ফালা-তু‘জিবকা আমওয়া-লুহুম ওয়ালাআওলা-দুহুম ইন্নামা-ইউরীদুল্লা-হু লিইউ‘আযযিবাহুম বিহা-ফিল হায়া-তিদদুনইয়া-ওয়া তাঝহাকা আনফুছুহুম ওয়া হুম কাফিরূন ।উচ্চারণ
তাদের ধন-দৌলত ও সন্তানের আধিক্য দেখে তোমরা প্রতারিত হয়ো না। আল্লাহ চান, এ জিনিসগুলোর মাধ্যমে দুনিয়ার জীবনে তাদের শাস্তি দিতে। ৫৪ আর তারা যদি প্রাণও দিয়ে দেয়, তাহলে তখন তারা থাকবে সত্য অস্বীকার করার অবস্থায়। ৫৫ তাফহীমুল কুরআন
তাদের অর্থ-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি (-এর আধিক্য) দেখে তোমার বিস্মিত হওয়া উচিত নয়। আল্লাহ তো চান দুনিয়ার জীবনে তাদেরকে এসব জিনিস দ্বারাই শাস্তি দিতে। #%৪৬%# আর যাতে কাফির অবস্থায়ই তাদের প্রাণ বের হয়।মুফতী তাকী উসমানী
অতএব তাদের ধন-সম্পদ এবং সন্তান-সন্ততি যেন তোমাকে বিস্মিত না করে; আল্লাহর ইচ্ছা শুধু এটাই যে, এসব বস্তুর কারণে তাদেরকে পার্থিব জীবনে আযাবে আবদ্ধ রাখেন এবং তাদের প্রাণ কুফরী অবস্থায় বের হয়।মুজিবুর রহমান
সুতরাং তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন আপনাকে বিস্মিত না করে। আল্লাহর ইচ্ছা হল এগুলো দ্বারা দুনিয়ার জীবনে তাদের আযাবে নিপতিত রাখা এবং প্রাণবিয়োগ হওয়া কুফরী অবস্থায়।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
সুতরাং এদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তোমাকে যেন বিমুগ্ধ না করে, আল্লাহ্ তো এর দিয়েই এদেরকে পার্থিব জীবনে শাস্তি দিতে চান। এরা কাফির থাকা অবস্থায় এদের আত্মা দেহ ত্যাগ করবে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন
অতএব তোমাকে যেন মুগ্ধ না করে তাদের ধন-সম্পদ এবং সন্তানাদি, আল্লাহ এর দ্বারা কেবল তাদের আযাব দিতে চান দুনিয়ার জীবনে এবং তাদের জান বের হবে কাফির অবস্থায়।আল-বায়ান
কাজেই তাদের ধন-সম্পত্তি আর সন্তান-সন্ততি যেন তোমার চোখ ধাঁধিয়ে না দেয়, ওসব দিয়েই আল্লাহ দুনিয়াতে ওদেরকে শাস্তি দিতে চান আর কাফির অবস্থাতেই যেন তাদের জান বাহির হয়।তাইসিরুল
তাদের ধনদৌলত তোমাকে যেন তাজ্জব না করে আর তাদের সন্তানসন্ততিও না। আল্লাহ্ আলবৎ চান এ-সবের দ্বারা পার্থিব জীবনে তাদের শাস্তি দিতে; আর তাদের প্রাণ ত্যাগ করে যায় তাদের অবিশ্বাসী থাকা অবস্থায়।মাওলানা জহুরুল হক
৫৪
