ওয়া‘লামূআন্নামা-গানিমতুম মিন শাইয়িন ফাআন্না লিল্লা-হি খুমুছাহূওয়া লিররছূলি ওয়া লিযিল কুরবা-ওয়াল ইয়াতা-মা-ওয়াল মাছা-কীনি ওয়াবনিছ ছাবীলি ইন কুনতুম আমানতুম বিল্লা-হি ওয়া মাআনঝালনা-‘আলা-‘আবদিনা-ইয়াওমাল ফুরক-নি ইয়াওমাল তাকাল জাম‘আ-নি ওয়াল্লা-হু ‘আলা-কুল্লি শাইয়িন কাদীর।উচ্চারণ
আর তোমরা জেনে রাখো, তোমরা যা কিছু গনীমাতের মাল লাভ করেছো তার পাঁচ ভাগের এক ভাগ আল্লাহ, তাঁর রসূল, আত্মীয়স্বজন, এতীম, মিসকীন ও মুসাফিরদের জন্য নির্ধারিত। ৩২ যদি তোমরা ঈমান এনে থাকো আল্লাহর প্রতি এবং ফায়সালার দিন অর্থাৎ উভয় সেনাবাহিনীর সামনা-সামনি মোকাবিলার দিন আমি নিজের বান্দার ওপর যা নাযিল করেছিলাম তার প্রতি, ৩৩ (অতএব সানন্দে এ অংশ আদায় করো) আল্লাহ প্রত্যেকটি জিনিসের ওপর শক্তিশালী। তাফহীমুল কুরআন
(হে মুসলিমগণ!) জেনে রাখ, তোমরা যা-কিছু গনীমত অর্জন কর, তার এক-পঞ্চমাংশ আল্লাহ, রাসূল, (তাঁর) আত্মীয়বর্গ, ইয়াতীম, মিসকীন ও মুসাফিরদের প্রাপ্য #%২৭%# (যা আদায় করা তোমাদের অবশ্য কর্তব্য)যদি তোমরা আল্লাহর প্রতি ও সেই বিষয়ের প্রতি ঈমান রাখ, যা আমি নিজ বান্দার উপর মীমাংসার দিন অবতীর্ণ করেছি #%২৮%# যে দিন দু’ দল পরস্পরের সম্মুখীন হয়েছিল। আল্লাহ সর্ব বিষয়ে শক্তিমান।মুফতী তাকী উসমানী
আর তোমরা জেনে রেখ যে, যুদ্ধে তোমরা যা কিছু গাণীমাতের মাল লাভ করেছ ওর এক পঞ্চমাংশ আল্লাহ, তাঁর রাসূল, (রাসূলের) নিকটাত্মীয়, ইয়াতীম, মিসকীন এবং মূসাফিরের জন্য - যদি তোমরা ঈমান এনে থাক আল্লাহর প্রতি এবং যা আমি অবতীর্ণ করেছি আমার বান্দার উপর সেই চুড়ান্ত ফাইসালার দিন, যেদিন দু‘দল পরস্পরের সম্মুখীন হয়েছিল। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ সকল বিষয়ে সর্বশক্তিমান।মুজিবুর রহমান
আর এ কথাও জেনে রাখ যে, কোন বস্তু-সামগ্রীর মধ্য থেকে যা কিছু তোমরা গনীমত হিসাবে পাবে, তার এক পঞ্চমাংশ হল আল্লাহর জন্য, রসূলের জন্য, তাঁর নিকটাত্নীয়-স্বজনের জন্য এবং এতীম-অসহায় ও মুসাফিরদের জন্য; যদি তোমাদের বিশ্বাস থাকে আল্লাহর উপর এবং সে বিষয়ের উপর যা আমি আমার বান্দার প্রতি অবতীর্ণ করেছি ফয়সালার দিনে, যেদিন সম্মুখীন হয়ে যায় উভয় সেনাদল। আর আল্লাহ সব কিছুর উপরই ক্ষমতাশীল।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
আরও জেনে রাখ, যুদ্ধে যা তোমরা লাভ কর তার এক-পঞ্চমাংশ আল্লাহ্ র , রাসূলের, রাসূলের স্বজনদের, ইয়াতীমদের, মিসকীনদের ও মুসাফিরদের, যদি তোমরা ঈমান রাখ আল্লাহে আর তাতে যা মীমাংসার দিন আমি আমার বান্দার প্রতি অবতীর্ণ করেছিলাম, যেদিন দুই দল পরস্পরের সম্মুখীন হয়েছিল আর আল্লাহ্ সর্ববিষয়ে শক্তিমান। ইসলামিক ফাউন্ডেশন
