وَسَلَٰمٌ عَلَيۡهِ يَوۡمَ وُلِدَ وَيَوۡمَ يَمُوتُ وَيَوۡمَ يُبۡعَثُ حَيّٗا

ওয়া ছালা-মুন ‘আলাইহি ইয়াওমা উলিদা ওয়া ইয়াওমা ইয়ামূতুওয়া ইয়াওমা ইউব‘আছু হাইইয়া-।উচ্চারণ

শান্তি তার প্রতি যেদিন সে জন্ম লাভ করে এবং যেদিন সে মৃত্যুবরণ করে আর যেদিন তাকে জীবিত করে উঠানো হবে। ১২ তাফহীমুল কুরআন

এবং (আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে) তার প্রতি সালাম যে দিন সে জন্মগ্রহণ করেছে, যে দিন তার মৃত্যু হবে এবং যে দিন সে জীবিত অবস্থায় পুনরুত্থিত হবে।মুফতী তাকী উসমানী

তার প্রতি ছিল শান্তি যেদিন সে জন্ম গ্রহণ করে এবং শান্তি যেদিন তার মৃত্যু হয় এবং যেদিন সে পুনরুজ্জীবিত হবে।মুজিবুর রহমান

তার প্রতি শান্তি-যেদিন সে জন্মগ্রহণ করে এবং যেদিন মৃত্যুবরণ করবে এবং যেদিন জীবিতাবস্থায় পুনরুত্থিত হবে।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

তার প্রতি শান্তি যেদিন সে জন্মলাভ করে, যেদিন তার মৃত্যু হবে এবং যেদিন সে জীবিত অবস্থায় উত্থিত হবে।ইসলামিক ফাউন্ডেশন

আর তার উপর শান্তি, যেদিন সে জন্মেছে এবং যেদিন সে মারা যাবে আর যেদিন তাকে জীবিত অবস্থায় উঠানো হবে।আল-বায়ান

তার উপর শান্তি যেদিন সে জন্মেছে, যেদিন তার মৃত্যু হবে আর যেদিন সে জীবন্ত হয়ে উত্থিত হবে।তাইসিরুল

আর শান্তি তাঁর উপরে যেদিন তাঁর জন্ম হয়েছিল ও যেদিন তিনি মারা গিয়েছিলেন আর যেদিন তাঁকে পুরুত্থিত করা হবে জীবিত অবস্থায়।মাওলানা জহুরুল হক

তাফহীমুল কুরআন

১২

বাইবেলের বিভিন্ন পুস্তকে হযরত ইয়াহিয়ার জীবনের যে ঘটনাবলী ছড়িয়ে আছে সেগুলো একত্র করে আমি এখানে তাঁর পূতপবিত্র জীবনের একটি চিত্র তুলে ধরছি। এর সাহায্যে সূরা আলে ইমরান এবং এ সূরাটির সংক্ষিপ্ত ইশারা ইঙ্গিতগুলোর ব্যাখ্যা হয়ে যাবে।

লুকের বর্ণনা অনুসারে হযরত ইয়াহইয়া (আ) ছিলেন, হযরত ঈসা (আ) চেয়ে ৬ মাসের বড়। তাঁর মাতা হযরত ঈসার (আ) মাতার নিকটাত্মীয়া ছিলেন। প্রায় ৩০ বছর বয়সে তিনি কার্যকরভাবে নবুওয়াতের দায়িত্ব লাভ করেন। যোহনের বর্ণনা অনুযায়ী তিনি ট্রান্স জর্ডন এলাকায় আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেবার কাজ শুরু করেন। তিনি বলতেনঃ

“আমি প্রান্তরে এক জনের রব যে ঘোষণা করিতেছে তোমরা প্রভুর সরল পথ ধর।” (যোহন১: ২৩)

মার্কের বর্ণনা মতে তিনি লোকদের পাপের জন্য তাদের তাওবা করাতেন এবং তাওবাকারীদেরকে বাপ্তাইজ করতেন। অর্থাৎ তাওবা করার পর তাদেরকে গোসল করাতেন, যাতে আত্মা ও শরীর উভয়ই পবিত্র হয়ে যায়। ইয়াহুদিয়া (যিহূদা) ও জেরুসালেমের অধিকাংশ লোক তাঁর ভক্ত হয়ে গিয়েছিল এবং তাঁর দ্বারা বাপ্তাইজিত হচ্ছিল। (মার্ক ১: ৪-৫) এ জন্য তিনি বাপ্তাইজক ইয়াহইয়া (Jhon The Baptist) নামে পরিচিত হয়ে গিয়েছিলেন। সাধারণভাবে বনী ইসরাঈল তাঁর নবুওয়াত স্বীকার করে নিয়েছিল। (মথি২১: ২৬) ঈসা আলাইহিস সালামের উক্তি ছিল, “স্ত্রী লোকের গর্ভজাত সকলের মধ্যে যোহন বাপ্তাইজক হইতে মহান কেহই উৎপন্ন হয় নাই।” (মথি ১১: ১১)।

