يَـٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِيُّ جَٰهِدِ ٱلۡكُفَّارَ وَٱلۡمُنَٰفِقِينَ وَٱغۡلُظۡ عَلَيۡهِمۡۚ وَمَأۡوَىٰهُمۡ جَهَنَّمُۖ وَبِئۡسَ ٱلۡمَصِيرُ,

ইয়াআইয়ুহান্নাবিইয়ুজা-হিদিল কুফফা-র ওয়াল মুনা-ফিকীনা ওয়াগলুজ‘আলাইহিম ওয়া মা’ওয়া-হুম জাহান্নামু ওয়া বি’ছাল মাসীর।উচ্চারণ

হে নবী! ৮১ পূর্ণ শক্তি দিয়ে কাফের ও মুনাফিক উভয়ের মোকাবিল করো এবং তাদের প্রতি কঠোর হও। ৮২ শেষ পর্যন্ত তাদের আবাস হবে জাহান্নাম এবং তা অত্যন্ত নিকৃষ্ট অবস্থান স্থল। তাফহীমুল কুরআন

হে নবী! কাফের ও মুনাফিকদের সাথে জিহাদ কর #%৬৪%# এবং তাদের প্রতি কঠোর হও। তাদের ঠিকানা জাহান্নাম আর তা অতি মন্দ ঠিকানা।মুফতী তাকী উসমানী

হে নাবী! কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ কর এবং তাদের প্রতি কঠোরতা অবলম্বন কর। তাদের বাসস্থান হচ্ছে জাহান্নাম; এবং ওটা নিকৃষ্ট স্থান।মুজিবুর রহমান

হে নবী, কাফেরদের সাথে যুদ্ধ করুন এবং মুনাফেকদের সাথে তাদের সাথে কঠোরতা অবলম্বন করুন। তাদের ঠিকানা হল দোযখ এবং তাহল নিকৃষ্ট ঠিকানা।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

হে নবী ! কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ কর ও এদের প্রতি কঠোর হও ; এদের আবাসস্থল জাহান্নাম, উহা কত নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তনস্থল! ইসলামিক ফাউন্ডেশন

হে নবী, কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ কর এবং তাদের উপর কঠোর হও, আর তাদের ঠিকানা হল জাহান্নাম; আর তা কতইনা নিকৃষ্ট স্থান।আল-বায়ান

হে নাবী! কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর, তাদের প্রতি কঠোরতা অবলম্বন কর, তাদের বাসস্থান হল জাহান্নাম, আর তা কতই না নিকৃষ্ট আশ্রয়স্থল!তাইসিরুল

হে প্রিয় নবী! অবিশ্বাসীদের ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করো, আর তাদের প্রতি কঠোর হও। আর তাদের আবাসস্থল জাহান্নাম। আর মন্দ সেই গন্তব্যস্থান।মাওলানা জহুরুল হক

