3 টি উত্তর
দিয়েছেন

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী দেশ। ৮০০০ মিলিটারি বেস ও পৃথিবীর মোট মিলিটারি খরচের ৩৭ ভাগ যুক্তরাষ্ট্রের দখলে। এতো কিছুর জন্য বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক দেশ হিসেবে গণ্য হয়েছে। শুধু তাই নয় তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা হয়েছে উন্নত এবং অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের পরিমাণ ও অতি অল্প। আমেরিকার বর্তমানে এতো শক্তি সঞ্চয় কিভাবে হলো, তা জানবো এই আয়োজনে-  স্বাধীনতা পাওয়ার প্রথম ৭০ বছর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র কোনো মতেই বিশ্বের বড় শক্তির মধ্যে পড়তো না। এই সত্তর বছরে তারা শুধুমাত্র তাদের রাজ্য বড়ই করেছে। তাদের রাজ্য প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিলো। এরপর সে দেশের মানুষজন দু’ভাগে বিভক্ত হতে থাকে যার এক ভাগ ছিল রাষ্ট্র বিস্তৃতির পক্ষে এবং অন্য ভাগ প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসাগর পর্যন্তই রাষ্ট্র রাখার মত দেন। মূলত আমেরিকা সিভিল ওয়ার-এর পরেই দেশটির জনগণ এই বিতর্কিত বিষয়ের উপর দুই ভাগে অবস্থান নেয়। ১৮৬৫ সালে আমেরিকার সিভিল ওয়ার এরপর তাদের এক রাজ্যে সেক্রেটারী উইলিয়াম এইচ  শিওয়ার্ড বলেন যে, আমেরিকার এখন বিশ্ব শক্তিতে পরিণত হওয়া উচিত। শুধু তাই নয় শিওয়ার্ড এ বিষয়ে সাফল্য অর্জন করেন এবং সেই সময় রাশিয়া থেকে আলাস্কা কিনে নেয় যুক্তরাষ্ট্র। তবে তার এই চেষ্টা থেমে যায় যখন আমেরিকান কংগ্রেস গ্রীনল্যান্ড আইসল্যান্ড ও ক্যারিবিয়ান কিছু দ্বীপপুঞ্জ কিনতে বাধা দেয়। কারণ, তখন ক্যাপিটল হিলের বেশিরভাগই সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ছিলো। মূলত তাদের ভয় ছিলো যুক্তরাষ্ট্র সে সময় বিশ্ব রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়বে।  

১৮০০ সালের পর আমেরিকার শিল্প বিপ্লব শুরু হয়। এই শিল্প বিপ্লবের ফলে যুক্তরাষ্ট্র শক্তিশালী অর্থনৈতিক দেশ হিসেবে মাথা উঁচু করে। এরপর সাম্রাজ্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে আমেরিকা ১৮৯৮ সালে কিউবা নিজেদের দখলে আনার জন্য স্পেনের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। শক্তিশালী হতে থাকা যুক্তরাষ্ট্র স্পেনকে সহজেই যুদ্ধে হারিয়ে দেয় এবং ফিলিপাইন সহ আরো বেশ কিছু অঞ্চল দখল করে নেয়। পরবর্তী দুই বছরের মধ্যে তারা হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ দখল করে এবং ওয়েক আইল্যান্ডসহ আমেরিকান সামোয়া দখল করে নেয়।

এরপর আমেরিকা তাদের চোখ দেয় পানামা খালের অঞ্চলে। কয়েক বছর পর তারা পানামা অঞ্চল দখল করে নেয়। এরপর ১৯১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সৈন্য পাঠিয়ে ডোমিনিকান রিপাবলিক দখল করে নেয়। এরপর ১৯১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র আমেরিকান ভার্জিন দ্বীপ কিনে নেয়। এ সময় আমেরিকা তাদের সাম্রাজ্যর এতো বড় করার পরে একটি বড় বিশ্ব শক্তিতে পরিণত হয়। এরপর যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে। আমেরিকার শক্তি কতটা বৃদ্ধি পেয়েছিলো তা বোঝা যায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তাদের নেয়া অবস্থানের উপর। মার্কিনদের প্রভাবে যে শুধু যুদ্ধের ফলাফলের উপর প্রভাব পড়েছিল তা নয়, এমনকি সেই সময়ের মার্কিন প্রেসিডেন্ট উইলসনের প্যারিস শান্তি চুক্তির ফলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়। এছাড়া প্রেসিডেন্ট উইলসন শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বেশ কিছু নিয়ম-কানুন জারি করার প্রচেষ্টা করেন। সেজন্য তার হাত ধরেই লীগ অব নেশনস এর জন্ম হয়েছিলো।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক না গলিয়ে নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত থাকে। কিন্তু সেই সময় জাপান তাদের জন্য হুমকি হলে যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিল। তারপরের ইতিহাস প্রায় সবারই জানা। অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র সেই সময় থেকেই তাদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করতে থাকে। এমনকি এর জন্য তারা আণবিক ও পারমাণবিক অস্ত্রের মজুদ বাড়াতে থাকে। তবে যুক্তরাষ্ট্র সেই সময় থেকেই বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে এবং পরবর্তীতে বিশ্বযুদ্ধ যাতে না হয় সেজন্য মূলত যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবেই জাতিসংঘের জন্ম হয়।  

