وَرَفَعَ أَبَوَيۡهِ عَلَى ٱلۡعَرۡشِ وَخَرُّواْ لَهُۥ سُجَّدٗاۖ وَقَالَ يَـٰٓأَبَتِ هَٰذَا تَأۡوِيلُ رُءۡيَٰيَ مِن قَبۡلُ قَدۡ جَعَلَهَا رَبِّي حَقّٗاۖ وَقَدۡ أَحۡسَنَ بِيٓ إِذۡ أَخۡرَجَنِي مِنَ ٱلسِّجۡنِ وَجَآءَ بِكُم مِّنَ ٱلۡبَدۡوِ مِنۢ بَعۡدِ أَن نَّزَغَ ٱلشَّيۡطَٰنُ بَيۡنِي وَبَيۡنَ إِخۡوَتِيٓۚ إِنَّ رَبِّي لَطِيفٞ لِّمَا يَشَآءُۚ إِنَّهُۥ هُوَ ٱلۡعَلِيمُ ٱلۡحَكِيمُ

ওয়া রফা‘আ আবাওয়াইহি ‘আলাল ‘আরশি ওয়া খাররূলাহূছুজ্জদাওঁ ওয়া ক-লা ইয়াআবাতি হা-যা-তা’বীলুরু‘ইয়া-ইয়া মিন কাবলু কাদ জা‘আলাহা-রববী হাক্কাওঁ ওয়া কাদ আহছানা বী ইযআখরজানী মিনাছছিজনি ওয়া জাআ বিকুম মিনাল বাদবিমিম বা‘দি আন নাঝাগাশশাইতা-নুবাইনী ওয়া বাইনা ইখওয়াতী ইন্না রববী লাতীফুল লিমা-ইয়াশাউ ইন্নাহূহুওয়াল ‘আলীমুল হাকীম।উচ্চারণ

(শহরে প্রবেশ করার পর) সে নিজের বাপ-মাকে উঠিয়ে নিজের পাশে সিংহাসনে বসালো এবং সবাই তার সামনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সিজদায় ঝুঁকে পড়লো। ৭০ ইউসুফ বললো, “আব্বাজান! আমি ইতিপূর্বে যে স্বপ্ন দেখেছিলাম এ হচ্ছে তার তা’বীর। আমার রব তাকে সত্য পরিণত করেছেন। আমার প্রতি তাঁর অনুগ্রহ হিসেবে তিনি আমাকে কারাগার থেকে বের করেছেন এবং আপনাদেরকে মরু অঞ্চল থেকে এনে আমার সাথে মিলিয়ে দিয়েছেন। আসলে আমার রব অননুভূত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তাঁর ইচ্ছা পূর্ণ করেন। নিঃসন্দেহে তিনি সবকিছু জানেন ও সুগভীর প্রজ্ঞার অধিকারী। তাফহীমুল কুরআন

সে তার পিতা-মাতাকে সিংহাসনে বসাল আর তারা সকলে তার সামনে সিজদায় পড়ে গেল। #%৬৪%# ইউসুফ বলল, আব্বাজী! এই হল আমার স্বপ্নের ব্যাখ্যা, যা আমার প্রতিপালক সত্যে পরিণত করেছেন। #%৬৫%# তিনি আমার প্রতি বড়ই অনুগ্রহ করেছেন যে, আমাকে কারাগার থেকে মুক্তি দিয়েছেন এবং আপনাদেরকে দেহাত থেকে এখানে নিয়ে এসেছেন। অথচ ইতঃপূর্বে আমার ও আমার ভাইদের মধ্যে শয়তান অনর্থ সৃষ্টি করেছিল। #%৬৬%# বস্তুত আমার প্রতিপালক যা ইচ্ছা করেন, তার জন্য অতি সূক্ষ্ম ব্যবস্থা করেন। নিশ্চয়ই তিনিই সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।মুফতী তাকী উসমানী

আর ইউসুফ তার মাতা-পিতাকে উচ্চাসনে বসাল এবং তারা সবাই তার সামনে সাজদাহয় লুটিয়ে পড়ল। সে বললঃ হে আমার পিতা! এটাই আমার পূর্বেকার স্বপ্নের ব্যাখ্যা; আমার রাব্ব ওটা সত্যে পরিণত করেছেন এবং তিনি আমাকে কারাগার হতে মুক্ত করেছেন এবং শাইতান আমার ও আমার ভাইদের সম্পর্ক নষ্ট করার পরও আপনাদেরকে মরু অঞ্চল হতে এখানে এনে দিয়ে আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, আমার রাব্ব যা ইচ্ছা তা নিপুণতার সাথে করে থাকেন, তিনিতো সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।মুজিবুর রহমান

