وَعَلَى ٱللَّهِ قَصۡدُ ٱلسَّبِيلِ وَمِنۡهَا جَآئِرٞۚ وَلَوۡ شَآءَ لَهَدَىٰكُمۡ أَجۡمَعِينَ

ওয়া ‘আলাল্লা-হি কাসদুছছাবীলি ওয়া মিনহা-জাইরুওঁ ওয়া লাও শাআ লাহাদা-কুম আজমা‘ঈন।উচ্চারণ

আর যেখানে বাঁকা পথও রয়েছে সেখানে সোজা পথ দেখাবার দায়িত্ব আল্লাহর ওপরই বর্তেছে। তিনি চাইলে তোমাদের সবাইকে সত্য-সোজা পথে পরিচালিত করতেন। ১০ তাফহীমুল কুরআন

সরল পথ দেখানোর দায়িত্ব আল্লাহ তাআলার। আর আছে বহু বাঁকা পথ। তিনি চাইলে তোমাদের সকলকে সরল পথে পরিচালিত করতেন। মুফতী তাকী উসমানী

সরল পথ আল্লাহর কাছে পৌঁছায়, কিন্তু পথগুলির মধ্যে বক্র পথও রয়েছে। তিনি ইচ্ছা করলে তোমাদের সকলকেই সৎ পথে পরিচালিত করতেন।মুজিবুর রহমান

সরল পথ আল্লাহ পর্যন্ত পৌছে এবং পথগুলোর মধ্যে কিছু বক্র পথও রয়েছে। তিনি ইচ্ছা করলে তোমাদের সবাইকে সৎপথে পরিচালিত করতে পারতেন।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

সরল পথ আল্লাহ্ র কাছে পৌঁছায়, কিন্তু পথগুলির মধ্যে বক্র পথও আছে। তিনি ইচ্ছা করলে তোমাদের সকলকেই সৎপথে পরিচালিত করতেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশন

আর সঠিক পথ বাতলে দেয়া আল্লাহর দায়িত্ব, এবং পথের মধ্যে কিছু আছে বক্র। আর তিনি যদি ইচ্ছা করতেন তবে তোমাদের সকলকে হিদায়াত করতেন।আল-বায়ান

আল্লাহরই দায়িত্বে রয়েছে সরল পথপ্রদর্শন। পথগুলোর মধ্যে বাঁকা পথও আছে। তিনি যদি ইচ্ছে করতেন তাহলে অবশ্যই তোমাদের সকলকেই সঠিক পথ প্রদর্শন করতেন।তাইসিরুল

আর আল্লাহ্‌র উপরেই রয়েছে সরলপথ, আর তাদের কতক হচ্ছে বাঁকা। আর তিনি যদি ইচ্ছা করতেন তবে তিনি তোমাদের সকলকেই সৎপথে পরিচালিত করতে পারতেন।মাওলানা জহুরুল হক

তাফহীমুল কুরআন

তাওহীদ, রহমত ও রবুবীয়াতের যু্ক্তি পেশ করতে গিয়ে এখানে ইঙ্গিতে নবুওয়াতের পক্ষেও একটি যুক্তি পেশ করা হয়েছে। এ যুক্তির সংক্ষিপ্তসার হচ্ছেঃ দুনিয়ায় মানুষের জন্য চিন্তা ও কর্মের অনেকগুলো ভিন্ন ভিন্ন পথ থাকা সম্ভব এবং কার্যত আছেও। এসব পথ তো আর একই সঙ্গে সত্য হতে পারে না। সত্য একটিই এবং যে জীবনাদর্শটি এ সত্য অনুযায়ী গড়ে ওঠে সেটিই একমাত্র সত্য জীবনাদর্শ। অন্যদিকে কর্মেরও অসংখ্য ভিন্ন ভিন্ন পথ থাকা সম্ভব এবং এ পথগুলোর মধ্যে যেটি সঠিক জীবনাদর্শের ভিত্তিতে পরিচালিত হয় সেটিই একমাত্র সঠিক পথ।

