আত্তাইবূনাল ‘আ-বিদূ নাল হা-মিদূ নাছছা-ইহুনার র-কি‘ঊনাছছা-জিদূ নাল আ-মিরূনা বিলামা‘রূফি ওয়ান্না-হুনা ‘আনিল মুনকারি ওয়াল হা-ফিজূনা লিহুদূ দিল্লা-হি ওয়া বাশশিরিল মু’মিনীন।উচ্চারণ
আল্লাহর দিকে বারবার প্রত্যাগমনকারী ১০৮ তার ইবাদতকারী, তার প্রশংসা বানী উচ্চারণকারী, তার জন্য যমীনে বিচরণকারী ১০৯ তার সামনে রুকূ ও সিজদাকারী, সৎকাজের আদেশকারী, অসৎকাজ থেকে বিরতকারী এবং আল্লাহর সীমারেখা সংরক্ষণকারী ১১০ (সেই সব মুমিন হয়ে থাকে যারা আল্লাহর সাথে কেনাবেচার সওদা করে) আর হে নবী! এ মুমিনদেরকে সুখবর দাও! তাফহীমুল কুরআন
(যারা এই সফল সওদা করেছে, তারা কারা? তারা) তাওবাকারী, (আল্লাহর) ইবাদতকারী, তাঁর প্রশংসাকারী, সওম পালনকারী, #%৯৩%# রুকু ও সিজদাকারী, সৎকাজের আদেশদাতা ও অন্যায় কাজে বাধাদানকারী এবং আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা সংরক্ষণকারী। #%৯৪%# (হে নবী!) এরূপ মুমিনদেরকে সুসংবাদ দাও।মুফতী তাকী উসমানী
তারা হচ্ছে তাওবাহকারী, ইবাদাতকারী, আল্লাহর প্রশংসাকারী, সিয়াম পালনকারী, রুকু ও সাজদাহকারী, সৎ বিষয় শিক্ষা প্রদানকারী এবং মন্দ বিষয়ে বাধা প্রদানকারী, আল্লাহর সীমাসমূহের (অর্থাৎ আহকামের) সংরক্ষণকারী; আর তুমি এমন মু’মিনদেরকে সুসংবাদ শুনিয়ে দাও।মুজিবুর রহমান
তারা তওবাকারী, এবাদতকারী, শোকরগোযার, (দুনিয়ার সাথে) সম্পর্কচ্ছেদকারী, রুকু ও সিজদা আদায়কারী, সৎকাজের আদেশ দানকারী ও মন্দ কাজ থেকে নিবৃতকারী এবং আল্লাহর দেওয়া সীমাসমূহের হেফাযতকারী। বস্তুতঃ সুসংবাদ দাও ঈমানদারদেরকে।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
তারা তওবাকারী, ‘ইবাদতকারী, আল্লাহ্ র প্রশংসাকারী, সিয়াম পালনকারী, রুক‚‘কারী, সিজ্দাকারী, সৎকাজের নির্দেশদাতা, অসৎকাজে নিষেধকারী এবং আল্লাহ্ র নির্ধারিত সীমারেখা সংরক্ষণকারী; এই মু’মিনদেরকে তুমি শুভ সংবাদ দাও। ইসলামিক ফাউন্ডেশন
তারা তাওবাকারী, ইবাদাতকারী, আল্লাহর প্রশংসাকারী, সিয়াম পালনকারী, রুকূকারী, সিজ্দাকারী, সৎকাজের আদেশদাতা, অসৎকাজের নিষেধকারী এবং আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা হেফাযতকারী। আর মুমিনদেরকে তুমি সুসংবাদ দাও।আল-বায়ান
তারা অনুশোচনাভরে (আল্লাহর দিকে) প্রত্যাবর্তনকারী, ‘ইবাদাতকারী, আল্লাহর প্রশংসাকারী, রোযা পালনকারী, রুকু‘কারী, সাজদাহকারী, সৎকাজের আদেশ দানকারী, অন্যায় কাজ হতে নিষেধকারী, আল্লাহর নির্ধারিত সীমা সংরক্ষণকারী, কাজেই (এসব) মু’মিনদেরকে সুসংবাদ দাও।তাইসিরুল
তওবাকারীরা, উপাসনাকারীরা, মহিমাকীর্তনকারীরা, রোযা পালনকারীরা, রুকুকারীরা, সিজদাকারীরা, সৎকর্মে নিদের্শ- দানকারীরা ও অসৎকর্মে নিষেধকারীরা, এবং আল্লাহ্র চৌহদ্দি রক্ষাকারীরা। আর মুমিনদের তুমি সুসংবাদ দাও।মাওলানা জহুরুল হক
১০৮