এবং তিনি পিতা-মাতাকে সিংহাসনের উপর বসালেন এবং তারা সবাই তাঁর সামনে সেজদাবনত হল। তিনি বললেনঃ পিতা এ হচ্ছে আমার ইতিপূর্বেকার স্বপ্নের বর্ণনা আমার পালনকর্তা একে সত্যে পরিণত করেছেন এবং তিনি আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। আমাকে জেল থেকে বের করেছেন এবং আপনাদেরকে গ্রাম থেকে নিয়ে এসেছেন, শয়তান আমার ও আমার ভাইদের মধ্যে কলহ সৃষ্টি করে দেয়ার পর। আমার পালনকর্তা যা চান, কৌশলে সম্পন্ন করেন। নিশ্চয় তিনি বিজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

এবং ইউসুফ তার মাতা-পিতাকে উচ্চাসনে বসাল এবং এরা সকলে তার সম্মানে সিজ্দায় লুটিয়ে পড়ল। সে বলল, ‘হে আমার পিতা! এটাই আমার পূর্বেকার স্বপ্নের ব্যাখ্যা; আমার প্রতিপালক তা সত্যে পরিণত করেছেন এবং তিনি আমাকে কারাগার হতে মুক্ত করে এবং শয়তান আমার ও আমার ভাইদের সম্পর্ক নষ্ট করার পরও আপনাদেরকে মরু অঞ্চল হতে এখানে এনে দিয়ে আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। আমার প্রতিপালক যা ইচ্ছা তা নিপুণতার সঙ্গে করেন। তিনি তো সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।’ ইসলামিক ফাউন্ডেশন

আর সে তার পিতামাতাকে রাজাসনে উঠাল এবং তারা সকলে তার সামনে সেজদায় লুটিয়ে পড়ল এবং সে বলল, ‘হে আমার পিতা, এই হল আমার ইতঃপূর্বের স্বপ্নের ব্যাখ্যা, আমার রব তা বাস্তবে পরিণত করেছেন আর তিনি আমার উপর এহসান করেছেন, যখন আমাকে জেলখানা থেকে বের করেছেন এবং তোমাদেরকে গ্রাম থেকে নিয়ে এসেছেন, শয়তান আমার ও আমার ভাইদের মধ্যে সম্পর্ক নষ্ট করার পর। নিশ্চয় আমার রব যা ইচ্ছা করেন, তা বাস্তবায়নে তিনি সূক্ষ্মদর্শী। নিশ্চয় তিনি সম্যক জ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়’।আল-বায়ান

সে তার পিতা-মাতাকে সিংহাসনে উঠিয়ে নিল আর সকলে তার সম্মানে সাজদাহয় ঝুঁকে পড়ল। ইউসুফ বলল, ‘হে পিতা! এ-ই হচ্ছে আমার সে আগের দেখা স্বপ্নের ব্যাখ্যা। আমার রব্ব একে সত্যে পরিণত করেছেন, তিনি আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন যে, তিনি আমাকে কয়েদখানা থেকে বের করে এনেছেন। আর শাইত্বান আমার আর আমার ভাইদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার পরও তিনি আপনাদেরকে মরু অঞ্চল থেকে এখানে (মিসরে) এনে দিয়েছেন। আমার রব্ব যা করতে ইচ্ছে করেন তা সূক্ষ্ণ উপায়ে বাস্তবায়িত করে থাকেন, তিনি বড়ই বিজ্ঞ, বড়ই প্রজ্ঞাময়।তাইসিরুল

আর তিনি তাঁর পিতামাতাকে উচ্চাসনে বসালেন, আর তাঁর কারণে তাঁরা সিজদারত হলেন। তখন তিনি বললেন, "হে আমার আব্বা! এটিই আমার পূর্বেকার দৈবদর্শনের তাৎপর্য, আমার প্রভু তা সত্যে পরিণত করেছেন। আর তিনি আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছিলেন যখন তিনি আমাকে কারাগার থেকে মুক্ত করেছিলেন, এবং মরুভূমি থেকে আপনাদের নিয়ে এসেছেন আমার মধ্যে ও আমার ভাইয়ের মধ্যে শয়তান বিরোধ বাধাবার পরে। নিঃসন্দেহ আমার প্রভু যাকে ইচ্ছা করেন তার প্রতি পরম সদাশয়। নিঃসন্দেহ তিনি নিজেই সর্বজ্ঞাতা, পরমজ্ঞানী।মাওলানা জহুরুল হক

