উহিল্লা লাকুম লাইলাতাসসিয়া-মিররফাছুইলা-নিছাইকুম হুন্না লিবা-ছুল্লাকুম ওয়া আনতুম লিবা-ছুল লাহুন্না ‘আলিমাল্লা-হু আন্নাকুম কুনতুম তাখতা-নূনা আনফুছাকুম ফাতাবা ‘আলাইকুম ওয়া ‘আফা- ‘আনকুম ফালআ-না বা-শিরূহুন্না ওয়াবতাগূ মা-কাতাবাল্লা-হু লাকুম ওয়া কুলূ ওয়াশরবূ হাত্তা-ইয়াতাবাইয়ানা লাকুমুল খাইতুল আবইয়াদুমিনাল খাইতিল আছওয়াদি মিনাল ফাজরি ছু ম্মা আতিম্মুস সিয়া-মা ইলাল্লাইলি ওয়ালাতুবা-শিরূহুন্না ওয়া আনতুম ‘আ-কিফূনা ফিল মাছা-জিদি তিলকা হুদূদুল্লা-হি ফালাতাকরবূহা-কাযা-লিকা ইউবাইয়িনুল্লা-হু আ-য়া-তিহী লিন্না-ছি লা‘আল্লাহুম ইয়াত্তাকূন।উচ্চারণ
রোযার সময় রাতের বেলা স্ত্রীদের কাছে যাওয়া তোমাদের জন্য হালাল করে দেয়া হয়েছে। তারা তোমাদের পোশাক এবং তোমরা তাদের পোশাক। ১৯০ আল্লাহ জানতে পেরেছেন, তোমরা চুপি চুপি নিজেরাই নিজেদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছিলে। কিন্তু তিনি তোমাদের অপরাধ মাফ করে দিয়েছেন এবং তোমাদের ক্ষমা করেছেন। এখন তোমরা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে রাত্রিবাস করো এবং যে স্বাদ আল্লাহ তোমাদের জন্য বৈধ করে দিয়েছেন তা গ্রহণ করো। ১৯১ আর পানাহার করতে থাকো। ১৯২ যতক্ষণ না রাত্রির কালো রেখার বুক চিরে প্রভাতের সাদা রেখা সুস্পষ্টভাবে দৃষ্টিগোচর হয়। ১৯৩ তখন এসব কাজ ত্যাগ করে রাত পর্যন্ত নিজের রোযা পূর্ণ করো। ১৯৪ আর যখন তোমরা মসজিদে ই’তিকাফে বসো তখন স্ত্রীদের সাথে সহবাস করো না। ১৯৫ এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা, এর ধারে কাছেও যেয়ো না। ১৯৬ এভাবে আল্লাহ তাঁর বিধান লোকদের জন্য সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন, আশা করা যায় এর ফলে তারা ভুল কর্মনীতি গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকবে। তাফহীমুল কুরআন
রোযার রাতে তোমাদের জন্য হালাল করে দেওয়া হয়েছে তোমাদের স্ত্রীদের সাথে সহবাস। তারা তোমাদের জন্য পোশাক এবং তোমরাও তাদের জন্য পোশাক। আল্লাহ জানতেন, তোমরা নিজেদের সাথে খেয়ানত করছিলে। অতঃপর তিনি তোমাদের প্রতি দয়াপরবশ হয়েছেন এবং তোমাদের ত্রুটি ক্ষমা করেছেন। #%১৩২%# সুতরাং এখন তোমরা তাদের সাথে সহবাস কর এবং আল্লাহ তোমাদের জন্য যা-কিছু লিখে রেখেছেন তা সন্ধান কর। #%১৩৩%# আর যতক্ষণ না ভোরের সাদা রেখা কালো রেখা থেকে পৃথক হয়ে যায়, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা খাও ও পান কর। তারপর রাতের আগমন পর্যন্ত রোযা পূর্ণ কর। আর তাদের সাথে (স্ত্রীদের সাথে) সহবাস করো না, যখন তোমরা মসজিদে ইতিকাফরত থাক। এসব আল্লাহর (নির্ধারিত) সীমা। সুতরাং তোমরা এগুলোর নিকটে যেও না। এভাবে আল্লাহ মানুষের সামনে স্বীয় নিদর্শনাবলী স্পষ্টরূপে বর্ণনা করেন, যাতে তারা তাকওয়া অবলম্বন করে।মুফতী তাকী উসমানী
রামাযানের রাতে আপন স্ত্রীদের সাথে মেলামেশা করা তোমাদের জন্য বৈধ করা হয়েছে, তারা তোমাদের জন্য এবং তোমরা তাদের জন্য আবরণ, তোমরা যে নিজেদের ক্ষতি করছিলে আল্লাহ তা জ্ঞাত আছেন, এ জন্য তিনি তোমাদের প্রতি প্রত্যাবৃত্ত হলেন এবং তোমাদের (ভার) লাঘব করে দিলেন; অতএব এক্ষণে তোমরা (রামাযানের রাতেও) তাদের সাথে মিলিত হও এবং আল্লাহ তোমাদের জন্য যা লিপিবদ্ধ করেছেন তা অনুসন্ধান কর এবং প্রত্যুষে কালো সূতা হতে সাদা সূতা প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত তোমরা আহার ও পান কর, অতঃপর রাত সমাগম পর্যন্ত তোমরা সিয়াম পূর্ণ কর; তোমরা মাসজিদে ই‘তিকাফ করার সময় (তোমাদের স্ত্রীদের সাথে) মিলিত হবেনা; এটিই আল্লাহর সীমা। অতএব তোমরা উহার নিকটেও যাবেনা; এভাবে আল্লাহ মানবমন্ডলীর জন্য তাঁর নিদর্শনসমূহ বিবৃত করেন, যেন তারা সংযত হয়।মুজিবুর রহমান