এতো কিছুর পরে ৪৪ দেশের ৭৩০ জন প্রতিনিধি মিলে হ্যাম্পশায়ারে একটি বৈঠক করেন, যার মূল উদ্দেশ্য ছিলো একটি গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল সিস্টেম তৈরি করা, যাতে করে অর্থনৈতিক অবস্থার কোনো বিরূপ প্রভাব না পড়ে এবং কোনো বিশ্বযুদ্ধ না হয়। এই বৈঠক শেষে সকলে মিলে একটি সমঝোতায় আসে, যার নাম ব্রেটন উড এগ্রিমেন্ট। এই সমঝোতার ফলেই বিশ্ব ব্যাংক এবং ওয়ার্ল্ড মনিটারি ফান্ড-এর জন্ম হয়। এতো এতো প্রতিষ্ঠান তৈরীর পর যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রে ঢুকে পড়ে। তবে সেই সময়ের দ্বিতীয় বৃহত্তর শক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রগতিকে দেখে অন্য চোখে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে সোভিয়েত ইউনিয়নের শক্তি বিবেচনা করে যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে পারে সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের ফ্রি ট্রেডিং-এর জন্য হুমকি হতে পারে। এসব দেখে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার সহযোগী বেশকিছু ইউরোপীয় দেশ মিলে ন্যাটো গঠন করে। সামরিক প্রতিষ্ঠান ন্যাটো মূলত প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো যাতে রাশিয়া অন্যান্য ইউরোপীয় দেশ দখল করতে না পারে। পরবর্তীতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হলে আমেরিকার সামনে আর কোনো সমশক্তি উঠে দাঁড়াতে পারেনি। এর ফলাফল হিসেবে আমেরিকা হয়ে ওঠে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ।

মূলত ১৯৪৫ সালে আমেরিকা তাদের বিদেশ নীতি এমনভাবে তৈরী করেছিলো আর নিয়ন্ত্রণ করেছিলো, তাদের মিত্ররা কখনোই তাদের বিরোধিতা করেনি। তাছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক সব প্রতিষ্ঠান তৈরী করে নিজেদের আলাদা ধরণের সুবিধা করে নিয়েছিলো তারা। ফলাফল? আমেরিকা আজও বিশ্বের দরবারে সেরা এবং বিশ্ব নিয়ন্ত্রণকারী দেশ।

দিয়েছেন

ট্রাম প্রশাসন প্রথম অবস্থানকে গ্রহণ করেছে, বিশেষত জন বোল্টন হোয়াইট হাউস জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হয়ে ও মাইক পম্পিও রাষ্ট্রের সচিব হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। যে কোনও রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রাথমিক অনুভূতি হতে পারে, তার আগমনের ফলে পররাষ্ট্রনীতিতে জর্জ ডাব্লু বুশের প্রথম মেয়াদে বর্ণিত বৈদেশিক নীতির কাছে বন্দী নন-কারাবন্দীদের কাছে প্রত্যাবর্তন ঘটে, যখন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি এবং নিউকোনভেরভেটভের শাসন ঘটে। সেই পূর্ববর্তী সময়ের একটি মূল বৈশিষ্ট্য ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এত শক্তিশালী যে এটি অনেকগুলি বিষয় নিয়ে একা যেতে পারে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি ও সংকল্পের বিক্ষোভের মাধ্যমে অন্যান্য রাজ্যগুলিকে জমা দিতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল। বুশের একজন সিনিয়র উপদেষ্টা হিসেবে (সাংবাদিক কার্ল রোভ) সাংবাদিক রন সাস্কিনকে বলেছেন: "আমরা এখন একটি সাম্রাজ্য, এবং যখন আমরা কাজ করি, তখন আমরা আমাদের নিজস্ব বাস্তবতা তৈরি করি।" সমঝোতা ও জোট-বিল্ডিং উইমস এবং আপিজারের জন্য ছিল; যেমন সম্ভবত সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ, এই পদ্ধতির মধ্যে এই যে কোনও উদ্দেশ্যগুলির মধ্যে কোনও প্রকৃত বাণিজ্য বন্ধ রয়েছে। যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়, তবে ইরানের কাছ থেকে তেলের ক্রয়ের বিষয়ে চীনকে অনুমোদন করা বেইজিংয়ের সাথে বাণিজ্য আলোচনার উপর কোন প্রভাব ফেলবে না এবং তুরস্ক একই রাশিয়ায় রাশিয়ার কাছাকাছি যেতে পারবে না। । এটি আরও অনুমান করে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাটো জোট ইউরোপের মার্কিন সামরিক বাহিনীকে এত বিরক্ত করছে যে তারা পুনরাবৃত্তি স্বীকার করবে এবং চীনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের অনুসরণ করবে, যদিও এই ক্ষেত্রে এটি ক্রমবর্ধমান প্রমাণের সত্ত্বেও নয়। মিশর, ইজরায়েল, সৌদি আরব এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে এটি কোনও ডাউনসাইড দেখায় না এবং এটি ইরানের বা অন্যের সাথে যুদ্ধের পক্ষে আরও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়া উচিত।

উনবিংশ শতকের শেষের দিকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির ঝানু পণ্ডিতদের অবাক করে দিয়ে বার্লিন দেয়াল ধসে গেলো। স্নায়ুযুদ্ধে হেরে গেলো সোভিয়েত ইউনিয়ন। জিতে গেলো আমেরিকার নেতৃত্বাধিকারী পুঁজিবাদিরা। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা ভুলেও চিন্তা করেননি যে – এভাবে হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যাবে স্নায়ুযুদ্ধ। আর থেমে যাবে দুই মেরুর বিশ্বব্যবস্থা। আমেরিকা হয়ে যাবে একচ্ছত্র কর্তা। তবুও তাই হলো।

১৯৪১ সাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কেঁপে উঠেছে ইউরোপ। ব্রিটেন, ফ্রান্সের আধিপত্যের হাটে পসরা নিয়ে এসে গেছেন হিটলার। রক্তের দামে তিনি পাল্টে দেবেন পৃথিবী। হিটলারের গর্জনে থরথর করে কাঁপছে ব্রিটেন। এই কাঁপুনি থামাতে ব্রিটেনের সামনে একটাই রাস্তা খোলা আছে। যদি নতুন মহাশক্তি আমেরিকা তাঁদের পাশে দাঁড়ায়। সেই আশাতেই ব্রিটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী উইন্সটন চার্চিল স্মরণ করলেন আমেরিকার রাষ্ট্রপতি ফ্রাংকলিন রুজভেল্টকে। প্রাজ্ঞ রুজভেল্ট এই সুযোগের আশাতেই ছিলেন। তিনি তাঁর মত করে ছক তৈরি করে ফেলেছেন। এবার বলটা ঠিক জায়গায় ফেলতে হবে। তাহলেই তৈরি হবে নতুন ইতিহাস।