তাফহীমুল কুরআন

৭০

এ “সিজদাহ” শব্দটি বহু লোককে বিভ্রান্ত করেছে। এমনকি একটি দল তো এ থেকে প্রমাণ সংগ্রহ করে বাদশাহ ও পীরদের জন্য “আদবের সিজদাহ” ও “সম্মান প্রদর্শনের সিজদাহ”-এর বৈধতা আবিষ্কার করেছেন। এর দোষমুক্ত হবার জন্য অন্য লোকদের এ ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে যে, আগের নবীদের শরীয়াতে কেবলমাত্র ইবাদাতের সিজদা আল্লাহ ছাড়া আর সবার জন্য হারাম ছিল। এছাড়া যে সিজদার মধ্যে ইবাদাতের অনুভূতি নেই তা আল্লাহ ছাড়া অন্যদের জন্যও করা যেতে পারতো। তবে মুহাম্মাদী শরীয়াতে আল্লাহ ছাড়া অন্যদের জন্য সব রকমের সিজদা হারাম করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু আসলে “সিজদাহ” শব্দটিকে বর্তমান ইসলামী পরিভাষার অর্থে গ্রহণ করার ফলেই যাবতীয় বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। অর্থাৎ হাত, হাঁটু ও কপাল মাটিতে ঠেকিয়ে দেয়া। অথচ সিজদার মূল অর্থ হচ্ছে শুধুমাত্র ঝুঁকে পড়া। আর এখানে এ শব্দটি এ অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। কারো প্রতি কৃতজ্ঞা প্রকাশ করার, কাউকে অভ্যর্থনা জানাবার অথবা নিছক কাউকে সালাম করার জন্য বুকে দু’হাত বেঁধে সামনের দিকে কিছুটা ঝুঁকে পড়ার রেওয়াজ প্রাচীন যুগের মানুষের সাংস্কৃতিক জীবনে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল এবং আজও দুনিয়ার কোন কোন দেশে এর প্রচলন আছে। এ ধরনের ঝুঁকে পড়ার জন্য আরবীতে “সিজদাহ” এবং ইরেজীতে Bow শব্দ ব্যবহার করা হয়। বাইবেলে আমরা এর অসংখ্য দৃষ্টান্ত পাই, যা থেকে প্রমাণ হয় যে, প্রাচীন যুগে এ পদ্ধতিটি সাংস্কৃতিক জীবনের অংশ ছিল। তাই হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম সম্পর্কে এক জায়গায় বলা হয়েছেঃ তিনি নিজের তাঁবুর দিকে তিনটি লোককে আসতে দেখলেন। তাদেরকে অভ্যর্থনা করার জন্য তিনি দৌড়ে গেলেন এবং মাটি পর্যন্ত ঝুঁকে পড়লেন। আরবী বাইবেলে এখানে যে শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়েছে তা হচ্ছেঃ

فَلَمَّا نَظَرَ رَكَضَ لِاسقِبَالِهِم مِن بَابِ الخِيمَةِ وَسَجَدَ اِلَى الَارضِ (تكوين: ٣-١٨)

তারপর যেখানে বলা হচ্ছে, হেতের সন্তানরা হযরত সারাকে দাফন করার জন্য বিনামূল্যে কবরের জন্য জমি দান করে, সেখানে উর্দূ বাইবেলে যা বলা হয়েছে তার বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায়। “ইবরাহীম উঠে বনী হেতের সামনে, যারা সেই দেশের বাসিন্দা ছিল, কুর্নিশ করলেন এবং তাদের সাথে এভাবে আলাপ করলেন।” (বাংলা বাইবেলে বলা হয়েছেঃ তখন আব্রাহাম উঠিয়া তদ্দেশীয় লোকদিগের, অর্থাৎ হেতের সন্তানগণের কাছে প্রণিপাত করিলেন ও সম্ভাসন করিয়া কহিলেন,) তারপর যখন তারা শুধু কবরের জমিই নয়, পুরো একটি ক্ষেত এবং একটি গুহা দান করে তখন “ইবরাহীম সেই দেশীয় লোকদের সামনে মাথা নত করলেন” (বাংলা বাইবেলে বলা হয়েছেঃ তখন আব্রাহাম তদ্দেশীয় লোকদের সামনে প্রণিপাত করিলেন। কিন্তু আরবী অনুবাদে এ উভয় জায়গায় কুর্নিশ করা, প্রণিপাত করা, মাথা নত করা ইত্যাদির জন্য “সিজদাহ” শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। বলা হয়েছেঃ