রোযার রাতে তোমাদের স্ত্রীদের সাথে সহবাস করা তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে। তারা তোমাদের পরিচ্ছদ এবং তোমরা তাদের পরিচ্ছদ। আল্লাহ অবগত রয়েছেন যে, তোমরা আত্নপ্রতারণা করছিলে, সুতরাং তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করেছেন এবং তোমাদের অব্যাহতি দিয়েছেন। অতঃপর তোমরা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে সহবাস কর এবং যা কিছু তোমাদের জন্য আল্লাহ দান করেছেন, তা আহরন কর। আর পানাহার কর যতক্ষণ না কাল রেখা থেকে ভোরের শুভ্র রেখা পরিষ্কার দেখা যায়। অতঃপর রোযা পূর্ণ কর রাত পর্যন্ত। আর যতক্ষণ তোমরা এতেকাফ অবস্থায় মসজিদে অবস্থান কর, ততক্ষণ পর্যন্ত স্ত্রীদের সাথে মিশো না। এই হলো আল্লাহ কর্তৃক বেঁধে দেয়া সীমানা। অতএব, এর কাছেও যেও না। এমনিভাবে বর্ণনা করেন আল্লাহ নিজের আয়াত সমূহ মানুষের জন্য, যাতে তারা বাঁচতে পারে।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
সিয়ামের রাত্রে তোমাদের জন্যে স্ত্রী-সম্ভোগ বৈধ করা হয়েছে। তারা তোমাদের পরিচ্ছদ এবং তোমরা তাদের পরিচ্ছদ। আল্লাহ্ জানেন যে, তোমরা নিজেদের প্রতি অবিচার করছিলে। এরপর তিনি তোমাদের প্রতি ক্ষমাশীল হয়েছেন আর তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করেছেন। সুতরাং এখন তোমরা তাদের সঙ্গে সংগত হও এবং আল্লাহ্ যা তোমাদের জন্যে নির্ধারণ করেছেন তা কামনা কর। আর তোমরা পানাহার কর যতক্ষণ রাত্রির কৃষ্ণরেখা হতে ঊষার শুভ্ররেখা স্পষ্টরূপে তোমাদের নিকট প্রতিভাত না হয়। এরপর নিশাগম পর্যন্ত সিয়াম পূর্ণ কর। তোমরা মসজিদে ই‘তিকাফরত অবস্থায় তাদের সঙ্গে সংগত হয়ো না। এইগুলি আল্লাহ্ র সীমারেখা। সুতরাং এইগুলির নিকটবর্তী হয়ো না। এইভাবে আল্লাহ্ তাঁর বিধানাবলী মানব জাতির জন্যে সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেন, যাতে তারা মুত্তাকী হতে পারে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন
সিয়ামের রাতে তোমাদের জন্য তোমাদের স্ত্রীদের নিকট গমন হালাল করা হয়েছে। তারা তোমাদের জন্য পরিচ্ছদ এবং তোমরা তাদের জন্য পরিচ্ছদ। আল্লাহ জেনেছেন যে, তোমরা নিজদের সাথে খিয়ানত করছিলে। অতঃপর তিনি তোমাদের তাওবা কবূল করেছেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করেছেন। অতএব, এখন তোমরা তাদের সাথে মিলিত হও এবং আল্লাহ তোমাদের জন্য যা লিখে দিয়েছেন, তা অনুসন্ধান কর। আর আহার কর ও পান কর যতক্ষণ না ফজরের সাদা রেখা কাল রেখা থেকে স্পষ্ট হয়। অতঃপর রাত পর্যন্ত সিয়াম পূর্ণ কর। আর তোমরা মাসজিদে ইতিকাফরত অবস্থায় স্ত্রীদের সাথে মিলিত হয়ো না। এটা আল্লাহর সীমারেখা, সুতরাং তোমরা তার নিকটবর্তী হয়ো না। এভাবেই আল্লাহ তাঁর আয়াতসমূহ মানুষের জন্য স্পষ্ট করেন যাতে তারা তাকওয়া অবলম্বন করে।আল-বায়ান
