দাঁতের ক্ষয় রোগ কি?
সাধারণত দাঁতের ক্ষয় হিসাবে পরিচিত গর্তগুলি দাঁতের এনামেলের বাইরের প্রতিরক্ষামূলক স্তরটির ক্ষতি করে।

শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্ক উভয়ের মধ্যে এটি খুবই প্রচলিত একটি দীর্ঘস্থায়ী রোগ। দাঁত ক্ষয় (ডেন্টাল ক্যারিস) তখন হয় যখন মুখের ভিতরের ব্যাকটেরিয়াগুলি অ্যাসিড তৈরি করে যা এনামেলকে আক্রমণ করে। এর ফলে দাঁতে গর্ত তৈরি হতে পারে। যদি সময় মতো এই রোগের যথাযথ চিকিৎসা করা না হয় তবে ব্যাথা, সংক্রমণ এমনকি দাঁত পড়েও যেতে পারে।

বেশিরভাগ উন্নয়নশীল স্বল্প-আয়ের দেশগুলিতে, দাঁতের ক্ষয়রোগের বিস্তারের হার বেশি এবং ৯০ শতাংশর বেশি ক্ষেত্রে চিকিৎসা করা হয় না। দাঁতের ক্ষয় বায়োফ্লিম-দ্বারা ঘটিত, শর্করা-নির্ভর রোগ যা যে কোন বয়সেই হতে পারে।

দুধের দাঁতেও (প্রাথমিকভাবে যে দাঁত গজায়) ক্ষয়ের সমস্যা হতে পারে আবার স্থায়ী দাঁতেও (প্রাথমিক পর্যায়ের পরে যে দাঁত গজায়) এই সমস্যা হয়, যার ফলে দাঁতের পরিকাঠামোগত ক্ষতি হয়।

সমগ্র বিশ্বের জনসংখ্যার ৩২ শতাংশ মানুষ দাঁতের ক্ষয়ে ভুগছেন, যেকারণে সচরাচর যে রোগগুলি মানুষের মধ্যে দেখা দেয় এমন অসুখের তালিকায় সাধারণ ঠান্ডা লাগার পর এটি দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে।

দাঁতের ক্ষয় রোগের প্রধান লক্ষণ ও উপসর্গগুলি কি কি?
প্রথমদিকে আলাদা করে কোনও উপসর্গ দেখা যায়না। কিন্তু ক্ষয় যত বাড়তে থাকে, লক্ষণগুলিও প্রকট হয়ে ওঠে।

  • দাঁতে খনিজগুলির অনুপস্থিতিতে সাদা বা বাদামি দাগ দেখা যায়, যা দাঁতের ক্ষয়রোগের প্রাথমিক লক্ষণ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়।
  • গরম, ঠান্ডা বা মিষ্টি জাতীয় খাবার খেলে দাঁতের সংবেদনশীলতা লক্ষ্য করা যায়।
  • খাবার চিবতে সমস্যা।
  • দন্তশূল বা দাঁতের বেদনা।
  • দাঁতে দৃশ্যমান গর্ত।
  • দাঁতের মাঝখানে খাবার আটকে যাওয়া।
  • এটি দাঁত এবং দাঁতের গোড়ায় থাকা স্নায়ুগুলির ক্ষতি করতে পারে।


দাঁতের ক্ষয় রোগ হওয়ার প্রধান কারণগুলি কি কি?
ক্ষয়ের প্রধান কারণ হলো মুখে বর্তমান থাকা ব্যাকটিরিয়া, যা সুক্রোজ, অন্যান্য শর্করা জাতীয় খাবার, পরিশ্রুত শ্বেতসার জাতীয় খাদ্য উপাদানের কারণে দাঁতের গোড়ায় গিয়ে আটকে যায়। এই ব্যাকটেরিয়া অ্যাসিড উৎপন্ন করে ও দাঁতের এনামেলকে ক্ষইয়ে ফেলে, যা হল দাঁতের সবচেয়ে শক্ত স্তর।

দাঁতের ক্ষয় রোগের প্রধান কারণ এবং ঝুঁকির বিষয়গুলি হল-
১) সঠিকভাবে দাঁতের যত্ন না নেওয়া

