আতাআমরুল্লা-হি ফালা-তাছতা‘জিলূহু ছুবহা-নাহূওয়া তা‘আ-লা-‘আম্মাইউশরিকূন।উচ্চারণ
এসে গেছে আল্লাহর ফায়সালা। ১ এখন আর একে ত্বরান্বিত করতে বলো না। পবিত্র তিনি এবং এরা যে শিরক করছে তার ঊর্ধ্বে তিনি অবস্থান করেন। ২ তাফহীমুল কুরআন
আল্লাহর হুকুম এসে গেছে। কাজেই তার জন্য তাড়াহুড়া করো না। তারা যে শিরক করছে, তিনি তা থেকে পবিত্র ও সমুচ্চ।মুফতী তাকী উসমানী
আল্লাহর আদেশ আসবেই; সুতরাং ওটা ত্বরান্বিত করতে চেওনা; তিনি মহিমান্বিত এবং তারা যাকে শরীক করে তিনি তার উর্ধ্বে।মুজিবুর রহমান
আল্লাহর নির্দেশ এসে গেছে। অতএব এর জন্যে তাড়াহুড়া করো না। ওরা যেসব শরীক সাব্যস্ত করছে সেসব থেকে তিনি পবিত্র ও বহু উর্ধ্বে।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
আল্লাহ্ র আদেশ আসবেই; সুতরাং তা ত্বরান্বিত করতে চেয়ো না। তিনি মহিমান্বিত এবং এরা যাকে শরীক করে তিনি তার ঊর্ধ্বে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন
আল্লাহর আদেশ এসে গেছে, সুতরাং তার জন্য তাড়াহুড়া করো না। তিনি পবিত্র এবং তারা যা শিরক করে, তা থেকে ঊর্ধ্বে।আল-বায়ান
আল্লাহর নির্দেশ এসে গেছে, অতএব এর জন্য তাড়াহুড়ো করো না। তিনি মহান পবিত্র, তারা যাকে শরীক সাব্যস্ত করে তাত্থেকে তিনি বহু ঊর্ধ্বে।তাইসিরুল
আল্লাহ্র হুকুম এসেই গেছে, সুতরাং তা ত্বরান্বিত করতে চেয়ো না। সমস্ত মহিমা তাঁরই, আর তারা যা অংশী করে তিনি তার বহু ঊর্ধ্বে।মাওলানা জহুরুল হক
১
অর্থাৎ তা একেবারে আসন্ন হয়ে উঠেছে। তার প্রকাশ ও প্রয়োগের সময় নিকটবর্তী হয়েছে। ব্যাপারটা একেবারেই অবধারিত ও সুনিশ্চিত অথবা একান্ত নিকটবর্তী এ ধারণা দেবার জন্য বাক্যটি অতীতকালের ক্রিয়াপদের সাহায্যে বর্ণনা করা হয়েছে। কিংবা কুরাইশ বংশীয় কাফেরদের সবরের পেয়ালা কানায় কানায় ভরে উঠেছিল এবং শেষ ও চূড়ান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করার সময় এসে গিয়েছিল বলেই অতীতকালের ক্রিয়াপদ দ্বারা একথা বলা হয়েছে।
প্রশ্ন জাগে, এ “ফায়সালা” কি ছিল এবং কোন আকৃতিতে এসেছে? আমরা মনে করি (তবে আল্লাহই সঠিক খবর ভাল জানেন) এ ফায়সালা বলতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মক্কা থেকে হিজরতকে বুঝানো হয়েছে। এ আয়াত নাযিলের কিছুদিন পরেই এ হিজরতের হুকুম দেয়া হয়। কুরআন অধ্যয়নে জানা যায়, যে সমাজে নবীর আগমন ঘটে তাদের অস্বীকৃতি ও প্রত্যাখ্যান একেবারে শেষ সীমানায় পৌঁছে গেলেই নবীকে হিজরতের হুকুম দেয়া হয়। এ হুকুম উল্লেখিত সমাজের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। এরপর হয় তাদের