فقام ابراهيم وسجد لشعب الارض لبنى حت (تكوين: ٧-٢٢)
فسجد ابراهيم امام شعب الارض (تكوين: ١٢-٢٣)

ইংরেজী বাইবেলে এখানে যে শব্দাবলী ব্যবহার করা হয়েছে তা হচ্ছেঃ

“Bowed himself towards the ground.

“Bowed himself to the people of the land and Abrahan bowed down himself before the people of the land”

এ ধরনের বিষয়ের বহু দৃষ্টান্ত বাইবেলে পাওয়া যায়। এ থেকে পরিষ্কার জানা যায়, বর্তমানে ইসলামী পরিভাষায় “সিজদাহ” বলতে যা বুঝায় এ সিজদাহর অর্থ তা নয়।

যারা বিষয়টির যথার্থ স্বরূপ না জেনে এর ব্যাখ্যায় হালকাভাবে লিখে দিয়েছেন যে, পূর্ববর্তী শরীয়াতগুলোয় গায়রুল্লাহকে সম্মানের সিজদা অথবা আদবের সিজদা করা জায়েয ছিল তারা নিছক একটি ভিত্তিহীন কথা বলেছেন। ইসলামী পরিভাষায় যাকে সিজদা বলা হয়, যদি সিজদা বলতে তাকেই বুঝানো হয় তাহলে আল্লাহর পাঠানো শরীয়াতে তা কোনদিন গায়রুল্লাহর জন্য জায়েয ছিল না। বাইবেলে উল্লেখিত হয়েছে যে, ব্যবিলনের পরাধীনতার যুগে বাদশাহ অহশ্বেরশ যখন হামানকে নিজের প্রধান অধ্যক্ষ করলেন এবং তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার জন্য তাকে সিজদা করার জন্য সবাইকে হুকুম দিলেন তখন বনী ইসরাঈলের পরম খোদাভক্ত ওলী মর্দখয় (মর্দকী) তা করতে অস্বীকার করলেন। (ইষ্টের ৩: ১-২) তালমূদে এ ঘটনাটির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে এর যে বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হয়েছে তা প্রণিধানযোগ্যঃ

“বাদশাহর কর্মচারীরা জিজ্ঞেস করলোঃ ব্যাপার কি, তুমি কেনইবা হামানকে সিজদা করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছো? আমরাও তো মানুষ কিন্তু আমরা বাদশাহর হুকুম মেনে চলি। তিনি জবাব দিলেনঃ তোমরা অজ্ঞ, একজন মরণশীল মানুষ, যে কাল মাটির সাথে মিশে যাবে, সে কি এমন যোগ্যতা রাখে যে, তার শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নেয়া হবে? আমি কি এমন একজনকে সিজদা করবো, যে একটি মহিলার পেট থেকে জন্ম নিয়েছে? যে কাল শিশু ছিল, আজ যুবক হয়েছে, কাল বুড়ো হয়ে যাবে এবং পরশু মারা যাবে? না, আমি তো একমাত্র সেই অনাদি অনন্ত আল্লাহর সামনে মাথা নত করবো যিনি চিরঞ্জীব ও স্বয়ম্ভু....... যিনি বিশ্বলোকের স্রষ্টা ও শাসক, আমি তো একমাত্র তাঁকেই সম্মান করবো, আর কাউকে নয়।

কুরআন নাযিলের প্রায় এক হাজার বছর আগে একজন ইসরাঈলী মু’মিনের কন্ঠে কথাগুলো উচ্চারিত হয়। কোন অর্থেও গায়রুল্লাহকে সিজদা করা বৈধ এ ধরনের চিন্তার নামগন্ধও এতে পাওয়া যায় না।