তোমাদের জন্য রমাযানের রাতে তোমাদের বিবিগণের নিকট গমন করা জায়িয করা হয়েছে, তারা তোমাদের আচ্ছাদন আর তোমরা তাদের আচ্ছাদন। আল্লাহ জানতেন যে, তোমরা নিজেদের সঙ্গে প্রতারণা করছিলে। সুতরাং তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করলেন এবং তোমাদের অব্যাহতি দিলেন। অতএব, এখন থেকে তোমরা তাদের সঙ্গে সহবাস করতে পার এবং আল্লাহ তোমাদের জন্য যা কিছু বিধিবদ্ধ করেছেন তা লাভ কর এবং তোমরা আহার ও পান করতে থাক যে পর্যন্ত তোমাদের জন্য কালো রেখা হতে ঊষাকালের সাদা রেখা প্রকাশ না পায়। তৎপর রাতের আগমন পর্যন্ত রোযা পূর্ণ কর, আর মাসজিদে ই’তিকাফ অবস্থায় তাদের সাথে সহবাস করো না। এসব আল্লাহর আইন, কাজেই এগুলোর নিকটবর্তী হয়ো না। আল্লাহ মানবজাতির জন্য নিজের আয়াতসমূহ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেন, যাতে তারা মুত্তাকী হতে পারে।তাইসিরুল
রোযার রাত্রে তোমাদের স্ত্রীদের কাছে গমন তোমাদের জন্য বৈধ করা গেল। তারা তোমাদের জন্য পোশাক আর তোমরা তাদের জন্য পোশাক। আল্লাহ্ জানেন যে তোমরা তোমাদের নিজেদের প্রবঞ্চনা করছিলে, তাই তিনি তোমাদের উপরে ফিরেছেন ও তোমাদের ভুলকে উপেক্ষা করেছেন। সুতরাং এখন তাদের সাহচর্য ভোগ করো, আর আল্লাহ্ তোমাদের জন্য যা নির্ধারিত করেছেন তা অনুসরণ করে চল। আর আহার করো ও পান করো যতক্ষণ না তোমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে ভোরবেলাতে সাদা কিরণ কালো ছায়া থেকে, তারপর রোযা সম্পূর্ণ করো রাত্রি সমাগম পর্যন্ত। আর তাদের স্পর্শ করো না যখন তোমরা মসজিদে ই'তিকাফ করো। এ হচ্ছে আল্লাহ্র সীমা, কাজেই সে-সবের নিকটে যেয়ো না। এইভাবে আল্লাহ্ তাঁর আয়াতসমূহ মানুষের জন্য সুস্পষ্ট করে দিয়েছেন যাতে তারা ধর্মপরায়ণতা অবলন্বন করে।মাওলানা জহুরুল হক
১৯০
অর্থাৎ পোশাক ও শরীরের মাঝখানে যেমন কোন পর্দা বা আবরণ থাকতে পারে না এবং উভয়ের সম্পর্ক ও সম্মিলন হয় অবিচ্ছিন্ন ও অবিচ্ছেদ্য, ঠিক তেমনি তোমাদের ও তোমাদের স্ত্রীদের সম্পর্কও।
১৯১
শুরুতে রমযান মাসের রাত্রিকালে স্ত্রীর সাথে রাত্রিবাস করার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা সম্বলিত কোন সুস্পষ্ট নির্দেশ না থাকলেও লোকেরা এমনটি করা অবৈধ মনে করতো। তারপর এই অবৈধ বা অপছন্দনীয় হবার ধারণা মনে মনে পোষণ করে অনেক সময় তারা নিজেদের স্ত্রীদের কাছে চলে যেতো। এটা যেন নিজের বিবেকের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা হতো। এর ফলে তাদের মধ্যে একটি অপরাধ ও পাপ মনোবৃত্তির লালনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। তাই মহান আল্লাহ প্রথমে তাদেরকে বিবেকের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছেন অতঃপর বলেছেন, এটি তোমাদের জন্য বৈধ। কাজেই এখন তোমরা খারাপ কাজ মনে করে একে করো না বরং আল্লাহ প্রদত্ত অনুমতির সুযোগ গ্রহণ করে মন ও বিবেকের পূর্ণ পবিত্রতা সহকারে করো।
১৯২