আর তোমরা জেনে রাখ, তোমরা যা কিছু গনীমতরূপে পেয়েছ, নিশ্চয় আল্লাহর জন্যই তার এক পঞ্চমাংশ ও রাসূলের জন্য, নিকট আত্মীয়, ইয়াতীম, মিসকীন ও মুসাফিরের জন্য, যদি তোমরা ঈমান এনে থাক আল্লাহর প্রতি এবং হক ও বাতিলের ফয়সালার দিন আমি আমার বান্দার উপর যা নাযিল করেছি তার প্রতি, যেদিন* দু’টি দল মুখোমুখি হয়েছে, আর আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।আল-বায়ান
তোমরা জেনে রেখ যে, যুদ্ধে যা তোমরা লাভ কর তার এক-পঞ্চমাংশ হচ্ছে আল্লাহ, তাঁর রসূল, রসূলের আত্মীয়স্বজন, ইয়াতীম, মিসকীন ও মুসাফিরদের জন্য যদি তোমরা আল্লাহর উপর আর চূড়ান্ত ফায়সালার দিন অর্থাৎ দু’পক্ষের (মুসলমান ও কাফের বাহিনীর) মিলিত হওয়ার দিন আমি যা আমার বান্দাহর উপর অবতীর্ণ করেছিলাম তার উপর বিশ্বাস করে থাক। আর আল্লাহ হলেন সকল বিষয়ের উপর ক্ষমতাবান।তাইসিরুল
আর জেনে রেখো যা কিছু তোমরা যুদ্ধক্ষেত্রে লাভ করো তার পঞ্চমাংশ তাহলে আল্লাহ্র, জন্য যথা রসূলের জন্য, আর নিকটাত্মীয়ের জন্য, আর এতীমদের, মিসকিনদের, ও পথচারীদের জন্য, যদি তোমরা বিশ্বাস করো আল্লাহ্তে আর তাতে যা আমরা আমাদের বান্দার কাছে অবতারণ করেছি সেই ফুরকানের দিনে, যেদিন দুই দল মুখোমুখি হয়েছিল। আর আল্লাহ্ সব-কিছুর উপরে সর্বশক্তিমান।মাওলানা জহুরুল হক
৩২
এ ভাষণটির শুরুতেই গনীমাতের মাল সম্পর্কে বলা হয়েছিল যে, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে পুরস্কার এবং তার ব্যাপারে ফয়সালা করার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ ও তাঁর রসূলই রাখেন। এখানে এ গনীমাতের মাল বন্টনের আইন-কানুন বর্ণনা করা হয়েছে। এখানে এ ফায়সালাটিও শুনিয়ে দেয়া হয়েছে যে, যুদ্ধের পরে সকল সৈনিকের সব ধরনের গনীমতের মাল এনে আমীর বা ইমামের কাছে জমা দিতে হবে। কোন একটি জিনিসও তারা লুকিয়ে রাখতে পারবে না। তারপর এ সম্পদ থেকে পাঁচ ভাগের এক ভাগ বের করে নিতে হবে। আয়াতে যে উদ্দেশ্যের কথা বলা হয়েছে এ দিয়ে তা পূর্ণ করতে হবে। বাকী চার অংশ যারা যুদ্ধে অংশ নিয়েছে তাদের মধ্যে বণ্টন করে দিতে হবে। কাজেই এ আয়াত অনুযায়ী নবী ﷺ হামেশা যুদ্ধের পর ঘোষনা দিতেনঃ
إِنَّ هَذِهِ غَنَائِمِكُمْ وَإِنَّهُ لَيْسَ لِى فِيهَا إِلاَّ نَصِيبِى مَعَكُمْ الْخُمُسُ وَالْخُمُسُ مَرْدُودٌ عَلَيْكُمْ فَأَدُّوا الْخَيْطَ وَالْمَخِيطَ وَأَكْبَرَ مِنْ ذَلِكَ وَأَصْغَرَ وَلاَ تَغُلُّوا فَإِنَّ الْغُلُولَ عَارٌ وَنَارٌ-
“এ গনীমাতের সম্পদগুলো তোমাদের জন্যই। এক পঞ্চমাংশ ছাড়া এর মধ্যে আমার নিজের কোন অধিকার নেই। আর এই এক পঞ্চমাংশ ও তোমাদেরই সামগ্রিক কল্যাণার্থেই ব্যয়িত হয়। কাজেই একটি সুঁই ও একটি সূতা পর্যন্তও এনে রেখে দাও। কোন ছোট বা বড় জিনিস লুকিয়ে রেখো না। কারণ এমনটি করা কলঙ্কের ব্যাপার এবং এর পরিণাম জাহান্নাম।”
