ট্যারা চোখ (বাঁকা চোখ) বা ক্রস আই কি?
যখন দুই চোখ একসঙ্গে কোনো বস্তু দেখতে পারে না এবং একটা চোখ আরেক চোখ থেকে দূরে সরে যায় বা বেঁকে যায়, সেই চোখকে টেরা চোখ বলে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে বলে অ্যাসটিগমেটিজম। এক্ষেত্রে একজন ব্যক্তি তার দু’টি চোখ দিয়ে একই দিকে তাকাতে অক্ষম হন। একটি চোখ ভিতর দিকে (এসোট্রোপিয়া), বাইরের দিকে (এক্সোট্রোপিয়া), উপরের দিকে (হাইপারট্রোপিয়া), ও নিচের দিকে (হাইপোট্রোপিয়া) বেঁকে যেতে পারে। ওয়ান্ডারিং আইস হলো আরও একটি প্রচলিত শব্দ, যা ক্রস আই বা ট্যারা চোখ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।

কখনো কখনো বাঁকা চোখের মানুষকে সামাজিকভাবে হেয় হতেও হয়। তেমনিভাবে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে যাওয়ার সমূহসম্ভাবনা থাকে। তাই এটি একটি সামাজিক সমস্যা আর শিশুদের জন্য মানসিক চাপেরও কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিয়ে, চাকরি ও নানা কর্মক্ষেত্রে টেরা চোখ অনেকের কাছে পীড়াদায়ক ও অস্বস্তিকর।

ট্যারা চোখের প্রধান লক্ষণ ও উপসর্গগুলি কি কি?
ট্যারা চোখের লক্ষণ ও উপসর্গগুলি হলো:

  • কোনও একটি নির্দিষ্ট দিকে তাকানোর সময় চোখের স্থানগত অবস্থান বেঠিক।
  • এই অবস্থা সামাল দেওয়ার জন্য মাথার অঙ্গবিন্যাসে অস্বাভাবিকতা।
  • বেশি দূরে বা সূর্যের আলোর দিকে তাকানোর সময় এক চোখ বন্ধ করে তেরছাভাবে দেখা।
  • চোখ কচলানো।


আক্রান্ত ব্যক্তি সবসময় লক্ষণগুলি উপলব্ধি করেন না। সাময়িক উপসর্গগুলির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত:

  • ডাবল ভিশন অর্থাৎ একই জিনিস দু’টি করে দেখা।
  • অবসাদ।
  • অস্থির প্রতিবিম্ব অথবা বারবার তাকানো।
  • একই সরলরেখায় দু’টি চোখ না নড়ার অনুভূতি।
  • অতিমাত্রায় দূরদৃষ্টি বা কাছের দৃষ্টিতে অসুবিধা।


ট্যারা চোখের প্রধান কারণগুলি কি কি?
যদিও এটি প্রাপ্ত বয়স্কদেরও হতে পারে, তবে ট্যারা চোখ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শিশু ও বাচ্চাদের মধ্যেই দেখা যায়।

এর সাধারণ কারণগুলি হলো:

  • শরীরের সর্বাধিক কর্মক্ষম চোখের মাংসপেশিতে আঘাত লাগলে চোখ ঘোরানোর ক্ষমতা কমে যায়।
  • রেটিনা লেন্স, কর্ণিয়া ও মণির রোগে চোখ ট্যারা হতে পারে।
  • এক চোখের দৃষ্টিশক্তি আরেক চোখের দৃষ্টিশক্তি থেকে বেশি কমে গেলে চোখ ট্যারা হয় (তিন ডায়াপ্টরের বেশি)।
  • চোখের মাংসে স্নায়ু থাকে যেমন- ৩, ৪ ও ৬নং ক্রানিয়াল নার্ভ আক্রান্ত হলেও চোখ ট্যারা হয়।
  • শৈশব থেকেই চোখের সমন্বয়ের অনুন্নত বিকাশ।
  • অতিমাত্রায় দূরদৃষ্টি (হাইপারোপিয়া)।
  • চোখের পেশী, স্নায়ু অথবা মস্তিষ্কে সমস্যা যা চোখের নড়াচড়ায় প্রভাব ফেলে।
  • মানসিক আঘাত, স্ট্রোক, ও অন্যান্য সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা।


ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়গুলি নিম্নলিখিত:

  • ট্যারা চোখের পারিবারিক ইতিহাস।
  • ডাউন’স সিন্ড্রোম ও সেরিব্রাল পালসি।


ট্যারা চোখ থাকলে কী করবেন?

  • পাঁচ বছর বয়সের মধ্যে সব শিশুর একবার চোখ পরীক্ষা করা দরকার।
  • কখনো কারও চোখে একটির চেয়ে অন্যটি কম দেখতে পেলে অকুলোপ্লাস্টি সার্জনের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
  • একটি বস্তুকে দুটি অথবা ঝাপসা দেখলে অকুলোপ্লাস্টি সার্জনের সাহায্য নেওয়া উচিত।
  • পড়াশোনা করার সময় কারও মাথাব্যথা হলে দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা করা উচিত।
  • যেকোনো বয়সের রোগীর টেরা চোখ থাকলে চিকিৎসার মাধ্যমে সারানো সম্ভব।
  • একটি চোখ বন্ধ করে, চোখের পাওয়ার নিরূপণ করে চশমা দিয়ে চোখের ব্যায়াম করে চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শে টেরা চোখ সারানোর চেষ্টা করা যায়।
  • এ ছাড়া অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে টেরা চোখ সম্পূর্ণ সোজা করা যায়।


কিভাবে ট্যারা চোখ নির্ণয় ও চিকিৎসা করা হয়?
ট্যারা চোখের সমস্যা নির্ণয় করার জন্য বিস্তারিতভাবে চক্ষু পরীক্ষা করার প্রয়োজন পড়ে। ডাক্তার উপসর্গের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসা করতে পারেন। চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ দৃষ্টিশক্তি ও চোখের সমন্বয় মূল্যায়ন করে দেখেন। এই পরীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত টেস্টগুলি হলো:

  • ভিজ্যুয়াল অ্যাকুইটি: এই পরীক্ষায় মূল্যায়ন করে দেখা হয়, দৃষ্টিশক্তি কতোটা প্রভাবিত হয়েছে। পরীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে- সংশ্লিষ্ট দুরত্ব থেকে বিভিন্ন আকারের অক্ষর পড়তে বলা, যা আপনার দৃষ্টিশক্তি সক্ষমতার আংশিক ফলাফল জানা যায়।
  • রিফ্র্যাক্টিভ এরর: ডাক্তার প্রতিসরণমূলক ত্রুটির নির্ণয় করবেন লেন্সের পাওয়ার সুনিশ্চিত করার জন্য, যাতে যে ত্রুটি হয়েছে, তা পূরণ করার উদ্দেশে।
  • আই হেলথ: আপনার চোখের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার জন্য ডাক্তার স্প্লিট লেন্স মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করতে পারেন।


ট্যারা চোখের চিকিৎসার মধ্যে অন্তর্গত:

  • চোখের চশমা বা কনট্যাকট লেন্স।
  • ভিশন থেরাপি।
  • চোখে অস্ত্রোপচার।