয়াতে জানাচ্ছেন, পূর্বের জাতিসমূহও তাদের মত মুজিযা দাবি করত। কিন্তু তাদের দাবি অনুযায়ী যখন তাদেরকে মুজিযা দেখানো হত, তখন যে তারা ঈমান আনত তা নয়; বরং তখন তারা নতুন বাহানা দেখাত। পরিণামে তাদেরকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়। আল্লাহ তাআলার জানা আছে ফরমায়েশী মুজিযা দেখার পরও তারা ঈমান আনবে না। অথচ আল্লাহ তাআলার নীতি হল, কোন সম্প্রদায় তাদের ফরমায়েশী মুজিযা দেখার পরও যদি ঈমান না আনে, তবে তাদেরকে তিনি ধ্বংস করে দেন। কিন্তু এদেরকে তো এখনই ধ্বংস করা তাঁর অভিপ্রেত নয়। এ কারণেই তিনি তাদেরকে তাদের দাবি অনুযায়ী মুজিযা দেখাচ্ছেন না।

তাফসীরে জাকারিয়া

৫. বরং তারা বলে, এসব অলীক কল্পনা, হয় সে এগুলো রটনা করেছে, না হয় সে একজন কবি।(১) অতএব সে নিয়ে আসুক আমাদের কাছে এক নিদর্শন যেরূপ নিদর্শনসহ প্রেরিত হয়েছিল পূর্ববর্তীগণ।

(১) যেসব স্বপ্নের মানসিক অথবা শয়তানী কল্পনা শামিল থাকে, সেগুলোকে أحلام বলা হয়। এ কারণেই এর অনুবাদ “অলীক কল্পনা” করা হয়েছে। এর আরেক অর্থ হয়, মিথ্যা স্বপ্ন। (ফাতহুল কাদীর) অর্থাৎ অবিশ্বাসীরা প্রথমে কুরআনকে জাদু বলেছে, এরপর আরও অগ্রসর হয়ে বলতে শুরু করেছে যে, এটা আল্লাহর বিরুদ্ধে মিথ্যা উদ্ভাবন ও অপবাদ যে, এটা তাঁর কালাম। অবশেষে বলতে শুরু করেছে যে, আসল কথা হচ্ছে লোকটি একজন কবি। তার কালামে কবিসুলভ কল্পনা আছে। এভাবে কাফেররা সীমালঙ্ঘন ও গোড়ামীর বশে যা ইচ্ছে তা-ই এ কুরআনের জন্য সাব্যস্ত করছে। যেমন অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, “দেখুন, তারা আপনার কী উপমা দেয়! ফলে তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে, সুতরাং তারা পথ পাবে না।” (সূরা আল-ইসরা: ৪৮) (ইবন কাসীর)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

(৫) বরং ওরা বলে, ‘এ হল আবোল-তাবোল স্বপ্ন; বরং সে তা উদ্ভাবন করেছে, বরং সে একজন কবি। (1) অতএব সে আমাদের নিকট এক নিদর্শন আনুক; যেরূপ (নিদর্শন সহ) পূর্ববর্তীগণ প্রেরিত হয়েছিল।’ (2)

(1) গোপনে সমালোচনাকারী অত্যাচারীরা এতেই ক্ষান্ত হয়নি; বরং তারা বলে, এ কুরআন তো অর্থহীন স্বপ্নের মত বিক্ষিপ্ত চিন্তাধারার এক সমষ্টি। বরং তা নিজের মনগড়া (স্বকপোলকল্পিত), বরং সে একজন কবি তথা এই কুরআন পথনির্দেশকারী গ্রন্থ নয়, কবিতাগুচ্ছ। অর্থাৎ, তারা কোন এক শ্রেণীর কথার উপর অটল নয়, বরং প্রত্যহ নিত্য নূতন পাঁয়তারা বদলায় এবং নূতন নূতন অভিযোগ আরোপ করে।

(2) অর্থাৎ, যেমন সামুদ জাতির জন্য উটনী ও মূসা (আঃ)-এর জন্য লাঠি ও উজ্জ্বল হাত ইত্যাদি।