লাকাদ নাসারকুমুল্লা-হু ফী মাওয়া-তিনা কাছীরতিওঁ ওয়া ইয়াওমা হুনাইনিন ইযআ‘জাবাতকুম কাছরতুকুম ফালাম তুগনি ‘আনকুম শাইআওঁ ওয়া দা-কাত ‘আলাইকুমুল আরদুবিমা-রহুবাত ছুম্মা ওয়াল্লাইতুম মুদবিরীন।উচ্চারণ
এর আগে আল্লাহ বহু ক্ষেত্রে তোমাদের সাহায্য করছেন। এই তো সেদিন, হুনায়েন যুদ্ধের দিন (তাঁর সাহায্যের অভাবনীয় রূপ তোমরা দেখছো) , ২৩ সেদিন তোমাদের মনে তোমাদের সংখ্যাধিক্যের অহমিকা ছিল। কিন্তু তা তোমাদের কোন কাজে আসেনি। আর এত বড় বিশাল পৃথিবীও তোমাদের জন্য সংকুচিত হয়ে গিয়েছিল এবং তোমরা পেছনে ফিরে পালিয়ে গিয়েছিলে। তাফহীমুল কুরআন
বস্তুত আল্লাহ বহু ক্ষেত্রে তোমাদের সাহায্য করেছেন এবং (বিশেষ করে) হুনায়নের দিন, যখন তোমাদের সংখ্যাধিক্য তোমাদেরকে আত্মপ্রসাদে লিপ্ত করেছিল। #%২০%# কিন্তু সে সংখ্যাধিক্য তোমাদের কোনও কাজে আসেনি এবং যমীন তার প্রশস্ততা সত্ত্বেও তোমাদের জন্য সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল। অতঃপর তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে (যুদ্ধক্ষেত্র হতে) পলায়ণ করেছিলে।মুফতী তাকী উসমানী
অবশ্যই আল্লাহ তোমাদেরকে (যুদ্ধে) বহু ক্ষেত্রে বিজয়ী করেছেন এবং হুনাইনের দিনেও। যখন তোমাদেরকে তোমাদের সংখ্যাধিক্য গর্বে উম্মত্ত করেছিল, অতঃপর সেই সংখ্যাধিক্য তোমাদের কোনই কাজে আসেনি, আর ভূ-পৃষ্ঠ প্রশস্ত থাকা সত্ত্বেও তা তোমাদের উপর সংকীর্ণ হয়ে গেল, অতঃপর তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন পূর্বক পলায়ন করলে।মুজিবুর রহমান
আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করেছেন অনেক ক্ষেত্রে এবং হোনাইনের দিনে, যখন তোমাদের সংখ্যধিক্য তোমাদের প্রফুল্ল করেছিল, কিন্তু তা তোমাদের কোন কাজে আসেনি এবং পৃথিবী প্রশস্ত হওয়া সত্তেও তোমাদের জন্য সংকুচিত হয়েছিল। অতঃপর পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পলায়ন করেছিলে।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
আল্লাহ্ তোমাদেরকে তো সাহায্য করেছেন বহু ক্ষেত্রে আর হুনায়নের যুদ্ধের দিনে যখন তোমাদেরকে উৎফুল্ল করেছিল তোমাদের সংখ্যাধিক্য; কিন্তু এটা তোমাদের কোন কাজে আসে নাই এবং বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও পৃথিবী তোমাদের জন্যে সংকুচিত হয়েছিল, পরে তোমরা পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে পলায়ন করেছিলে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন
