يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ كُتِبَ عَلَيۡكُمُ ٱلۡقِصَاصُ فِي ٱلۡقَتۡلَىۖ ٱلۡحُرُّ بِٱلۡحُرِّ وَٱلۡعَبۡدُ بِٱلۡعَبۡدِ وَٱلۡأُنثَىٰ بِٱلۡأُنثَىٰۚ فَمَنۡ عُفِيَ لَهُۥ مِنۡ أَخِيهِ شَيۡءٞ فَٱتِّبَاعُۢ بِٱلۡمَعۡرُوفِ وَأَدَآءٌ إِلَيۡهِ بِإِحۡسَٰنٖۗ ذَٰلِكَ تَخۡفِيفٞ مِّن رَّبِّكُمۡ وَرَحۡمَةٞۗ فَمَنِ ٱعۡتَدَىٰ بَعۡدَ ذَٰلِكَ فَلَهُۥ عَذَابٌ أَلِيمٞ

ইয়াআইয়ূহাল্লাযীনা আ-মানূ কুতিবা ‘আলাইকুমুল কিসা-সু ফিলকাতলা- আলহুররু বিলহুররি ওয়াল ‘আবদু বিল‘আবদি ওয়াল উনছা-বিলউনছা-ফামান ‘উফিয়া লাহু মিন আখীহি শাইউন ফাত্তিবা-‘উম বিলমা‘রূফি ওয়া আদাউন ইলাইহি বিইহছানিন যা-লিকা তাখফীফুম মিররব্বিকুম ওয়া রহমাতুন ফামানি‘তাদা-বা‘দা যা-লিকা ফালাহু ‘আযা-বুন আলীম।উচ্চারণ

হে ঈমানদারগণ! তোমাদের জন্য হত্যার ব্যাপারে কিসাসের বিধান লিখে দেয়া হয়েছে। ১৭৬ স্বাধীন ব্যক্তি হত্যা করে থাকলে তার বদলায় ঐ স্বাধীন ব্যক্তিকেই হত্যা করা হবে, দাস হত্যাকারী হলে ঐ দাসকেই হত্যা করা হবে, আর নারী এই অপরাধ সংঘটিত করলে সেই নারীকে হত্যা করেই এর কিসাস নেয়া হবে। ১৭৭ তবে কোন হত্যাকারীর সাথে তার ভাই যদি কিছু কোমল ব্যবহার করতে প্রস্তুত হয়, ১৭৮ তাহলে প্রচলিত পদ্ধতি অনুযায়ী ১৭৯ রক্তপণ দানের ব্যবস্থা হওয়া উচিত এবং সততার সঙ্গে রক্তপণ আদায় করা হত্যাকারীর জন্য অপরিহার্য। এটা তোমাদের রবের পক্ষ থেকে দন্ড হ্রাস ও অনুগ্রহ। এরপরও যে ব্যক্তি বাড়াবাড়ি করবে ১৮০ তার জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। তাফহীমুল কুরআন

হে মুমিনগণ! যাদেরকে (ইচ্ছাকৃত অন্যায়ভাবে) হত্যা করা হয়েছে, তাদের ব্যাপারে তোমাদের প্রতি কিসাস (-এর বিধান) ফরয করা হয়েছে- স্বাধীন ব্যক্তির বদলে স্বাধীন ব্যক্তি, গোলামের বদলে গোলাম, নারীর বদলে নারী (-কেই হত্যা করা হবে)। #%১২৩%# অতঃপর হত্যাকারীকে যদি তার ভাই (নিহতের অলি)-এর পক্ষ হতে কিছুটা ক্ষমা করা হয়, #%১২৪%# তবে ন্যায়ানুগভাবে (রক্তপণ) দাবী করার অধিকার (অলির) আছে। আর উত্তমরূপে তা আদায় করা (হত্যাকারীর) কর্তব্য। এটা তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে এক লঘুকরণ এবং একটি রহমত। এরপরও কেউ সীমালংঘন করলে সে যন্ত্রণাময় শাস্তির উপযুক্ত। #%১২৫%#মুফতী তাকী উসমানী