তাফহীমুল কুরআন

৮১

তাবুক যুদ্ধের পর যে ভাষণটি নাযিল হয়েছিল এখান থেকে সেই তৃতীয় ভাষণটি শুরু হচ্ছে।

৮২

এ পর্যন্ত মুনাফিকদের কার্যকলাপের ব্যাপারে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে উপেক্ষার নীতি অবলম্বন করা হচ্ছিল। এর দু’টি কারণ ছিল। এক, তখনো পর্যন্ত মুসলমানদের হাত এত বেশী শক্তিশালী হতে পারেনি, যে, বাইরের শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করার সাথে সাথে তারা ভেতরের শত্রুদের সাথেও লড়াই করতে পারতো। দুই, যারা সন্দেহ-সংশয়ে ডুবে ছিল ঈমান ও প্রত্যয় লাভ করার জন্য তাদেকে যথেষ্ট সুযোগ দেয়াই ছিল উদ্দেশ্য। এ দু’টি কারণ এখন আর বর্তমান ছিল না। মুসলিম শক্তি এখন সমগ্র আরব ভূখণ্ডকে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন করে নিয়েছিল এবং আরবের বাইরের শক্তিগুলোর সাথে সংঘাতের সিলসিলা শুরু হতে যাচ্ছিল। এ কারণে ঘরের এ শত্রুদের মাথা গুড়ো করে দেয়া এখন সম্ভবও ছিল এবং অপরিহার্যও হয়ে পড়েছিল। তাহলে তারা আর বিদেশী শক্তির সাথে হাত মিলিয়ে দেশে আভ্যন্তরীণ বিপদ সৃষ্টি করতে পারতো না। তাছাড়া তাদেরকে ৯ বছর সময় দেয়া হয়েছিল চিন্তা-ভাবনা করার, বুঝার এবং আল্লাহর সত্য দ্বীনকে যাচাই-পর্যালোচনা করার জন্য। তাদের মধ্যে যথার্থ কল্যাণ লাভের কোন আকাঙ্ক্ষা থাকলে তারা এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে পারতো। এরপর তাদেরকে আরো বেশী সুযোগ সুবিধা দেয়ার মুনাফিকদের বিরুদ্ধেও এবার জিহাদ শুরু করে দিতে হবে এবং এদের ব্যাপারে এ পর্যন্ত যে উদার নীতি অবলম্বন করা হয়েছে তার অবসান ঘটিয়ে কঠোর নীতি অবলম্ব করতে হবে।

তাই বলে মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা ও কঠোর নীতি অবলম্বন করার মানে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা নয়। আসলে এর অর্থ হচ্ছে, তাদের মুনাফিকী মনোভাব ও কর্মনীতিকে এ পর্যন্ত যেভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে এবং যে কারণে তারা মুসলমানদের সাথে মিলেমিশে থেকেছে, সাধারণ মুসলমানরা তাদেরকে নিজেদের সমাজেরই একটি অংশ মেনে করেছে এবং তারা ইসলামী দল ও সংগঠনের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করার ও ইসলামী সমাজে মুনাফিকীর বিষ ছড়াবার যে সুযোগ পেয়েছে তা এখন ভবিষ্যতের জন্য সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দিতে হবে। এখন যে ব্যক্তিই মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে মুনাফিকী নীতি অবলম্বন করবে এবং যার কার্যধারা থেকে একথাও প্রকাশ হবে, যে সে আল্লাহ, তাঁর রসূল ও মু’মিনদের অন্তরঙ্গ বন্ধু নয়, সর্ব সম্মুখে তার মুখোশ খুলে দিতে হবে এবং নিন্দা করতে হবে। মুসলিম সমাজে তার মর্যাদা ও আস্থা লাভের সকল প্রকার সুযোগ খতম করে দিতে হবে। তাকে সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে। দলীয় পরামর্শের ক্ষেত্রে থেকে তাকে দূরে রাখতে হবে। আদালতে তার সাক্ষ্য অনির্ভরযোগ্য গণ্য করতে হবে। বড় বড় পদ ও মর্যাদার দরজা তার জন্য বন্ধ করে দিতে হবে। সভা-সমিতিতে তাকে গুরুত্ব দেবে না। প্রত্যেক মুসলমান তার সাথে এমন আচরণ করবে যাতে সে নিজে অনুভব করতে পারে যে, সমগ্র মুসলিম সমাজে কোথাও তার কোন মর্যাদা ও গুরুত্ব নেই এবং কারো অন্তরে তার জন্য এতটুকু সম্ভ্রমবোধও নেই। তারপর তাদের মধ্য থেকে কোন ব্যক্তি যদি কোন সুস্পষ্ট বিশ্বাসঘাতকতা করে তাহলে তার অপরাধ লুকানো যাবে না এবং তাকে ক্ষমা করা ও যাবে না। বরং সর্ব সম্মুখে তার বিরুদ্ধে মোকদ্দামা চালাতে হবে এবং তাকে উপযুক্ত শাস্তি দিতে হবে।