এ ব্যাপারেও শুরুতে লোকদের ভুল ধারণা ছিল। কারোর ধারণা ছিল, এশার নামায পড়ার পর থেকে পানাহার হারাম হয়ে যায়। আবার কেউ মনে করতো, রাতে যতক্ষণ জেগে থাকা হয় ততক্ষণ পানাহার করা যেতে পারে, ঘুমিয়ে পড়ার পর আবার উঠে কিছু খাওয়া যেতে পারে না। লোকেরা মনে মনে এই বিধান কল্পনা করে রেখেছিল এর ফলে অনেক সময় তাদের বড়ই ভোগান্তি হতো। এই আয়াতে ঐ ভুল ধারণাগুলো দূর করা হয়েছে। এখানে রোযার সীমানা বর্ণনা করা হয়েছে প্রভাতের শ্বেত আভার উদয় থেকে শুরু করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। অন্যদিকে সূর্য ডুবে যাওয়ার পর থেকে নিয়ে প্রভাতের সাদা রেখা জেগে না ওঠা পর্যন্ত সারা রাত পানাহার ও স্ত্রী সম্ভোগ করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। এই সাথে নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেহরী খাওয়ার নিয়মের প্রচলন করেছেন, যাতে প্রভাতের উদয়ের ঠিক পূর্বেই লোকেরা ভালোভাবে পানাহার করে নিতে পারে।
১৯৩
ইসলাম তার ইবাদাত-বন্দেগীর জন্য সময়ের এমন একটি মান নির্ণয় করে দিয়েছে যার ফলে দুনিয়ায় সর্বকালে সকল তামাদ্দুনিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশে লালিত লোকেরা সব দেশে ও সব জায়গায় ইবাদাতের সময় নির্ধারণ করে নিতে সক্ষম হয়। ঘড়ির সাহায্যে সময় নির্ধারণ করার পরিবর্তে আকাশে ও দিগন্তে উদ্ভাসিত সুস্পষ্ট নিদর্শনসমূহের প্রেক্ষিতে সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু অজ্ঞ ও আনাড়ী লোকেরা এই সময় নির্ধারণ পদ্ধতির বিরুদ্ধে সাধারণত এই মর্মে আপত্তি উত্থাপন করেছে যে, উত্তর মেরু ও দক্ষিণ মেরুর সন্নিকটে, যেখানে রাত ও দিন হয় কয়েক মাসের, সেখানে এই সময় নির্ধারণ পদ্ধতি কিভাবে কাজে লাগবে? অথচ অগভীর ভূগোল জ্ঞানের কারণে তাদের মনে এ প্রশ্নের উদয় হয়েছে। আসলে আমরা বিষুব রেখার আশেপাশের এলাকার লোকেরা যে অর্থে দিন ও রাত শব্দ দু’টি বলে থাকি উত্তর মেরু দক্ষিণ মেরু এলাকায় ঠিক সেই অর্থে ছ’মাস রাত ও ছ’মাস দিন হয় না। রাত্রির পালা বা দিনের পালা যাই হোক না কেন, মোট কথা সকাল ও সন্ধ্যার আলামত সেখানে যথারীতি দিগন্তে ফুটে ওঠে এবং তারই প্রেক্ষিতে সেখানকার লোকেরা আমাদেরই মতো নিজেদের ঘুমোবার, জাগবার, কাজকর্ম করার ও বেড়াবার আয়োজন করে থাকে। যে যুগে ঘড়ির ব্যাপক প্রচলন ছিলনা সে যুগেও ফিনল্যাণ্ড, নরওয়ে, গ্রীনল্যাণ্ড ইত্যাদির দেশের লোকেরা নিজেদের সময় অবশ্যি জেনে নিতো। সে আমলে তাদের সময় জানার উপায় ছিল এই দিগন্তের আলামত। কাজেই দুনিয়ার আর সব ব্যাপারে এই আলামতগুলো যেমন তাদের সময় নির্ধারণে সাহায্য করতো তেমনিভাবে নামায, রোযা, সেহরী ও ইফতারের ব্যাপারেও তাদের সময় নির্ধারণ করতে সক্ষম।
১৯৪
রাত পর্যন্ত রোযা পূর্ণ করার অর্থ হচ্ছে, যেখানে রাতের সীমানা শুরু হচ্ছে সেখানে তোমাদের রোযার সীমানা শেষ হয়ে যাচ্ছে। সবাই জানেন, রাতের সীমানা শুরু হয় সূর্যাস্ত থেকে। কাজেই সূর্যাস্তের সাথে সাথেই ইফতার করা উচিত। সেহরী ও ইফতারের সঠিক আলামত হচ্ছে, রাতের শেষ ভাগে যখন পূর্ব দিগন্তে প্রভাতের শুভ্রতার সরু রেখা ভেসে উঠে ওপরের দিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে তখন সেহরীর সময় শেষ হয়ে যায়। আবার যখন দিনের শেষ ভাগে পূর্ব দিগন্ত থেকে রাতের আঁধার ওপরের দিকে উঠতে থাকে তখন ইফতারের সময় হয়। আজকাল লোকেরা সেহরী ও ইফতার উভয় ব্যাপারে অত্যধিক সতর্কতার কারণে কিছু অযথা কড়াকড়ি শুরু করেছে। কিন্তু শরীয়াত ঐ দু’টি সময়ের এমন কোন সীমানা নির্ধারণ করে দেয়নি যে তা থেকে কয়েক সেকেণ্ড বা কয়েক মিনিট এদিক ওদিক হয়ে গেলে রোযা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। প্রভাত কালে রাত্রির কালো বুক চিরে প্রভাতের সাদা রেখা ফুটে ওঠার মধ্যে যথেষ্ট সময়ের অবকাশ রয়েছে। ঠিক প্রভাতের উদয় মুহূর্তে যদি কোন ব্যক্তির ঘুম ভেঙে যায় তাহলে সঙ্গতভাবেই সে তাড়াতাড়ি উঠে কিছু পানাহার করে নিতে পারে। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ যদি তোমাদের কেউ সেহরী খাচ্ছে এমন সময় আযানের আওয়াজ কানে এসে গিয়ে থাকে তাহলে সঙ্গে সঙ্গেই সে যেন আহার ছেড়ে না দেয় বরং পেট ভরে পানাহার করে নেয়। অনুরূপভাবে ইফতারের সময়ও সূর্য অস্ত যাওয়ার পর অযথা দিনের আলো মিলিয়ে যাওয়ার প্রতীক্ষায় বসে থাকার কোন প্রয়োজন নেই। নবী ﷺ সূর্য ডোবার সাথে সাথেই বেলাল রাদিয়াল্লাহু আনহুকে ডেকে বলতেন, আমার শরবত আনো। বেলাল রাদিয়াল্লাহু আনহু বলতেন, হে আল্লাহর রসূল! এখনো তো দিনের আলো ফুটে আছে। তিনি জবাব দিতেন, যখন রাতের আঁধার পূর্বাকাশ থেকে উঠতে শুরু করে তখনই রোযার সময় শেষ হয়ে যায়।
১৯৫
ইতিকাফে বসার মানে হচ্ছে, রমযানের শেষ দশ দিন মসজিদে অবস্থান করা এবং এই দিনগুলোকে আল্লাহর যিকিরের জন্য নির্দিষ্ট করা। এই ইতিকাফে থাকা অবস্থায় নিজের মানবিক ও প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূর্ণ করার জন্য মসজিদের বাইরে যাওয়া যায় কিন্তু যৌন স্বাদ আস্বাদন করা থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ দূরে রাখা একান্ত অপরিহার্য।
১৯৬
এই সীমারেখাগুলো অতিক্রম করার কথা বলা হয়নি বরং বলা হয়েছে, এগুলোর ধারে কাছেও যেয়ো না। এর অর্থ হচ্ছে, যেখান থেকে গোনাহের সীমানা শুরু হচ্ছে ঠিক সেই শেষ প্রান্তে সীমানা লাইন বরাবর ঘোরাফেরা করা বিপদজ্জনক। সীমান্ত থেকে দূরে থাকাই নিরাপদ ব্যবস্থা। কারণ সীমান্ত বরাবর ঘোরাফেরা করলে ভুলেও কখনো সীমান্তের ওপারে পা চলে যেতে পারে। তাই এ ব্যাপারে নবী ﷺ বলেছেনঃ
لِكُلِّ مَلِكٍ حِمًى وَإِنَّ حِمَى اللَّهِ مَحَارِمُهُ فَمَن رتَعَ حَوْلَ الْحِمَى يُوشِكُ أَنْ يَّقِعَ فِيهِ
“প্রত্যেক বাদশাহর একটি ‘হিমা’ থাকে। আর আল্লাহর হিমা হচ্ছে তাঁর নির্ধারিত হারাম বিষয়গুলো। কাজেই যে ব্যক্তি হিমার চারদিকে ঘুরে বেড়ায় তার হিমার মধ্যে পড়ে যাবার আশঙ্কাও রয়েছে।”
আরবী ভাষায় “হিমা” বলা হয় এমন একটি চারণক্ষেত্রকে যাকে কোন নেতা বা বাদশাহ সাধারণ মানুষের মধ্যে নিষিদ্ধ করে দেন। এই উপমাটি ব্যবহার করে নবী ﷺ বলছেন, প্রত্যেক বাদশাহর একটি হিমা আছে আর আল্লাহর হিমা হচ্ছে তাঁর সেই সীমানাগুলো যার মাধ্যমে তিনি হালাল ও হারাম এবং আনুগত্য ও অবাধ্যতার পার্থক্য সৃষ্টি করেছেন। যে পশু ‘হিমার’ (বেড়া) চারপাশে চরতে থাকে একদিন সে হয়তো হিমার মধ্যেও ঢুকে পড়তে পারে। দুঃখের বিষয় শরীয়াতের মৌল প্রাণসত্ত্বা সম্পর্কে অনবহিত লোকেরা সবসময় অনুমতির শেষ সীমায় চলে যাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করে থাকে। আবার অনেক আলেম ও মাশায়েখ এই বিপজ্জনক সীমানায় তাদের ঘোরাফেরা করতে দেয়ার উদ্দেশ্যে দলীল প্রমাণ সংগ্রহ করে অনুমতির শেষ সীমা তাদেরকে জানিয়ে দেয়ার কাজ করে যেতে থাকে। অথচ অনুমতির এই শেষ সীমায় আনুগত্য ও অবাধ্যতার মধ্যে মাত্র চুল পরিমাণ ব্যবধান থেকে যায়। এরই ফলে আজ অসংখ্য লোক গোনাহ এবং তার থেকে অগ্রসর হয়ে গোমরাহীতে লিপ্ত হয়ে চলেছে। কারণ ঐ সমস্ত সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম সীমান্ত রেখার মধ্যে পার্থক্য করা এবং তাদের কিনারে পৌঁছে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ কথা নয়।