সে ইতিহাস হিটলার নয়, লিখবেন আমেরিকানরা। রুজভেল্ট আসলেন চার্চিলের ডাকে। না, লন্ডনে নয়। তিনি আসলেন আটলান্টিক মহাসাগরে। কানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ড ঘেঁষে ভাসছিল ব্রিটেনের রণতরী ‘প্রিন্সেস অফ ওয়েলস’। সাগরের বুকে ভেসে ভেসে তিনদিন আলাপ করলেন তাঁরা। রুজভেল্ট সাহেব চার্চিলকে জানালেন তাঁর প্রস্তাব। আমেরিকা সব কিছু দিয়ে ব্রিটেনকে বাঁচাবে, কোন সমস্যা নেই। শর্ত একটাই – যুদ্ধ শেষ হলে সারা পৃথিবীতে ব্রিটিশদের অধীনে যত ভূখণ্ড আছে, সেখানে স্বাধিকার (সেলফ ডিটারমিনেশান) দিতে হবে। এর মানে হল – ব্রিটিশ উপনিবেশগুলোর মানুষ স্বাধিকার পাবে। তাঁরা নিজেরা চাইলে ব্রিটেনের অধীনে থাকবে, না চাইলে স্বাধীন হয়ে যাবে। আর ব্রিটেনকে মেনে নিতে হবে এই জনরায় – তার প্রতিটি উপনিবেশে।

যুদ্ধ শুরু হবার পরেই চার্চিলের পায়ের নিচের মাটি সরে গিয়েছিল। এবার রুজভেল্টের প্রস্তাব শুনে তাঁর মনে হল – এর চেয়ে আটলান্টিকে ডুবে যাওয়াও ভাল। কিন্তু কী আর করা! রুজভেল্ট তো আর তাঁকে বাধ্য করছে না। চার্চিল সাহেব ইচ্ছা করলে এই প্রস্তাব না মানতেই পারেন। জাহাজের উপর দাঁড়িয়ে দুদিকে তাকালেন তিনি। একদিকে দেখলেন – হিটলার আসছেন লন্ডনের দিকে। রুজভেল্টের কথা না শুনলে তাঁর গোটা সাম্রাজ্যই চলে যাবে জার্মানির হাতে। অন্যদিকে দেখলেন – রুজভেল্ট হাসছেন মুচকি মুচকি। তাঁর কথা শুনলে যুদ্ধ শেষে একে একে স্বাধীন হয়ে যাবে সকল ব্রিটিশ উপনিবেশ। ব্রিটেনের রাণীর মুকুট থেকে ধীরে ধীরে খসে পড়বে একটি একটি পালক। এছাড়া আর কোন উপায় নেই। তিনি বললেন, এ কথা মানলে ব্রিটেনের মানুষ আমাকে ছাড়বে না। রুজভেল্ট জবাব দিলেন, কিন্তু যুদ্ধটা ব্রিটেন জিতে যাবে। চার্চিল মনে মনে বললেন, তা বটে। কিন্তু আমি মনে হয় আর প্রধানমন্ত্রী হতে পারব না। আর হয়েছেও তাই। তিনি পরের নির্বাচনে হেরে গেলেন।

সকাল বিকাল মহাত্মা গান্ধীকে ‘নেকেড বেগার’ বলে গালি দেয়া চার্চিল নিজেই তখন ভিখারি। তবে মহাত্মা গান্ধীর মত ন্যাংটা না – কোট পরা, চুরুট মুখে ভিখারি। আটলান্টিকের বুকে দাঁড়িয়ে তাঁকে মানতে হল রুজভেল্টের কথা। স্বাক্ষর হল চুক্তি – আটলান্টিক সনদ। এটাই জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার প্রথম পদক্ষেপ। তাঁর চেয়েও অনেক গভীরের কথা হল, এতে নিশ্চিত হল – যুদ্ধ শেষে ইউরোপীয় দেশগুলো একে একে হারাবে তাদের সকল উপনিবেশ। হারাবে বিনা পয়সায় পাওয়া কাঁচামাল, মনোপলি মার্কেট। যে সাগরপথ তারা আটকে রেখেছে, সেগুলো খুলে দিতে হবে সবার জন্য। অনেক নতুন স্বাধীন দেশ তৈরি হবে। সেখানে সস্তায় পাওয়া যাবে অনেক কাঁচামাল। যেই বাজারগুলো উপনিবেশের বাঁধনে দখল করে রেখেছে ইউরোপীয়রা, সেগুলো হবে উন্মুক্ত। আর যুদ্ধ শেষে একমাত্র বড় শক্তি হবে আমেরিকা। তাই ধীরে ধীরে এসবই আসবে আমেরিকার হাতে।

