ওয়া আতিম্মুল হাজ্জা ওয়াল ‘উমরতা লিল্লা-হি ফাইন উহসিরতুম ফামাছ তাইছার মিনাল হাদয়ি ওয়ালা-তাহলিকূরুঊছাকুম হাত্তা-ইয়াবলুগাল হাদইউ মাহিল্লা-হূ ফামান ক-না মিনকুম মারীদান আও বিহীআযাম মির র’ছিহী ফাফিদইয়াতুম মিন সিয়া-মিন আও সাদাকাতিন আও নুছুকিন ফাইযা-আমিনতুম ফামান তামাত্তা‘আ বিল ‘উমরতি ইলাল হাজ্জি ফামাছতাইছার মিনাল হাদয়ি ফামাল্লাম ইয়াজিদ ফাসিয়া-মু ছালা-ছাতি আইয়া-মিন ফিল হাজ্জি ওয়া ছাব‘আতিন ইযা-রজা‘তুম তিলকা ‘আশারতুন ক-মিলাতুন যা-লিকা লিমাল্লাম ইয়াকুন আহলুহূহা-দিরিল মাছজিদিল হার-মি ওয়াত্তাকূল্লা-হা ওয়া‘লামূআন্নাল্লা-হা শাদীদুল ‘ইক-ব।উচ্চারণ
আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য যখন হজ্জ ও উমরাহ করার নিয়ত করো তখন তা পূর্ণ করো। আর যদি কোথাও আটকা পড়ো তাহলে যে কুরবানী তোমাদের আয়ত্বাধীন হয় তাই আল্লাহর উদ্দেশ্যে পেশ করো। ২০৯ আর কুরবানী তার নিজের জায়গায় পৌঁছে না যাওয়া পর্যন্ত তোমরা নিজেদের মাথা মুণ্ডন করো না। ২১০ তবে যে ব্যক্তি রোগগ্রস্ত হয় অথবা যার মাথায় কোন কষ্ট থাকে এবং সেজন্য মাথা মুণ্ডন করে তাহলে তার ‘ফিদিয়া’ হিসেবে রোযা রাখা বা সাদকা দেয়া অথবা কুরবানী করা উচিত। ২১১ তারপর যদি তোমাদের নিরাপত্তা অর্জিত হয় ২১২ (এবং তোমরা হজ্জের আগে মক্কায় পৌঁছে যাও) তাহলে তোমাদের মধ্য থেকে যে ব্যক্তি হজ্জ্বের সময় আসা পর্যন্ত উমরাহ্র সুযোগ লাভ করে সে যেন সামর্থ অনুযায়ী কুরবানী করে। আর যদি কুরবানীর যোগাড় না হয়, তাহলে হজ্জ্বের যামানায় তিনটি রোযা এবং সাতটি রোযা ঘরে ফিরে গিয়ে, এভাবে পুরো দশটি রোযা যেন রাখে। এই সুবিধে তাদের জন্য যাদের বাড়ী-ঘর মসজিদে হারামের কাছাকাছি নয়। ২১৩ আল্লাহর এ সমস্ত বিধানের বিরোধিতা করা থেকে দূরে থাকো এবং ভালোভাবে জেনে নাও আল্লাহ কঠিন শাস্তি প্রদানকারী। তাফহীমুল কুরআন
এবং আল্লাহর জন্য হজ্জ ও উমরা পূর্ণ কর। হাঁ তোমাদেরকে যদি বাধা দেওয়া হয়, তবে যে কুরবানী সম্ভব হয় (তা আল্লাহর উদ্দেশ্যে নিবেদন কর)। #%১৪০%# আর নিজেদের মাথা ততক্ষণ পর্যন্ত কামিও না, যতক্ষণ না কুরবানী নিজ জায়গায় পৌঁছে যায়। হাঁ তোমাদের মধ্যে কেউ যদি অসুস্থ হয়ে পড়ে বা তার মাথায় ক্লেশ দেখা দেয়, তবে সে রোযা বা সাদাকা কিংবা কুরবানীর ফিদয়া দেবে। #%১৪১%# তারপর যখন তোমরা নিরাপদ হয়ে যাবে, তখন যে ব্যক্তি হজ্জের সাথে উমরার সুবিধাও ভোগ করবে, সে (আল্লাহর উদ্দেশ্যে পেশ করবে) যে কুরবানী সহজলভ্য হয়। আর কারও যদি সে সামর্থ্য না থাকে, তবে সে হজ্জের দিনে তিনটি রোযা রাখবে এবং সাতটি (রোযা রাখবে) সেই সময়, যখন তোমরা (বাড়িতে) প্রত্যাবর্তন করবে। এভাবে মোট দশটি রোযা হবে। #%১৪২%# এ বিধান সেই সব লোকের জন্য, যাদের পরিবারবর্গ মসজিদুল হারামের নিকটে বাস করে না। #%১৪৩%# আর আল্লাহকে ভয় করে চলো এবং জেনে রেখ, আল্লাহর আযাব সুকঠিন।মুফতী তাকী উসমানী