অধিকাংশ তাফসীরবিদ এর ব্যাখ্যা এই করেছেন যে, স্ত্রীর সাথে সহবাসকালে সেই সন্তান লাভের নিয়ত থাকা চাই, যা আল্লাহ তাআলা তাকদীরে লিখে রেখেছেন। কোনও কোনও মুফাসসির এই ব্যাখ্যাও করেছেন যে, সহবাসকালে কেবল সেই আনন্দই কামনা করা চাই যা আল্লাহ তাআলা জায়েয করেছেন। যে-কোন নাজায়েয পন্থা তথা বিকৃত ও স্বভাব-বিরুদ্ধ পন্থা পরিহার করা অবশ্য কর্তব্য।
১৮৭. সিয়ামের রাতে তোমাদের জন্য স্ত্রী-সম্ভোগ বৈধ করা হয়েছে(১)। তারা তোমাদের পোষাকস্বরুপ এবং তোমরাও তাদের পোষাকস্বরুপ। আল্লাহ জানেন যে, তোমরা নিজদের সাথে খিয়নত কর ছিলে। সুতরাং তিনি তোমাদের তাওবা কবুল করেছেন এবং তোমাদেরকে মার্জনা করেছেন। কাজেই এখন তোমরা তাদের সাথে সংগত হও এবং আল্লাহ যা তোমাদের জন্য বিধিবদ্ধ করেছেন তা কামনা কর। আর তোমরা পানাহার কর যতক্ষণ রাতের কালোরেখা থেকে উষার সাদা রেখা স্পষ্টরূপে তোমাদের নিকট প্রকাশ না হয়(২)। তারপর রাতের আগমন পর্যন্ত সিয়াম পূর্ণ কর। আর তোমরা মসজিদে ইতিকাফরত(৩) অবস্থায় তাদের সাথে সংগত হয়ো না। এগুলো আল্লাহর সীমারেখা। কাজেই এগুলোর নিকটবর্তী হয়ে না(৪)। এভাবে আল্লাহ তার আয়াতসমূহ মানুষদের জন্য সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেন, যাতে তারা তাকওয়ার অধিকারী হতে পারে।
(১) যে বিষয়টিকে এ আয়াত দ্বারা হালাল করা হয়েছে, তা ইতঃপূর্বে হারাম ছিল। বিভিন্ন হাদীসে উল্লেখিত হয়েছে যে, প্রথম যখন রমাদানের সাওম ফরয করা হয়েছিল, তখন ইফতারের পর থেকে শয্যগ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত খানা-পিনা ও স্ত্রী সহবাসের অনুমতি ছিল। একবার শয্যাগ্রহণ করে ঘুমিয়ে পড়ার সাথে সাথেই এ সবকিছু হারাম হয়ে যেত। কোন কোন সাহাবী এ ব্যাপারে অসুবিধায় পড়েন। কায়েস ইবনে সিরমাহ আনসারী নামক জনৈক সাহাবী একবার সমগ্র দিন কঠোর পরিশ্রম করে ইফতারের সময় ঘরে এসে দেখেন, ঘরে খাওয়ার মত কোন কিছুই নেই। স্ত্রী বললেন, একটু অপেক্ষা করুন, আমি কোথাও থেকে কিছু সংগ্রহ করে আনার চেষ্টা করি। স্ত্রী যখন কিছু খাদ্য সংগ্রহ করে ফিরে এলেন তখন সারাদিনের পরিশ্রমের ক্লান্তিতে তিনি ঘুমিয়ে পড়েছেন। ইফতারের পর ঘুমিয়ে পড়ার দরুন খানা-পিনা তার জন্য হারাম হয়ে যায়। ফলে পরদিন তিনি এ অবস্থাতেই সাওম পালন করেন। কিন্তু দুপুর বেলায় শরীর দুর্বল হয়ে তিনি বেহুশ হয়ে পড়ে যান। (বুখারী: ১৯১৫)
অনুরূপভাবে কোন কোন সাহাবী গভীর রাতে ঘুম ভাঙ্গার পর স্ত্রীদের সাথে সহবাসে লিপ্ত হয়ে মানসিক কষ্টে পতিত হন। এসব ঘটনার পর এ আয়াত নাযিল হয়, যাতে পূর্ববর্তী হুকুম রহিত করে সূর্যাস্তের পর থেকে শুরু করে সুবহে-সাদিক উদিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সমগ্র রাতেই খানা-পিনা ও স্ত্রী সহবাস বৈধ করা হয়েছে। ঘুমাবার আগে কিংবা ঘুম থেকে উঠার পর সম্পর্কে কোন বাধ্যবাধকতাই এতে আর অবশিষ্ট রাখা হয়নি। এমনকি হাদীস অনুযায়ী শেষরাতে সেহরী খাওয়া সুন্নাত সাব্যস্ত করা হয়েছে। আলোচ্য আয়াতে এ সম্পর্কিত নির্দেশই প্রদান করা হয়েছে।