তিনি উটের লোমের কাপড় পরতেন, চর্মপটুকা কোমরে বাঁধতেন এবং তার খাদ্য ছিল পঙ্গপাল ও বনমধু। (মথি৩: ৪) এই ফকিরী জীবন যাপনের সাথে সাথে তিনি প্রচার করে বেড়াতেনঃ “মন ফিরাও (অর্থাৎ তাওবা কর) কেননা স্বর্গ রাজ্য সন্নিকট হইল।” (মথি৩: ২) অর্থাৎ ঈসা আলাইহিস সালামের নবুওয়াতের দাওয়াতের সূচনা হতে যাচ্ছে। এ কারণে তাঁকে সাধারণ হযরত ঈসার (আ) ‘আরহাস’ বলা হতো। কুরআন মজীদেও তাঁর সম্পর্কে একথাই এভাবে বলা হয়েছেঃ

مُصَدِّقًا بِكَلِمَةٍ مِنَ اللَّهِ

অর্থাৎ “সে আল্লাহর বাণী সত্যতার সাক্ষ্যদানকারী”(আলে ইমরান ৩৯) তিনি লোকদের নামায পড়ার ও রোযা রাখার উপদেশ দিতেন (মথি ৯: ১৪, লুক, ৫: ৩৩, লুক১১: ১)

তিনি লোকদের বলতেন, “যাহার দুইটি আঙ্রাখা আছে, সে, যাহার নাই, তাহাকে একটি দিউক; আর যাহার কাছে খাদ্যদ্রব্য আছে সেও তদ্রূপ করুক।” কর গ্রাহীরাও তাঁকে জিজ্ঞেস করলো, গুরু আমরা কি করবো? তাতে তিনি জবাব দেন, “তোমাদের জন্য যাহা নিরূপিত তাহার অধিক আদায় করিও না।” সৈনিকরা জিজ্ঞেস করলো, আমাদের প্রতি কি নির্দেশ? জবাব দেন, “কাহারও প্রতি দৌরাত্ম্য করিও না, অন্যায় পূর্বক কিছু আদায়ও করিও না এবং তোমাদের বেতনে সন্তুষ্ট থাকিও।” (লুক ৩: ১০-১৪) বনী ইসরাঈলদের বিপথগামী উলামা, ফরীশী ও সদ্দুকীরা তাঁর কাছে বাপ্তাইজ হবার জন্য এলে তিনি তাদেরকে ধমক দিয়ে বলেন, “হে সর্পের বংশেরা আগামী কোপ হইতে পলায়ন করিতে তোমাদিগকে কে চেতনা দিল? . . . . . . . . . . . . . . . আর ভাবিও না যে, তোমরা মনে মনে বলিতে পার আব্রাহাম আমাদের পিতা, ……………… আর এখন গাছগুলোর মুলে কুড়াল লাগান আছে, অতএব যে কোন গাছে উত্তম ফল ধরে না তাহা কাটিয়া আগুনে ফেলিয়া দেওয়া যায়।” (মথি ৩: ৭-১০)

তাঁর যুগের ইহুদী শাসনকর্তা হীরোদ এন্টিপাসের রাজ্যে তিনি সত্যের দাওয়াতের দায়িত্ব পালন করছিলেন। এই শাসনকর্তা ছিল আপাদমস্তক রোমীয় সভ্যতার প্রতিভূ। তারই কারণে সারাদেশে দুষ্কৃতি, নৈতিকতা বিরোধী ও আল্লাহর প্রতি অবাধ্যতামূলক কার্যকলাপ প্রসার লাভ করছিল। সে নিজের ভাই ফিলিপের স্ত্রী হিরোদিয়াসকে নিজের গৃহে রক্ষিতা রেখেছিল। হযরত ইয়াহইয়াএ জন্য হিরোদকে ভর্ৎসনা করেন এবং তার পাপাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। এ অপরাধে হিরোদ তাঁকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠায়। তবুও সে তাঁকে একজন পবিত্রাত্মা ও সৎকর্মশীল মনে করে তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতো এবং জনগণের মধ্যে তাঁর প্রভাবের কারণে তাঁকে ভয়ও করতো। কিন্তু হিরোদিয়াস মনে করতো, ইয়াহইয়া, আলাইহিস সালাম জনগণের মধ্যে যে নৈতিক চেতনা সঞ্চার করেছেন তার ফলে জনগণের দৃষ্টিতে তার মতো মেয়েরা ঘৃণিত হয়ে যাচ্ছে। তাই তাঁর প্রাণ সংহারের প্রচেষ্টা চালাতে থাকে। শেষ পর্যন্ত হিরোদের জন্ম বার্ষিকী উৎসবে সে তার কাংখিত সুযোগ পেয়ে যান। উৎসবে তার মেয়ে মনোমুগ্ধকর নৃত্য প্রদর্শন করে হিরোদের চিত্ত জয় করে। হিরোদ সন্তুষ্ট হয়ে তাকে বলে, কি পুরস্কার চাও বলো। মেয়ে তার ব্যভিচারী মাকে জিজ্ঞেস করে, কি চাইবো? মা বলে, ইয়াহিয়ার মস্তক চাও। তাই সে হিরোদের সামনে হাত জোড় করে বলে, জাহাঁপনা! আমাকে এখনি ইয়াহইয়া বাপ্তাইজকের মাথা একটি থালায় করে আনিয়ে দিন। হিরোদ একথা শুনে বড়ই বিষণ্ণ হয়ে পড়ে। কিন্তু প্রিয়ার মেয়ের দাবী না মেনে উপায় ছিল না। সে তৎক্ষণাত কারাগার থেকে ইয়াহইয়া আলাইহিস সালামের মাথা কেটে আনলো এবং তা একটি থালায় রেখে নর্তকীকে নজরানা দিল। (মথি ১৪: ৩-১২, মার্ক ৬: ১৭-১৯ ও লুক ৩: ১৯-২০)