মূল আয়াতে التَّائِبُونَ(আত্ তা-য়েবুন) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এর শাব্দিক অনুবাদ করলে দাঁড়ায় তাওবাকারী। কিন্তু যে বর্ণনা রীতিতে ও শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে তা থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, তাওবা করা ঈমানদারদের স্থায়ী ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অন্তর্ভুক্ত। তাই এর সঠিক অর্থ হচ্ছে তারা কেবলমাত্র একবার তাওবা করে না বরং সবসময় তাওবা করতে থাকে। আর তাওবার আসল অর্থ হচ্ছে ফিরে আসা। কাজেই এ শব্দটির মূল প্রাণ সত্তা প্রকাশ কারার জন্য আমি এর ব্যাখ্যামূলক অনুবাদ এভাবে করেছি তারা আল্লাহর দিকে বারবার ফিরে আসে। মু’মিন যদিও তার পূর্ণ চেতনা ও সংকল্প সহকারে আল্লাহর সাথে নিজের প্রাণ ও ধন-সম্পদ কেনা-বেচার কারবার করে কিন্তু যেহেতু বাইরের অবস্থার প্রেক্ষিতে এটাই অনুভূত হয় যে, প্রাণ তার নিজের এবং ধন ও তার নিজের আর তাছাড়া এ প্রাণ ও ধনের আসল মালিক মহান আল্লাহ। কোন অনুভূত সত্তা নন বরং একটি যুক্তিগ্রাহ্য সত্তা। তাই মু’মিনের জীবনের বারবার এমন সময় আসতে থাকে যখন সে সাময়িকভাবে আল্লাহর সাথে করা তার কেনা-বেচার চুক্তি ভুলে যায়। এ অবস্থায় এ চুক্তি থেকে গাফেল হয়ে সে কোন লাগামহীন কার্যকলাপ করে বসে। কিন্তু একজন প্রকৃতও যথার্থ মু’মিনের বৈশিষ্ট্য এই যে, এ সমায়িক ভুলে যাওয়ার হাত থেকে যখনই সে রেহাই পায়, তখনই নিজের গাফলতির পর্দা ছিড়ে সে বেরিয়ে আসে এবং অনুভব করতে থাকে যে, অবচেতনভাবে সে নিজের অঙ্গীকারের বিরুদ্ধাচরণ করে ফেলেছে তখনই সে লজ্জা অনুভব করে, তীব্র অনুশোচনা সহকারে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করে ক্ষমা চায় এবং নিজের অঙ্গীকারকে পুনরায় তরতাজা করে নেয়। এ বারবার তাওবা করা, বারবার আল্লাহর দিকে ফিরে আসা এবং প্রত্যেকটি পদস্খলনের পর বিশ্বস্ততার পথে ফিরে আসাই ঈমানের স্থিতি ও স্থায়িত্বের প্রতীক। নয়তো যেসব মানবিক দুর্বলতা সহকারে মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে সেগুলোর উপস্থিতিতে তার পক্ষে এটা কোন ক্রমেই সম্ভব নয় যে, সে আল্লাহর হাতে একবার ধন-প্রাণ বিক্রি করার পর চিরকাল পূর্ণ সচেতন অবস্থায় এ কেনা-বেচার দাবী পূরণ করতে থাকবে এবং কখনো গাফলতি ও বিস্মৃতির শিকার হবে না। তাই মহান আল্লাহ মু’মিনের এ সংজ্ঞা বর্ণনা করেন না যে, বন্দেগীর পথে এসে কখনো যার পা পিছলে যায় না সে মু’মিন। বরং বার বার পা পিছলে যাবার পরও প্রতিবারই সে একই পথে ফিরে আসে, এটিকেই আল্লাহ মু’মিনের প্রশংসনীয় গুণ হিসেবে গণ্য করেছেন। আর এটিই হচ্ছে মানুষের আয়ত্বের ভেতরের শ্রেষ্ঠতম গুণ।
আবার এ প্রসঙ্গে মু’মিনের গুণাবলীর মধ্যে সবার আগে তাওবার কথা বলার আর একটি উপযোগিতাও রয়েছে। আগে থেকে যে ধারাবাহিক বক্তব্য চলে আসছে তাতে এমনসব লোকের উদ্দেশ্যে কথা বলা হয়েছে যাদের থেকে ঈমান বিরোধী কার্যকলাপের প্রকাশ ঘটেছিল। কাজেই তাদেরকে ঈমানের তাৎপর্য ও তার মৌলিক দাবী জানিয়ে দেবার পর এবার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে যে, মু’মিনের যে অপরিহার্য গুণাবলীর অধিকারী হতে হবে তার মধ্যে প্রথম ও প্রধান গুণ হচ্ছেঃ যখনই বন্দেগীর পথ থেকে তাদের পা পিছলে যায় তারা যেন সঙ্গে সঙ্গেই আবার সেদিকে ফিরে আসে। নিজেদের সত্য বিচ্যুতির ওপর যেন অবিচল হয়ে দাড়িয়ে না থাকে এবং পিছনের দিকে বেশী দূরে চলে না যায়।