এ সঠিক আদর্শ ও সঠিক কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। বরং এটিই তার আসল মৌলিক প্রয়োজন। কারণ অন্যান্য সমস্ত জিনিস তো মানুষের শুধুমাত্র এমন সব প্রয়োজন পূর্ণ করে যা একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রাণী হওয়ার কারণে তার জন্য অপরিহার্য হয়। কিন্তু এ একটিমাত্র প্রয়োজন শুধুমাত্র মানুষ হবার কারণে তার জন্য অপরিহার্য হয়। এটি যদি পূর্ণ না হয় তাহলে এর মানে দাঁড়ায় এই যে, মানুষের সমস্ত জীবনটাই নিষ্ফল ও ব্যর্থ হয়ে গেছে।

এখন ভেবে দেখো, যে আল্লাহ তোমাদের অস্তিত্বদান করার আগে তোমাদের জন্য এতসব সাজ সরঞ্জাম প্রস্তুত করে রেখেছেন এবং যিনি অস্তিত্ব দান করার পর তোমাদের প্রাণী-জীবনের প্রত্যেকটি প্রয়োজন পূর্ণ করার এমন সূক্ষ্ম ও ব্যাপকতর ব্যবস্থা করেছেন, তোমরা কি তাঁর কাছে এটা আশা করো যে, তিনি তোমাদের মানবিক জীবনের এই সবচেয়ে বড় ও আসল প্রয়োজনটি পূর্ণ করার ব্যবস্থা না করে থাকবেন?

নবুওয়াতের মাধ্যমে এ ব্যবস্থাটিই তো করা হয়েছে। যদি তুমি নবুওয়াত না মানো তাহলে বলো তোমার মতে মানুষের হেদায়েতের জন্য আল্লাহ অন্য কি ব্যবস্থা করেছেন? এর জবাবে তুমি একথা বলতে পারো না যে, পথের সন্ধান করার জন্য আল্লাহ আমাদের বুদ্ধি ও চিন্তাশক্তি দিয়ে রেখেছেন। কারণ মানবিক বুদ্ধি ও চিন্তাশক্তি ইতিপূর্বেই এমন অসংখ্য পথ উদ্ভাবন করে ফেলেছে যা তার সত্য-সরল পথের সঠিক উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে তার ব্যর্থতার সুস্পষ্ট প্রামণ। আবার তুমি একথাও বলতে পারো না যে, আল্লাহ আমাদের পথ দেখাবার কোন ব্যবস্থা করেননি। কারণ আল্লাহর ব্যাপারে এর চেয়ে বড় আর কোন কুধারণা হতেই পারে না যে, প্রাণী হবার দিক দিয়ে তোমাদের প্রতিপালন ও বিকাশ লাভের এতসব বিস্তারিত ও পূর্ণাংগ ব্যবস্থা তিনি করে রেখেছেন অথচ মানুষ হবার দিক দিয়ে তোমাদের একেবারে অন্ধকারের বুকে পথ হারিয়ে উদভ্রান্তের মতো ছুটে বেড়াবার ও পদে পদে ঠোকর খাবার জন্য ছেড়ে দিয়েছেন। (আরো বেশী জানার জন্য সূরা আর রাহমানের ২-৩ টীকা দেখুন)।