অবশ্যই আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য করেছেন বহু জায়গায় এবং হুনাইনের দিনে, যখন তোমাদের সংখ্যাধিক্য তোমাদেরকে উৎফুল্ল করেছিল, অথচ তা তোমাদের কোন কাজে আসেনি। আর যমীন প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও তোমাদের উপর সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল। অতঃপর তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পলায়ন করেছিলে।আল-বায়ান
বস্তুতঃ আল্লাহ তোমাদেরকে বহু যুদ্ধ ক্ষেত্রে সাহায্য করেছেন আর হুনায়নের যুদ্ধের দিন, তোমাদের সংখ্যার আধিক্য তোমাদেরকে গর্বে মাতোয়ারা করে দিয়েছিল, কিন্তু তা তোমাদের কোন কাজে আসেনি, যমীন সুপ্রশস্ত হওয়া সত্বেও তা তোমাদের নিকট সংকীর্ণই হয়ে গিয়েছিল, আর তোমরা পিছন ফিরে পালিয়ে গিয়েছিলে।তাইসিরুল
আল্লাহ্ ইতিমধ্যে বহুক্ষেত্রে তোমাদের সাহায্য করেছেন, আর হুনাইনের দিনেও যখন তোমাদের সংখ্যাধিক্য তোমাদের উৎফুল্ল করেছিল, কিন্তু তা তোমাদের লাভবান করে নি কোনো-ভাবেই, আর পৃথিবী বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও তোমাদের জন্য হয়েছিল সংকীর্ণ, তোমরা ফিরেছিলে পলায়নপর হয়ে।মাওলানা জহুরুল হক
২৩
দায়িত্ব মুক্তি ও সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা সম্বলিত ভয়ংকর নীতি কার্যকর করার ফলে সারা আরবে সর্বত্র যুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠবে এবং তার মোকাবিলা করা অসম্ভব হবে বলে যারাআশঙ্কা করছিল তাদেরকে বলা হচ্ছে, এসব অমূলক ভয়ে ভীত হচ্ছো কেন? এর চাইতেও বেশী কঠিন বিপদের সময় যে আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করেছেন তিনি এখনো তোমাদের সাহায্য করার জন্য রয়েছেন। এ কাজ যদি তোমাদের শক্তির ওপর নির্ভর করতো তাহলে এর আর মক্কা সীমানা পার হতে হতো না। আর না হোক, বদরের ময়দানেতো খতমই হয়ে যেতো। কিন্তু এর পেছনে তো রয়েছে স্বয়ং আল্লাহর শক্তি। আর অতীতের অভিজ্ঞতাসমূহ তোমার কাছে একথা প্রমাণ করে দিয়েছে যে, এখনো পর্যন্ত আল্লাহর শক্তিই এর উন্নতি ও বিকাশ সাধন করে এসেছে। কাজেই নিশ্চিত বিশ্বাস রাখো, আজো তিনিই একে উন্নতি ও অগ্রগতি দান করবেন।
এখানে হুনায়েন যুদ্ধের কথা বলা হয়েছে। এ যুদ্ধটি ৮ হিজরীর শওয়াল মাসে এ আয়াত গুলো নাযিলের মাত্র বার তের মাস আগে মক্কা ও তায়েফের মাঝখানে হুনায়েন উপত্যকায় সংঘটিত হয়েছিল। এ যুদ্ধে মুসলমানদের পক্ষে ছিল ১২ হাজার সৈন্য। এর আগে কোন যুদ্ধে মুসলমানদের এত বিপুলসংখ্যক সৈন্য জামায়েত হয়নি। অন্যদিকে কাফেরদের সৈন্য সংখ্যা ছিল এর তুলনায় অনেক কম। কিন্তু এ সত্ত্বেও হাওয়াযিন গোত্রের তীরন্দাজরা যুদ্ধের মোড় ফিরিয়ে দিল। মুসলিম সেনাদলে মারাত্মক বিশৃঙ্খলা দেখা দিল। তারা বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত হয়ে পিছু হটতে লাগলো। এ সময় শুধুমাত্র নবী (সা.) এবং মুষ্টিমেয় কতিপয় মরণপণ সাহাবী যুদ্ধের ময়দানে দৃঢ়পদ ছিলেন। তাদের অবিচলতার ফলেই সেনাবাহিনী পুনর্বার সংগঠিত হলো এবং মুসলমানরা বিজয় লাভ করলো। অন্যথায় মক্কা বিজয়ের ফলে মুসলমানরা যে পরিমাণে লাভবান হয়েছিল হুনায়েনে তাদেরকে তার চাইতে অনেক বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হতে হতো।