তোমরা আল্লাহর উদ্দেশে হাজ্জ ও ‘ওমরাহ সম্পূর্ণ কর; কিন্তু তোমরা যদি বাধাপ্রাপ্ত হও তাহলে যা সহজ প্রাপ্র তাই উৎসর্গ কর এবং কুরবানীর জন্তুগুলি স্বস্থানে না পৌঁছা পর্যন্ত তোমাদের মস্তক মুন্ডন করনা। কিন্তু কেহ যদি তোমাদের মধ্যে পীড়িত হয়, অথবা তার মস্তিস্ক যন্ত্রনাগ্রস্ত হয় তাহলে সে সিয়াম কিংবা সাদাকাহ অথবা কুরবানী দ্বারা ওর বিনিময় করবে, অতঃপর যখন তোমরা শান্তিতে থাকো তখন যে ব্যক্তি ওমরাহ্ ও হাজ্জ একত্রে কামনা করে তাহলে যা সহজ প্রাপ্য তা’ই উৎসর্গ করবে। কিন্তু কেহ যদি তা প্রাপ্ত না হয় তাহলে হাজ্জের সময় তিন দিন এবং যখন তোমরা প্রত্যাবর্তিত হও তখন সাত দিন - এই পূর্ণ দশ দিন সিয়াম পালন করবে; এটা তারই জন্য - যার পরিজন পবিত্রতম মাসজিদে উপস্থিত না থাকে এবং আল্লাহকে ভয় কর ও জেনে রেখ যে, আল্লাহ কঠিন শাস্তি দাতা।মুজিবুর রহমান
আর তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ্জ্ব ওমরাহ পরিপূর্ণ ভাবে পালন কর। যদি তোমরা বাধা প্রাপ্ত হও, তাহলে কোরবানীর জন্য যাকিছু সহজলভ্য, তাই তোমাদের উপর ধার্য। আর তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত মাথা মুন্ডন করবে না, যতক্ষণ না কোরবাণী যথাস্থানে পৌছে যাবে। যারা তোমাদের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়বে কিংবা মাথায় যদি কোন কষ্ট থাকে, তাহলে তার পরিবর্তে রোজা করবে কিংবা খয়রাত দেবে অথবা কুরবানী করবে। আর তোমাদের মধ্যে যারা হজ্জ্ব ওমরাহ একত্রে একই সাথে পালন করতে চাও, তবে যাকিছু সহজলভ্য, তা দিয়ে কুরবানী করাই তার উপর কর্তব্য। বস্তুতঃ যারা কোরবানীর পশু পাবে না, তারা হজ্জ্বের দিনগুলোর মধ্যে রোজা রাখবে তিনটি আর সাতটি রোযা রাখবে ফিরে যাবার পর। এভাবে দশটি রোযা পূর্ণ হয়ে যাবে। এ নির্দেশটি তাদের জন্য, যাদের পরিবার পরিজন মসজিদুল হারামের আশে-পাশে বসবাস করে না। আর আল্লাহকে ভয় করতে থাক। সন্দেহাতীতভাবে জেনো যে, আল্লাহর আযাব বড়ই কঠিন।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