হে বিশ্বাস স্থাপনকারীগণ! নিহতদের সম্বন্ধে তোমাদের জন্য প্রতিশোধ গ্রহণ বিধিবদ্ধ করা হল; স্বাধীনের পরিবর্তে স্বাধীন, দাসের পরিবর্তে দাস এবং নারীর পরিবর্তে নারী। কিন্তু যদি কেহ তার ভাই কর্তৃক কোন বিষয়ে ক্ষমা প্রাপ্ত হয় তাহলে যেন ন্যায় সঙ্গতভাবে পাওনা সাব্যস্ত করা হয় এবং সদ্ভাবে তা পরিশোধ করে। এটা তোমাদের রবের পক্ষ হতে লঘু বিধান ও করুণা; অতঃপর যে কেহ সীমা লংঘন করবে তার জন্য যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি রয়েছে।মুজিবুর রহমান

হে ঈমানদারগন! তোমাদের প্রতি নিহতদের ব্যাপারে কেসাস গ্রহণ করা বিধিবদ্ধ করা হয়েছে। স্বাধীন ব্যক্তি স্বাধীন ব্যক্তির বদলায়, দাস দাসের বদলায় এবং নারী নারীর বদলায়। অতঃপর তার ভাইয়ের তরফ থেকে যদি কাউকে কিছুটা মাফ করে দেয়া হয়, তবে প্রচলিত নিয়মের অনুসরণ করবে এবং ভালভাবে তাকে তা প্রদান করতে হবে। এটা তোমাদের পালনকর্তার তরফ থেকে সহজ এবং বিশেষ অনুগ্রহ। এরপরও যে ব্যাক্তি বাড়াবাড়ি করে, তার জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক আযাব।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

হে মু’মিনগণ! নিহতদের ব্যাপারে তোমাদের জন্যে কিসাসের বিধান দেওয়া হয়েছে। স্বাধীন ব্যক্তির বদলে স্বাধীন ব্যক্তি, ক্রীতদাসের বদলে ক্রীতদাস ও নারীর বদলে নারী, কিন্তু তার ভাইয়ের পক্ষ হতে কিছুটা ক্ষমা প্রদর্শন করা হলে যথাযথ বিধির অনুসরণ করা ও সততার সঙ্গে তার দেয় আদায় বিধেয়। এটা তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে ভার লাঘব ও অনুগ্রহ। এর পরও যে সীমালংঘন করে তার জন্যে মর্মন্তুদ শাস্তি রয়েছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন

হে মুমিনগণ, নিহতদের ব্যাপারে তোমাদের উপর ‘কিসাস’ ফরয করা হয়েছে। স্বাধীনের বদলে স্বাধীন, দাসের বদলে দাস, নারীর বদলে নারী। তবে যাকে কিছুটা ক্ষমা করা হবে তার ভাইয়ের পক্ষ থেকে, তাহলে সততার অনুসরণ করবে এবং সুন্দরভাবে তাকে আদায় করে দেবে। এটি তোমাদের রবের পক্ষ থেকে হালকাকরণ ও রহমত। সুতরাং এরপর যে সীমালঙ্ঘন করবে, তার জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব।আল-বায়ান

হে মু’মিনগণ! তোমাদের প্রতি নিহতদের কিসাস সম্পর্কে আদেশ দেয়া যাচ্ছে, স্বাধীন ব্যক্তির বদলে স্বাধীন, গোলামের বদলে গোলাম এবং স্ত্রীলোকের বদলে স্ত্রীলোক, অতঃপর যাকে তার ভাইয়ের পক্ষ হতে কিছু অংশ মাফ ক’রে দেয়া হয়, সে অবস্থায় যথাযথ বিধির অনুসরণ করা ও সততার সঙ্গে তার দেয় আদায় করা বিধেয়, এটা তোমাদের প্রভুর পক্ষ হতে ভার লাঘব ও অনুগ্রহ, এরপর যে কেউ বাড়াবাড়ি করবে, তার জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে।তাইসিরুল