এ বন্টনে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের অংশ একটিই। এ অংশটিকে আল্লাহর কালেমা বুলন্দ করা এবং সত্য দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজে ব্যয় করাই মূল লক্ষ্য।
আত্মীয়-স্বজন বলতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায় তো তাঁর আত্মীয়-স্বজনই বুঝোতো। কারণ তিনি নিজের সবটুকু সময় দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজে ব্যয় করতেন। নিজের অন্ন সংস্থানের জন্য কোন কাজ করা তাঁর পক্ষে সম্ভবপর ছিল না। এ কারনে তাঁর নিজের, তাঁর পরিবারের লোকদের এবং যেসব আত্মীয়ের ভরণ-পোষনের দায়িত্ব তাঁর ওপর ছিল, তাদের সবার প্রয়োজন পূরণ করার কোন একটা ব্যবস্থা থাকার প্রয়োজন ছিল। তাই ‘খুমুস’ তথা এক পঞ্চমাংশে তাঁর আত্মীয়ের অংশ রাখা হয়েছে। কিন্তু নবী (সা.) এর ইন্তেকালের পর ‘আত্মীয়-স্বজনদের’ এ অংশটি কাদেরকে দেয়া হবে এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। এক দলের মতে, নবী (সা.) এর পরে এ অংশটি বাতিল হয়ে গেছে। দ্বিতীয় দলের মতে, নবী (সা.) এর পরে যে ব্যক্তি তাঁর খেলাফতের দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত হবেন তার আত্মীয়-স্বজনরা এ অংশটি পাবে। তৃতীয় দলটির মতে, এ অংশটি নবীর বংশের ফকীর-মিসকীনদের মধ্যে বণ্টন করা হতে থাকবে। আমার নিজস্ব গবেষনা-অনুসন্ধানের ফলে যেটুকু আমি জানতে পেরেছি, তাতে দেখা যায় যে, খোলাফায়ের রাশেদীনের যামানায় এ তৃতীয় মতটিই কার্যকর হতে থেকেছে।
৩৩
অর্থাৎ যে সাহায্য-সমর্থনের মাধ্যমে তোমরা বিজয় অর্জন করেছো।
গনীমত বলে সেই সম্পদকে, যা জিহাদকালে শত্রুপক্ষের থেকে মুজাহিদদের হস্তগত হয়। এ আয়াতে তা বণ্টনের মূলনীতি শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। মূলনীতির সারমর্ম এই যে, জিহাদে যে সম্পদ অর্জিত হয়, তাকে পাঁচ ভাগ করা হবে। তার চার ভাগ মুজাহিদদের মধ্যে বণ্টন করা হবে এবং পঞ্চম ভাগ বায়তুল মালে (রাষ্ট্রীয় কোষাগারে) জমা করা হবে। এই পঞ্চম ভাগকে ‘খুমুস’ বলা হয়। খুমুস বণ্টনের নিয়ম সম্পর্কে আয়াতে প্রথমে বলা হয়েছে যে, এ মালের প্রকৃত মালিক আল্লাহ তাআলা। সুতরাং তার নির্দেশ মতই এটা বণ্টন করতে হবে। অতঃপর এটা বণ্টনের পাঁচটি খাত উল্লেখ করা হয়েছে। এক ভাগ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের। এক ভাগ তাঁর আত্মীয়-স্বজনের। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আত্মীয়বর্গ তাঁর ও ইসলামের সাহায্যার্থে অসাধারণ ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন, আবার তাদের জন্য যাকাতের অর্থও হারাম করা হয়েছিল। অবশিষ্ট তিন ভাগ ইয়াতীম, মিসকীন ও মুসাফিরদের জন্য ব্যয় করার হুকুম দেওয়া হয়েছে। অধিকাংশ ফুকাহায়ে কিরামের মতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অংশ তাঁর ওফাতের পর আর কার্যকর নেই। তাঁর আত্মীয়দের অংশ সম্পর্কে ফকীহগণের মধ্যে কিছুটা মতভেদ আছে। ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর মতে এ অংশের কার্যকারিতা এখনও বহাল আছে। কাজেই তা বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিবের মধ্যে তাদের অধিকার হিসেবে বণ্টন করা জরুরী, তাতে তারা ধনী হোক বা গরীব। কিন্তু আহলুস সুন্নাহর অন্যান্য ফকীহগণ বলেন, তারা গরীব হলে তো অন্যান্য গরীবদের উপর অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে তাদেরকে খুমুসের অর্থ দেওয়া হবে। আর তারা যদি অভাবগ্রস্ত না হয়, তবে খুমুসে আলাদাভাবে তাদের কোন অধিকার থাকবে না। হযরত উমর (রাযি.) একবার হযরত আলী (রাযি.)কে খুমুস থেকে অংশ দিলে হযরত আলী (রাযি.) এই বলে তা প্রত্যাখ্যান করলেন যে, এ বছর আমাদের খান্দানের কোন প্রয়োজন নেই (আবু দাঊদ, হাদীস নং ২৯৮৪)। সুতরাং হযরত আলী (রাযি.)-সহ চারও খুলাফায়ে রাশেদীনের নীতি এটাই ছিল যে, বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিবের লোকজন অভাবগ্রস্ত হলে খুমুস থেকে অংশ দানের ক্ষেত্রে তাদেরকে অগ্রাধিকার দিতেন; আর তারা যদি অভাবগ্রস্ত না হতেন, তবে তাদেরকে দিতেন না। তার একটি কারণ এই-ও যে, অধিকাংশ ফুকাহা ও মুফাসসিরগণের মতে এ আয়াতে যে পাঁচটি খাত বর্ণিত হয়েছে, খুমুসের অর্থ তাদের সকল শ্রেণীকে দেওয়া এবং সমহারে দেওয়া অপরিহার্য নয় এবং আয়াতের উদ্দেশ্যও সেটা নয়; বরং খুমুস ব্যয়ের এ পঞ্চ খাত যাকাতের খাতসমূহেরই মত (যাদের উল্লেখ সূরা তাওবায় [৯ : ৬০] আসছে)। অর্থাৎ ইমাম তথা রাষ্ট্রপ্রধানের এখতিয়ার রয়েছে যে, এ খাতসমূহের মধ্যে প্রয়োজন অনুযায়ী যে খাতে যে পরিমাণ দেওয়া সমীচীন মনে করেন তাই দেবেন। এ মাসআলা সম্পর্কে বান্দা সহীহ মুসলিমের ভাষ্যগ্রন্থ তাকমিলা ফাতহুল মুলহিমে (খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৫৪-২৫৮) বিস্তারিত আলোচনা করেছে।
৪১. আর জেনে রাখ, যুদ্ধে যা তোমরা গনীমত হিসেবে লাভ করেছ, তার এক-পঞ্চমাংশ আল্লাহর(১), রাসূলের, রাসূলের স্বজনদের, ইয়াতীমদের, মিসকীনদের এবং সফরকারীদের(২) যদি তোমরা ঈমান রাখ আল্লাহতে এবং তাতে যা মীমাংসার দিন আমরা আমাদের বান্দার প্রতি নাযিল করেছিলাম(৩), যে দিন দু’ দল পরস্পরের সম্মুখীন হয়েছিল। আর আল্লাহ সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।
(১) এ আয়াতে গনীমতের বিধান ও তার বন্টননীতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। অভিধানে গনীমত বলা হয় সে সমস্ত মাল-সামানকে যা শত্রুর নিকট থেকে লাভ করা হয়। শরীআতের পরিভাষা অনুযায়ী অমুসলিমদের নিকট থেকে যুদ্ধ-বিগ্রহে বিজয়ার্জনের মাধ্যমে যে মালামাল অর্জিত হয়, তাকেই বলা হয় ‘গনীমত’। (ফাতহুল কাদীর) আর যা কিছু আপোষ, সন্ধি-সম্মতির মাধ্যমে অর্জিত হয়, তাকে বলা হয় ‘ফাই’। (ইবন কাসীর)