১০

অর্থাৎ যদিও আল্লাহ‌ সমস্ত মানুষকে অন্যান্য সকল ক্ষমতাসীন সৃষ্টির মতো জন্মগতভাবে সঠিক পথে পরিচালিত করে নিজের এ দায়িত্বটি (যা তিনি মানুষকে পথ দেখাবার জন্য নিজেই নিজের ওপর আরোপ করে নিয়েছিলেন) পালন করতে পারতেন। কিন্তু এটি তিনি চাননি। তিনি চেয়েছিলেন এমন একটি স্বাধীন ক্ষমতাসম্পন্ন সৃষ্টির উদ্ভব ঘটানো যে নিজের পছন্দ ও বাছ-বিচারের মাধ্যমে সঠিক ও ভ্রান্ত সব রকমের পথে চলার স্বাধীনতা রাখে। এ স্বাধীন ক্ষমত ব্যবহার করার জন্য তাকে জ্ঞানের উপকরণ, বুদ্ধি ও চিন্তার যোগ্যতা এবং ইচ্ছা ও সংকল্পের শক্তি দান করা হয়েছে। তাকে নিজের ভিতরের ও বাইরের অসংখ্য জিনিস ব্যবহার করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। তার ভিতরে ও বাইরে সবদিকে এমন সব অসংখ্য কার্যকারণ ছড়িয়ে রাখা হয়েছে যা তার জন্য সঠিক পথ পাওয়া ও ভুল পথে পরিচালিত হওয়া উভয়টিরই কারণ হতে পারে। যদি তাকে জন্মগতভাবে সঠিক পথানুসারী করে দেয়া হতো তাহলে এসবই অর্থহীন হয়ে যেতো এবং উন্নতির এমন সব উচ্চতম পর্যায়ে পৌঁছানো মানুষের পক্ষে কখনো সম্ভব হতো না, যা কেবলমাত্র স্বাধীনতার সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমেই মানুষ লাভ করতে পারে। তাই মহান আল্লাহ‌ মানুষকে দেখাবার জন্য জোরপূর্বক সঠিক পথে পরিচালিত করার পদ্ধতি পরিহার করে রিসালাতের পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন। এভাবে মানুষের স্বাধীনতা যেমন অক্ষুণ্ণ থাকবে, তেমনি তার পরীক্ষার উদ্দেশ্যও পূর্ণ হবে এবং সত্য-সরল পথ ও সর্বোত্তম যুক্তিসঙ্গত পদ্ধতিতে তার সামনে পেশ করে দেয়া যাবে।

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা মানুষকে যেমন দুনিয়ার পথ পাড়ি দেওয়ার জন্য এসব বাহন সৃষ্টি করেছেন, তেমনি আখেরাতের রূহানী সফরের জন্য তিনি সরল পথ দেখানোর দায়িত্বও গ্রহণ করেছেন। কেননা মানুষ এর জন্য বহু বাঁকা পথ তৈরি করে রেখেছে। তা থেকে রক্ষা করার জন্য আল্লাহ তাআলা নবী-রাসূল পাঠান ও কিতাব নাযিল করেন এবং তাদের মাধ্যমে মানুষকে সরল সোজা পথ দেখিয়ে দেন। তবে কাউকে তিনি জবরদস্তিমূলকভাবে এ পথে পরিচালিত করেন না। ইচ্ছা করলে তাও করতে পারতেন। কিন্তু তা করেন না এজন্য যে, তিনি চান মানুষ তাঁর প্রদর্শিত পথে জবরদস্তিমূলকভাবে নয়; বরং স্বেচ্ছায় ও সজ্ঞানে চলুক। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা নিজ নবী-রাসূলগণের মাধ্যমে মানুষকে পথ দেখানোর ব্যবস্থা করেই ক্ষান্ত হয়েছেন।

তাফসীরে জাকারিয়া

৯. আর সরল পথ আল্লাহর কাছে পৌছায়(১), কিন্তু পথগুলোর মধ্যে বাঁকা পথও আছে(২)। আর তিনি ইচ্ছে করলে তোমাদের সবাইকেই সৎপথে পরিচালিত করতেন।

(১) (قَصْدُ السَّبِيلِ) শব্দের অর্থঃ সরল পথ, মধ্যম পথ। এমন পথ যা উদ্দেশ্যে পৌছে দেয়। (কুরতুবী) এর দ্বারা এখানে ইসলাম, হক্ক পথ বুঝানো হয়েছে। (কুরতুবী) পূর্ববর্তী আয়াতসমূহে দুনিয়ার বাহ্যিক পথসমূহের বর্ণনার পর এ আয়াতে দ্বীনি পথের কথা আলোচনা করা হচ্ছে। দুনিয়াতে যেমন চলার পথ আল্লাহর সৃষ্টি তেমনি আখেরাতের পথে কিভাবে চলতে হবে তাও মহান আল্লাহ শিখিয়ে দিচ্ছেন। তিনি জানাচ্ছেন যে, হক পথ হচ্ছে সেটিই যা আল্লাহর কাছে পৌছায়। (ইবন কাসীর) অন্য আয়াতেও এসেছে, “আল্লাহ বললেন, এটাই আমার কাছে পৌছার সরল পথ।” (সূরা আল হিজর: ৪১) আরও বলেন, “আর এ পথই আমার সরল পথ।