হিটলার মাঠ তৈরি করেছিলেন, বলও তিনিই মাঠে ঢেলেছেন। কিন্তু গোল দিলেন রুজভেল্ট। নিশ্চিত করলেন – যুদ্ধ শেষে যে দিন আসবে, সেই দিন হবে আমেরিকার দিন। কিন্তু কিভাবে? আগে তো ইউরোপিয়ানরা সরাসরি দস্যু পাঠিয়ে লুট করে আনত। জোর করে শুধু তাঁদের বানানো জিনিসই চড়াদামে বিক্রি করত উপনিবেশগুলোতে। এখন তো সেটা হবে না। আবার শুরু হল আলোচনা আমেরিকার মাটিতে। নিউ হ্যাম্পসায়ারের ব্রেটন উডসে। মাউন্ট ওয়াশিংটন হোটেলে – ১৯৪৪ সালে। ততদিনে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার রূপরেখা অনেকটাই এগিয়ে গেছে। তার মানে রাজনৈতিকভাবে পৃথিবীকে পরিচালনা করার প্লট প্রায় রেডি। এখন দরকার অর্থনৈতিক নকশা। সেই নকশায় তৈরি হবে বিশ্ব অর্থনীতির ঘুড়ি। ঘুড়িটা ওড়তে থাকবে পৃথিবীর কোনায় কোনায়, তবে লাগাম লাগবে মাত্র কয়েকটা ধনী দেশের হাতে। একটানা বাইশ দিন আলাপ চলল ব্রেটন উডসে। এই আলাপ থেকে জন্ম হল তিনটি প্রতিষ্ঠানের – বিশ্ব ব্যাংক (ডব্লিউবি), আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও)। পৃথিবী পেল এক নতুন মহাজনী কারবার। চরিত্রে আন্তর্জাতিক, আর মুখে মধুর ভাষণ। টাইয়ের নটে বাঁধা অদৃশ্য ছুড়ি। এই মহাজনী কারবারে ভিন্ন ভিন্ন দেশ ভিন্ন ভিন্ন পরিমাণ টাকা দিল। সেই টাকায় একটা ফান্ড হল। আর সেই ফান্ড থেকে ঋণ দেয়া হবে বিভিন্ন দেশকে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হল কোটি কোটি গ্যালন রক্ত শুষে হিটলারের স্বপ্নের ফানুস চুপসে যাবার মাধ্যমে। ইউরোপ জুড়ে ধ্বংসচিহ্ন। পূর্ব-এশিয়ায় পারমাণবিক বোমার গর্বিত অভিষেক হয়েছে। শুধু একক সম্রাট হয়ে দুইটি মহাসাগরের প্রান্ত ছুঁয়ে আনন্দধ্বনি বাজছে আমেরিকায়। যদিও যুদ্ধ চলাকালীন সময়েই মারা গেছেন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট, তাঁর প্লান চমৎকারভাবে কাজ করেছে। যুদ্ধ শেষেই পৃথিবীজুড়ে স্বাধীন হতে থাকল ইউরোপীয় উপনিবেশগুলো। এই নতুন দেশগুলো প্রায় সকলেই ভীষণ গরীব। আর ইউরোপও বিধ্বস্ত। এই দেশগুলোকে বাঁচাতে আমেরিকার নেতৃত্বে এগিয়ে এল বিশ্বব্যাংক আর আইএমএফ। গরীব দেশগুলো ভাবল – আহা কত ভাল এই বিশ্বব্যাংক গোষ্ঠী। তাঁদের বিপদে কত সহজে এগিয়ে এসেছে। কিন্তু সমস্যা একটাই – এরা শুধু ঋণই দেয় না। ঋণের সাথে সাথে একটা প্রেসক্রিপশানও দেয়। উন্নয়নের প্রেসক্রিপশান। তাতে ভাঁজে ভাঁজে লিখা থাকে কি কি করলে উন্নয়ন হেঁটে হেঁটে উঠানে চলে আসবে।

কিন্তু এই উন্নয়ন প্রেসক্রিপশান সকল দেশের জন্য মোটামুটি একই রকম। অর্থনীতির ভারী ভারী কথা ছেনে ছেনে তারা গরীব দেশগুলোকে বলল – ‘সরকার হল দেশের জন্য বোঝা, তাই সব জায়গা থেকে সরকারের হাত ছেঁটে দাও। সবকিছু হবে প্রাইভেট। সে স্মার্টফোনই হোক অথবা আন্ডারওয়্যার, হাসপাতালই হোক বা কবরস্থান, সেভেন স্টার হোটেলই হোক বা পাবলিক টয়লেট – সব উন্মুক্ত করে দাও।’

একথা শুনে খাতক দেশ হায় হায় করে উঠল, দেব, সব খুলে দেব। কিন্তু এত কিছু চলানোর মত প্রাইভেট কোম্পানি তো আমাদের দেশে নেই। মহাজন উত্তর করল, বোকা বালক, তাইলে আমরা আছি কি করতে? তোমাদের দেশে বড় প্রাইভেট কোম্পানি নেই, তো কি হয়েছে? ধনী দেশগুলোতে তো আছে। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি। তাঁরা যাবে তোমার দেশে। খালি হাতে যাবে না, বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার নিয়ে যাবে। সেই বিলিয়ন ডলার দিয়ে অনেক বড় বড় অফিস হবে। লক্ষ লক্ষ লোকের চাকুরি হবে। তাঁদের অনেক ভাল বেতন হবে। ভাল বেতন হলে সঞ্চয় বেশী হবে। সরকারের ট্যাক্স বেশি আদায় হবে। সরকারও ধনী হবে। অন্যদিকে সেই দেশের প্রাকৃতিক অর্থনৈতিক সম্পদগুলো খালি হবে আর হবে, শুধু হতেই থাকবে।

আরে বাব্বা এত কিছু হবে? আহা আপনারা এতদিন কোথায় ছিলেন? হুম, এখন থেকে সব হবে। তবে এই যে এত এত মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি তোমাদের দেশে টাকা-পয়সা ঢালবে, তাঁদের দিকটাও কিন্তু দেখতে হবে। এরা যেন তোমাদের উপকার করতে গিয়ে কোন সমস্যায় না পড়ে। এরা তো তোমাদের অতিথি। এদেরকে একটু জামাই আদরে রাখতে হবে। তোমাদের দেশের কোম্পানি আর এই মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানিকে কোনরকম দুই চোখে দেখা চলবে না। না না, সবাইকে এক চোখেই দেখব। বাহ,বেশ। তো এজন্য তোমাদের দেশের আইন-কানুন একটু পাল্টাতে হবে। এমন করে আইন করতে হবে যেন – এইসব মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি যদি ভুল করেও কোন ভুল করে ফেলে, তাঁদের বিচার কিন্তু আমরা করব, তোমরা কিছু করতে পারবে না। ঠিক আছে। জ্বি, ঠিক আছে। আহা এই তো সুবোধ বালক। তোমাদের মুখের কথায়ই আমাদের হান্ড্রেড পারসেন্ট বিশ্বাস আছে। তবু একটা সমস্যা। দুদিন পরে হয়তো তুমি বা আমি কেউই আগের জায়গায় থাকব না। কী থেকে কী হয়! তাই একটু স্বচ্ছতা আনতে হবে। এজন্য আমাদের কয়েকজন লোক তোমাদের দেশে যাবে। ওনারা আমাদের পক্ষ থেকে তোমাদের কনসালটেন্ট। তাঁরা পরামর্শ দিবে, দেখবে সবকিছু ঠিক আছে কিনা। ওনারা অনেক বড় বড় পণ্ডিত। তোমাদের দেশের অর্থমন্ত্রণালয়ে তাঁদের জন্য কিছু জায়গা করতে হবে।