কুরআনুল কারীমে এতদুভয় শব্দের মাধ্যমে (অর্থাৎ ‘গনীমত’ ও ‘ফাই’) এতদুভয় প্রকার মালামালের হুকুম-আহকাম তথা বিধি-বিধান বর্ণনা করা হয়েছে সূরা আনফালের প্রথম আয়াতে এবং এ আয়াতে শুধুমাত্র গনীমতের মালামালের কথাই আলোচিত হয়েছে যা যুদ্ধকালে অমুসলিমদের কাছ থেকে লাভ হয়েছে। ‘ফাই’-এর আলোচনা সূরা হাশর-এ আসবে।
(২) এখানে জিহাদের পর যুদ্ধলব্ধ সম্পদ গণীমতের হকদারদের বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হয়েছে। সমস্ত সম্পদ পাঁচ ভাগে ভাগ করা হবে। এর চার ভাগ যোদ্ধাদের মধ্যে বন্টন করা হবে। আর বাকী এক পঞ্চমাংশ পাঁচভাগে ভাগ করা হবে। প্রথমভাগ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের। এ অংশ মুসলিমদের সাধারণ স্বার্থ সংরক্ষনে ব্যয় হবে। দ্বিতীয়ভাগ রাসূলের স্বজনদের জন্য নির্ধারিত। তারা হলেন ঐ সমস্ত লোক যাদের উপর সদকা খাওয়া হারাম। অর্থাৎ বনু হাশেম ও বনু মুত্তালিব। কারণ তাদের দেখাশুনার দায়িত্ব রাসূলের ছিল।
তিনি তার নবুওয়াতের কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত থাকায় তাদের জন্য এ গণীমতের মাল থেকে দেয়া ছাড়া কোন উপায় নেই। তৃতীয়ভাগ ইয়াতিমদের জন্য সুনির্দিষ্ট। চতুর্থভাগ ফকীর ও মিসকিনদের জন্য, আর পঞ্চম ভাগ মুসাফিরদের জন্য। (ইবন কাসীর) ইবন তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেন, পুরো এক পঞ্চমাংশই বর্তমানে ইমামের কর্তৃত্বে থাকবে। তিনি মুসলিমদের অবস্থা অনুযায়ী কল্যাণকর কাজে ব্যয় করবেন। (ইবন কাসীর) সুতরাং বুঝা যাচ্ছে যে, গণীমতের মাল যদিও পূর্বে সূরা আনফালের প্রথম আয়াতে শুধু আল্লাহ ও তার রাসূলের বলা হয়েছে তবুও তা মূলতঃ মুসলিমদের মধ্যেই পুনরায় বন্টন হয়ে গেছে। রাসূল তার জন্য তার জীবদ্দশায় যা কিছু পেতেন তাও বর্তমানে সাধারণ জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা হয়ে থাকে।
(৩) অর্থাৎ সে সাহায্য ও সহায়তা, যার বদৌলতে তোমরা জয়লাভ করেছ। (মুয়াসসার) এখানে মীমাংসার দিন বলে বদরের দিনকে বুঝানো হয়েছে। কারণ এ দিন তিনি হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্য করেছেন, ঈমানের কালেমাকে কুফরীর কালেমার উপর বিজয়ী করেছেন এবং তার দ্বীন, তার নবী ও অনুসারীদেরকে উপরে উঠিয়েছেন। (ইবন কাসীর)
(৪১) আরো জেনে রাখ যে, যুদ্ধে যা কিছু তোমরা (গনীমত) লাভ কর(1) তার এক-পঞ্চমাংশ আল্লাহ, তাঁর রসূলের, রসূলের নিকটাত্মীয়, পিতৃহীন এতীম, দরিদ্র এবং পথচারীদের জন্য;(2) যদি তোমরা আল্লাহতে ও সেই জিনিসে বিশ্বাসী হও যা ফায়সালার দিন(3) (বদরে) আমি আমার দাসের প্রতি অবতীর্ণ করেছিলাম;(4) যেদিন দুই দল পরস্পরের সম্মুখীন হয়েছিল(5) এবং আল্লাহ সর্ব বিষয়ে শক্তিমান।