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

তাফসীরে জাকারিয়া

১৫. আর তাঁর প্রতি শান্তি যেদিন তিনি জন্ম লাভ করেন, যেদিন তার মৃত্যু হবে এবং যেদিন তিনি জীবিত অবস্থায় উত্থিত হবেন।(১)

(১) সুফইয়ান ইবনে উয়াইনাহ বলেন, তিন সময়ে মানুষ সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখিন হয়।

এক. যখন সে দুনিয়াতে প্রথম আসে। কারণ সে তাকে এক ভিন্ন পরিবেশে আবিস্কার করে।
দুই. যখন সে মারা যায়। কারণ সে তখন এমন এক সম্প্রদায়কে দেখে যাদেরকে দেখতে সে অভ্যস্ত নয়।
তিন. হাশরের মাঠে; কারণ তখন সে নিজেকে এক ভীতিপ্রদ অবস্থায় জমায়েত দেখতে পায়।

তাই ইয়াহইয়া ইবন যাকারিয়্যা আলাইহিস সালামকে এ তিন বিপৰ্যয়কর অবস্থার বিভিষিকা থেকে নিরাপত্তা প্ৰদান করেছেন। (ইবন কাসীর)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

(১৫) তার প্রতি শান্তি তার জন্মদিনে, তার মৃত্যুদিনে এবং তার পুনরুজ্জীবনের দিনে। (1)

(1) মানুষের জন্য তিনটি সময় কঠিন ও ভয়াবহ। (ক) যখন মানুষ মায়ের গর্ভ থেকে পৃথিবীতে আসে। (খ) যখন মৃত্যুর কবলে পতিত হয়। এবং (গ) যখন কবর হতে জীবিত করে উঠানো হবে এবং নিজেকে কিয়ামতের ভয়াবহতায় পরিবেষ্টিত দেখবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, এই তিন সময়েই তার জন্য থাকবে শান্তি ও নিরাপত্তা। বিদআতীরা এই আয়াত দ্বারা (মহানবীর) জন্মোৎসব (নবীদিবস) পালন করার বৈধতা প্রমাণ করে। কিন্তু তাদের নিকট জিজ্ঞাস্য যে, মৃত্যুর দিনে মৃত্যু-উৎসব পালন করাও তাদের জন্য জরুরী। কেননা জন্ম দিনের জন্য যেমন সালাম (শান্তি) শব্দ ব্যবহার হয়েছে তেমনি মৃত্যুর জন্যও সালাম শব্দ ব্যবহার হয়েছে। শুধু সালাম শব্দ দ্বারা যদি ‘ঈদে মীলাদ’ (জন্মোৎসব) সাব্যস্ত হয়, তাহলে সালাম শব্দ দ্বারা ‘ঈদে ওফাত’ (মৃত্যু-উৎসব)ও সাব্যস্ত হবে। কিন্তু এখানে মৃত্যু-উৎসব তো দূরের কথা বরং নবী (সাঃ)-এর মৃত্যুকেই অস্বীকার করা হয়। নবী (সাঃ)-এর মৃত্যুকে অস্বীকার করে কুরআনের আয়াতকে তো অস্বীকার করেই থাকে; উপরন্তু তারা তাদের দলীল গ্রহণের পদ্ধতি অনুসারে আলোচ্য আয়াতের এক অংশের উপর ঈমান রাখে এবং ঐ আয়াতেরই দ্বিতীয় অংশের উপর ঈমান রাখে না। {أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ}  অর্থাৎ, তোমরা কি কিতাবের কিছু অংশের উপর ঈমান আনবে, আর কিছুকে অস্বীকার করবে? (বাক্বারাহঃ ৮৫)