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযি.) থেকে এ আয়াতের যে তাফসীর বর্ণিত আছে, সে অনুযায়ী হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের সামনে তাঁরা সিজদা করেছিল আল্লাহর তাআলার শোকর আদায়ের লক্ষ্যে। অর্থাৎ, তারা সিজদা করেছিল আল্লাহ তাআলাকেই। হ্যাঁ, তা করেছিল হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের সামনে, তাকে ফিরে পাওয়ার আনন্দে। ইমাম রাযী (রহ.) এ তাফসীরকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। অন্যান্য মুফাসসিরগণ বলেন, এটা ইবাদতমূলক সিজদা ছিল না; বরং শ্রদ্ধাজ্ঞাপনমূলক সিজদা, যেমন ফেরেশতাগণ হযরত আদম আলাইহিস সালামকে সিজদা করেছিল। এরূপ সিজদা হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের শরীয়তে জায়েয ছিল। কিন্তু মহানবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরীয়তে এরূপ শ্রদ্ধাজ্ঞাপনমূলক সিজদাও জায়েয নয়।

তাফসীরে জাকারিয়া

১০০. আর ইউসুফ তার পিতা-মাতাকে(১) উঁচু আসনে বসালেন এবং তারা সবাই তার সম্মানে সিজদায় লুটিয়ে পড়ল।(২) তিনি বললেন, হে আমার পিতা! এটাই আমার আগেকার স্বপ্নের ব্যাখ্য(৩); আমার রব এটা সত্যে পরিণত করেছেন এবং তিনি আমাকে কারাগার থেকে মুক্ত করেন এবং শয়তান আমার ও আমার ভাইদের সম্পর্ক নষ্ট করার পরও আপনাদেরকে মরু অঞ্চল হতে এখানে এনে দিয়ে আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। আমার রব যা ইচ্ছে তা নিপুণতার সাথে করেন। তিনি তো সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।(৪)

(১) এখানে أَبَوَيْهِ (পিতা-মাতা) উল্লেখ করা হয়েছে। তাই অনেকের মতেই ইউসুফের মাতা জীবিত ছিলেন। (ইবন কাসীর)। তবে অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, ইউসুফ 'আলাইহিস সালাম-এর মাতা তার শৈশবেই ইন্তেকাল করেছিলেন। কিন্তু তারপর ইয়াকুব আলাইহিস সালাম মৃতার ভগ্নিকে বিয়ে করেছিলেন। তিনি ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর খালা হওয়ার দিক দিয়েও মায়ের মতই ছিলেন এবং পিতার বিবাহিতা স্ত্রী হওয়ার দিক দিয়েও মাতাই ছিলেন। (বাগভী; কুরতুবী)

(২) অর্থাৎ পিতা-মাতাকে রাজ সিংহাসনে বসালেন আর ভ্রাতারা সবাই ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর সামনে সিজদা করলেন। এ “সিজদাহ” শব্দটি বহু লোককে বিভ্রান্ত করেছে। এমনকি একটি দল তো এ থেকে প্রমাণ সংগ্রহ করে বাদশাহ ও পীরদের জন্য “আদবের সিজদাহ” ও “সম্মান প্রদর্শনের সিজদাহ” এর বৈধতা আবিষ্কার করেছেন। এর দোষমুক্ত হবার জন্য অন্য লোকদের এ ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে যে, আগের নবীদের শরীআতে কেবলমাত্র ইবাদাতের সিজদা আল্লাহ ছাড়া আর সবার জন্য হারাম ছিল।

এ ছাড়া যে সিজদার মধ্যে ইবাদাতের অনুভূতি নেই তা আল্লাহ ছাড়া অন্যদের জন্যও করা যেতে পারতো। তবে মুহাম্মাদী শরীয়াতে আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্যদের জন্য সব রকমের সিজদা হারাম করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু আসলে “সিজদাহ” শব্দটি বর্তমান ইসলামী পরিভাষার অর্থে গ্রহণ করার ফলেই যাবতীয় বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। অর্থাৎ হাত, হাটু ও কপাল মাটিতে ঠেকিয়ে দেয়া। অথচ সিজদাহর মূল অর্থ হচ্ছে শুধুমাত্র ঝুঁকে পড়া। আর এখানে এ শব্দটি এ অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। আর এ অর্থই ইমাম বাগভী পছন্দ করেছেন।