(1) ‘গনীমতের মাল’ থেকে সেই মাল উদ্দেশ্য যা কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার পর লাভ হয়। পূর্বের উম্মতে এই মাল বিতরণের পদ্ধতি এই ছিল যে, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর কাফেরদের নিকট হতে লাভ করা সমস্ত মাল-সম্পদকে এক জায়গায় জমা করা হত, আর আসমান হতে আগুন এসে তাকে জ্বালিয়ে ভস্ম করে দিত। কিন্তু মুসলিম উম্মতের জন্য এই গনীমতের মাল আল্লাহ হালাল করে দিয়েছেন। আর যে মাল দুই দলের সন্ধি চুক্তির ভিত্তিতে বিনা যুদ্ধে অথবা জিযিয়া কর ও খাজনা আদায়ের মাধ্যমে লাভ হয় তাকে ‘ফাই-এর মাল’ বলা হয়। কখনো কখনো গনীমতের মালকেও ফাই-এর মাল বলা হয়ে থাকে। من شيءٍ অর্থঃ যা কিছু। অর্থাৎ, কম হোক অথবা বেশী, মূল্যবান হোক অথবা সামান্য মূল্যের, সমস্তকে জমা করে তা যথারীতি বণ্টন করা হবে। কোন সৈন্যের জন্য তা হতে বণ্টনের পূর্বে কোন বস্তু রেখে নেওয়ার অনুমতি নেই।
(2) এখানে ‘আল্লাহ’ শব্দটি বরকতস্বরূপ। পরন্তু এই জন্যও যে, প্রত্যেক জিনিসের প্রকৃত পক্ষে মালিক হলেন তিনিই। আর আদেশও তাঁরই চলে। আল্লাহ ও তদীয় রসূলের ভাগ থেকে উদ্দেশ্য একটাই। অর্থাৎ, সমস্ত গনীমতের মালকে পাঁচ ভাগ করে চার ভাগ সেই মুজাহিদদের মধ্যে বণ্টন করা হবে, যাঁরা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাঁদের মধ্যেও পদাতিক (পায়ে হাঁটা ব্যক্তিদের)-কে এক ভাগ এবং অশ্বারোহীকে তিন ভাগ দেওয়া হবে। আর পঞ্চম ভাগটাকে পুনরায় পাঁচ ভাগ করা হবে, তার মধ্যে রসূল (সাঃ)-এর জন্য এক ভাগ। অতঃপর বাকী ভাগগুলি মুসলিমদের সাধারণ কল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা হবে। যেমন, নবী (সাঃ) নিজেও এই ভাগগুলি মুসলিমদের উপরেই খরচ করতেন। বরং তিনি বলেছেনও, الخمسُ مَردودٌ عليكم (সুনানে নাসাঈ, সহীহ নাসাঈ ৩৮৫৮নং, আহমাদ ৫/৩১৯) অর্থাৎ, আমার ভাগে যে পঞ্চম অংশ রয়েছে সেটাও মুসলিমদের উপকারে ব্যয় করা হবে। দ্বিতীয় ভাগ রসূল (সাঃ)-এর আত্মীয়-স্বজনের জন্য। অতঃপর এতীম ও মিসকীন ও মুসাফিরদের জন্য। আরো বলা হয় যে, এই পঞ্চম ভাগটি প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যয় করা হবে।
(3) ‘ফায়সালার দিন’ বলতে হক ও বাতিলের মাঝে চূড়ান্ত ফায়সালার দিন, বদর যুদ্ধের দিন। এ যুদ্ধ সন ২ হিজরী, রমযানের ১৭ তারীখে ঘটেছিল। সেই দিনটিকে ‘ফায়সালার দিন’ এই জন্য বলা হয় যে, এটা ছিল কাফের ও মুসলিমদের মাঝে প্রথম যুদ্ধ এবং তাতে মুসলিমদেরকে বিজয়ী করে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, ইসলাম ধর্মই হল সত্য ধর্ম আর কুফর ও শিরক হল বাতিল ধর্ম।
(4) এখানে ‘যা অবতীর্ণ’ বলতে ফিরিশতা এবং অলৌকিক কিছু বিষয় ইত্যাদি অবতীর্ণ করাকে বুঝানো হয়েছে, যা বদর যুদ্ধের দিন ঘটেছিল।
(5)অর্থাৎ, মুসলিম ও কাফিরদের সৈনদল।