  • দিনে দুবার দাঁত না মাজা।
  • খাদ্য গ্রহণের পরেই মুখ না ধোওয়া।
  • অত্যধিক চিনি বা শ্বেতসারযুক্ত খাবার এবং পানীয় গ্রহণ করা।


২) দাঁতের ক্ষয়রোগ হওয়ার সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা রয়েছে-

  • যারা বোতল (বাচ্চা এবং শিশু) থেকে খাদ্য বা পানীয় গ্রহণ করে, বিশেষত যদি তাদের শোয়ার সময় চিনি মিশ্রিত দুধ বা রস খাওয়ানো হয়। এর ফলে দীর্ঘ সময় ধরে তাদের দাঁত শর্করার সংস্পর্শে থাকে। খাওয়ানোর পরে একটি সুতির কাপড় দিয়ে তাঁদের মাড়ি পরিষ্কার করে দেওয়া উচিৎ।
  • পর্যাপ্ত ফ্লোরাইড না পাওয়া।
  • কিছু ওষুধ, নির্দিষ্ট রোগ বা ক্যানসারের চিকিৎসার কারণে লালা কমে যায়।


৩) মাড়ির পিছনের দাঁতগুলি অসমান হয় যার ফলে খাদ্য কণা আটকে যায় এবং ক্ষয় হওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে।

৪) টফি, চকোলেট, আইসক্রিম, মধু, চিনি, সোডা, শুকনো ফল, কেক, কুকিজ, শুকনো দানাশস্য এবং চিপসের মতো আঠালো খাবারগুলি দাঁত ক্ষয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।

৫) ঘন ঘন স্ন্যাকস এবং শর্করাযুক্ত পানীয়গুলি মুখের ব্যাকটেরিয়াগুলিকে অ্যাসিড তৈরি করতে আরও সহায়তা করে যা আমাদের দাঁতকে আক্রমণ করে এবং ক্ষয় হয়।

দাঁতের ক্ষয় রোগ কিভাবে নির্ণয় করা হয় ও এর চিকিৎসা কি?

  • ক্ষয় হয়েছে কি না তা দেখার জন্য দাঁতের ডাক্তার প্রথমে মুখের ভিতর পরীক্ষা করে দেখেন নানারকম যন্ত্রপাতির সাহায্যে।
  • যদি প্রয়োজন হয়, ডাক্তার রেডিওগ্রাফি করারও পরামর্শ দিতে পারেন দৃষ্টিলব্ধ পরীক্ষণটিকে নিশ্চিত করতে।
  • এরপর, পরীক্ষা করে পাওয়া ফল ও রোগীর উপসর্গগুলির মধ্যে সংগতি রেখে, দাঁতের ডাক্তার চিকিৎসা পদ্ধতি ঠিক করেন।
  • প্রাথমিক ভাবে, দাঁতে সাদা ছোপ দেখা দেয় যার থেকে বোঝা যায় এনামেলের ক্ষয় হচ্ছে। যাইহোক, অনেক সময় দাঁতে স্বাভাবিক কারণেও সাদা ছোপ ফুটে উঠতে পারে, একে ডেন্টাল ফ্লুওরোসিস বলা হয়।
  • দাঁত বিবর্ণ হয়ে যাওয়ার কারণ মানষিক আঘাতও হতে পারে। এইকারণে, দাঁত বিবর্ণ হয়ে যাওয়া মানেই দাঁতের ক্ষয় নয়।
  • চা ও কফি খেলে দাঁতে গর্তের কারণে দাগ বা দাঁতে ফাটল দেখা দিতে পারে। তাই, চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ধারণ করার আগে দাঁতের ডাক্তার ভালো করে পরীক্ষা করে দেখেন।


দাঁতের ক্ষয়ের ব্যাপকতা অনুযায়ী, দাঁতের ডাক্তার চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ধারণ করেন।