অর্থাৎ এ ধন-সম্পদ ও সন্তান সন্তুতির মায়ার ডোরে আবদ্ধ হয়ে তারা সে মুনাফিকী নীতি অবলম্বন করেছে, সেজন্য মুসলিম সমাজে তারা চরমভাবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হবে। এতদিনকার আরবীয় সমাজে তাদের যে প্রভাব-প্রতিপত্তি, মান-মর্যাদা, নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব ছিল নব্য ইসলামী সামাজ ব্যবস্থায় তা সম্পূর্ণ মাটিতে মিশে যাবে। যেসব নগণ্য দাস ও দাস পুত্ররা এবং মামুলী কৃষক ও রাখালরা ঈমানী নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার প্রমাণ পেশ করেছে, এ নতুন সমাজে তারা হবে মর্যাদাশীল অন্যদিকে বংশানুক্রমিক সমাজনেতা ও সমাজপতিরা নিজেদের দুনিয়া প্রীতির কারণে মর্যাদাহীন হয়ে পড়বে।
হযরত উমরের (রা.) মজলিসে একবার একটি ঘটনা ঘটেছিল। সেটি ছিল এ অবস্থার একটি চমকপ্রদ চিত্র। সুহাইল ইবনে আমর ও হারেস ইবনে হিশামের মতো বড় বড় কুরাইশী সরদাররা হযরত উমরের (রা.) সাথে সাক্ষাত করতে গিয়েছিলেন। সেখানে আনসার ও মহাজিরদের মধ্যে থেকে মামুলী পর্যায়ের কোন লোক হলেও হযরত উমর (রা.) তাকে ডেকে নিজের কাছে বসাচ্ছিলেন এবং এ সমাজপতিদের সরে তার জন্য জায়গা করে দিতে বলেছিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে সমাজপতিরা সরতে সরতে একেবারে মজলিসের কিনারে গিয়ে পৌঁছলেন। বাইরে বের হয়ে এসে হারেস ইবনে হিশাম নিজের সাথীদের বললেন, তোমরা দেখলে তো আজ আমাদের সাথে কি ব্যবহার করা হলো? সুহাইল ইবনে আমর বললেন, এতে উমরের কোন দোষ নেই। দোষ আমাদের। কারণ আমাদের যখন এ দ্বীনের দিকে ডাকা হয়েছিল তখন আমরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলাম এবং এ লোকেরা দৌড়ে এসেছিল। তারপর এ দু সমাজপতি দ্বিতীয়বার হযরত উমরের কাছে হাযির হলেন। এবার তারা বললেন, আজ আমরা আপনার আচরণ দেখলাম। আমরা জানি, আমাদের ত্রুটির কারণেই এ অবস্থা হয়েছে। কিন্তু এখন এর প্রতিবিধানের কোন উপায় আছে কি? হযরত উমর (রা.) মুখে কোন জবাব দিলেন না। তিনি শুধু রোম সীমান্তের দিকে ইশারা করলেন। মানে, তিনি বলতে চাচ্ছিলেন, এখন জিহাদের ময়দানে জান-মাল উৎসর্গ করো, তাহলে হয়তো তোমরা নিজেদের হারানো মর্যাদা আবার ফিরে পাবে।
৫৫
অর্থাৎ এতসব লাঞ্ছনা-গাঞ্জনার মধ্যেও তাদের জন্য আরো বড় বিপদ হবে এই যে, তারা নিজেদের মধ্যে যে মুনাফিকী চরিত্র বৈশিষ্ট্য লালন করছে তার বদৌলতে মরার আগ পর্যন্ত তারা সত্যিকার ঈমান লাভের সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত থাকবে এবং নিজেদের পার্থিব সুখ-সুবিধা ধ্বংস করার পর দুনিয়া থেকে এমন অবস্থায় বিদায় নেবে যে, তাদের আখেরাত হবে এর চাইতেও অনেক বেশী খারাপ।