সংক্ষেপে হুনায়ন যুদ্ধের ঘটনা নিম্নরূপ, মক্কা মুকাররমায় জয়লাভ করার পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সংবাদ পেলেন মালিক ইবনে আউফের নেতৃত্বে বনু হাওয়াযিন তাঁর বিরুদ্ধে সৈন্য সংগ্রহ করছে। বনু হাওয়াযিন এক বিশাল জনগোষ্ঠীর নাম। এর অনেকগুলো শাখা-প্রশাখা ছিল। তায়েফের প্রসিদ্ধ ছাকীফ গোত্রও এ গোষ্ঠীরই শাখা। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গুপ্তচর পাঠিয়ে সংবাদটির সত্যতা যাচাই করলেন। জানা গেল, সংবাদ সত্য এবং তারা জোরে-শোরে বিপুল উত্তেজনায় যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। ইবনে হাজার রহমাতুল্লাহি আলাইহির বর্ণনা অনুযায়ী বনু হাওয়াযিনের লোকসংখ্যা ছিল চব্বিশ হাজার থেকে আটাশ হাজারের মাঝামাঝি। সুতরাং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চৌদ্দ হাজার সাহাবায়ে কিরামের এক বাহিনী নিয়ে রওয়ানা হলেন। এ যুদ্ধ হয়েছিল হুনায়ন নামক স্থানে, যা মক্কা মুকাররমা থেকে আনুমানিক দশ মাইল দূরে অবস্থিত মক্কা ও তায়েফের মধ্যবর্তী একটা উপত্যকার নাম। এ যুদ্ধে মুসলিম সৈন্যসংখ্যা ছিল চৌদ্দ হাজার। এর আগে অন্য কোন যুদ্ধে মুসলিম সৈন্যদের সংখ্যা এত বিপুল ছিল না। মুসলিমগণ সর্বদা নিজেদের সৈন্যসংখ্যা অল্প হওয়া সত্ত্বেও বেশি সৈন্যের মুকাবিলায় জয়লাভ করেছে। এবার যেহেতু তাদের সৈন্য সংখ্যাও বিপুল, তাই তাদের কারও কারও মুখ থেকে বের হয়ে গেল যে, আজ আমাদের সংখ্যা অনেক বেশি। সুতরাং আজ আমরা কারও কাছে পরাস্ত হতেই পারি না। মুসলিমগণ আল্লাহ তাআলার পরিবর্তে নিজেদের সংখ্যার উপর নির্ভর করবে এটা আল্লাহ তাআলার পছন্দ হল না। সুতরাং তিনি এর ফল দেখালেন। মুসলিম বাহিনী এক সংকীর্ণ গিরিপথ অতিক্রম করছিল। এ সময় বনু হাওয়াযিনের তীরন্দাজ বাহিনী অকস্মাৎ তাদের উপর বৃষ্টির মত তীর ছুঁড়তে শুরু করল। তা এতটাই প্রচণ্ড ছিল যে, মুসলিম বাহিনী তার সামনে তিষ্ঠাতে পারছিল না। তাদের বহু সদস্য পালাতে শুরু করল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অবশ্য কতিপয় নিবেদিতপ্রাণ সাহাবীসহ অবিচলিত থাকলেন। তিনি হযরত আব্বাস (রাযি.)-কে হুকুম দিলেন, যেন পলায়নরতদেরকে উচ্চস্বরে ডাক দেন। হযরত আব্বাস (রাযি.)