এটি ছিল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ। এ পর্যায়ে মুসলমানদেরকে এ নির্দেশটি দেয়ার প্রয়োজন ছিল। এছাড়া ইসলামী সমাজকে অবনতি ও পতনের আভ্যন্তরীণ কার্যকারণ থেকে সংরক্ষণ করা সম্ভব হতো না। যে জামায়াত ও সংগঠন তার নিজের মধ্যে মুনাফিক ও বিশ্বাসঘাতকদেরকে লালন করে এবং যেখানে দুধকলা দিয়ে সাপ পোষা হয়, তার নৈতিক অধঃপতন এবং সবশেষে পূর্ণ ধ্বংস ছাড়া গত্যন্তর নেই। মুনাফিকী প্লেগের মতো একটি মহামারী। আর মুনাফিক হচ্ছে এমন একটি ইঁদুর যে এ মহামারীর জীবাণু বহন করে বেড়ায়। তাকে জনবসতির মধ্যে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার সুযোগ দেয়ার অর্থ গোটা জনবসতিকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া। মুসলমানদের সমাজে একজন মুনাফিকদের মর্যাদা ও সম্ভ্রম লাভ করার অর্থ হলো হাজার হাজার মানুষকে বিশ্বাসঘাতকতা ও মুনাফিকী করতে দুঃসাহস যোগানো। এতে সাধারণ্যে এ ধারণা বিস্তার লাভ করে যে, এ সমাজে মার্যাদা লাভ করার জন্য আন্তরিকতা, সদিচ্ছা ও সাচ্চা ঈমানদারীর কোন প্রয়োজন নেই। বরং মিথ্যা ঈমানদের প্রদর্শনীয় সাথে খেয়ানত ও বিশ্বাসঘাতকতার পথ অবলম্বন করেও এখানে মানুষ ফুলে ফেঁপে বড় হয়ে উঠতে পারে। একথাটিই রসূলুল্লাহ ﷺ তার একটি সংক্ষিপ্ত জ্ঞানগর্ভ বক্তব্যের মাধ্যমে এভাবে বর্ণনা করেছেনঃ

من وقر صاحب بدعة فقد أعان على هدم الإسلام

“যে ব্যক্তি কোন বিদআত পন্থীকে সম্মান করলো সে আসলে ইসলামের ইমারত ভেঙ্গে ফেলতে সাহায্য করলো।”

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

‘জিহাদ’-এর মূল অর্থ, চেষ্টা, মেহনত ও পরিশ্রম করা। দ্বীনের হেফাজত ও প্রতিরক্ষার জন্য এ মেহনত সশস্ত্র সংগ্রাম রূপেও হতে পারে এবং মৌখিক দাওয়াত ও তাবলীগ, আলোচনা-পর্যালোচনা ও তর্ক-বিতর্কের পন্থায়ও হতে পারে। যারা প্রকাশ্য কাফের, তাদের সাথে জিহাদ দ্বারা এখানে প্রথমোক্ত অর্থই বোঝানো হয়েছে। আর মুনাফিকদের সাথে জিহাদ দ্বারা দ্বিতীয় অর্থ উদ্দেশ্য। মুনাফিকরা যেহেতু মুখে ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করত তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের অপতৎপরতা সত্ত্বেও হুকুম দেন যে, দুনিয়ায় তাদের সাথে মুসলিমদের মতই ব্যবহার করতে হবে। সুতরাং তাদের সাথে জিহাদের অর্থ হবে মৌখিক জিহাদ। আর তাদের প্রতি কঠোর হওয়ার অর্থ, কথাবার্তায় তাদের কোনও খাতির না করা এবং তাদের দ্বারা শাস্তিযোগ্য কোন অপরাধ ঘটলে তাদেরকে ক্ষমা না করা।

তাফসীরে জাকারিয়া

৭৩. হে নবী কাফের ও মুনাফেকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করুন(১), তাদের প্রতি কঠোর হোন(২); এবং তাদের আবাসস্থল জাহান্নাম, আর তা কত নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তন স্থল!

(১) আয়াতে কাফের ও মুনাফিক উভয় সম্প্রদায়ের সাথে জিহাদ করতে এবং তাদের ব্যাপারে কঠোর হতে রাসূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। (তাবারী) প্রকাশ্যভাবে যারা কাফের তাদের সাথে জিহাদ করার বিষয়টি তো সুস্পষ্ট যে তাদের বিরুদ্ধে সার্বিকভাবে জিহাদ করতে হবে, কিন্তু মুনাফিকদের সাথে জিহাদ কিভাবে করতে হবে। আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, তাদের বিরুদ্ধেও হাত দিয়ে, সম্ভব না হলে মুখ দিয়ে, তাতেও সম্ভব না হলে অন্তর দিয়ে জিহাদ করতে হবে। আর সেটা হচ্ছে তাদেরকে দেখলে কঠোরভাবে তাকানো। (বাগভী)