তোমরা আল্লাহ্ র উদ্দেশ্যে হজ্জ ও উমরা পূর্ণ কর, কিন্তু তোমরা যদি বাধাপ্রাপ্ত হও তবে সহজলভ্য কুরবানী কর। যে পর্যন্ত কুরবানীর পশু এর স্থানে না পৌঁছে তোমরা মস্তক মুণ্ডন কর না। তোমাদের মধ্যে যদি কেউ পীড়িত হয় কিংবা মাথায় ক্লেশ থাকে তবে সিয়াম কিংবা সাদাকা বা কুরবানীর মাধ্যমে এর ফিদ্য়া দিবে। যখন তোমরা নিরাপদ হবে তখন তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি হজ্জের প্রাক্কালে উমরা দিয়ে লাভবান হতে চায় সে সহজলভ্য কুরবানী করবে। কিন্তু যদি কেউ তা না পায় তবে তাকে হজ্জের সময় তিনদিন এবং বাড়ী ফেরার পর সাতদিন-এই পূর্ণ দশদিন সিয়াম পালন করতে হবে। এটা তাদের জন্যে, যাদের পরিজনবর্গ মসজিদুল হারামের বাসিন্দা নয়। আল্লাহ্কে ভয় কর এবং জেনে রাখ যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ্ শাস্তি দানে কঠোর।ইসলামিক ফাউন্ডেশন
আর হজ ও উমরা আল্লাহর জন্য পূর্ণ কর। অতঃপর যদি তোমরা আটকে পড় তবে যে পশু সহজ হবে (তা যবেহ কর)। আর তোমরা তোমাদের মাথা মুন্ডন করো না, যতক্ষণ না পশু তার যথাস্থানে পৌঁছে। আর তোমাদের মধ্যে যে অসুস্থ কিংবা তার মাথায় যদি কোন কষ্ট থাকে তবে সিয়াম কিংবা সদাকা অথবা পশু যবেহ এর মাধ্যমে ফিদয়া দেবে। আর যখন তোমরা নিরাপদ হবে তখন যে ব্যক্তি উমরার পর হজ সম্পাদনপূর্বক তামাত্তু করবে, তবে যে পশু সহজ হবে, তা যবেহ করবে। কিন্তু যে তা পাবে না তাকে হজে তিন দিন এবং যখন তোমরা ফিরে যাবে, তখন সাত দিন সিয়াম পালন করবে। এই হল পূর্ণ দশ। এই বিধান তার জন্য, যার পরিবার মাসজিদুল হারামের অধিবাসী নয়। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ আযাবদানে কঠোর।আল-বায়ান
আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হাজ্জ ও ‘উমরাহকে পূর্ণ কর, কিন্তু যদি তোমরা বাধাগ্রস্ত হও, তবে যা সম্ভব কুরবানী দিবে এবং কুরবানী যথাস্থানে না পৌঁছা পর্যন্ত নিজেদের মস্তক মুন্ডন করো না, তবে তোমাদের মধ্যে যে পীড়িত কিংবা মাথায় যন্ত্রণাগ্রস্ত, সে রোযা কিংবা সদাক্বাহ বা কুরবানী দ্বারা ফিদইয়া দিবে এবং যখন তোমরা নিরাপদ থাক, তখন যে কেউ ‘উমরাহকে হাজ্জের সঙ্গে মিলিয়ে উপকার লাভ করতে ইচ্ছুক, সে যেমন সম্ভব কুরবানী দিবে এবং যার পক্ষে সম্ভব না হয়, সে ব্যক্তি হাজ্জের দিনগুলোর মধ্যে তিনদিন এবং গৃহে ফেরার পর সাতদিন, এই মোট দশদিন রোযা পালন করবে। এটা সেই লোকের জন্য, যার পরিবারবর্গ মাসজিদে হারামের বাসিন্দা নয়। আল্লাহকে ভয় কর আর জেনে রেখ, নিশ্চয়ই আল্লাহ শাস্তিদানে কঠোর।তাইসিরুল