ওপর ধ্বংসাত্মক আযাব এসে যায় অথবা নবী ও তাঁর অনুসারীদের হাত দিয়ে তাদেরকে সমূলে উৎপাটিত করে দেয়া হয়। ইতিহাস থেকেও একথাই জানা যায়। হিজরত সংঘটিত হবার পর মক্কার কাফেররা মনে করলো ফায়সালা তাদের পক্ষেই হয়েছে। কিন্তু আট দশ বছরের মধ্যেই দুনিয়াবাসীরা দেখে নিল, শুধুমাত্র মক্কা থেকেই নয়, সমগ্র আরব ভূখণ্ড থেকেই শিরক ও কুফরীকে শিকড় সুদ্ধ উপড়ে ফেলে দেয়া হয়েছে।
২
প্রথম বাক্য ও দ্বিতীয় বাক্যের পারস্পরিক সম্পর্ক অনুধাবন করার জন্য এর পটভূমি সামনে রাখা প্রয়োজন। কাফেররা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বারবার চ্যালেঞ্জ দিয়ে আসছিল যে, তুমি আল্লাহর যে ফায়সালার কথা বলে আমাদের ভয় দেখিয়ে থাকো তা আসছে না কেন? তাদের এ চ্যালেঞ্জের পিছনে আসলে যে চিন্তাটি সক্রিয় ছিল তা ছিল এই যে, তাদের মুশরিকী ধর্মই সত্য এবং মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খামাখা আল্লাহর নামে একটি ভ্রান্ত ধর্ম পেশ করছেন। আল্লাহ এ ধর্মকে অনুমোদন দান করেননি। তাদের যুক্তি ছিল, আমরা যদি আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে থাকি এবং মুহাম্মাদ ﷺ তাঁর পাঠানো নবী হয়ে থাকেন তাহলে আমরা তাঁর সাথে যে ব্যবহার করছি তাতে আমাদের সর্বনাশ হওয়া উচিত ছিল না কি? কিন্তু তা হচ্ছে না, এটা কেমন করে সম্ভব? তাই আল্লাহর ফায়সালার ঘোষণা দেবার সাথে সাথেই বলা হয়েছে, এ ফায়সালার প্রয়োগ বিলম্বিত হবার যে কারণ তোমরা মনে করছো তা মোটেই সঠিক নয়। আল্লাহর সাথে কারো শরীক হবার প্রশ্নই ওঠে না। তাঁর সত্তা এর অনেক ঊর্ধ্বে এবং এ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র।
আরবী ভাষার বাকরীতি অনুযায়ী এটি অত্যন্ত বলিষ্ঠ বাক্য। ভবিষ্যতে নিশ্চিতভাবেই ঘটবে এরূপ ঘটনাকে আরবীতে অতীত ক্রিয়ায় ব্যক্ত করা হয়ে থাকে। এর শক্তি ও প্রভাব অন্য কোন ভাষায় আদায় করা খুবই কঠিন। এস্থলে যে ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, তার পটভূমি এই, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কাফেরদেরকে বলতেন, কুফর করতে থাকলে তার পরিণামে আল্লাহ তাআলা তোমাদের উপর আযাব নাযিল করবেন এবং মুসলিমদেরকে বিজয়ী করবেন, তখন তারা ঠাট্টাচ্ছলে বলত, আল্লাহ তাআলা যদি আযাব নাযিল করেনই, তবে তাকে বলুন যেন এখনই তা নাযিল করেন। এই বলে তারা বোঝাতে চাচ্ছিল, শাস্তির শাসানি ও মুসলিমদের জয়লাভের প্রতিশ্রুতি তাঁর মনগড়া কথা, এর কোন বাস্তবতা নেই (নাউযুবিল্লাহ)। তাদের সে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের উত্তর দ্বারাই সূরাটির