-এর আওয়াজ খুব বড় ছিল। তিনি ডাক দিলেন এবং মুসলিম সৈন্যদের মধ্যে তা বিজলীর মত ছড়িয়ে পড়ল। যারা ময়দান ত্যাগ করেছিল তারা নতুন উদ্যমে ফিরে আসল। দেখতে না দেখতে দৃশ্যপট পাল্টে গেল এবং মুসলিমদের বিজয় অর্জিত হল। বনু হাওয়াযিনের সত্তর জন নেতা নিহত হল। দলপতি মালিক ইবনে আউফ তার পরিবার-পরিজন ও অর্থ-সম্পদ ছেড়ে পালিয়ে গেল এবং তায়েফের দূর্গে গিয়ে আশ্রয় নিল। তাদের ছয় হাজার সদস্য বন্দী হল। বিপুল সংখ্যক গবাদি পশু ও চার হাজার উকিয়া রূপা গনীমত হিসেবে মুসলিমদের হস্তগত হল।
২৫. অবশ্যই আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য করেছেন বহু ক্ষেত্রে এবং হুনায়নের যুদ্ধের দিনে(১) যখন তোমাদেরকে উৎফুল্ল করেছিল তোমাদের সংখ্যাধিক্য হওয়া; কিন্তু তা তোমাদের কোন কাজে আসেনি এবং বিস্তৃত হওয়া সত্বেও যমীন তোমাদের জন্য সংকুচিত হয়েছিল। তারপর তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পালিয়েছিলে।(২)
(১) এ আয়াতের শুরুতে আল্লাহর সেই দয়া ও দানের উল্লেখ রয়েছে যা প্রতি ক্ষেত্রে মুসলিমরা লাভ করে। বলা হয়েছেঃ “আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করেছেন অনেক ক্ষেত্রে” এরপর বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয় হুনাইন যুদ্ধের কথা। কারণ, সে যুদ্ধে এমনসব ধারণাতীত অদ্ভুত ঘটনার প্রকাশ ঘটেছে, যেগুলো নিয়ে চিন্তা করলে মানুষের ঈমানী শক্তি প্রবল ও কর্মপ্রেরণা বৃদ্ধি পায়।
‘হুনাইন’ মক্কা ও তায়েফের মধ্যবর্তী একটি জায়গার নাম। যা মক্কা শরীফ থেকে পূর্ব দিকে ত্রিশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এটি অনেকটা আরাফার দিকে। বর্তমানে এ স্থানকে ‘আশ-শারায়ে’ বলা হয়। (আতেক গাইস আল-বিলাদী, মুজামুল মা'আলিমিল জুগরাফিয়্যাহ ১০৭) অষ্টম হিজরীর রমযান মাসে যখন মক্কা বিজিত হয় আর মক্কার কুরাইশগণ অস্ত্র সমর্পণ করে, তখন আরবের বিখ্যাত ধনী ও যুদ্ধবাজ হাওয়াযেন গোত্র-যার একটি শাখা তায়েফের বনূ-সকীফ নামে পরিচিত, তাদের মাঝে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। ফলে তারা একত্রিত হয়ে আশংকা প্রকাশ করতে থাকে যে, মক্কা বিজয়ের পর মুসলিমদের বিপুল শক্তি সঞ্চিত হয়েছে, তখন পরবর্তী আক্রমণের লক্ষ্য হবে তায়েফ। তাই তাদের আগে আমাদের আক্রমণ পরিচালনা হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
পরামর্শ মত এ উদ্দেশ্যে হাওয়াযেন গোত্র মক্কা থেকে তায়েফ পর্যন্ত বিস্তৃত শাখা-গোত্রগুলোকে একত্রিত করে। আর বিশাল সে গোত্রের প্রায় সবাই যুদ্ধের জন্য সমবেত হয়।