আর আল্লাহ্র জন্য সম্পূর্ণ করো হজ এবং উমরাহ। কিন্তু যদি বাধা পাও, তবে কুরবানির যা-কিছু পাওয়া যায় তাই, আর তোমাদের মাথা কামাবে না যতক্ষণ না কুরবানি তার গন্তব্যস্থানে পৌঁছেছে কিন্তু তোমাদের মধ্যে যদি কেউ অসুস্থ হয় অথবা তার মাথায় রোগ থাকে, তবে প্রতিবিধান হচ্ছে রোযা রেখে বা সদকা দিয়ে বা কুরবানি ক’রে। কিন্তু যখন তোমরা নিরাপদ বোধ করবে তখন যে উমরাহ্কে হজের সঙ্গে সংযোজন ক’রে লাভবান হতে চায়, সে যেন কুরবানির যা-কিছু পায় তাই। কিন্তু যে পায় না, রোযা হচ্ছে হজের সময়ে তিনদিন আর তোমরা যখন ফিরে এস তখন সাত, -- এই হলো পুরো দশ। এটা তার জন্য যার পরিবার পবিত্র- মজজিদে হাজির থাকে না। আর আল্লাহ্কে ভয়-ভক্তি করো, আর জেনে রেখো যে নিঃসন্দেহ আল্লাহ্ প্রতিফলদানে কঠোর।মাওলানা জহুরুল হক
২০৯
অর্থাৎ পথে যদি এমন কোন কারণ দেখা দেয় যার ফলে সামনে এগিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং বাধ্য হয়ে পথেই থেমে যেতে হয় তাহলে উট, গরু, ছাগলের মধ্য থেকে যে পশুটি পাওয়া সম্ভব হয় সেটি আল্লাহর জন্য কুরবানী করো।
২১০
কুরবানী তার নিজের জায়গায় পৌঁছে যাওয়ার অর্থ কি? এ ব্যাপারে বিভিন্ন মত প্রকাশ করা হয়েছে। হানাফী ফকীহদের মতে এর অর্থ হচ্ছে হারাম শরীফ। অর্থাৎ হজ্জযাত্রী যদি পথে থেমে যেতে বাধ্য হয় তাহলে নিজের কুরবানীর পশু বা তার মূল্য পাঠিয়ে দেবে এবং তার পক্ষ থেকে হারাম শরীফের সীমানার মধ্যে কুরবানী করতে হবে। ইমাম মালিক (র) ও ইমাম শাফেঈর (র) মতে হজ্জযাত্রী যেখানে আটক হয়ে যায় সেখানে কুরবানী করে দেয়াই হচ্ছে এর অর্থ। মাথা মুণ্ডন করার অর্থ হচ্ছে, মাথার চুল চেঁছে ফেলা। অর্থাৎ কুরবানী না হওয়া পর্যন্ত মাথার চুল চেঁছে ফেলতে পারবে না।
২১১
হাদীস থেকে জানা যায়, এ অবস্থায় নবী সালআল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিন দিন রোযা রাখা বা ছয় জন মিসকিনকে আহার করানো অথবা কমপক্ষে একটি ছাগল যবেহ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
২১২
অর্থাৎ যে কারণে পথে তোমাদের বাধ্য হয়ে থেমে যেতে হয়েছিল সে কারণ যদি দূর হয়ে যায়। যেহেতু সে যুগে ইসলাম বৈরী গোত্রদের বাঁধা দেয়ার ফলেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে হজ্জের পথ বন্ধ হয়ে যেতো এবং হাজীদের পথে থেমে যেতে হতো, তাই আল্লাহ ওপরের আয়াতে “আটকা পড়ো” এবং তার মোকাবিলায় “নিরাপত্তা অর্জিত হয়” শব্দ ব্যবহার করেছেন। কিন্তু “আটকা পড়া”র মধ্যে যেমন শত্রুর বাঁধা দেয়া ও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার সাথে সাথে অন্যান্য যাবতীয় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অর্থও অন্তর্ভুক্ত হয় তেমনি “নিরাপত্তা অর্জিত হয়” শব্দের মধ্যেও যাবতীয় প্রতিবন্ধকতা দূর হয়ে যাবার অর্থ অন্তর্ভুক্ত হয়।