ওহে যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের প্রতি হত্যার ক্ষেত্রে প্রতিশোধের বিধান দেয়া হয়েছে। স্বাধীন ব্যক্তির উপরে স্বাধীন ব্যক্তির ক্ষেত্রে, আর দাসের উপরে দাসের ক্ষেত্রে, আর নারীর উপরে নারীর ক্ষেত্রে। তবে যাকে কিছুটা রেহাই দেয়া হয় তার ভাইয়ের তরফ হতে, তাহলে বিচার হবে ন্যায্যভাবে, আর তার প্রতি ক্ষতিপূরণ দিতে হবে উদারভাবে। -- এটি তোমাদের প্রভুর কাছ থেকে লঘু-ব্যবস্থা ও করুণা। কাজেই এরপরে যে সীমালঙ্ঘন করবে তার জন্য রয়েছে ব্যথাদায়ক শাস্তি।মাওলানা জহুরুল হক

তাফহীমুল কুরআন

১৭৬

‘কিসাস’ হচ্ছে রক্তপাতের বদলা বা প্রতিশোধ। অর্থাৎ হত্যাকারীর সাথে এমন ব্যবহার করা যেমন সে নিহত ব্যক্তির সাথে করেছে। কিন্তু এর অর্থ এ নয় যে, হত্যাকারী যেভাবে নিহত ব্যক্তিকে হত্যা করেছে ঠিক সেভাবে তাকেও হত্যা করতে হবে। বরং এর অর্থ হচ্ছে, সে একজনকে হত্যা করেছে, তাকেও হত্যা করা হবে।

১৭৭

জাহেলী যুগে হত্যার বদলা নেয়ার ব্যাপারে একটি পদ্ধতি প্রচলন ছিল। কোন জাতি বা গোত্রের লোকেরা তাদের নিহত ব্যক্তির রক্তকে যে পর্যায়ের মূল্যবান মনে করতো হত্যাকারীর পরিবার, গোত্র বা জাতির কাছ থেকে ঠিক সেই পরিমাণ মূল্যের রক্ত আদায় করতে চাইতো। নিহত ব্যক্তির বদলায় কেবলমাত্র হত্যাকারীর প্রাণ সংহার করেই তাদের কলিজা ঠাণ্ডা হতো না। বরং নিজেদের একজন লোক হত্যা করার প্রতিশোধ নিতে চাইতো তারা প্রতিপক্ষের শত শত লোককে হত্যা করে। তাদের কোন অভিজাত ও সম্মানী ব্যক্তি যদি অন্য গোত্রের একজন সাধারণ ও নীচু স্তরের লোকের হাতে মারা যেতো, তাহলে এক্ষেত্রে তারা নিছক হত্যাকারীকে হত্যা করাই যথেষ্ট মনে করতো না। বরং হত্যাকারীর গোত্রের ঠিক সমপরিমাণ অভিজাত ও মর্যাদাশীল কোন ব্যক্তির প্রাণ সংহার করতে অথবা তাদের কয়েক জনকে হত্যা করতে চাইত। বিপরীত পক্ষে নিহত ব্যক্তি তাদের দৃষ্টিতে যদি কোন সামান্য ব্যক্তি হতো আর অন্যদিকে হত্যাকারী হতো বেশী মর্যাদাশীল ও অভিজাত, তাহলে এক্ষেত্রে তারা নিহত ব্যক্তির প্রাণের বদলায় হত্যাকারীর প্রাণ সংহার করতে দিতে চাইতো না। এটা কেবল, প্রাচীন জাহেলী যুগের রেওয়াজ ছিল না। বর্তমান যুগেও যাদেরকে দুনিয়ার সবচেয়ে সুসভ্য জাতি মনে করা হয় তাদের সরকারী ঘোষণাবলীতেও অনেক সময় নির্লজ্জের মতো দুনিয়াবসীকে শুনিয়ে দেয়া হয়ঃ আমাদের একজন নিহত হলে আমরা হত্যাকারীর জাতির পঞ্চাশ জনকে হত্যা করবো। প্রায়ই আমরা শুনতে পাই, এক ব্যক্তিকে হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করার জন্য পরাজিত ও অধীনস্থ জাতির আটককৃত বহু ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়েছে। এই বিশ শতকের একটি ‘সুসভ্য’ জাতি নিজেদের এক ব্যক্তির হত্যার প্রতিশোধ নিয়েছে সমগ্র মিসরীয় জাতির ওপর। অন্যদিকে এই তথাকথিত সুসভ্য জাতিগুলোর বিধিবদ্ধ আদালতসমূহেও দেখা যায়, হত্যাকারী যদি শাসক জাতির এবং নিহত ব্যক্তি পরাজিত ও অধীনস্ত জাতির অন্তর্ভুক্ত হয়, তাহলে তাদের বিচারকরা প্রাণদণ্ডের সিদ্ধান্ত দিতে চায় না। এসব অন্যায় ও অবিচারের পথ বন্ধ করার জন্য আল্লাহ‌ এই আয়াতে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, নিহত ব্যক্তি ও হত্যাকারীর কোন প্রকার মর্যাদার বাছ-বিচার না করে নিহত ব্যক্তির প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য শুধুমাত্র হত্যাকারীরই প্রাণ সংহার করা হবে।