এ আয়াত দুনিয়ার ধন-দৌলত সম্পর্কিত এক মহা সত্যের প্রতি ইশারা করছে। ইসলামের শিক্ষা হল, ধন-দৌলত এমনিতে এমন কোন বিষয় নয়, যাকে মানুষ তার জীবনের লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে। মানুষের আসল লক্ষ্য তো হবে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জন ও আখিরাতের সর্বোত্তম প্রস্তুতি গ্রহণ। তবে দুনিয়ায় বেঁচে থাকতে হলে যেহেতু অর্থ-সম্পদের প্রয়োজন, তাই বৈধ উপায়ে তা অর্জন করা চাই। এক্ষেত্রেও ভুলে গেলে চলবে না যে, দুনিয়ার প্রয়োজন সমাধায়ও অর্থ-সম্পদ স্বয়ং সরাসরি কোনও উপকার দিতে পারে না। বরং তা আরাম-আয়েশের উপকরণ সংগ্রহের মাধ্যমই হতে পারে। মানুষ যখন তাকে জীবনের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে নেয় এবং সর্বদা এই ধান্ধায় পড়ে থাকে যে, দিন-দিন তা কিভাবে বাড়ানো যায়, তবে সে বেচারার জন্য অর্থ-সম্পদ একটা মুসিবত হয়ে দাঁড়ায়। সে যে এই ধান্ধার ভেতর নিজের সুখণ্ডশান্তি সব বিসর্জন দিয়েছে সে খবরও তার থাকে না। এতে কোনও সন্দেহ নেই যে, তার ব্যাংক-ব্যালান্স উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিন্তু তার তো দিনেও স্বস্তি নেই, রাতেও আরাম নেই। না স্ত্রী-সন্তানদের সাথে কথা বলার ফুরসত আছে আর না আরাম-আয়েশের উপকরণসমূহ ভোগ করার অবকাশ আছে। যদি কখনও তার অর্থ-বিত্তে লোকসান দেখা দেয়, তবে তো মাথার উপর দুঃখের পাহাড় ভেঙ্গে পড়ে। কেননা তার তো সে লোকসানের বিনিময়ে আখিরাতে কিছু পাওয়ার ধারণা নেই। এভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে, দুনিয়াদারের পক্ষে অর্থ-বিত্ত তার দুনিয়ার জীবনেই আযাব হয়ে দাঁড়ায়।
৫৫. কাজেই তাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি আপনাকে যেন বিমুগ্ধ না করে, আল্লাহ তো এসবের দ্বারাই তাদেরকে দুনিয়ার জীবনে শাস্তি দিতে চান। আর তাদের আত্মা দেহত্যাগ করবে কাফের থাকা অবস্থায়।(১)
(১) এ আয়াতে মুনাফিকদের জন্যে তাদের ধন সম্পদ ও সন্তান সন্ততিকে যে আযাব বলে অভিহিত করা হয়েছে, তার কারণ হল, দুনিয়ার মোহে উন্মত্ত থাকা মানুষের জন্যে পার্থিব জীবনেও এক বড় আযাব। প্রথমে অর্থ উপার্জনের সুতীব্র কামনা, অতঃপর তা হাসিলের জন্যে নানা চেষ্টা তদবীর নিরন্তর দৈহিক ও মানসিক পরিশ্রম, না দিনের আরাম না রাতের ঘুম, না স্বাস্থ্যের হেফাযত আর না পরিবার পরিজনের সাথে আমোদ আহলাদের অবকাশ। অতঃপর হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম দ্বারা যা কিছু অর্জিত হয়, তার রক্ষণাবেক্ষণ ও তাকে দ্বিগুণ চতুর্গুণ বৃদ্ধি করার অবিশ্রান্ত চিন্তা ভাবনা প্রভৃতি হল একেকটি স্বতন্ত্র আযাব। এরপরে যদি কোন দুর্ঘটনা ঘটে বা রোগ ব্যাধির কবলে পতিত হয়, তখন যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ে।