২১৩
জাহেলী যুদ্ধে আরবের লোকেরা ধারণা করতো, একই সফরে হজ্জ ও উমরাহ দু’টো সম্পন্ন করা মহাপাপ। তাদের মনগড়া শরীয়াতী বিধান অনুযায়ী হজ্জের জন্য একটি সফর এবং উমরাহর জন্য আর একটি সফল করা অপরিহার্য ছিল। মহান আল্লাহ তাদের আরোপিত এই বাধ্য-বাধকতা খতম করে দেন এবং বাইর থেকে আগমনকারীদেরকে এই সফরে হজ্জ ও উমরাহ করার সুবিধা দান করেন। তবে যারা মক্কার আশেপাশের মীকাতের (যে স্থান থেক হজ্জযাত্রীকে ইহরাম বাঁধতে হয়) সীমার মধ্যে অবস্থান করে তাদেরকে এই সুযোগ দেয়া হয়নি। কারণ তাদের পক্ষে হজ্জ ও উমরাহর জন্য পৃথক পৃথক সফর করা মোটেই কঠিন কাজ নয়।
হজ্জের সময় আসা পর্যন্ত উমরাহর সুযোগ লাভ করার অর্থ হচ্ছে, উমরাহ সম্পন্ন করে ইহরাম খুলে ফেলতে হবে এবং ইহরাম থাকা অবস্থায় যেসব বিধি-নিষেধ মেনে চলতে হচ্ছিল সেগুলো থেকে মুক্ত হয়ে যাবে। তারপর হজ্জের সময় এলে আবার নতুন করে ইহরাম বেঁধে নেবে।
অর্থাৎ কেউ যখন হজ্জ বা উমরার ইহরাম বেঁধে ফেলবে, তখন হজ্জ বা উমরার কাজ সমাপণ না করা পর্যন্ত ইহরাম খোলা জায়েয হবে না। তবে কেউ যদি নিরুপায় হয়ে যায়, ফলে ইহরাম বাঁধার পর মক্কায় পৌঁছা সম্ভব না হয়, তার কথা ভিন্ন। খোদ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও এরূপ অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিলেন। সাহাবীগণকে নিয়ে তিনি উমরার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছিলেন। কিন্তু যখন হুদায়বিয়ায় পৌঁছান, তখন মক্কার মুশরিকরা তাঁকে সেখানে আটকে দেয়। ফলে তিনি আর সামনে অগ্রসর হতে পারেননি। তখনই এই আয়াত নাযিল হয়। আয়াতে এরূপ পরিস্থিতিতে এই সমাধান দেওয়া হয়েছে যে, এরূপ অবস্থায় কুরবানী করে ইহরাম খোলা যেতে পারে। ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে এ কুরবানী হারামের সীমানার মধ্যে হতে হবে, যেমন পরবর্তী বাক্যে বলা হয়েছে, ‘নিজেদের মাথা ততক্ষণ পর্যন্ত কামিও না, যতক্ষণ না কুরবানী নিজ জায়গায় পৌঁছে যায়। অতঃপর যেই হজ্জ বা উমরার ইহরাম বেঁধেছিল তার কাযা করাও জরুরী। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরের বছর এ উমরার কাযা করেছিলেন।