১০৯
মূল ইবারতে السَّائِحُونَ(আস সায়েহুন) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। কোন কোন মুফাসসির এর অর্থ করেছেন الصَّائِمُون (আস সা-য়েমুন) অর্থাৎ যারা রোযা রাখে। কিন্তু السَّائِحُونَ আস সায়েহুনা বা বিচরণকারীকে রোযাদার অর্থে ব্যবহার করলে সেটা হবে তার রূপক ও পরোক্ষ অর্থ। এর প্রকৃত ও প্রত্যক্ষ অর্থ এটা নয়। আর যে হাদীসে বলা হয়েছে, নবী (সা.) নিজেই এ শব্দটির এ অর্থ বিশ্লেষণ করেছেন সেটিকে নবীর ﷺ ওপর প্রয়োগ করা ঠিক নয়। তাই আমরা একে এর প্রকৃত অর্থে গ্রহণ করাকেই বেশী সঠিক মনে করি। কুরআনে বিভিন্ন জায়গায় ইসফাক শব্দটি সরল ও সাধারণ অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে, এর মানে হয় ব্যয় করা এবং এর উদ্দেশ্য আল্লাহর পথে ব্যয় করা। ঠিক তেমনি এখানে বিচরণ করা মানেও নিছক ঘোরাফেরা করা নয়। বরং এমন উদ্দেশ্যে যমীনে চলাফেরা করা, যা পবিত্র ও উন্নত এবং যার মধ্যে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্য নিহিত থাকে। যেমন, দীন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে জিহাদ করা, কুফর শাসিত এলাকা থেকে হিরজত করা, দীনের দাওয়াত দেয়া, মানুষের চরিত্র সংশোধন করা, পরিছন্ন ও কল্যাণকর জ্ঞান অর্জন করা , আল্লাহর নিদর্শনসমূহ পর্যবেক্ষণ করা এবং হালাল জীবিকা উপার্জন করা। এ গুণটিকে এখানে বিশেষভাবে মু’মিনদের গুণের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এ জন্য যে, যারা ঈমানের দাবী করা সত্ত্বেও জিহাদের আহবানে ঘর থেকে বের হয়নি তাদেরকে একথা জানিয়ে দেয়া যে, সত্যিকার মু’মিন ঈমানের দাবী করার পর নিজের জায়গায় আরামে বসে থাকতে পারে না। বরং সে আল্লাহর দীন গ্রহণ করার পর তার উন্নতি ও অগ্রগতির জন্য অবিচলভাবে দাঁড়িয়ে যায় এবং তার দাবী পূরণ করার জন্য সারা পৃথিবীব্যাপী অবিরাম প্রচেষ্টা ও সংগ্রাম চালাতে থাকে।
১১০
অর্থাৎ মহান আল্লাহ আকীদা-বিশ্বাস, ইবাদত-বন্দেগী, নৈতিক চরিত্র, সামাজিকতা, তামাদ্দুন অর্থনীতি-রাজনীতি আইন-আদালত এবং যুদ্ধ ও শান্তির ব্যাপারে যে সীমারেখা নির্ধারণ করেছেন তারা তা পুরোপুরি মেনে চলে। নিজেদের ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক কর্মকাণ্ড এ সীমারেখার মধ্যে আবদ্ধ রাখে। কখনো এ সীমা অতিক্রম করে ইচ্ছা মতো কাজ করতে থাকে না। আবার কখনো আল্লাহর আইনের পরিবর্তে মনগড়া আইনের বা মানুষের তৈরী ভিন্নতর আইনকে জীবন বিধান হিসেবে গ্রহণ করে না। এছাড়াও আল্লাহর সীমারেখা গুলো প্রতিষ্ঠিত করতে হবে এবং এগুলো লঙ্ঘন করতে দেয়া যাবে না। কাজেই সাচ্চা ঈমানদারদের সংজ্ঞা কেবল এতটুকুই নয় যে, তারা নিজেরা আল্লাহর সীমা মেনে চলে বরং তাদের অতিরিক্ত গুণাবলী হচ্ছে এই যে, তারা দুনিয়ায় আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করে, সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ করে এবং সেগুলো অটুট রাখার জন্য নিজেরদের সর্বশক্তি নিয়োগ করে।