সৌভাগ্যক্রমে সবই যদি ঠিক থাকে এবং মনের চাহিদামত অর্থকড়ি আসতে থাকে, তখন তার নিরাপত্তার প্রয়োজন ও উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায় এবং তখন সে চিন্তা ফিকির তাকে মুহুর্তের জন্যও আরামে বসতে দেয়না। পরিশেষে এ সকল অর্থ সম্পদ যখন মৃত্যুকালে বা তার আগে হাত ছাড়া হতে দেখে, তখন দুঃখ ও অনুশোচনার অন্ত থাকেনা। বস্ততঃ এসবই হল আযাব। অজ্ঞ মানুষ একে শান্তি ও আরামের সম্বল মনে করে। কিন্তু মনের প্রকৃত শান্তি ও তৃপ্তি কিসে, তার সন্ধান নেয় না। তাই শান্তির এই উপকরণকেই প্রকৃত শান্তি মনে করে তা নিয়েই দিবা নিশি ব্যস্ত থাকে। অথচ প্রকৃতপক্ষে তা দুনিয়ার জীবনে তার আরামের শক্র এবং আখেরাতের আযাবের পটভূমি। (ইবনুল কাইয়্যেম: ইগাসাতুল লাহফানঃ ১/৩৫-৩৬)
এ আয়াতের সমর্থনে কুরআনের অন্যত্র আরও এসেছে, “আর আপনি আপনার দু'চোখ কখনো প্রসারিত করবেন না তার প্রতি, যা আমরা বিভিন্ন শ্ৰেণীকে দুনিয়ার জীবনের সৌন্দর্যস্বরূপ উপভোগের উপকরণ হিসেবে দিয়েছি তা দ্বারা তাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য। আপনার রব-এর দেয়া জীবনোপকরণ উৎকৃষ্ট ও অধিক স্থায়ী। (সূরা ত্বা-হাঃ ১৩১) আরও বলেন, “তারা কি মনে করে যে, আমরা তাদেরকে যে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দ্বারা সহযোগিতা করছি, তার মাধ্যমে, তাদের জন্য সকল মংগল ত্বরান্বিত করছি? না, তারা উপলব্ধি করে না। (সূরা আল মুমিনুন: ৫৫–৫৬)
(৫৫) অতএব তাদের ধন-সম্পদ এবং সন্তানাদি যেন তোমাকে বিস্মিত না করে। (1) আল্লাহর ইচ্ছা শুধু এটাই যে, এসব বস্তুর মাধ্যমে তাদেরকে পার্থিব জীবনে শাস্তি প্রদান করবেন(2) এবং তাদের প্রাণ কাফের অবস্থাতে দেহত্যাগ করবে। (3)
(1) কারণ, এ সব তাদের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ। যেমন মহান আল্লাহ আরো বলেন, ‘‘আমি তাদের বিভিন্ন শ্রেণীকে পরীক্ষা করার জন্য পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য-স্বরূপ ভোগ-বিলাসের যে উপকরণ দিয়েছি, তার প্রতি তুমি কখনোও তোমার চক্ষুদ্বয় প্রসারিত করো না।’’ (সূরা ত্বাহা ১৩১ আয়াত) ‘‘তারা কি মনে করে যে, আমি তাদেরকে সাহায্য স্বরূপ যে ধনৈশ্বর্য ও সন্তান-সন্ততি দান করি তার দ্বারা তাদের জন্যে সর্বপ্রকার মঙ্গল ত্বরান্বিত করছি? বরং তারা বুঝে না।’’ (সূরা মু’মিনূন ৫৫-৫৬ আয়াত)
(2) ইমাম ইবনে কাসীর এবং ইবনে জারীর ত্বাবারী (রঃ) বলেছেন, এ শাস্তি থেকে যাকাত ও আল্লাহর রাস্তায় দান-খয়রাত উদ্দেশ্য। অর্থাৎ, এই মুনাফিক্বদের নিকট থেকে যাকাত ও স্বাদক্বাহ (যা তারা নিজেদেরকে মুসলমান প্রকাশ করার জন্য দিয়ে থাকে তা) দুনিয়াতে কবুল করে নেওয়া হোক, যাতে এইভাবে তাদেরকে সম্পদের মারও দুনিয়াতে দেওয়া হয়।
(3) পরন্তু তাদের মৃত্যু কুফরী অবস্থায় আসবে। যেহেতু, তারা আল্লাহর পয়গম্বরকে সত্য হৃদয়ে স্বীকার করতে রাজী নয়; বরং তারা তাদের কুফরী ও নিফাকেই দস্তরমত অটল রয়েছে।