ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিস (ডিভিটি) কি?
পায়ের পিছনে (ইংরেজিতে কাফ বলা হয়) বিশেষ ধরনের ডিপ ভেন থাকে। বিভিন্ন কারণে এই ভেনে রক্ত জমাট বেঁধে গেলে, তাকে বলে ডিপ ভেন থ্রম্বোসিস (ডিভিটি)। বেশির ভাগ সময়ে কাফের ডিপ ভেনেই ডিভিটি হয়ে থাকে। জমাট বাঁধা রক্তের দলাকে বলা হয় থ্রম্বাস আর জমাট বাঁধার পদ্ধতিটির নাম থ্রম্বোসিস। ডিভিটি থেকে নানা গুরুতর রোগ বা সমস্যা হতে পারে, যার দু’একটি প্রাণঘাতীও। ষাট বা তার বেশি বয়সের ব্যক্তিদের মধ্যে এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা অপেক্ষাকৃত বেশি। যদিও কম বয়সের মানুষদেরও এই সমস্যা হতে পারে। যেমন, যাঁদের দীর্ঘক্ষণ পা ঝুলিয়ে বসে বা দাঁড়িয়ে কাজ করতে হয় বা যাঁরা অনেকক্ষণ একনাগাড়ে গাড়ি চালান, তাঁরাও ডিভিটি-তে আক্রান্ত হতে পারেন।

ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিস এর প্রধান লক্ষণ এবং উপসর্গগুলো কি কি?
ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিস এর প্রধান উপসর্গ হল পা ফুলে যাওয়া। সেটা হঠাৎ করে অথবা ধীরে ধীরেও হতে পারে। বেশিক্ষণ পা ঝুলিয়ে বসে থাকলে অনেকের পা ফুলে যায়। এটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু যদি অল্প সময়ের মধ্যে পা ফোলে, সঙ্গে মৃদু যন্ত্রণা হয়, সেখানে ত্বক লালচে হয়ে যায়, তা হলে এগুলোকে ডিপ ভেন থ্রম্বোসিসের লক্ষণ বলেই ধরে নেওয়া হয়। যে জায়গাটা ফুলছে, সেই জায়গায় আঙুল দিয়ে চাপ দিলে সেটা ঢুকে যাবে। তা ছাড়া, ফোলা অংশটা সামান্য গরমও হতে পারে। খুবই বিরল ক্ষেত্রে, দুই পা ফুলে যেতে দেখা যায়।

এর অন্যান্য উপসর্গগুলির মধ্যে রয়েছে:

  • পায়ে ব্যথা।
  • পায়ের উপরে লালচে বিবর্ণতা।
  • পায়ে গরম অনুভব করা।


যদি এই উপসর্গগুলিকে উপেক্ষা করা হয়, তাহলে রক্তের জমাট স্থানচ্যুত হতে পারে, এবং রক্তস্রোতের মাধ্যমে ফুসফুস অবধি বইতে থাকে এবং রক্ত চলাচল রোধ করে, যা পালমোনারি এম্বলিজমের কারণ হয়।

পালমোনারি এম্বলিজমের উপসর্গগুলির মধ্যে রয়েছে:

  • হঠাৎ করে নিঃশ্বাস নেওয়ার সমস্যা।
  • বুকে ব্যথা যা গভীর নিঃশ্বাস নেওয়া এবং কাশির সাথে আরো খারাপ হয়।
  • মাথা ঘোরা।
  • নাড়ির স্পন্দনের বৃদ্ধি।
  • রক্ত কাশি হওয়া।


ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিস এর প্রধান কারণগুলি কি কি?
যে কোন জিনিস যা রক্ত চলাচল রোধ করে তা ডিভিটির কারণ হতে পারে। এর প্রধান কারণগুলি হল:

  • ভেইনে কোন আঘাত।
  • অস্ত্রোপচার।
  • গুরুতর অসুস্থতা যেমন ক্যান্সার, হার্টের রোগ অথবা তীব্র সংক্রমণ।
  • নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ।
  • দীর্ঘ সময়ের নিষ্ক্রিয়তা।


কিছু ঝুঁকির বিষয়গুলি যা ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিস হওয়ার সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দেয়:

  • বংশগত তঞ্চন ব্যাধি।
  • গর্ভাবস্থা।
  • জন্ম নিয়ন্ত্রণকারক ওষুধ ব্যবহার করা।
  • স্থূলতা।
  • ধূমপান করা।
  • হৃদস্পন্দন বন্ধ হওয়া।
  • ইনফ্লামাটরি বাওয়েল ডিজিজ।


ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিস কিভাবে নির্ণয় এবং চিকিৎসা করা হয়?
ডিপ ভেন থ্রম্বোসিস নির্ণয়ের জন্য পায়ের শিরার (লেগ ভেনস) কালার ডপলার স্টাডি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়াও চিকিৎসকেরা বিভিন্ন রক্ত পরীক্ষা, পেটের ইউএসজি, ইকোকার্ডিয়োগ্রাম ইত্যাদি করে দেখে নেন অন্য কোনও কারণে পায়ের সমস্যাটা হচ্ছে কি না। রোগীর মেডিকেল ইতিহাস এবং প্রভাবিত পায়ের শারীরিক পরীক্ষার উপর মূলত নির্ণয় নির্ভর করে। ওষুধের ইতিহাসও নেওয়া হয়।

এমন কিছু পরীক্ষাও আছে যা ডিভিটির অন্তর্নিহিত কারণ সনাক্ত করতে পারে:

  • রক্ত পরীক্ষা।
  • বুকের এক্স-রে।
  • ইসিজি।


ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিসের চিকিৎসাঃ
ডিভিটি হলে কী করা উচিত আর কী নয় এবং সেই বিষয়ে সচেতন হওয়া সবচেয়ে জরুরি। যেমন, যাঁরা ধূমপান করেন, তাঁদের এই অভ্যেস ত্যাগ করতেই হবে। মহিলাদের চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কনট্রাসেপটিভ পিল নেওয়া একেবারেই চলবে না, বিশেষত অনেক দিন ধরে। এখন অনেকেই বাড়িতে বসে কাজ করছেন। কিছু ক্ষণ কাজ করার পরেই একটু হাঁটাচলা করতে হবে। একই নিয়ম বর্তাবে, যাঁরা দীর্ঘক্ষণ গাড়ি চালান তাঁদের ক্ষেত্রেও। সাধারণত, দু’তিন ঘণ্টা গাড়ি চালানোর পরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়া জরুরি ও একটু চলাফেরাও করা দরকার। যাঁরা স্থূলকায়, তাঁদের উদ্যোগ নিতে হবে ওজন কমানোর। অনেকেরই বয়সকালে নানা ধরনের অস্ত্রোপচার হয়। অস্ত্রোপচারের পরে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চলাফেরা শুরু করতে হবে। যাঁরা উঠতে পারবেন না, তাঁদের অন্তত পা, কোমর নাড়াচাড়া করা প্রয়োজন।

ডায়াটিশিয়ানের পরামর্শ নিয়ে বয়স অনুযায়ী নিয়মমাফিক খাওয়াদাওয়া এবং শারীরিক কসরত ডিভিটি নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে খুবই জরুরি। তা ছাড়া, ডিভিটি-র রোগীদের শোয়ার সময় পা তুলে শুতে হবে। পা ফোলা থাকলে চলাফেরা করার সময়ে ব্যবহার করতে হবে ইলাস্টিক স্টকিং (বিশেষ ধরনের মোজা)। অ্যান্টি-প্লেটলেট গ্রুপের ওষুধ (অ্যাস্পিরিন বা ক্লপিডগরেল) এই রোগ প্রতিরোধে কাজে লাগে। যদিও যে ব্লাড ক্লটগুলি ইতিমধ্যেই রয়েছে, সেগুলি কিন্তু গলাতে পারে না এই ওষুধ। তার জন্য দরকার হয় অ্যান্টিকোয়াগুল্যান্ট।

প্রাথমিক ভাবে হেপারিন দিয়ে চিকিৎসার পরে ওরাল অ্যান্টিকোয়াগুল্যান্ট শুরু করা হয়। এটি দীর্ঘ দিন চলতে পারে। মাঝেমধ্যে মনিটরিং করে দেখে নিতে হয় ডোজ় ঠিক আছে কি না। ডিভিটির ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন খুব কমই পড়ে। তবে পালমোনারি এম্বলিজ়মের ক্ষেত্রে এর প্রয়োজন হতে পারে। অনেক সময়ে ডিভিটি রোগীর কুঁচকির শিরার মধ্যে অস্ত্রোপচার করে ছাতার মতো একটি বস্তু লাগিয়ে দেওয়া হয়, যাতে জমাট রক্ত উপরের দিকে উঠতে না পারে। কিন্তু খুব প্রয়োজন ছাড়া এই অস্ত্রোপচার করা হয় না।

ডিভিটি রোগ নির্ণয় এবং তার চিকিৎসার সতর্কতামূলক নিয়মগুলি মেনে চলা খুবই জরুরি। না হলে আবার এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়।