কুরআন মাজীদের বহু স্থানে ‘আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা’ ও তা সংরক্ষণ করার নির্দেশ বর্ণিত আছে। এ শব্দাবলী অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর প্রেক্ষাপট এই যে, আল্লাহ তাআলা যত বিধান দিয়েছেন, তার প্রত্যেকটির কিছু সীমারেখা আছে। সেই সীমারেখার ভেতর থেকেই যদি তা পালন করা হয়, তবে সঠিক হয় ও পুণ্যের কাজ হিসেবে গণ্য হয়। পক্ষান্তরে যদি কোন কাজে সীমারেখা ডিঙিয়ে যাওয়া হয়, তবে সেই কাজই অপছন্দনীয় এমনকি কখনও তা গুনাহের কাজ হিসেবে গণ্য হয়। উদাহরণত আল্লাহ তাআলার ইবাদত একটি বড় সওয়াবের কাজ, কিন্তু কেউ যদি ইবাদতে এতটা মগ্ন হয়ে পড়ে যে, আল্লাহ তাআলা বান্দাদের যে সকল হক তার উপর আরোপ করেছেন, তা উপেক্ষিত হয়, তবে সেই ইবাদতও অবৈধ হয়ে যায়। তাহাজ্জুদের নামায অনেক বড় সওয়াবের কাজ, কিন্তু কেউ যদি এ নামায পড়তে গিয়ে অন্যদের ঘুম নষ্ট করে, তবে তা নাজায়েয হয়ে যায়। এমনিভাবে পিতা-মাতার সেবার উপরে কোনও নফল ইবাদত নেই, কিন্তু কেউ যদি এ কারণে স্ত্রী ও সন্তানদের হক পদদলিত করতে শুরু করে, তবে সে খেদমত গুনাহে পরিণত হয়। খুব সম্ভব এ কারণেই অনেকগুলো নেক কাজ বর্ণনা করার পর এ আয়াতের শেষে সীমারেখা সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বোঝানো হচ্ছে যে, তারা ওই সমস্ত নেক কাজ তার নির্ধারিত সীমারেখার ভেতর থেকে আঞ্জাম দেয়। আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সেসব সীমারেখা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ কথা ও কাজ দ্বারা শিক্ষা দিয়েছেন। আর তা শেখার সর্বোত্তম পন্থা হচ্ছে কোনও আল্লাহওয়ালার সাহচর্যে থাকা এবং তার কর্মপন্থা দেখে সে সকল সীমারেখা উপলব্ধি করা ও নিজ জীবনে তা রূপায়নের চেষ্টা করা।
১১২. তারা(১) তাওবাহকারী, ইবাদতকারী, আল্লাহর প্রশংসাকারী, সিয়াম পালনকারী(২), রুকূ’কারী, সিজদাকারী, সৎকাজের আদেশদাতা, অসৎকাজের নিষেধকারী এবং আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা সংরক্ষণকারী(৩); আর আপনি মুমিনদেরকে শুভ সংবাদ দিন।
(১) এ গুণাবলী হলো সেসব মুমিনের যাদের সম্পর্কে পূর্বের আয়াতে বলা হয়েছে- ‘আল্লাহ্ জান্নাতের বিনিময়ে তাদের জান-মাল খরিদ করে নিয়েছেন’। আল্লাহ্র রাহে জিহাদকারী সবাই এ আয়াতের মর্মভুক্ত। তবে এখানে যে সমস্ত গুণাবলীর উল্লেখ হয়েছে, তা শর্তরূপে নয়। কারণ, আল্লাহর রাহে কেবল জিহাদের বিনিময়েই জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। তবে এ গুণাবলী উল্লেখের উদ্দেশ্য এই যে, যারা জান্নাতের উপযুক্ত, তারা এ সকল গুণের অধিকারী হয়। (কুরতুবী)