১৯৬. আর তোমরা হজ ও উমরা পূর্ণ কর(১) আল্লাহর উদ্দেশ্যে। অতঃপর যদি তোমরা বাধা প্রাপ্ত হও তাহলে সহজলভ্য হাদঈ(২) প্রদান করো। আর তোমরা মাথা মুন্ডন করো না(৩) যে পর্যন্ত হাদঈ তার স্থানে না পৌছে। অতঃপর তোমাদের মধ্যে যদি কেউ অসুস্থ হয় বা মাথায় কষ্টদায়ক কিছু হয় তবে সিয়াম কিংবা সাদাকা অথবা পশু যবেহ দ্বারা তার ফিদইয়া দিবে(৪)। অতঃপর যখন তোমরা নিরাপদ হবে তখন তোমাদের মধ্যে যে কেউ উমরাকে হজের সঙ্গে মিলিয়ে লাভবান হতে চায়(৫) সে সহজলভ্য হাদঈ যবাই করবে। কিন্তু যদি কেউ তা না পায়, তবে তাকে হজের সময় তিন দিন এবং ঘরে ফিরার পর সাত দিন এ পূর্ণ দশ দিন সিয়াম পালন করতে হবে। এটা তাদের জন্য, যাদের পরিজনবর্গ মসজিদুল হারামের বাসিন্দা নয়। আর তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর এবং জেনে রাখ যে, নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি দানে কঠোর।(৬)
(১) হজ সর্বসম্মতভাবে ইসলামের আরকানসমূহের মধ্যে একটি রুকন এবং ইসলামের ফরযসমূহ বা অবশ্যকরণীয় বিষয়সমূহের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ফরয। কুরআনের বহু আয়াত এবং অসংখ্য হাদীসের মাধ্যমে এর প্রতি তাকিদ ও গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
(২) হাদঈ বলতে এমন জানোয়ার বুঝায় যা মীকাতের বাইরের লোকদের মধ্য থেকে যারা হজ ও উমরা একই সফরে আদায় করবে, তাদের উপর আল্লাহর জন্য যবেহ করা ওয়াজিব হয়। যার রক্ত হারাম এলাকায় পড়তে হয়। মনে রাখাতে হবে যে, তা সাধারণ কুরবানী নয়।
(৩) আয়াতে মাথা মুণ্ডনকে ইহরাম ভঙ্গ করার নিদর্শন বলে সাব্যস্ত করা হয়েছে। এতেই প্রমাণিত হয় যে, ইহরাম অবস্থায় চুল ছাটা বা কাটা অথবা মাথা মুণ্ডন করা নিষিদ্ধ।
(৪) যদি কোন অসুস্থতার দরুন মাথা বা শরীরের অন্য কোন স্থানের চুল কাটতে হয় অথবা মাথায় উকুন হওয়াতে বিশেষ কষ্ট পায়, তবে এমতাবস্থায় মাথার চুল বা শরীরের অন্য কোন স্থানের লোম কাটা জায়েয। কিন্তু এর ফিদইয়া বা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। আর তা হচ্ছে সাওম পালন করা বা সদকা দেয়া বা যবেহ্ করা। ফিদইয়া যবেহ করার জন্য হারামের সীমারেখা নির্ধারিত রয়েছে। কিন্তু সাওম পালন বা সদকা দেয়ার জন্য কোন বিশেষ স্থান নির্ধারিত নেই। তা যে কোন স্থানে আদায় করা চলে। কুরআনের শব্দের মধ্যে সাওমের কোন সংখ্যা নির্ধারিত নেই এবং সদকারও কোন পরিমাণ নির্দেশ করা হয়নি। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবী কাব ইবনে উজরার এমনি অবস্থার প্রেক্ষিতে এরশাদ করেছেনঃ তিন দিন সাওম অথবা ছয়জন মিসকীনকে খাবার দাও, প্রত্যেক মিসকীনকে মাথাপিছু অর্ধ সা খাবার দাও এবং তোমার মাথা মুণ্ডন করে ফেল। (বুখারীঃ ৪৫১৭)