এই পরামর্শদাতাদের বেতন-বোনাস একটু বেশিই হবে। একটু ভেবে দেখ, ওরা নিজেদের পার্টনার ছেড়ে, সন্তান ছেড়ে কতদিনের জন্য তোমাদের মত জংলী দেশে যাবে। না, না – ভুল বুঝনা। ব্যক্তি তোমাকে জংলী বলি নি। আসলে তোমদের দেশে যাওয়া মানে ওদের জীবনের উপর একটা রিস্ক আসবে। তাঁর জন্য একটু রিস্ক ভাতা না দিলে কি চলে? ওরা আবার যেখানে সেখানে থাকতে পারবে না। তোমাদের দেশে তো তেমন স্বাস্থ্যকর বাসস্থানও নেই। তাই ওই পরামর্শদাতাদের জন্য সবচেয়ে ভাল হোটেলে স্থায়ীভাবে একটা জায়গা দিয়ে দিতে হবে। বুঝতে পারছি – তোমাদের খরচ একটু বেশি হয়ে যাবে। তা আগে কিছুদিন একদিকে খরচ করলে, তারপর তো চারদিক থেকে কেবল উন্নয়নই আসতে থাকবে। ওহ, আর একটা মহাগুরুত্বপুর্ণ কথা বলা হয়নি। সারা পৃথিবীর জন্য আমাদের একটা সুন্দর পরিকল্পনা আছে। যিনি যেই কাজ সবচেয়ে ভাল পারে, শুধু তিনিই সেই কাজটা করবেন। যেমন, চালের দাম তোমাদের দেশে বেশি। অন্য দেশে কম। তাঁর মানে অন্যরা তোমাদের থেকে কৃষিকাজে ভাল। তাই তোমরা আর চাল জন্মাবে না। কম দামে চাল কিনবে বিদেশ থেকে। ওই চাষাদের ভর্তুকি দিয়ে দিয়ে তোমারা ওদের অনুন্নত করে রেখেছ। এসব আর চলবে না।

এভাবে মিষ্টি মিষ্টি কথার জালে একের পর এক শর্তে এক একটা গরীব দেশকে বেঁধে ফেলে এই আন্তর্জাতিক মহাজনরা। মহাজনদের এসব মারপ্যাচ বেশির ভাগ দেশ বুঝতেই পারে না। যখন বুঝতে পারে, ততদিনে তাঁর সকল কাঁচামাল চলে গেছে বিদেশী কোম্পানির হাতে। তাঁর ছোট ছোট শিল্প ধ্বংস হয়ে গেছে। বাজার ভরে গেছে বড় বড় কোম্পানির বিদেশী পণ্যে। ঋণ তো শোধ হয়ইনি, উল্টো বেড়েছে।

গ্রামের ধূর্ত মহাজনদের থেকেও এই আন্তর্জাতিক মহাজনদের হাত অনেক বেশি বিস্তৃত। এদের কোন বিকল্প নেই। এদের রয়েছে জগতজুড়ে মহাজনী সিন্ডিকেট। এরা খুশী না হলে অন্য কেউ ঋণ দেবে না। কোন দেশও না, কোন আঞ্চলিক ব্যাংকও না। তাদের সার্টিফিকেট ব্যাতিত কোন বড় কোম্পানিও পাশে দাঁড়াবে না। এই নাটক চলছে দশকের পর দশক জুড়ে, মহাদেশ থেকে মহাদেশের সীমানায়।

আফ্রিকার দেশ লাইবেরিয়া। কাঁচালোহা, সোনা এসব বিদেশে বিক্রি করে দু পয়সা পেত দেশটা। হঠাৎ ১৯৭০ এর দশকে আন্তর্জাতিক বাজারে এসব জিনিসের দাম হুট করে অনেক কমে গেল। এতে লাইবেরিয়ার হাতে ডলারের পরিমাণও অনেক কমে গেল। বেশ বিপদে পড়ল দেশটা। বিদেশের সাথে বাণিজ্য ডলার ছাড়া তো হবে না। তাই একমাত্র উপায় হিসেবে লাইবেরিয়ার নেতারা গেল মহাজনের কাছে – খটখট করল আইএমএফের দুয়ারে। ১৯৭৯ সালে আইএমএফ এল লাইবেরিয়ায় – ঋণের ডালা নিয়ে। সাথে এল তাঁদের দুইজন কনসালটেন্ট। তারা লাইবেরিয়ার অর্থমন্ত্রনালয়ে ঘাঁটি গেড়ে বসল। বসেই বলল, ধানের উপর ভর্তুকি দিচ্ছ কেন? এসব বাদ দাও। এতে পয়সা নষ্ট হচ্ছে।