১৭৮

“ভাই” শব্দটি ব্যবহার করে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে কোমল ব্যবহার করার সুপারিশও করে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ তোমাদের ও তার মধ্যে চরম শত্রুতার সম্পর্ক থাকলেও আসলে সে তোমাদের মানবিক ভ্রাতৃ সমাজেরই একজন সদস্য। কাজেই তোমাদের একজন অপরাধী ভাইয়ের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণ করার পরিবর্তে নিজেদের প্রতিশোধ স্পৃহাকে যদি দমন করতে পারো তাহলে এটাই হবে তোমাদের মানবিক ব্যবহারের যথার্থ উপযোগী। এ আয়াত থেকে একথাও জানা গেলো যে, ইসলামী দণ্ডবিধিতে নর হত্যার মতো মারাত্মক বিষয়টিও উভয় পক্ষের মর্জীর ওপর নির্ভরশীল। নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীরা হত্যাকারীকে মাফ করে দেয়ার অধিকার রাখে এবং এ অবস্থায় হত্যাকারীর প্রাণদণ্ডের ওপর জোর দেয়া আদালতের জন্য বৈধ নয়। তবে পরবর্তী আয়াতগুলোর বর্ণনা অনুযায়ী হত্যাকারীকে মাফ করে দেয়া হলে তাকে অবশ্যি রক্তপণ আদায় করতে হবে।

১৭৯

এখানে কুরআনে “মা’রুফ” শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। কুরআনে অত্যন্ত ব্যাপকভাবে শব্দটির ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। এর অর্থ হচ্ছে, এমন একটি সঠিক কর্মপদ্ধতি যার সাথে সাধারণত সবাই সুপরিচিত। প্রত্যেকটি নিরপেক্ষ ব্যক্তি যার কোন স্বার্থ এর সাথে জড়িত নেই, সে প্রথম দৃষ্টিতেই যেন এর সম্পর্কে বলে ওঠে হ্যাঁ এটিই ভারসাম্যপূর্ণ ও উপযোগী কর্মপদ্ধতি। প্রচলিত রীতিকেও (Common Law) ইসলামী পরিভাষায় “উর্‌ফ” ও “মা’রু‌ফ” বলা হয়। যেসব ব্যাপারে শরীয়াত কোন বিশেষ নিয়ম নির্ধারণ করেনি এমন সব ব্যাপারেই একে নির্ভরযোগ্য মনে করা হয়।

১৮০

যেমন হত্যাকারীর উত্তরাধিকারীরা রক্তপণ আদায় করার পরও আবার প্রতিশোধ নেয়ার প্রচেষ্টা চালায় অথবা হত্যাকারী রক্তপণ আদায় করার ব্যাপারে টালবাহানা করে এবং নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীরা তার প্রতি যে উদারতা প্রর্দশণ করে নিজের অকৃতজ্ঞ ব্যবহারের মাধ্যমে তার জবাব দেয়। এসবগুলোকেই বাড়াবাড়ি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