(৫) হজের মাসে হজের সাথে উমরাকে একত্রিকরণের দুটি পদ্ধতি রয়েছে। একটি হচ্ছে, মীকাত হতে হজ ও উমরাহর জন্য একত্রে এহরাম করা। শরীআতের পরিভাষায় একে হজে-কেরান’ বলা হয়। এর এহরাম হজের এহরামের সাথেই ছাড়তে হবে, হজের শেষদিন পর্যন্ত তাকে এহরাম অবস্থায়ই কাটাতে হয়। দ্বিতীয় পদ্ধতি হচ্ছে এই যে, মীকাত হতে শুধু উমরার এহরাম করবে। মক্কায় আগমনের পর উমরার কাজ-কর্ম শেষ করে এহরাম খুলবে এবং ৮ই জিলহজ তারিখে মীনা যাওয়ার প্রাক্কালে স্ব স্ব স্থান থেকে এহরাম বেঁধে নেবে। শরীআতের পরিভাষায় একে ‘হজে-তামাতু’ বলা হয়।
(৬) আয়াতটিতে প্রথমে তাকওয়া অবলম্বন করার আদেশ দেয়া হয়েছে; যার অর্থ এসব নির্দেশের বিরুদ্ধাচরণ থেকে বিরত, সতর্ক ও ভীত থাকা বুঝায়। যে ব্যক্তি জেনে-বুঝে আল্লাহ্র নির্দেশাবালীর বিরুদ্ধাচরন করে, তার জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি। আজকাল হজ্ব ও উমরাকারীগণের অধিকাংশই এ সম্পর্কে অসতর্ক। তারা প্রথমতঃ হজ্ব ও উমরার নিয়মাবলী জানতেই চেষ্টা করে না। আর যদিওবা জেনে নেয়, অনেকেই তা যথাযথভাবে পালন করে না। অনেকে ওয়াজিবও পরিত্যাগ করে। আর সুন্নাত ও মুস্তাহাবের তো কথাই নেই। আল্লাহ সবাইকে নিজ নিজ আমল যথাযথভাবে পালন করার তৌফিক দান করুন।
(১৯৬) আর আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ্জ্ব ও উমরাহ পূর্ণভাবে সম্পাদন কর,(1) কিন্তু (ইহরাম বাঁধার পর) যদি তোমরা বাধাপ্রাপ্ত হও, তাহলে সহজলভ্য (পশু) কুরবানী কর(2) এবং যে পর্যন্ত কুরবানীর (পশু) তার যবেহস্থলে উপস্থিত না হয়, তোমরা মস্তক মুন্ডন করো না (হালাল হয়ো না)।(3) অতএব তোমাদের মধ্যে কেউ পীড়িত হলে, অথবা মাথায় কোন ব্যাধি থাকলে (এবং তার জন্য মস্তক মুন্ডন করতে হলে তার পরিবর্তে) সে রোযা রাখবে কিংবা সাদকাহ করবে, কিংবা কুরবানী দ্বারা তার ফিদ্ইয়া (বিনিময়) দেবে।(4) অতঃপর যখন তোমরা নিরাপদ হবে, তখন তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি হজ্জ্বের পূর্বে উমরাহ দ্বারা লাভবান হতে চায়, সে সহজলভ্য কুরবানী করবে। কিন্তু যদি কেউ কুরবানী না পায় (বা দিতে অক্ষম হয়), তাহলে তাকে হজ্জের সময় তিন দিন এবং গৃহে প্রত্যাবর্তনের পর সাত দিন (5) -- এই পূর্ণ দশ দিন রোযা পালন করতে হবে। এই নিয়ম সেই ব্যক্তির জন্য, যার পরিবার-পরিজন পবিত্র কা’বার নিকটে (মক্কায়) বাস করে না।(6) আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং জেনে রাখ যে, আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা।
(1) হজ্জ ও উমরার ইহরাম বেঁধে নেওয়ার পর তা পূর্ণ করা ওয়াজিব, যদিও তা (হজ্জ ও উমরাহ) নফল হয়। (আইসারুত তাফাসীর)