আমাদের পয়সা এভাবে নষ্ট করা যাবে না। বিদেশ থেকে কম দামে চাল কিন। আজকে থেকেই কৃষিতে সরকারের সবরকম ভর্তুকি একদম বন্ধ। লাইবেরিয়ার নেতারা তখন আইএমএফের টাকা দিয়ে নিজেরা মাস্তি করছে। তাঁদের নিজেদের জন্য দামী বাড়ি-গাড়ি। নেতারা মরার আগেই স্বর্গ পেয়ে গেছে। তাঁরা বলল, বেশতো, আজই কৃষিতে ভর্তুকি বন্ধ। কিন্তু বিদেশ থেকে সময়মত চাল এল না। মানুষ দেখল বাজারে চাল নেই। যা আছে তার দামও অনেক বেড়ে গেছে। তাঁদের পক্ষে কেনা সম্ভব নয়। ঘরে ঘরে অভুক্ত শিশু। মানুষ রাস্তায় নেমে এল।

আইএমএফ সেখানে যাবার তিন মাসের মাথায়ই রাজধানী জুড়ে লেগে গেল ভয়াবহ দাঙ্গা– শুধু খাবারের জন্য। জনগণ, সামরিক বাহিনী সবাই ক্ষেপে উঠল সরকারের উপর। এক বছরের মাথায় সেখানে ক্যু হল। সামরিক বাহিনীর একাংশ দখল করল ক্ষমতা। আর এই ক্ষমতা দখল নিয়ে শুরু হল গৃহযুদ্ধ। সেই যুদ্ধ চলল একটানা ছাব্বিশ বছর। আর এই ছাব্বিশ বছর কি করেছে সেই মহাজনগোষ্ঠী? তাঁরা সানন্দে সমর্থন করে গেছে সামরিক শাসকদের। নতুন নতুন ঋণ দিয়েছে। সেই টাকায় সামরিক নেতারা অস্ত্র কিনেছে ওই ধনী দেশগুলো থেকেই। সেই অস্ত্রে মারা হয়েছে লাখ লাখ সাধারণ মানুষ। আবার মহাজনদের ঋণের টাকা শোধ করতে হয়েছে ওই সাধারণ মানুষকেই। এভাবে সব জেনে বুঝে কইয়ের তেলে কই ভেজে গেছে মহাজনরা।

আগের গ্রাম্য মহাজনদের থাকত লাঠিয়াল বাহিনী। প্রয়োজনে পাইক, পেয়াদা দিয়ে শায়েস্তা করত অবাধ্য খাতকদের। একইভাবে এখনকার এই আন্তর্জাতিক মহাজনরাও নিয়মিতই কাজে লাগায় তাঁদের আধুনিক পাইক, বরকন্দাজদের। আফ্রিকার আরেক দেশ কঙ্গো।

প্যাট্রিক লুলুম্বা নামে এক শ্রমিক নেতার নেতৃত্বে তাঁরা স্বাধীন হল। নতুন দেশ কঙ্গো, অনেক গরীব দেশ। তো শুরু হল বিশ্বব্যাংকের সাথে দেন দরবার। কিন্তু লুলুম্বা দেখলেন, ওই মহাজনদের কাজ শুধু ধনীদের স্বার্থে। সারাজীবন শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে রাজনীতি করেছেন লুলুম্বা। তিনি কি করে ওই মহাজনদের নীতিতে চলেন? তিনি সরে গেলেন বিশ্বব্যাংকের বলয় থেকে। এত বড় সাহস কি সহ্য হবার কথা ওই শক্তিশালী মহাজনদের? সরে যাবার কিছু দিন পরই আততায়ীদের হাতে নিহত হলেন লুলুম্বা।

মহাজনদের আধুনিক দালালরা নিশ্চিত করেছে তাঁর মৃত্যু। আর ক্ষমতায় বসিয়েছে তাঁদের পুতুল নেতা মুবুতোকে। তিনি চল্লিশ বছর ধরে অগণতান্ত্রিকভাবে শাসন করেছেন কঙ্গো। শুষেছেন কালো মানুষের লাল রক্ত। আর মহাজনরা তাঁকে সমর্থন করে গেছে নির্লজ্জের মত। এই মহাজনী কারবার আজও চলছে। চলছে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর থেকেই। কিন্তু এই আন্তর্জাতিক মহাজনদের সালিশি করবে কে? ডলার, বাজার, অস্ত্র, ক্ষমতার এই চক্রব্যুহ ভেদ করার মন্ত্র গরীব দেশের নিরীহ মানুষরা যে এখনো এসব গোপন সাজানো নাটকের ‘ক’-ও তারা জানে না।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রানীতিকে অনেক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। কয়েক দশকের নিষ্প্রভতার পর আশির দশকের মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অর্থনৈতিক নীতির শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে শিল্পোন্নত দেশগুলোয় মুদ্রানীতি পুনরায় আবির্ভূত হয়। ওই সময় মুদ্রানীতির চরিত্রসংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলো নীতি বিতর্কে অগ্রাধিকার পায়। মুদ্রানীতির লক্ষ্য হিসেবে প্রবৃদ্ধি ও মূল্যের স্থিতিশীলতার আপেক্ষিক গুরুত্ব, পাশাপাশি মুদ্রানীতির সঠিক অন্তর্বর্তী লক্ষ্য— ওই সময় আলোচনার কেন্দ্রে ছিল। আর্থিক ব্যবস্থার সাম্প্রতিক মন্থরগতি শুধু লক্ষ্যগুলো নিয়ে নয়, বরং মুদ্রানীতির সার্বিক চরিত্র নিয়ে নতুন করে বিভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি ও ব্যক্তির চরম মুক্তির কারণে নতুন নতুন পেশার উদ্ভব হয়েছে এবং ব্যক্তির পছন্দেও বৈচিত্র্য এসেছে। একই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ট্রান্সন্যাশনালিজম বা আন্তসীমান্ত বাণিজ্য। এই আন্তরাষ্ট্রীয় উদার অর্থনীতির কারণে শুধু পণ্যেরই অবাধ প্রবেশ ঘটছে না, একই সঙ্গে বাজারে সস্তা শ্রমেরও প্রবেশ ঘটছে। স্থানীয় বাজার অনেক ক্ষেত্রেই আন্তরাষ্ট্রীয় বাজারের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছে না। ফলে ঝুঁকি মোকাবেলা করতে অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সন্ধান করছে নতুন পেশার মানুষেরা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই ইউরোপে বামপন্থীদের অবস্থানগত পরিবর্তন আসতে থাকে। একদিকে পূর্ব ইউরোপে বাম শাসনের নামে একধরনের কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা কায়েম করা হয়, অন্যদিকে পশ্চিম ইউরোপের দলগুলো কমিউনিজমকে পরিত্যাগ করে গণতন্ত্রী হওয়া শুরু করে। উভয় অঞ্চলের বামপন্থীরাই মনে করত, তারা শ্রমিকশ্রেণির অধিকার আদায়ের জন্য রাজনীতি করছে। তবে পূর্ব ইউরোপে ছিল অনেকটা রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক কাঠামো। আর পশ্চিম ইউরোপের বাম দলগুলো মনে করত, অপেক্ষাকৃত উদার অর্থনৈতিক নীতি অনুসরণ করেই শ্রমিকশ্রেণির মুক্তি সম্ভব।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে উন্নয়নের জোয়ারের সময় পশ্চিম ইউরোপের বামপন্থীরা কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনের দিকে মন দেয়। এই সময় এরা করনির্ভর কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠন করতে সফল হয়, বিশেষ করে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে। উত্তর-পশ্চিম ইউরোপের বেশ কিছু দেশ; যেমন- জার্মানি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, স্পেন, ইতালিসহ বেশ কয়েকটি দেশও কমবেশি এই কাঠামো অনুসরণ করতে থাকে। কিছুটা কমিউনিজম থেকে সরে আসা এই দলগুলো মূলত মধ্যবাম হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। এরা পূর্ব ইউরোপের বামপন্থীদের রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করে।