এখানে আরও জানা আবশ্যক যে, কারো প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার, কাউকে অভ্যর্থনা জানাবার অথবা নিছক কাউকে সালাম করার জন্য সামনের দিকে কিছুটা ঝুঁকে পড়ার রেওয়াজ প্রাচীন যুগের মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। এ ধরনের ঝুঁকে পড়ার জন্য আরবীতে ‘সিজদাহ’ শব্দ ব্যবহার করা হয়। সেটাও এ শরীআতে মনসুখ বা রহিত। (কুরতুবী)

এ থেকে পরিষ্কার জানা যায়, বর্তমানে ইসলামী পরিভাষায় ‘সিজদাহ’ বলতে যা বুঝায় এ সিজদাহর অর্থ তা নয়। ইসলামী পরিভাষায় যাকে সিজদা বলা হয়, সে সিজদা আল্লাহর পাঠানো শরীআতে তা কোনদিন গায়রুল্লাহর জন্য জায়েয ছিল না। হাদীসে বলা হয়েছেঃ কোন মানুষের জন্য অপর মানুষকে সিজদা করা বৈধ নয়। (নাসায়ী, আস-সুনানুল কুবরা: ৯১৪৭; ইবন আবী শাইবাহ, হাদীস নং ১৭১৩২)

(৩) ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর সামনে যখন পিতা-মাতা ও এগার ভাই একযোগে সিজদা করল, তখন শৈশবের স্বপ্নের কথা তার মনে পড়ল। তিনি বললেনঃ পিতা, এটা আমার শৈশবে দেখা স্বপ্নের ব্যাখ্যা, যাতে দেখেছিলাম যে, সূর্য, চন্দ্র ও এগারটি নক্ষত্র আমাকে সিজদা করছে। আল্লাহর শোকর যে, তিনি এ স্বপ্নের সত্যতা চোখে দেখিয়ে দিয়েছেন।

(৪) এরপর ইউসুফ আলাইহিস সালাম পিতা-মাতার কাছে কিছু অতীত কাহিনী বর্ণনা করতে শুরু করে বললেনঃ “আল্লাহ তা'আলা আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, যখন কারাগার থেকে আমাকে বের করেছেন এবং আপনাকে বাইরে থেকে এখানে এনেছেন; অথচ শয়তান আমার ও আমার ভাইদের মধ্যে কলহ সৃষ্টি করে দিয়েছিল”।

ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর দুঃখ-কষ্ট যথাক্রমে তিন অধ্যায়ে বিভক্ত। (এক) ভাইদের অত্যাচার ও উৎপীড়ন। (দুই) পিতা-মাতার কাছ থেকে দীর্ঘদিনের বিচ্ছেদ এবং (তিন) কারাগারের কষ্ট। আল্লাহর মনোনীত নবী স্বীয় বিবৃতিতে প্রথমে ঘটনাবলীর ধারাবাহিকতা পরিবর্তন করে কারাগার থেকে কথা শুরু করেছেন। ভ্রাতারা যে তাকে কূপে নিক্ষেপ করেছিল, তা উল্লেখ করেননি, কারণ, তিনি তা উল্লেখ করে ভাইদেরকে লজ্জা দেয়া সমীচীন মনে করেননি। (কুরতুবী) ইউসুফ আলাইহিস সালাম তারপর বললেন, আমার পালনকর্তা যে কাজ করতে চান, তার তদবীর সূক্ষ্ম করে দেন। নিশ্চয় তিনি সুবিজ্ঞ, প্রজ্ঞাবান। তিনি তাঁর বান্দার স্বার্থ যাতে রয়েছে তাতে তাকে এমনভাবে প্রবেশ করান যে, কেউ তা জানতে পারে না। (কুরতুবী)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

(১০০) আর ইউসুফ তার পিতা-মাতাকে সিংহাসনে বসাল(1) এবং তারা সবাই তার সামনে সিজদায় লুটিয়ে পড়ল।(2) সে বলল, ‘হে আমার পিতা! এটাই আমার পূর্বেকার স্বপ্নের ব্যাখ্যা;(3) আমার প্রতিপালক তা বাস্তবে পরিণত করেছেন। আর তিনি আমাকে কারাগার হতে মুক্ত করে(4) এবং শয়তানের আমার ও আমার ভাইদের মাঝে সম্পর্ক নষ্ট করার পরও(5) আপনাদেরকে মরু অঞ্চল হতে এখানে এনে দিয়ে(6) আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। আমার প্রতিপালক যা ইচ্ছা তা নিপুণতার সাথে করে থাকেন, তিনি তো সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।