এ অভিযানের নেতা ছিলেন মালেক ইবন আউফ। অবশ্য পরে তিনি মুসলিম হয়ে ইসলামের অন্যতম ঝাণ্ডাবাহী হন। তবে প্রথমে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার তীব্র প্রেরণা ছিল তার মনে। তাই স্বগোত্রের সংখ্যাগুরু অংশ তার সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে আরম্ভ করে। কিন্তু এ গোত্রের অপর দুটি ছোট শাখা- বনু-কা’ব ও বনু-কেলাব মতানৈক্য প্রকাশ করে। আল্লাহ তাদের কিছু দিব্যদৃষ্টি দান করেছিলেন। তারা বলতে থাকে, পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত সমগ্র দুনিয়াও যদি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে একত্রিত হয়, তথাপি তিনি সকলের উপর জয়ী হবেন, আমরা আল্লাহর শক্তির সাথে যুদ্ধ করতে পারব না।
এই দুই গোত্র ছাড়া বাকী সবাই যুদ্ধ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। সেনানায়ক মালেক ইবন আউফ পূর্ণ শক্তির সাথে রণাঙ্গনে তাদের সুদৃঢ় রাখার জন্য এ কৌশল অবলম্বন করেন যে, যুদ্ধেক্ষেত্রে সকলের পরিবার-পরিজনও উপস্থিত থাকবে এবং প্রত্যেকের জীবিকার প্রধান সহায় পশুপালও সাথে রাখতে হবে। উদ্দেশ্য, কেউ যেন পরিবার-পরিজন ও সহায়-সম্পদের টানে রণক্ষেত্র ত্যাগ না করে। তাদের সংখ্যা সম্পর্কে ঐতিহাসিকগণের বিভিন্ন মত রয়েছে। হাফেযুল-হাদীস আল্লামা ইবন হাজার রাহিমাহুল্লাহ চব্বিশ বা আটাশ হাজারের সংখ্যাকে সঠিক মনে করেন। আর কেউ কেউ বলেনঃ এদের সংখ্যা চার হাজার ছিল। তবে এও হতে পারে যে, পরিবার-পরিজনসহ ছিল তারা চব্বিশ বা আটাশ হাজার, আর যোদ্ধা ছিল চার হাজার।
মোটকথা, এদের দূরভিসন্ধি সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা শরীফেই অবহিত হন এবং তিনিও এদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সংকল্প নেন। মক্কায় আত্তাব ইবন আসাদ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে আমীর নিয়োগ করেন এবং মুআয ইবন জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহুকে লোকদের ইসলামী তা’লীম দানের জন্য তার সাথে রাখেন। তারপর মক্কার কুরাইশদের থেকে অস্ত্র-শস্ত্র ধারস্বরূপ সংগ্রহ করেন। ইমাম যুহরীর বর্ণনামতে চৌদ্দ হাজার মুসলিম সেনা নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ যুদ্ধের প্রস্তুতি নেন। এতে ছিলেন মদীনার বার হাজার আনসার যারা মক্কা বিজয়ের জন্য তার সাথে এসেছিলেন। বাকী দু'হাজার ছিলেন আশপাশের অধিবাসী, যারা মক্কা বিজয়ের দিন মুসলিম হয়েছিলেন এবং যাদের বলা হত ‘তোলাকা’ অর্থাৎ সাধারণ ক্ষমায় মুক্তিপ্রাপ্ত। ৮ম হিজরীর ৬ই শাওয়াল শুক্রবার রাসূলের নেতৃত্বে মুসলিম সেনাদলের যুদ্ধযাত্রা শুরু হয়।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ ইনশাআল্লাহ, আগামীকাল আমাদের অবস্থান হবে খায়ফে বনী-কেনানার সে স্থানে, যেখানে মক্কার কুরাইশগণ ইতিপূর্বে মুসলিমদের সাথে সামাজিক বয়কটের চুক্তিপত্র সই করেছিল।