সূচনা হয়েছে। বলা হয়েছে, কাফেরদের বিরুদ্ধে প্রেরিতব্য শাস্তি ও মুসলিমদের জয়লাভের যে সংবাদকে তোমরা অসম্ভব মনে করছ, প্রকৃতপক্ষে তা আল্লাহ তাআলার অনড় ফায়সালা এবং তা এতটা নিশ্চিত, যেন তা ঘটেই গেছে। সুতরাং তোমরা তার আগমনের জন্য তাড়া দেখানোর ছলে তার প্রতি ব্যঙ্গ প্রদর্শন করো না। কেননা তা তোমাদের মাথার উপর খাড়া রয়েছে। পরবর্তী বাক্যে এ শাস্তির অবশ্যম্ভাবী হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, তোমরা আল্লাহ তাআলার সাথে অন্যকে শরীক করে থাক। অথচ আল্লাহ তাআলা যে কোনও রকমের অংশীদারিত্ব থেকে কেবল পবিত্রই নন, বরং তিনি তার বহু উর্ধ্বে। সুতরাং কাউকে তাঁর শরীক সাব্যস্ত করা তাঁর প্রতি চরম অমর্যাদা প্রকাশের নামান্তর। বিশ্ব-জগতের সৃষ্টিকর্তাকে অসম্মান করার অনিবার্য পরিণাম তো এটাই যে, যে ব্যক্তি তাঁকে অসম্মান করবে তার উপর আযাব পতিত হবে। (তাফসীরুল মাহাইমী, ১ম খণ্ড, ৪০২ পৃষ্ঠা)
১. আল্লাহর(১) আদেশ আসবেই(২); কাজেই তা(৩) তাড়াতাড়ি পেতে চেয়ো না। তিনি মহিমান্বিত এবং তারা যা শরীক করে তিনি তা থেকে ঊর্ধ্বে(৪)।
(১) এ সূরা নাহ্লকে বিশেষ কোন ভূমিকা ছাড়াই কঠোর শাস্তির সতর্কবাণী ও ভয়াবহ বিষয়বস্তু দ্বারা শুরু করা হয়েছে। এর কারণ ছিল মুশরিকদের এই উক্তি যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে কেয়ামত ও আযাবের ভয় দেখায় এবং বলে যে, আল্লাহ তা'আলা তাকে জয়ী করা এবং বিরোধীদেরকে শাস্তি দেয়ার ওয়াদা করেছেন। আমাদের তো এরূপ কিছু ঘটবে বলে মনে হয় না। এর উত্তরে বলা হয়েছেঃ আল্লাহর নির্দেশ এসে গেছে। তোমরা তাড়াহুড়া করো না। (দেখুন, আত-তাহরীর ওয়াত তানওয়ীর)
(২) অর্থাৎ তা একেবারে আসন্ন হয়ে উঠেছে। তার প্রকাশ ও প্রয়োগের সময় নিকটবর্তী হয়েছে। ব্যাপারটা একেবারেই অবধারিত ও সুনিশ্চিত অথবা একান্ত নিকটবর্তী এ ধারণা দেবার জন্য ব্যাক্যটি অতীতকালের ক্রিয়াপদের সাহায্যে বর্ণনা করা হয়েছে। (আদওয়াউল বায়ান; আত-তাহরীর ওয়াত তানওয়ীর) তবে এ “আদেশ বা ফায়সালা” কি ছিল এবং কোন আকৃতিতে এসেছে? এ ব্যাপারে বিভিন্ন মত আছেঃ
* কোন কোন মুফাসসির বলেন যে, এখানে ‘আল্লাহর নির্দেশ’ বলে কেয়ামত বোঝানো হয়েছে। এর এসে যাওয়ার অর্থও এই যে, আসা অতি নিকটবর্তী। সমগ্র জগতের বয়সের দিক দিয়ে দেখলে কেয়ামতের নিকটবর্তী হওয়া কিংবা এসে পৌছাও দূরবর্তী কোন বিষয় নয়। অথবা, তা অবশ্যম্ভাবী হওয়ার কারণে অতীতকালের পদ ব্যবহার করা হয়েছে। অন্য আয়াতেও বলা হয়েছে, “মানুষের হিসেব-নিকেশের সময় আসন্ন, কিন্তু তারা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে রয়েছে।” (সূরা আল-আম্বিয়া: ১) আরও এসেছে, “কিয়ামত কাছাকাছি হয়েছে, আর চাঁদ বিদীর্ণ হয়েছে” (সূরা আল-কামারঃ ১) (ইবন কাসীর)