কিসাস অর্থ সম-পরিমাণ বদলা নেওয়া। এ আয়াতে আদেশ করা হয়েছে, কোনও ব্যক্তিকে যদি ইচ্ছাকৃত অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয় এবং হত্যাকারীর অপরাধ প্রমাণিত হয়, তবে নিহতের ওয়ারিশের এ অধিকার থাকে যে, সে হত্যাকারী থেকে কিসাস গ্রহণের দাবী তুলবে। জাহিলী যুগেও কিসাস গ্রহণ করা হত, কিন্তু তাতে ইনসাফ রক্ষা করা হত না। তারা মানুষের মধ্যে নিজেদের ধ্যান-ধারণা অনুযায়ী বিভিন্ন স্তর সৃষ্টি করে রেখেছিল, আর সে হিসেবে নিুস্তরের কোনও লোক উচ্চস্তরের কাউকে হত্যা করলে ওয়ারিশগণ হত্যাকারীর পরিবর্তে তার গোত্রের এমন কাউকে হত্যা করতে চাইত যে মর্যাদায় নিহতের সমান। যদি কোনও গোলাম স্বাধীন কোনও ব্যক্তিকে হত্যা করত, তবে গোলামের পরিবর্তে একজন স্বাধীন ব্যক্তিকে হত্যা করার দাবি জানাত। এমনিভাবে হত্যাকারী নারী এবং নিহত পুরুষ হলে বলা হত, সেই নারীর পরিবর্তে একজন পুরুষকে হত্যা করা হবে। পক্ষান্তরে হত্যাকারী যদি নিহত ব্যক্তি অপেক্ষা উচ্চস্তরের লোক হত, যেমন হত্যাকারী পুরুষ এবং নিহত নারী, তবে হত্যাকারীর গোত্র বলত, আমাদের কোনও নারীকে হত্যা কর; পুরুষ হত্যাকারীর থেকে কিসাস নেওয়া যাবে না। আলোচ্য আয়াত জাহিলী যুগের এই অন্যায় প্রথার বিলোপ সাধন করেছে এবং ঘোষণা করে দিয়েছে, প্রাণ সকলেরই সমান। সর্বাবস্থায় হত্যাকারীর থেকেই কিসাস নেওয়া হবে, তাতে সে পুরুষ হোক বা নারী এবং স্বাধীন ব্যক্তি হোক বা গোলাম।

তাফসীরে জাকারিয়া

১৭৮. হে ঈমানদারগণ! নিহতদের ব্যাপারে তোমাদের উপর কিসাসের(১) বিধান লিখে দেয়া হয়েছে। স্বাধীন ব্যক্তির বদলে স্বাধীন ব্যক্তি, ক্রীতদাসের বদলে ক্রিতদাস, নারীর বদলে নারী। তবে তার ভাইয়ের(২) পক্ষ থেকে কোন ক্ষমা প্রদর্শন করা হলে যথাযথ বিধির(৩) অনুসরণ করা ও সততার সাথে তার রক্ত-বিনিময় আদায় করা কর্তব্য। এটা তোমাদের রব-এর পক্ষ থেকে শিথিলতা ও অনুগ্রহ। সুতরাং এর পরও যে সীমালংঘন করে(৪) তার জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।

(১) কিসাস’-এর শাব্দিক অর্থ সমপরিমাণ বা অনুরূপ। অর্থাৎ অন্যের প্রতি যতটুকু যুলুম করা হয়েছে, তার সমপরিমাণ প্রতিশোধ গ্রহণ করা তার পক্ষে জায়েয এর চাইতে বেশী কিছু করা জায়েয নয়। এ সূরারই ১৯৪ নং আয়াতে এর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, অত:পর যে কেউ তোমাদেরকে আক্রমণ করবে তোমরাও তাকে অনুরূপ আক্রমণ করবে। অনুরূপ সূরা আন-নাহলের ১২৬ নং আয়াতে রয়েছে, আর যদি তোমরা শাস্তি দাও তবে ঠিক ততখানি শাস্তি দেবে যতখানি অন্যায় তোমাদের প্রতি করা হয়েছে, এতে আলোচ্য বিষয়ই আরও বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে। সে মতে শরীআতের পরিভাষায় ‘কিসাস’ বলা হয় হত্যা ও আঘাতের সে শাস্তিকে, যা সমতা ও পরিমাণের প্রতি লক্ষ্য রেখে বিধান করা হয়। এখানে কয়েকটি বিষয় জানা বিশেষভাবে জরুরী:

এক. কিসাস কেবল ইচ্ছাকৃত হত্যার বেলায়ই প্রযোজ্য। আর ইচ্ছাকৃত হত্যা বলা হয় কোন অস্ত্র কিংবা এমন কোন কিছুর দ্বারা হত্যার উদ্দেশ্যে আঘাত করা, যার দ্বারা রক্ত প্রবাহিত হয় অথবা হত্যা সংঘটিত হয় সুতরাং কিসাস অর্থাৎ ‘জানের বদলে জান’ এ ধরনের হত্যার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