(২) অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে আয়াতে উল্লেখিত السَّائِحُونَ দ্বারা উদ্দেশ্য সাওম পালনকারীগণ। (কুরতুবী; ইবন কাসীর) আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ ও আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুম বলেন, কুরআন মজীদে ব্যবহৃত سائحين শব্দের অর্থ রোযাদার। (বাগভী; কুরতুবী) তাছাড়া سائح বলে জিহাদকারীদেরকেও বুঝায়। তবে মূল শব্দটি سياحة যার অর্থঃ দেশ ভ্রমণ। বিভিন্ন ধর্মের লোক দেশ ভ্রমণকে ইবাদাত মনে করতো। অর্থাৎ মানুষ পরিবার পরিজন ও ঘর-বাড়ী ত্যাগ করে ধর্ম প্রচার করার উদ্দেশ্যে দেশ দেশান্তরে ঘুরে বেড়াত। ইসলাম একে বৈরাগ্যবাদ বলে অভিহিত করে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে (ইবন কাসীর) এর পরিবর্তে সিয়াম পালনের ইবাদতকে এর স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে। আবার কতিপয় বর্ণনায় জিহাদকেও দেশ ভ্রমনের অনুরূপ বলা হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমার উম্মতের দেশভ্রমণ হলো জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ। (আবু দাউদ: ২৪৮৬)
(৩) আলোচ্য আয়াতে মুমিন মুজাহিদের আটটি গুণ উল্লেখ করে নবম গুণ হিসেবে বলা হয়েছে “আর আল্লাহর দেয়া সীমারেখার হেফাযতকারী” মূলতঃ এতে রয়েছে উপরোক্ত সাতটি গুণের সমাবেশ। অর্থাৎ সাতটি গুণের মধ্যে যে তাফসীল রয়েছে, তার সংক্ষিপ্ত সার হলো যে, এরা নিজেদের প্রতিটি কর্ম ও কথায় আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সীমা তথা শরীআতের হুকুমের অনুগত ও তার হেফাযতকারী। (আত-তাহরীর ওয়াত তানওয়ীর)
(১১২) তারা হচ্ছে তওবাকারী, ইবাদতকারী, প্রশংসাকারী, রোযা পালনকারী, রুকু ও সিজদাকারী, সৎকাজে আদেশ এবং মন্দ কাজে বাধা প্রদানকারী, আল্লাহর বিধি-সীমাসমূহের সংরক্ষণকারী।(1) আর তুমি বিশ্বাসীদেরকে সুসংবাদ দাও।(2)
(1) এখানে ঐ সকল মু’মিন ব্যক্তিদের আরো কিছু গুণ বর্ণনা করা হচ্ছে, যাদের জান ও মাল আল্লাহ তাআলা জান্নাতের বিনিময়ে ক্রয় করে নিয়েছেন। তারা গুনাহ ও অশ্লীলতা থেকে তওবাকারী হবে, নিয়মিত আপন প্রভূর ইবাদতকারী হবে, আর মুখে আল্লাহর প্রশংসা বর্ণনাকারী এবং এই আয়াতে বর্ণিত সকল গুণের অধিকারী হবে। অধিকাংশ তফসীরবিদদের মতে سَائحُون এর অর্থ রোযাপালনকারী। এই অর্থকেই ইবনে কাসীর (রহঃ) সহীহ ও প্রসিদ্ধ মত বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। অনেকে তার অর্থ আল্লাহর পথে জিহাদ বলেছেন। এরপরেও ‘সিয়াহাত’ এর অর্থ দেশ-ভ্রমণ নয় যেমন অনেকে এই অর্থ নিয়েছেন। অনুরূপ ইবাদতের জন্য পাহাড়ের চূড়া, গুহা এবং নির্জন মরুভূমিতে গিয়ে বসবাস করাও এর অর্থ নয়। কারণ তা বৈরাগ্যবাদের একটা অংশ যা ইসলাম ধর্মে নেই। তবে হ্যাঁ, ফিতনার সময় নিজের দ্বীন বাঁচানোর তাগীদে শহর ও জনবসতি ত্যাগ করে জঙ্গল ও মরুভূমিতে গিয়ে বাস করার অনুমতি হাদীসে দেওয়া হয়েছে। (বুখারী)
(2) উদ্দেশ্য হল যে, বিশ্বাসী বা পূর্ণ মু’মিন ঐ ব্যক্তি; যে কথা ও কর্মে ইসলামী শিক্ষার উত্তম নমুনা হয় এবং আল্লাহর নিষিদ্ধ বস্তু থেকে বিরত থাকে এবং আল্লাহর নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘনকারী নয় বরং তার সংরক্ষণকারী হয়। এরূপ পূর্ণ মু’মিনরাই সুসংবাদের অধিকারী। এটা সেই কথাই, যা কুরআনে (آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَات) শব্দ দ্বারা বার বার উক্ত হয়েছে। এখানে কিছু নেক আমলের কথা কিঞ্চিৎ বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।