* কোন কোন মুফাসসির বলেনঃ ‘আল্লাহর নির্দেশ’ বলে এখানে আল্লাহর আদেশ নিষেধ সম্পর্কিত, হালাল হারাম সম্বলিত বিধানাবলী বোঝানো হয়েছে। (কুরতুবী)
* কোন কোন মুফাসসির বলেনঃ এখানে ‘আল্লাহর নির্দেশ’ বলে তাদের উপর যে শাস্তি আসার কথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে ভয় প্রদর্শন করাতেন তা বুঝানো হয়েছে। আযাবের ব্যাপারে কুরাইশ বংশীয় কাফেরদের সবরের পেয়ালা কানায় ভরে উঠেছিল এবং শেষ ও চূড়ান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করার সময় এসে গিয়েছিল বলেই অতীতকালের ক্রিয়াপদ দ্বারা একথা বলা হয়েছে। (কুরতুবী; ফাতহুল কাদীর)
(৩) কাফের মুশরিকগণের চিরাচরিত নিয়ম ছিল যে, তারা আল্লাহর আযাবকে কামনা করত, তারা ভাবত যে আল্লাহর আযাব যদি আসবে তবে আসে না কেন? কিন্তু আল্লাহর নিয়ম হলো, তিনি কোন জাতিকে ধ্বংস করার পূর্বে তাকে প্রচুর সময় দেন। এ ব্যাপারটি আল্লাহ তা'আলা অন্যান্য আয়াতেও উল্লেখ করেছেন। (দেখুন, সূরা আল-আনকাবুতঃ ৫৩, ৫৪) (ইবন কাসীর)
(৪) এখানে তাদের শির্ক বলতে, তারা যে আযাব তাড়াতাড়ি চাচ্ছিল, অথবা কিয়ামত তাড়াতাড়ি চাচ্ছিল তা-ই বোঝানো হয়েছে। কেননা এর দ্বারা তারা মূলত: আল্লাহর ওয়াদাকে ভ্রান্ত সাব্যস্ত করেছে, এটা কুফর ও শির্ক। তারা মনে করছে যে, আল্লাহ এটা করতে সম্ভব নন। তিনি সেটা করতে পারবে না। আর অপারগতা মূলত: বান্দাদের গুণ। বান্দাদের গুণকে আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা শির্ক। এ হিসেবে তারা শির্কে লিপ্ত হয়েছিল। (ফাতহুল কাদীর) নতুবা আল্লাহর সাথে কারো শরীক হবার প্রশ্নই ওঠে না। তাঁর সত্তা এর অনেক ঊর্ধ্বে এবং এ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র। মোটকথাঃ তারা যে শির্ক করছে আল্লাহ্ তা'আলা তা থেকে পবিত্র। একটি কঠোর সতর্কবাণীর মাধ্যমে তাওহীদের দাওয়াত দেয়া এই আয়াতের সারমর্ম।
(১) আল্লাহর আদেশ আসবেই;(1) সুতরাং তোমরা তা ত্বরান্বিত করতে চেয়ো না। তিনি মহিমার্নিত এবং ওরা যাকে অংশী করে তিনি তার উর্ধে।
(1) আদেশ বলতে কিয়ামতকে বুঝানো হয়েছে, অর্থ কিয়ামত নিকটবর্তী যাকে তোমরা দূর মনে কর। অতএব তোমরা এ ব্যাপারে তাড়াহুড়ো করো না। অথবা সেই আযাবকে বুঝানো হয়েছে যা মুশরিকরা চাইত। এ কথাটি ভবিষ্যৎকালের ক্রিয়ার পরিবর্তে অতীতকালের ক্রিয়া দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে, যেহেতু তার আগমনে কোন সন্দেহ নেই।