দুই. এ ধরনের হত্যার অপরাধে স্ত্রীলোক হত্যার অপরাধে পুরুষকে এবং পুরুষ হত্যার অপরাধে স্ত্রীলোককেও মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে। আয়াতে স্ত্রীলোকের বদলায় স্ত্রীলোককে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার যে উল্লেখ রয়েছে, তা একটা বিশেষ ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করেই বলা হয়েছে, যে ঘটনার প্রেক্ষিতে এ আয়াতটি নাযিল হয়।

তিন. ইচ্ছাকৃত হত্যার ক্ষেত্রে যদি হত্যাকারীকে সম্পূর্ণ মাফ করে দেয়া হয়, যেমন নিহত ব্যক্তির ওয়ারিস মাত্র দুই পুত্র, সে দুজনই যদি মাফ করে দেয়, তবে এমতাবস্থায় হত্যাকারীর উপর কোন কিছু ওয়াজিব হবে না। সে ব্যক্তি সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে যাবে। কিন্তু যদি পূর্ণ মাফ না হয়, অর্থাৎ উপরোক্ত ক্ষেত্রে এক পুত্র মাফ করে এবং অপর পুত্র তা না করে, তবে এমতাবস্থায় হত্যাকারী কেসাসের দণ্ড থেকে অব্যাহতি পাবে সত্য, কিন্তু এক পুত্রের দাবীর বদলায় অর্ধেক দিয়াত প্রদান করতে হবে। শরীআতের বিধানে হত্যার বদলায় যে দিয়াত বা অর্থদণ্ড প্রদান করতে হয়, তার পরিমাণ হচ্ছে মধ্যম আকৃতির একশ’ উট।

চার. কেসাসের আংশিক দাবী মাফ হয়ে গেলে যেমন মৃত্যুদণ্ড মওকুফ হয়ে দিয়াত ওয়াজিব হয়, তেমনি উভয় পক্ষ যদি কোন নির্ধারিত পরিমাণ অর্থ প্রদানের শর্তে আপোষ-নিম্পত্তি করে ফেলে, তবে সে অবস্থাতেও ‘কিসাস’ মওকুফ হয়ে অর্থ প্রদান করা ওয়াজিব হবে। তবে এ ক্ষেত্রে কিছু শর্ত রয়েছে, যা ফেকাহর কিতাবসমূহে বিস্তারিতভাবে উল্লেখিত রয়েছে।

পাঁচ. নিহত ব্যক্তির যে ক’জন ওয়ারিস থাকবে, তাদের প্রত্যেকেই মীরাস’-এর অংশ অনুপাতে ‘কিসাস’ ও ‘দিয়াত’-এর মালিক হবে এবং দিয়াত হিসেবে প্রাপ্ত অর্থ ‘মীরাস’-এর অংশ অনুপাতে বন্টিত হবে। তবে কিসাস যেহেতু বন্টনযোগ্য নয়, সেহেতু ওয়ারিসগণের মধ্য থেকে যে কোন একজনও যদি কেসাসের দাবী ত্যাগ করে, তবে তার উপর কিসাস ওয়াজিব হবে না; বরং দিয়াত ওয়াজিব হবে এবং প্রত্যেকেই অংশ অনুযায়ী দিয়াতের ভাগ পাবে।

ছয়. কিসাস গ্রহণ করার অধিকার যদিও নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারগণের, তথাপি নিজেরা সে অধিকার প্রয়োগ করতে পারবে না। অর্থাৎ নিহত ব্যক্তির বদলায় হত্যাকারীকে তারা নিজেরা হত্যা করতে পারবে না। এ অধিকার আদায় করার জন্য আইনী কর্তৃপক্ষের সাহায্য গ্রহণ করতে হবে। কেননা, কোন অবস্থায় কিসাস ওয়াজিব হয় এবং কোন অবস্থায় হয় না, এ সম্পর্কিত অনেক সূক্ষ্ম দিকও রয়েছে, যা সবার পক্ষে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তাছাড়া নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীরা রাগের মাথায় বাড়াবাড়িও করে ফেলতে পারে, এ জন্য আলেম ও ফেকাহবিদগণের সর্বসম্মত অভিমত অনুযায়ী ‘কিসাস’-এর হক আদায় করার জন্য ইসলামী আদালতের শরণাপন্ন হতে হবে। (মাআরিফুল কুরআন)