কাজেই তোমরা এর অনুসরণ কর এবং বিভিন্ন পথ অনুসরণ করবে না, করলে তা তোমাদেরকে তার পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করবে। (সূরা আল-আনআমঃ ১৫৩)। অথবা আয়াতের অর্থ, হক পথ বর্ণনা করা আল্লাহর যিম্মায়। তিনি সেটা রাসূল, দলীল-প্রমাণাদির মাধ্যমে বর্ণনা করেন। (কুরতুবী: মুয়াসসার, আত-তাফসীরুস সহীহ) দুনিয়াতে যেমন অনেক পথ আছে কিন্তু সব পথই গন্তব্যস্থানে পৌছাতে পারে না শুধু সে পথই সঠিক গন্তব্যে পৌছাবে যে পথের সন্ধানদাতা সে পথ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত, তেমনিভাবে দ্বীনি ব্যাপারেও অনেকে অনেক পথের দিকে আহবান জানাবে কিন্তু আল্লাহ্ তা'আলার প্রদর্শিত পথ ছাড়া অপরাপর কোন পথই সঠিক গন্তব্যে পৌছাতে সহযোগিতা করতে পারবে না। (সা’দী)

(২) তাওহীদ, রহমত ও রবুবীয়াতের যুক্তি পেশ করতে গিয়ে এখানে ইঙ্গিতে নবুওয়াতের পক্ষেও একটি যুক্তি পেশ করা হয়েছে। এ যুক্তির সংক্ষিপ্তসার হচ্ছেঃ দুনিয়ায় মানুষের জন্য চিন্তা ও কর্মের অনেকগুলো ভিন্ন ভিন্ন পথ থাকা সম্ভব এবং কার্যত আছেও। যেমন, ইয়াহুদীবাদ, নাসারাবাদ, মজুসীবাদ ইত্যাদি। (ইবন কাসীর) এসব পথ তো আর একই সংগে সত্য হতে পারে না। সত্য একটিই বাকীগুলো সঠিক পথ নয়। বরং বাঁকা পথ। সেগুলো দ্বারা আল্লাহর কাছে পৌছা যায় না। আর এসব পথে মানুষ হিদায়াতও পায় না। এসব পথে চলে হক পথে আসাও সম্ভব হয় না। (কুরতুবী)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

(৯) সরল পথের নির্দেশ করা আল্লাহর দায়িত্ব।(1) আর পথগুলির মধ্যে বক্রপথও আছে; তিনি ইচ্ছা করলে তোমাদের সকলকেই সৎপথে পরিচালিত করতেন। (2)

(1) অর্থাৎ, সরল পথ প্রদর্শন করা আল্লাহর দায়িত্ব এবং তিনি তা করেছেন। সুতরাং তিনি হিদায়াত ও ভ্রষ্টতা দু’টিকেই স্পষ্ট করে দিয়েছেন। সেই কারণে পরে বলছেন যে, কিছু পথ হল বক্র, অর্থাৎ বাঁকা ও ভ্রষ্ট।

(2) কিন্তু যেহেতু তাতে মানুষকে বাধ্য করে দেওয়া হত, পরীক্ষা নেওয়ার কোন অর্থ থাকত না, সেই কারণে আল্লাহ নিজ ইচ্ছায় সকলকে বাধ্য করেননি, বরং দুই রাস্তার জ্ঞানদান করে মানুষকে ইচ্ছার স্বাধীনতা দান করেছেন।