চৌদ্দ হাজারের এ বিরাট সেনাদল জিহাদের উদ্দেশ্যে বের হয়ে পড়ে তাদের সাথে মক্কার অসংখ্য নারী-পুরুষও যুদ্ধের দৃশ্য উপভোগের জন্যে বের হয়ে আসে। তাদের সাধারণ মনোভাব ছিল, এ যুদ্ধে মুসলিম সেনারা হেরে গেলে আমাদের পক্ষে প্রতিশোধ নেয়ার একটা ভাল সুযোগ হবে। আর যদি তারা জয়ী হয়ে যায় তা হলেও আমাদের ক্ষতি নেই। সে যা হোক, মুসলিম সেনা দল হুনাইন নামক স্থানে শিবির স্থাপন করে। এ সময় সুহাইল ইবন হানযালা রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেনঃ জনৈক অশ্বারোহী এসে শক্রদলের সংবাদ দিয়েছে যে, তারা পরিবার-পরিজন ও সহায়-সম্পদসহ রণাঙ্গনে জমায়েত হয়েছে। স্মিতহাস্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ চিন্তা করো না, ওদের সবকিছু গনীমতের মাল হিসাবে মুসলিমদের হস্তগত হবে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুনাইনে অবস্থান নিয়ে আব্দুল্লাহ ইবন হাদ্দাদ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে গোয়েন্দারূপে পাঠান। তিনি দুদিন তাদের সাথে অবস্থান করে তাদের সকল যুদ্ধ প্রস্তুতি অবলোকন করেন। এক সময় শক্ৰ সেনানায়ক মালেক ইবনে আউফকে স্বীয় লোকদের একথা বলতে শোনেনঃ মুহাম্মাদ এখনো কোন সাহসী যুদ্ধবাজদের পাল্লায় পড়েনি। মক্কার নিরীহ কুরাইশদের দমন করে তিনি বেশ দাম্ভিক হয়ে উঠেছেন। কিন্তু এখন বুঝতে পারবে কার সাথে তার মোকাবেলা। আমরা তার সকল দম্ভ চূর্ণ করে দেব তোমরা কাল ভোরেই রণাঙ্গনে এরূপ সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়াবে যে, প্রত্যেকের পেছনে তার স্ত্রী-পরিজন ও মালামাল উপস্থিত থাকবে। তরবারীর কোষ ভেঙ্গে ফেলবে এবং সকলে একসাথে আক্রমণ করবে। বস্তুতঃ কাফেরদের ছিল প্রচুর যুদ্ধ অভিজ্ঞতা। তাই তারা বিভিন্ন ঘাঁটিতে কয়েকটি সেনাদল লুকায়িত রেখে দেয়।
এ হল শক্রদের রণপ্রস্তুতির একটি চিত্র। কিন্তু অন্যদিকে এক হিসাবে এটি ছিল মুসলিমদের প্রথম যুদ্ধ যাতে অংশ নিয়েছে চৌদ্দ হাজারের এক বিরাট বাহিনী। এ ছাড়া অস্ত্রশস্ত্রও ছিল আগের তুলনায় প্রচুর। তাই কারো কারো মন থেকে বের হয়ে আসেঃ আজকের জয় অনিবার্য, পরাজয় অসম্ভব। যুদ্ধের প্রথম ধাক্কাতেই শত্রুদল পালাতে বাধ্য হবে। কিন্তু মুসলিমরা আল্লাহর উপর ভরসা না করে জনবলের উপর তৃপ্ত থাকবে এটা আল্লাহর পছন্দ ছিল না। এটাই হুনাইনের যুদ্ধে দেখিয়ে দেয়া হয়েছে। হাওয়াযেন গোত্র পূর্ব পরিকল্পনা মতে মুসলিমদের প্রতি সম্মিলিত আক্রমণ পরিচালনা করে। একই সাথে বিভিন্ন ঘাঁটিতে লুকায়িত কাফের সেনারা চতুর্দিক থেকে মুসলিমদের ঘিরে ফেলে। এ সময় আবার ধূলি-ঝড় উঠে সর্বত্র অন্ধকারাচ্ছন্ন করে ফেলে। এতে সাহাবাগণের পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব হলো না। ফলে তারা পিছু হটতে শুরু করেন।
কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সামনের দিকে বাড়তে থাকেন। তার সাথে ছিলেন অল্প সংখ্যক সাহাবী। এরাও চাচ্ছিলেন যেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অগ্রসর না হন। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলেনঃ উচ্চঃস্বরে ডাক দাও, বৃক্ষের নীচে জিহাদের বাই’আত গ্রহণকারী সাহাবীগণ কোথায়? সূরা বাকারাওয়ালারা কোথায়? জান কুরবানের প্রতিশ্রুতিদানকারী আনসারগণই বা কোথায়? সাবই ফিরে এস, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখানেই আছেন।
আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর এ আওয়ায রণাঙ্গনকে প্রকম্পিত করে তোলে। পলায়নরত সাহাবীগণ ফিরে দাঁড়ান এবং প্রবল সাহসিকতার সাথে বীরবিক্রমে যুদ্ধ করে চলেন। ঠিক এ সময় আল্লাহ এদের সাহায্যে ফেরেশতাদল পাঠিয়ে দেন। এরপর যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়। কাফের সেনানায়ক মালেক ইবন আউফ পরিবার-পরিজন ও মালামালের মায়া ত্যাগ করে পালিয়ে যায় এবং তায়েফ দূর্গে আত্মগোপন করে। এরপর গোটা শক্রদল পালাতে শুরু করে। যুদ্ধ শেষে মুসলিমদের হাতে আসে তাদের সকল মালামাল, ছয় হাজার যুদ্ধবন্দী, চব্বিশ হাজার উট, চব্বিশ হাজার ছাগল এবং চার হাজার উকিয়া রৌপ্য। (কুরতুবী; বাগভী; ইবন কাসীর প্রমূখ। বিস্তারিত জানার জন্য আরও দেখুন, ইবরাহীম ইবন ইবরাহীম কুরাইবী কৃত মারওয়িয়াতু গাযওয়াতি হুনাইন ওয়া হিসারুত তায়িফ)
(২) অর্থাৎ তোমরা সংখ্যাধিক্যে আত্মপ্রসাদ লাভ করছিলে, কারণ তারা সংখ্যায় ছিল বার হাজার, মতান্তরে ষোল হাজার। (কুরতুবী) এটা নিঃসন্দেহে এক বিরাট বাহিনী। তাদের কেউ কেউ বলেও বসল যে, আমরা আজ সংখ্যায় স্বল্পতার কারণে পরাজিত হব না। কিন্তু পরাজিত তাদের হতেই হলো, সে সংখ্যাধিক্য তোমাদের কাজে আসল না। প্রশস্ত হওয়া সত্বেও পৃথিবী তোমাদের জন্য সংকুচিত হয়ে গেল। তারপর তোমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েছিল। এর দ্বারা বুঝা যায় যে, মুসলিমরা সংখ্যাধিক্যে কখনও জয়লাভ করে না। তারা জয়লাভ করে আল্লাহর সাহায্যে। (কুরতুবী)।
এরপর আল্লাহ তার রাসূল এবং তোমাদের উপর তাঁর সাকীনাহ বা প্রশান্তি নাযিল করলেন এবং ফেরেশতাদের এমন সৈন্যদল প্রেরণ করেন যাদের তোমরা দেখনি। তারপর তোমাদের হাতে কাফেরদেরকে শাস্তি দিলেন।
(২৫) আল্লাহ তোমাদেরকে তো বহুক্ষেত্রে সাহায্য করেছেন এবং হুনাইনের যুদ্ধের দিনেও; যখন তোমাদের সংখ্যাধিক্য তোমাদেরকে উৎফুল্ল করেছিল। কিন্তু তা তোমাদের কোন কাজে আসেনি এবং পৃথিবী বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও তা তোমাদের জন্য সঙ্কুচিত হয়েছিল, অতঃপর তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পলায়ন করেছিলে।(1)