(২) 'ভাই' শব্দটি ব্যবহার করে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে কোমল ব্যবহার করার সুপারিশও করে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ তোমাদের ও তার মাঝে চরম শক্রতার সম্পর্ক থাকলেও আসলে সে তোমাদের মানবিক ভ্রাতৃ-সমাজেরই একজন সদস্য। তাছাড়া এখানে যে ক্ষমা প্রদর্শনের কথা বলা হয়েছে তার অর্থ হচ্ছে, ইচ্ছাকৃত হত্যার বেলায় কিসাস না গ্রহণ করে দিয়াত গ্রহণ করা। (বুখারী: ৪৪৯৮)

(৩) এখানে কুরআনে ‘মা’রূফ’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। কুরআনে অত্যন্ত ব্যাপকভাবে শব্দটির ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। এর অর্থ হচ্ছে, এমন একটি সঠিক কর্মপদ্ধতি যার সাথে সাধারণত সবাই সুপরিচিত। প্রত্যেকটি নিরপেক্ষ ব্যক্তি যার কোন স্বার্থ এর সাথে জড়িত নেই, সে প্রথম দৃষ্টিতেই যেন এর সম্পর্কে বলে উঠেঃ হ্যাঁ, এটিই ভারসাম্যপূর্ণ ও উপযোগী কর্মপদ্ধতি। প্রচলিত রীতিকেও ইসলামী পরিভাষায় উরফ ও মা’রূফ বলা হয়। যেসব ব্যাপারে শরীআত কোন বিশেষ নিয়ম নির্ধারণ করেনি, এমনসব ব্যাপারেই একে নির্ভরযোগ্য মনে করা হয়।

(৪) ইবনে আব্বাস ও মুজাহিদ বলেন, এর অর্থ, যে ব্যক্তি দিয়াত গ্রহণ করার পর হত্যা করতে উদ্যত হয়। (বুখারী: ১১১, মুসলিম: ১৩৭০)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

(১৭৮) হে বিশ্বাসিগণ! নরহত্যার ব্যাপারে তোমাদের জন্য ক্বিস্বাসের (প্রতিশোধ গ্রহণের বিধান) বিধিবদ্ধ করা হল; স্বাধীন ব্যক্তির বদলে স্বাধীন ব্যক্তি, ক্রীতদাসের বদলে ক্রীতদাস ও নারীর বদলে নারী।(1) কিন্তু তার ভাইয়ের পক্ষ হতে কিছুটা ক্ষমা প্রদর্শন করা হলে, প্রচলিত প্রথার অনুসরণ করা ও সদয়ভাবে তার দেয় পরিশোধ করা উচিত।(2) এ তো তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে ভার লাঘব ও অনুগ্রহ।(3) এর পরও যে সীমালংঘন করে, তার জন্য কঠিন শাস্তি রয়েছে।(4)