ইবন আব্বাস বলেন, তাদের সাথে জিহাদ করার মর্ম হল মৌখিক জিহাদ এবং কোমলতা পরিত্যাগ। (তাবারী) অর্থাৎ তাদেরকে ইসলামের সত্যতা উপলব্ধি করার জন্য আমন্ত্রণ জানাতে হবে যাতে করে তারা ইসলামের দাবীতে নিষ্ঠাবান হয়ে যেতে পারে। দাহহাক বলেন, তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ হচ্ছে, কথায় কঠোরতা অবলম্বন। কাতাদা বলেন, এক্ষেত্রে বাস্তব ও কার্যকর কঠোরতাই বুঝানো হয়েছে, অর্থাৎ তাদের উপর শরীআতের হুকুম জারী করতে গিয়ে কোন রকম দয়া বা কোমলতা করবেন না। (বাগভী)

(২) এখানে বর্ণিত غلظة এর প্রকৃত অর্থ হল, উদ্দিষ্ট ব্যক্তি যে আচরণের যোগ্য হবে তাতে কোন রকম কোমলতা যেন না করা হয়। এ শব্দটি رأفة এর বিপরীতে ব্যবহৃত হয়, যার অর্থ হল কোমলতা ও করুণা। (ফাতহুল কাদীর)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

(৭৩) হে নবী! তুমি কাফের ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ কর(1) এবং তাদের প্রতি কঠোর হও।(2) তাদের বাসস্থান হবে জাহান্নাম এবং তা কত নিকৃষ্ট ঠিকানা। (3)

(1) এই আয়াতে নবী (সাঃ)-কে কাফের ও মুনাফিক্বদের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে ও তাদের প্রতি কঠোর হতে আদেশ করা হচ্ছে। নবী (সাঃ)-এর গত হওয়ার পর তাঁর উম্মত হল এ সম্বোধনের লক্ষ্য। কাফেরদের সাথে সাথে মুনাফিক্বদের বিরুদ্ধেও জিহাদ করার যে আদেশ করা হয়েছে এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। এক রায় হল এই যে, যদি মুনাফিক্বদের মুনাফিক্বী এবং তাদের চক্রান্ত স্পষ্টাকারে প্রকাশ পায়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করতে হবে; যেমন কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হয়ে থাকে। দ্বিতীয় রায় হল যে, মুনাফিক্বদের বিরুদ্ধে জিহাদ হল এই যে, তাদেরকে জিহ্বা দ্বারা ওয়ায-নসীহত করা হবে অথবা তারা চারিত্রিক কোন সীমালংঘন করলে তাদের উপর হদ্দ্ (দন্ডবিধি) জারী করা হবে। তৃতীয় রায় হল যে, জিহাদের হুকুম কাফেরদের ব্যাপারে এবং কঠোরতা মুনাফিক্বদের ব্যাপারে। ইমাম ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন যে, এই সমস্ত রায়ের মধ্যে কোন পরস্পর-বিরোধিতা নেই। কেননা, অবস্থা ও পরিস্থিতি বুঝে এসব রায়ের মধ্যে কোন একটার উপর আমল করা বৈধ।

(2) غِلظَة শব্দটি رَأفَة এর বিপরীত; যার অর্থ হল নম্রতা ও দয়া। এই হিসাবে غِلظَة এর অর্থ হল কঠোরতা ও শক্তিমত্তার সাথে শত্রুদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া। কেবলমাত্র জিহ্বা দ্বারা কঠোরতা উদ্দেশ্য নয়। যেহেতু তা নবী (সাঃ)-এর সুমহান চরিত্রের পরিপন্থী। সুতরাং তা তিনি অবলম্বন করতে পারতেন না এবং আল্লাহ তাআলা তা অবলম্বন করতে আদেশও দিতেন না।

(3) জিহাদ এবং কঠোরতার সম্পর্ক পার্থিব জীবনের সাথে। আর আখেরাতে তাদের জন্য জাহান্নাম প্রস্তুত রয়েছে যা নিকৃষ্টতম স্থান।