(1) মক্কা ও তায়েফের মধ্যস্থলে একটি উপত্যকার নাম হুনাইন। এখানে হাওয়াযিন এবং সাকীফ নামক দুই গোত্র বসবাস করত। এই উভয় গোত্রের লোকেরা তীর নিক্ষেপ কাজে বড় পটু বলে প্রসিদ্ধি ছিল। এরা মুসলিমদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সে কথা রসূল (সাঃ) জানতে পারলে ১২ হাজার সৈন্য নিয়ে সেই গোত্র দু’টির সাথে লড়াই করার উদ্দেশ্যে ‘হুনাইন’ উপত্যকায় উপস্থিত হলেন। এই যুদ্ধ মক্কা বিজয়ের ১৮/১৯ দিন পর শওয়াল মাসে সংঘটিত হয়। উল্লিখিত উভয় গোত্রের লোকেরা পরিপূর্ণরূপে প্রস্তুতি নিয়েই ছিল। তারা বিভিন্ন ঘাঁটিতে তীরন্দাজদেরকে মোতায়েন করে দিল। এদিকে মুসলিমদের মাঝে আত্মগর্ব সৃষ্টি হল যে, আজ আমরা কমসে কম সংখ্যা স্বল্পতার কারণে পরাজিত হব না। অর্থাৎ, আল্লাহর মদদ বিস্মৃত হয়ে নিজেদের সংখ্যাধিক্যের উপর ভরসা করে বসলেন। আল্লাহর নিকট এই গর্ব পছন্দ ছিল না। পরিণামস্বরূপ যখন হাওয়াযিনের সুদক্ষ তীরন্দাজরা বিভিন্ন ঘাঁটি থেকে মুসলিম বাহিনীর উপর ধারণাতীতভাবে একই সাথে তীর বর্ষণ করতে শুরু করল, তখন মুসলিম বাহিনী বিচলিত ও বিক্ষিপ্ত হয়ে পলায়ন শুরু করল। যুদ্ধ-ময়দানে কেবল নবী (সাঃ) ১০০ জন মত সৈন্য নিয়ে অবিচলিত থাকলেন। তিনি মুসলিমদেরকে ডাক দিয়ে বললেন, ‘হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা আমার কাছে এসো। আমি হলাম আল্লাহর রসূল।’ কখনো কখনো তিনি এই যুদ্ধ-কবিতা পড়তেন, أنا النبي لا كذب ـ أنا ابن عبد المطلب অর্থাৎ, ‘আমি হলাম নবী, এটা মিথ্যা নয়। আমি আব্দুল মুত্তালিবের সন্তান।’ পুনরায় তিনি আব্বাস (রাঃ)-কে (যাঁর গলার আওয়াজ বড় উঁচু ছিল) আদেশ করলেন যে, ‘মুসলিমদেরকে একত্রিত করার জন্য ডাক দাও।’ অতএব তাঁর আওয়াজ শুনে মুসলিমরা লজ্জিত হলেন এবং পুনরায় ময়দানে একত্রিত হলেন। অতঃপর এমন দৃঢ়তার সাথে যুদ্ধ করলেন যে, আল্লাহ তাআলা তাঁদেরকে জয়ী করে দিলেন। আল্লাহর মদদ এমনভাবে এল যে, তাঁদের উপর সান্ত্বনা অবতীর্ণ করলেন; যার ফলে তাঁদের অন্তর থেকে কাফেরদের ভয় দূর হয়ে গেল। দ্বিতীয়তঃ ফিরিশতাদল প্রেরণ করলেন। এই যুদ্ধে মুসলিমরা (নারী ও শিশু সহ) ৬ হাজার কাফেরকে বন্দী করলেন। (যাদেরকে নবী (সাঃ) তাদের অনুরোধে ছেড়ে দিলেন।) প্রচুর পরিমাণে গনীমতের মাল হস্তগত হল। যুদ্ধের পর কাফেরদের বেশ কয়েকজন সর্দার বা নেতৃস্থানীয় লোক ইসলাম গ্রহণ করেছিল। এখানে তিনটি আয়াতে আল্লাহ তাআলা এই ঘটনাকে সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করেছেন।