  • প্রাথমিক চিকিৎসা – দাঁতের এনামেলের পুনর্গঠনের জন্য ফ্লুওরাইডেটেড বার্নিশ ব্যবহার করা হয়।
  • এর পরবর্তী পর্যায়ে চিকিৎসা হল, দাঁতের ক্ষয় বন্ধ করতে ভরাট করা বা রুট ক্যানাল ট্রিটমেন্ট, খুবই মারাত্মকভাবে দাঁতের ক্ষয় হলে, ডাক্তার দাঁত তুলেও দিতে পারেন।


চিকিৎসায় কত সময় লাগবে সেটা নির্ভর করে চিকিৎসার ব্যাপ্তির ওপর। বর্তমানে প্রযুক্তির যেভাবে উন্নতি হয়েছে তাতে, দাঁতের ডাক্তারের পক্ষে একদিনেই এর চিকিৎসা করা সম্ভব হয়। দাঁতের চিকিৎসা যন্ত্রণাদায়ক তবে সেটা সবসময় নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই, ডাক্তার লোকাল অ্যানাসথেসিয়া ব্যবহার করেন চিকিৎসার সময় যাতে ব্যথা অনুভূত না হয়। দাঁতের গর্ত বা ক্ষয় হওয়া অংশে ফ্লুওরাইড জেল ব্যবহার করা হয় অথবা দাঁতের গর্ত বা ক্ষয়টিকে বন্ধ করে দেওয়া হয় নির্দিষ্ট উপাদান দিয়ে। দাঁতে গর্ত যদি খুব গভীর হয়, তাহলে প্রথমে সেটিকে পরিষ্কার করা হয়, তারপর দাঁতের ওপর কৃত্রিম মাথা বা ক্রাউন বসানো হয়। যদি ক্ষয় মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তাহলে ক্ষয় হওয়া দাঁত তুলে ফেলার প্রয়োজন হয়।

দাঁতের ক্ষয় রোগ প্রতিরোধ করারঃ

  • দাঁতের ক্ষয়রোগ প্রতিরোধের প্রথম ধাপ হল মুখগহ্বরের যত্ন নেওয়া।
  • প্রতিদিন দুবার ফ্লুরাইডযুক্ত মাজন দিয়ে দাঁত মাজতে হবে।
  • ফ্লস বা ইন্টারডেন্টাল ক্লিনার ব্যবহার করে আপনার দাঁত পরিষ্কার করুন।
  • খাবারের মধ্যে শর্করাযুক্ত খাবার নির্দিষ্ট মাত্রায় গ্রহণ করুন এবং অতিরিক্ত চিনি, উচ্চমাত্রায়-অ্যাসিডযুক্ত খাবার নিয়ন্ত্রণ করুন।
  • এমন খাবারগুলি এড়িয়ে চলুন যা খাওয়ার পরে দাঁতের গর্তগুলিতে আটকে পড়ে এবং খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মুখ ধুয়ে ফেলুন বা দাঁত মেজে নিন।
  • খাওয়ার পরে অবশ্যই ভাল করে মুখ ধুয়ে ফেলুন।
  • চিনিবিহীন জাইলিটল-সহ গাম চিবাতে পারেন, যা লালারস প্রবাহকে সচল রাখে।
  • যখনই সম্ভব, কিছুটা হলেও কলের জল পান করুন কারণ জনসাধারণের জল সরবরাহে ফ্লোরাইড থাকে, যা দাঁতের ক্ষয়কে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করতে সহায়তা করে।
  • সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) স্কুলবয়সি সমস্ত বাচ্চার জন্য সিল্যান্টের প্রস্তাব দেয়। সিল্যান্টগুলি দাঁতের অসম পৃষ্ঠকে সমান রাখতে সাহায্য করে। মাড়ির পিছনের দিকের দাঁতগুলির তল অসমান হওয়ার কারণে খাবার জমে থাকে, সিল্যান্ট সেই সমস্যা দূর করতে সাহায্য করে।
  • সিডিসির মতে, “সিল্যান্টবিহীন স্কুলবয়সি বাচ্চাদের সিল্যান্টযুক্ত শিশুদের চেয়ে দাঁতে প্রায় তিনগুণ বেশি গহ্বর রয়েছে।"
  • দাঁতের ক্ষয় শনাক্ত করার জন্য নিয়মিত দাঁতের চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।