(২) আয়াতে রাতের অন্ধকারকে কালো রেখা এবং ভোরের আলো ফোটাকে সাদা রেখার সাথে তুলনা করে সাওমের শুরু এবং খানা-পিনা হারাম হওয়ার সঠিক সময়টি বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। অধিকন্তু এ সময়-সীমার মধ্যে কম-বেশী হওয়ার সম্ভাবনা যাতে না থাকে সে জন্য (حَتَّىٰ يَتَبَيَّنَ) শব্দটিও যোগ করে দেয়া হয়েছে। এতে সুস্পষ্টভাবে বলে দেয়া হয়েছে যে, সন্দেহপ্রবণ লোকদের ন্যায় সুবহে-সাদিক দেখা দেয়ার আগেই খানা-পিনা হারাম মনে করো না অথবা এমন অসাবধানতাও অবলম্বন করো না যে, সুবহে-সাদিকের আলো ফোটার পরও খানা-পিনা করতে থাকবে। বরং খানা-পিনা এবং সাওমের মধ্যে সুবহে-সাদিকের উদয় সঠিকভাবে নির্ণয়ই হচ্ছে সীমারেখা। এ সীমারেখা উদয় হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত খানা-পিনা বন্ধ করা জরুরী মনে করা যেমন জায়েয নয়, তেমনি সুবহে-সাদিক উদয় হওয়ার ব্যাপারে ইয়াকীন হয়ে যাওয়ার পর খানা-পিনা করাও হারাম এবং সাওম নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণ, তা এক মিনিটের জন্য হলেও। সুবহে-সাদিক উদয় হওয়া সম্পর্কে ইয়াকীন হওয়া পর্যন্তই সেহরীর শেষ সময়। (মা'আরিফুল কুরআন)
(৩) ইতিকাফ-এর শাব্দিক অর্থ কোন এক স্থানে অবস্থান করা। কুরআন-সুন্নাহর পরিভাষায় কতগুলো বিশেষ শর্তসাপেক্ষে একটা নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে নির্দিষ্ট মসজিদে অবস্থান করাকে ইতিকাফ বলা হয়। জামাআত হয় এমন যে কোন মসজিদেই ইতেকাফ হতে পারে। ইতিকাফের অবস্থায় খানা-পিনার হুকুম সাধারণত সাওম পালনকারীদের প্রতি প্রযোজ্য নির্দেশেরই অনুরূপ। তবে স্ত্রী সহবাসের ব্যাপারে এ অবস্থায় পৃথক নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে যে, ইতিকাফ অবস্থায় এটা রাতের বেলায়ও জায়েয নয়।
(৪) অর্থাৎ সাওমের মধ্যে খানা-পিনা এবং স্ত্রী সহবাস সম্পর্কিত যেসব নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, এগুলো আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সীমারেখা, এর ধারে-কাছেও যেও না। কেননা, কাছে গেলেই সীমালংঘনের সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে। একই কারণে সাওম অবস্থায় কুলি করতে বাড়াবাড়ি করা, যদ্দরুন গলার ভেতর পানি প্রবেশ করতে পারে; মুখের ভেতর কোন ঔষধ ব্যবহার করা, এসব ব্যাপার অসাবধানতা এবং শৈথিল্য প্রদর্শন আল্লাহর এ নির্দেশের পরিপন্থী। তাই সীমান্ত থেকে দূরে থাকাই নিরাপদ ব্যবস্থা। কারণ, ঐ সমস্ত সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম সীমান্ত রেখার মধ্যে পার্থক্য করা এবং তাদের কিনারে পৌছে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ কথা নয়। এ ব্যাপারে সাবধান করে রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “প্রত্যেক বাদশারই একটি সংরক্ষিত এলাকা রয়েছে। আল্লাহর সে সংরক্ষিত এলাকা হল, তার নির্ধারিত হারাম বিষয়সমূহ। যে ব্যক্তি এর চারদিকে ঘুরে বেড়ায় সে উক্ত সংরক্ষিত এলাকার মধ্যে পড়ে যাওয়ার আশং রয়েছে।” (মুসলিমঃ ২৬৮১)