(1) কতিপয় ব্যাখ্যাকরীদের মত যে, ইউসুফ (আঃ)-এর মাতা বলতে বিমাতা এবং আপন খালা ছিলেন। কেননা তাঁর আপন মাতা বিনয়্যামীনের জন্মের পর মারা গিয়েছিলেন। ইয়াকূব (আঃ) তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর বোনকে বিবাহ করেছিলেন। উক্ত খালাই ইয়াকূব (আঃ)-এর সাথে মিসর গিয়েছিলেন। (ফাতহুল কাদীর) কিন্তু ইমাম ইবনে জারীর ত্বাবারী এর বিপরীত বলেছেন যে, ইউসুফ (আঃ)-এর নিজস্ব মাতা মারা যাননি, তিনিই ইয়াকূব (আঃ)-এর সঙ্গে ছিলেন।

(2) কেউ কেউ এর তরজমা করেছেন যে, তারা সবাই আদব ও সম্মান করতঃ তার সামনে অবনত হল। কিন্তু ﴿وَخَرُّوْا لَهُ سُجَّدًا﴾ এর শব্দগুলো প্রমাণ করছে যে, তারা ইউসুফ (আঃ)-এর সামনে মাটিতে সিজদাবনত হয়েছিলেন। অর্থাৎ সিজদার অর্থ এখানে সিজদাই। তবে এই সিজদা সম্মানের সিজদা, ইবাদতের সিজদা নয়। আর সম্মানের (তা’যীমী) সিজদা ইয়াকূব (আঃ)-এর শরীয়তে জায়েয ছিল। ইসলামে শিরকের দরজা বন্ধ করার জন্য সম্মানসূচক সিজদাকেও হারাম ঘোষণা করা হয়েছে, সুতরাং এখন সম্মানসূচক সিজদাও কারো জন্য বৈধ নয়। (‘‘মুআয যখন শাম (দেশ) থেকে ফিরে এলেন তখন নবী (সাঃ)-কে সিজদা করলেন। আল্লাহর রসূল (সাঃ) বললেন, ‘‘একি মুআয?’’ মুআয বললেন, ‘আমি শাম গিয়ে দেখলাম, সে দেশের লোকেরা তাদের যাজক ও পাদ্রীগণকে সিজদা করছে। তাই আমি মনে মনে চাইলাম যে, আমরাও আপনার জন্য সিজদা করব।’ তা শুনে তিনি বললেন ‘‘খবরদার! তা করো না। কারণ, আমি যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য সিজদা করতে কাউকে আদেশ করতাম, তাহলে মহিলাকে আদেশ করতাম, সে যেন তার স্বামীকে সিজদা করে।) (ইবনে মাজাহ ১৮৫৩ নং, আহমাদ ৪/৩৮১, ইবনে হিব্বান ৪১৭১ নং, হাকেম ৪/১৭২, বায্যার ১৪৬১নং, সিলসিলাহ সহীহাহ ১২০৩নং)

(3) অর্থাৎ ইউসুফ (আঃ) যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, এসব পরীক্ষার সম্মুখীন হওয়ার পর শেষ পর্যন্ত তার এই তা‘বীর (ব্যাখ্যা) সামনে এল যে, মহান আল্লাহ তাঁকে রাজ সিংহাসনে বসালেন এবং পিতা-মাতা সহ সকল ভায়েরা তাঁকে সিজদা করলেন।

(4) আল্লাহর অনুগ্রহসমূহের মধ্যে কূপ থেকে বের করার কথা উল্লেখ করলেন না, যেন তাতে তাঁর ভায়েরা লজ্জিত না হন, এ হল নববী চরিত্র।

(5) এটাও উদার চরিত্রের একটি নমুনা যে, ভাইদেরকে একটুও দোষারোপ না করে শয়তানকে উক্ত কীর্তিকলাপের কারণ বানালেন।

(6) মিসরের মত সভ্য এলাকার তুলনায় কানআন একটি মরুভূমির মত এলাকা, তাই তিনি بَدْو (মরু অঞ্চল) শব্দ ব্যবহার করলেন।