এখন অর্থনীতির আলোচনা বাদ দিয়ে চলুন ঘুরে আসি আন্তর্জাতিক রাজনীতির জগত থেকে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন আমেরিকার শাসিত এই নতুন এক মেরুর পৃথিবীকে? কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ এই সুযোগে আগাছাজাতীয় ভুঁইফোঁড়ের মতো নিয়ে আসলো আন্তর্জাতিক রাজনীতির নতুন সব তত্ত্ব। তাঁরা বলল – হেরে গেছে সমাজতন্ত্র। ধনতন্ত্র বা ক্যাপিটালিজমের চিরবিজয় হয়ে গেছে। এরপর পৃথিবীতে আসবে শান্তি। ধনতন্ত্রের মধু মাখা অখণ্ড শান্তি। এই প্রেক্ষিতে ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা ১৯৯২ সালে তাঁর বিখ্যাত বই লিখলেন “The End of History and the Last Man”। তিনি বললেন – ইতিহাস সমাপ্ত হয়েছে। আমেরিকা জিতে গেছে। পৃথিবীতে লিবারেল ডেমোক্রেসিই (উদার গণতন্ত্র) শেষ কথা। এটাই শান্তির একমাত্র পথ। কার্ল মার্ক্স যে বলেছিলেন, শ্রমিকের হাতে ভর করে একদিন কমিউনিজম ক্যাপিটালিজমকে হারিয়ে দেবে – সেটা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ক্যাপিটালিজম জিতে গেছে। এখন থেকে ক্যাপিটালিজম লিবারেল ডেমোক্রেসির ঢাকনা পরে পৃথিবীতে শান্তির বাতাস ঘুরে বেড়াবে। বইটার এইসব কথাবার্তা পশ্চিমের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও কূটনীতিকদের খুব মনে ধরল। সব জায়গায় এটা নিয়ে তুমুল আলোচনা। হ্যাঁ ঠিকই তো – গণতন্ত্রেরই জয় হয়েছে। ইতিহাসের পরিসমাপ্তি ঘটেছে।

কিন্তু ফুকুয়ামারই শিক্ষক স্যামুয়েল হান্টিংটন ভাবলেন – আরে আমার শিষ্যকে তো আর বেশিদূর ওঠতে দেয়া যায় না। এক সেমিনারে হান্টিংটন বললেন – না, ইতিহাস শেষ হয়নি। আরেক ইতিহাসের শুরু হয়েছে মাত্র। সেই ইতিহাস হল – ‘The Clash of Civilizations’ – মানে ‘সভ্যতার দ্বন্দ্ব’। এখন থেকে শুরু হবে এক সভ্যতার সাথে অন্য সভ্যতার দ্বন্দ্ব। সেই বক্তৃতার কথা বার্তা নিয়ে লিখে ফেললেন বই। বইয়ের নাম – “The Clash of Civilizations and the Remaking of World Order” বইতে দেখালেন, পৃথিবীতে নাকি আলাদা আটটি সভ্যতা আছে – পাশ্চাত্য সভ্যতা, মুসলিম সভ্যতা, ল্যাটিন সভ্যতা, হিন্দু সভ্যতাসহ আরো কত অজানা নাম।

আর এই সভ্যতাগুলো নাকি এখন থেকে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হবে। আর এই দ্বন্দ্বই হবে আগামী পৃথিবীর ইতিহাস। হান্টিংটনের এই বই কূটনীতির বাজারে হলো দারুন হিট। রাতারাতি সকল রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আর কূটনীতিকদের অন্দরমহলে আলোচনা শুরু হল – ‘Clash of Civilizations.’ অনেকেই মেনে নিলেন – হ্যাঁ হ্যাঁ, এরকম দ্বন্দ্ব তো আছেই। দ্বন্দ্ব, বিভাজন এসবই আসলে মানুষের পরিণতি। তাদের মধ্যে অল্প কিছু মানুষ এই তত্ত্বকে মানেননি। তারমধ্যে বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেছেন, “এই দ্বন্দ্বের চিন্তাধারা মানবতার জন্য অশনি সংকেত। এতে মানুষের ঘরে ঘরে যুদ্ধ পৌঁছে যাবে।”