(১৮৭) রোযার রাতে তোমাদের জন্য স্ত্রী-সম্ভোগ বৈধ করা হয়েছে। তারা তোমাদের পোশাক এবং তোমরা তাদের পোশাক। আল্লাহ জানতেন যে, তোমরা আত্মপ্রতারণা করছ। তাই তো তিনি তোমাদের প্রতি সদয় হয়েছেন এবং তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করেছেন। অতএব এখন তোমরা তোমাদের পত্নীদের সঙ্গে সহবাস করতে পার এবং আল্লাহ তোমাদের জন্য যা (সন্তান) লিখে রেখেছেন, তা কামনা কর। আর তোমরা পানাহার কর; যতক্ষণ কালো সুতা (রাতের কালো রেখা) হতে ঊষার সাদা সুতা (সাদা রেখা) স্পষ্টরূপে তোমাদের নিকট প্রতিভাত না হয়।(1) অতঃপর রাত্রি পর্যন্ত রোযা পূর্ণ কর।(2) আর তোমরা মসজিদে ‘ইতিকাফ’ রত অবস্থায় স্ত্রী সহবাস করো না।(3) এগুলি আল্লাহর সীমারেখা; সুতরাং এর ধারে-পাশে যেও না। এভাবে আল্লাহ মানুষের জন্য তাঁর নিদর্শনাবলী সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেন, যাতে তারা সাবধান হয়ে চলতে পারে।
(1) ইসলামের প্রাথমিক পর্যায়ে একটি নির্দেশ এ রকম ছিল যে, রোযার ইফতারী করার পর থেকে এশার নামায অথবা ঘুমিয়ে পড়া পর্যন্ত পানাহার এবং স্ত্রীর-সহবাস করার অনুমতি ছিল। ঘুমিয়ে গেলে এগুলোর কোনটাই করা যেত না। পরিষ্কার কথা যে, মুসলিমদের জন্য এই বাধ্য-বাধকতা বড়ই কঠিন ছিল এবং এর উপর আমলও বড় কষ্টকর ছিল। মহান আল্লাহ উক্ত আয়াতে এই দুটি নিষেধাজ্ঞাই উঠিয়ে নিয়ে ইফতারী থেকে ফজর উদয় হওয়ার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত পানাহার এবং স্ত্রীর সাথে যৌনক্ষুধা নিবারণের অনুমতি দান করলেন। الرَّفَث এর অর্থ, স্ত্রীর সাথে সহবাস করা। الخيط الأبيض (সাদা সুতা বা ভোরের সাদা রেখা)এর অর্থ, সুবহে সাদেক এবং الخيط الأسود (কাল সুতা বা রেখা)এর অর্থ, রাত। (ইবনে কাসীর)
মাসআলাঃ এ থেকে এ কথাও প্রতীয়মান হয় যে, অপবিত্র অবস্থায় রোযা রাখা যায়। কেননা, ফজর পর্যন্ত মহান আল্লাহ সহবাস ইত্যাদির অনুমতি দিয়েছেন এবং সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হাদীস দ্বারাও এর সমর্থন হয়। (ইবনে কাসীর)
(2) অর্থাৎ, রাত (শুরু) হওয়ার সাথে সাথেই (সূর্যাস্তের পর পরই) ইফতারী করে নাও, দেরী করো না। হাদীসেও রোযা তাড়াতাড়ি ইফতারী করার তাকীদ ও ফযীলতের কথা এসেছে। আর দ্বিতীয় নির্দেশ হল, ‘বিসাল’ (একটানা রোযা) করো না। অর্থাৎ, একদিন রোযা রেখে ইফতারী না করে (এবং সেহরীও না খেয়ে) পরের দিনও রোযা রেখো না। নবী করীম (সাঃ)ও এ রোযা রাখতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। (হাদীস গ্রন্থসমূহ দ্রষ্টব্য)
(3) ইতিক্বাফ অবস্থায় স্ত্রী-সঙ্গম ও তার সাথে কোন প্রকার যৌনাচার করার অনুমতি নেই। হ্যাঁ, দেখা-সাক্ষাৎ ও কথাবার্তা জায়েয। {عَاكِفُوْنَ فِي الْمَسَاجِدِ} থেকে সাব্যস্ত করা হয়েছে যে, ইতিক্বাফের জন্য মসজিদে অবস্থান জরুরী। তাতে সে পুরুষ হোক অথবা মহিলা। নবী করীম (সাঃ)-এর পবিত্রা স্ত্রীগণও মসজিদে ইতিক্বাফ করতেন। কাজেই মহিলাদের নিজেদের ঘরে ইতিক্বাফে বসা ঠিক নয়। অবশ্য মসজিদে তাদের জন্য পুরুষ থেকে পৃথকভাবে প্রত্যেক জিনিসের ব্যবস্থা থাকা জরুরী। যাতে পুরুষদের সাথে কোন প্রকারের মেলামেশা না ঘটে। যতক্ষণ পর্যন্ত মসজিদে মহিলাদের জন্য পুরুষদের থেকে পৃথকভাবে উপযুক্ত ও সুরক্ষিত ব্যবস্থা না করা যাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদেরকে মসজিদে ইতিক্বাফে বসতে না দেওয়াই উচিত হবে এবং মহিলাদেরও উচিত, তারা যেন এ ব্যাপারে জেদ না ধরে। এটা কেবল একটি নফল ইবাদত, তাই সম্পূর্ণরূপে হেফাযতের ব্যবস্থা না থাকলে এই নফল ইবাদত ত্যাগ করাই ভাল। ফিকহের মূলনীতি হল, কল্যাণ আনয়নের উপর অকল্যাণ নিবারণকে প্রাধান্য দিতে হবে।