(1) জাহেলিয়াতের যুগে কোন আইন-কানুন ছিল না, তাই সবল গোত্রগুলো দুর্বল গোত্রগুলোর উপর যেভাবে চাইতো যুলুম-অত্যাচার করত। তাদের যুলুমের একটি প্রকার এ রকম ছিল যে, যদি সবল গোত্রের কোন পুরুষ হত্যা হয়ে যেত, তাহলে তারা কেবল হত্যাকারীকে হত্যা করার পরিবর্তে তার (হত্যাকারীর) পরিবারের কয়েকজনকে এমন কি কখনো কখনো পুরো গোত্রকে বিনাশ করার প্রচেষ্টা করত এবং মহিলার পরিবর্তে পুরুষকে ও ক্রীতদাসের পরিবর্তে স্বাধীন ব্যক্তিকে হত্যা করত। মহান আল্লাহ এই ভেদাভেদ উচ্ছেদ করে বললেন, যে হত্যা করবে, ক্বিসাসে (প্রতিশোধ গ্রহণে) কেবল তাকেই হত্যা করা হবে। হত্যাকারী স্বাধীন ব্যক্তি হলে, বদলায় ঐ স্বাধীন ব্যক্তিকেই, ক্রীতদাস হলে, ঐ ক্রীতদাসকেই এবং মহিলা হলে, ঐ মহিলাকেই হত্যা করা হবে। ক্রীতদাসের পরিবর্তে স্বাধীন ব্যক্তিকে, মহিলার পরিবর্তে পুরুষকে অথবা একজন পুরুষের পরিবর্তে কয়েকজন পুরুষকে হত্যা করা যাবে না। তবে এর অর্থ এই নয় যে, পুরুষ যদি মহিলাকে হত্যা করে, তাহলে ক্বিস্বাসে কোন মহিলাকে হত্যা করা হবে অথবা মহিলা যদি পুরুষকে হত্যা করে, তবে ক্বিস্বাসে কোন পুরুষকে হত্যা করা হবে (যেমন শব্দের বাহ্যিক ভাবার্থ থেকে এটাই ফুটে উঠছে)। বরং শব্দগুলো আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণ অনুপাতে সন্নিবিষ্ট হয়েছে; যার পরিষ্কার অর্থ (লক্ষ্যার্থ) হল, ক্বিস্বাসে হত্যাকারীকেই হত্যা করা হবে। তাতে সে পুরুষ হোক অথবা মহিলা, সবল হোক কিংবা দুর্বল। হাদীসে এসেছে, সমস্ত মুসলিমের রক্ত (পুরুষ হোক বা মহিলা) সমান। (আবূ দাউদ ২৭৫১) সুতরাং, আয়াতের অর্থ হল তা-ই যা অন্য আয়াতে এসেছে, প্রাণের বদলে প্রাণ। (মাইদাহ ৪৫ আয়াত) হানাফী উলামাগণ এই আয়াত থেকে সাব্যস্ত করেছেন যে, মুসলিমকে কাফেরের ক্বিস্বাসে হত্যা করা যাবে। কিন্তু অধিকাংশ আলেমগণ এ কথার সমর্থন করেননি। কারণ, হাদীসে পরিষ্কার বলা হয়েছে যে, মুসলিমকে কাফেরের ক্বিস্বাসে হত্যা করা যাবে না। (বুখারী ১১১নং, ফাতহুল ক্বাদীর, আরো দেখুন সূরা মাইদার ৪৫নং আয়াতের টীকা।)

(2) ক্ষমা করে দেওয়ার দু’টি পদ্ধতি। যথাঃ (ক) মালের কোন বিনিময় গ্রহণ ছাড়াই কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে ক্ষমা করে দেওয়া। (খ) ক্বিসাসের পরিবর্তে মুক্তিপণ গ্রহণ করে নেওয়া। দ্বিতীয় পদ্ধতি অবলম্বন করলে মুক্তিপণের দাবীদারকে বলা হয়েছে যে, সে যেন প্রচলিত নিয়মের অনুসরণ করে। আর {وَاَدآءٌ إِلَيْهِ بِإِحْسَانٍ} এ হত্যাকারীকে বলা হচ্ছে যে, সে যেন কোন সংকীর্ণতা সৃষ্টি না করে বিনিময় ভালভাবে আদায় করে দেয়। হতের আত্মীয়রা তার প্রাণ না নিয়ে তার উপর যে অনুগ্রহ করল, তার বদলাও অনুগ্রহের সাথে হওয়া দরকার।

{هَلْ جَزَاءُ الْأِحْسَانِ إِلَّا الْأِحْسَانُ} الرحمن:(60)

(3) এই লাঘব এবং অনুগ্রহ (অর্থাৎ, ক্বিস্বাস, ক্ষমা অথবা মুক্তিপণ গ্রহণ এই তিনটি পদ্ধতিই) আল্লাহর পক্ষ থেকে খাস তোমাদের জন্যই। ইতিপূর্বে তাওরাতধারীদের জন্য কেবল ক্বিস্বাস ও ক্ষমা ছিল। মুক্তিপণ ছিল না। আর ইঞ্জীলধারীদের মাঝে কেবল ক্ষমা ছিল; ক্বিস্বাস ছিল না এবং মুক্তিপণও না। (ইবনে কাসীর)

(4) মুক্তিপণ গ্রহণ করার পর যদি আবার হত্যাকারীকে হত্যা করা হয়, তাহলে তা সীমালংঘন ও বাড়াবাড়ি হবে এবং এর শাস্তি তাকে দুনিয়াতেও ভোগ করতে হবে এবং আখেরাতেও।