আর ঠিক তাই হল অবশেষে। ঐ সভ্যতার দ্বন্দ্বে তাত্ত্বিকভাবে যাই থাকুক না কেন, বাস্তব প্রয়োগ হিসেবে দেখা গেল – এটাকে আসলে মুসলিম সভ্যতার সাথে অন্যান্য সভ্যতার দ্বন্দ্বের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেই দিকেই লিখালিখি শুরু হল। শুরু হল শত্রু শত্রু খেলা। কিছু মুসলিম সংগঠনও আনন্দে লাফিয়ে ওঠলো। তাঁদেরও এই দ্বন্দ্বে সাময়িক লাভের সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু পরিণতি চিন্তা করার মত সময় তাঁদের ছিল না। আর সাধারণ মানুষ কিছুই বুঝল না। কিন্তু এক থেকে দুই দশকের মধ্যে দেখতে পেল, তাঁদের ঘরে বোমা পড়ছে। তাঁদের সন্তান তাঁদের অজান্তেই যুদ্ধ করছে কোন এক পক্ষের হয়ে।

বিষয়টা বুঝতে অনেক নেতারই বেশ সময় লেগে গেলো। বুঝতে পেরে ইরানের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি মুহাম্মদ খাতামি এটার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ‘সভ্যতার সংলাপ (Dialogue among Civilizations)’ -এর কথা বললেন। তাঁর কথার ভিত্তিতেই জাতিসংঘ ২০০১ সালকে ‘ডায়লগ এমোং সিভিলাইজেশান’ বর্ষ ঘোষণা করে। ২০০৫ সালে স্পেনের প্রেসিডেন্ট জোসে লুইস রড্রিগেজ এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেসেপ তাইপে এরদোগান জাতিসংঘে ‘সভ্যতার মৈত্রী (Alliance of Civilizations)’ -এর প্রস্তাব করেন। কিন্তু তার আগেই অনেক দেরী হয়ে গেছে। হান্টিংটনের দ্বন্দ্বের থিউরি বাজার দখল করে ফেলেছে। আর বড় বড় যুদ্ধের বদলে ছোট ছোট যুদ্ধে ছেয়ে গেছে বিভিন্ন মহাদেশ। অস্ত্র বিক্রি হচ্ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মত। ধর্মীয় অনুভূতি আর উগ্র জাতীয়তা দেশে দেশে সৃষ্টি করছে তীব্র বিভাজনের সমাজ, গড়ে তুলেছি দ্বন্দ্বের সমাজ।

আর এজন্য বিশ্ব-মানবতা ভেঙ্গে পড়ল। আর প্রতিটা দেশের শেয়ারবাজার, জাতীয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তাসের ঘরের মত ভেঙ্গে পড়তে থাকলো। কোনো কিছুর বিনিময়ে এই ঠাণ্ডা বিশ্বযুদ্ধের গতিবেগ দমন করার ব্যর্থ প্রচেষ্টা চলছিলো। এরপর ২০০১ সালে আমেরিকা নিজেই বিমান দিয়ে তার টুইন-টাওয়ার ধ্বংস করে দিল। আর দোষ হল ইরাকের সাদ্দাম, লিবিয়ার গাদ্দাফি ও আফগানিস্তানের উপর। চলল দেশগুলোর উপর অমানুষিক ও পাশবিক নির্যাতন। কারণ আমেরিকা খুব ভালো করেই জানে, মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোতে প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ, বিশেষ করে তেল আছে তাদের। এটাই তো সুবর্ণ সুযোগ। আর এই সুযোগে অধিকাংশ মুসলিম দেশগুলোর অবস্থা ভয়ানক হল। এরপরে ২০০৮ সালে আমেরিকার ‘ওয়াল স্ট্রিট’ -এর সব স্টকে শেয়ারের দাম এতটাই কমে গেল, যার জন্যে সারা বিশ্বে অর্থনৈতিক ধস নামল। আর বিশ্বে যত নোংরা রাজনৈতিক দালালী হয়, যা অন্যের ক্ষতির কারণ হয়ে যায়। তবুও তারা এইসব নোংরা খেলা বন্ধ করে না। শুধু তাদের অর্থ-প্রাচুর্য গ্রহণের জন্য, আর নিজেরা সেগুলো দিয়ে আরো সম্পদের পাহাড় বানিয়ে, তাতে আরামে বসবাসের জন্য।

 

তথ্যসুত্রঃ

(01) The Rise and Fall of the Great Powers: Economic Change and Military Conflict from 1500 to 2000 -Paul Kennedy.

(02) Preparing for the Twenty-first Century – Paul Kennedy.

(03) From War to Peace: Altered Strategic Landscapes in the Twentieth Century – Paul Kennedy.

(04) The Future of Freedom: Illiberal Democracy at Home and Abroad – Fareed Zakaria.

(05) From Wealth to Power – Fareed Zakaria.

(06) The Post-American World – Fareed Zakaria.

(07) The World Is Flat: A Brief History of the Twenty-first Century – Thomas L. Friedman.

(08) Political Order in Changing Societies – Samuel P. Huntington.

(09) The Clash of Civilizations and the Remaking of World Order – Samuel P. Huntington.

(10) The Third Wave: Democratization in the Late Twentieth Century – Samuel P. Huntington.

(11) Age of Extremes The Short Twentieth Century, 1914-1991 – Eric Hobsbawm.

(12) Globalisation, Democracy And Terrorism – Eric Hobsbawm.

(13) On Empire: America, War, and Global Supremacy – Eric Hobsbawm.

(14) The Bubble of American Supremacy: Correcting the Misuse of American Power. – George Soros.

(15) The Isolationist Impulse: Its Twentieth Century Reaction – Selig Adler.

(16) The End of History and the Last Man – Francis Fukuyama.

(17) The Idea of Justice – Amartya Sen.

Download Bissoy Answers App Bissoy Answers