(2) অর্থাৎ, যদি পথে শত্রু অথবা কঠিন অসুস্থতার কারণে বাধাপ্রাপ্ত হও, তাহলে একটি পশু, উট অথবা গরু (গোটা অথবা এক সপ্তমাংশ) অথবা ছাগল বা ভেড়া সেখানেই যবেহ করে মাথা নেড়া করে হালাল হয়ে যাও। যেমন, নবী করীম (সাঃ) এবং তাঁর সাহাবীগণ হুদাইবিয়্যাতে কুরবানী যবেহ করেছিলেন। আর হুদাইবিয়্যা হারাম সীমানার বাইরে। (ফাতহুল ক্বাদীর) অতঃপর আগামী বছরে তার কাযা কর। যেমন, নবী করীম (সাঃ) সন ৬ হিজরীর উমরার কাযা সন ৭ হিজরীতে করেছিলেন।
(3) এর সংযোগ {وَاَتِمُّوا الْحَجَّ} (আর তোমরা হজ্জ--- সম্পাদন কর)এর সাথে। আর এর সম্পর্ক হল নিরাপদ পরিস্থিতির সাথে। অর্থাৎ, নিরাপদ অবস্থায় ততক্ষণ পর্যন্ত মাথা নেড়া করবে না (ইহরাম খুলে হালাল হবে না), যতক্ষণ না হজ্জের সমস্ত কার্যাদি পূরণ করেছ।
(4) অর্থাৎ, সে যদি এমন কষ্টে পতিত হয়ে পড়ে যে, তাকে মাথার চুল কাটতেই হবে, তাহলে তাকে ফিদ্ইয়া (বিনিময়) অবশ্যই দিতে হবে। হাদীস অনুযায়ী এ রকম (অসুবিধাগ্রস্ত) ব্যক্তি ছ’জন মিসকীনকে খাদ্য দান করবে অথবা একটি ছাগল যবেহ করবে কিংবা তিন দিন রোযা রাখবে। রোযা ব্যতীত অন্য দু’টি ফিদ্ইয়ার স্থানের ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেছেন, খাদ্য দান ও ছাগল যবেহ করার কাজ মক্কাতে করতে হবে। আবার কেউ বলেছেন, রোযার মতই এর জন্য কোন নির্দিষ্ট স্থান নেই। ইমাম শাওকানী এই মতেরই সমর্থন করেছেন। (ফাতহুল ক্বাদীর)
(5) হজ্জ তিন প্রকার; ইফরাদঃ কেবল হজ্জের নিয়তে ইহরাম বাঁধা। ক্বিরানঃ হজ্জ ও উমরার এক সাথে নিয়ত করে ইহরাম বাঁধা। এই উভয় অবস্থায় হজ্জের সমস্ত কার্যাদি সুসম্পন্ন না করে ইহরাম খোলা বৈধ নয়। তামাত্তুঃ এতেও হজ্জ ও উমরার নিয়ত হয়। তবে প্রথমে উমরার নিয়তে ইহরাম বাঁধা হয় এবং উমরাহ সম্পূর্ণ করে ইহরাম খুলে দেওয়া হয় এবং যুল-হজ্জ মাসের ৮ তারীখে হজ্জের জন্য মক্কা থেকেই দ্বিতীয়বার ইহরাম বাঁধা হয়। ‘তামাত্তু’র অর্থ লাভবান হওয়া। অর্থাৎ, উমরাহ ও হজ্জের মাঝে ইহরাম খুলে লাভবান হওয়া হয়। হজ্জে ক্বিরান এবং হজ্জে তামাত্তু’তে একটি হাদ্ই (অর্থাৎ, একটি ছাগল বা ভেড়া কিংবা উট বা গরুর এক সপ্তমাংশ) কুরবানী দিতে হবে। যদি কেউ কুরবানী দিতে না পারে, তাহলে সে হজ্জের দিনগুলোতে তিনটি এবং বাড়ি ফিরে সাতটি রোযা রাখবে। হজ্জের দিনগুলোতে যে রোযা রাখবে, তা হয় ৯ই যুল-হজ্জের (আরাফার দিনের) আগে রাখবে অথবা তাশরীকের দিনগুলোতে রাখবে।
(6) অর্থাৎ, তামাত্তু’ হজ্জ ও কুরবানী বা রোযা রাখা কেবল তাদের জন্য বিধেয়, যারা মসজিদে হারামের বাসিন্দা নয়। অর্থাৎ, হারাম সীমানার অথবা তার এত কাছের বাসিন্দা নয় যে, তাদের সফরে নামায কসর করা যায়। (ইবনে কাসীর, ইবনে জারীর)