ডাস্ট অ্যালার্জি কি?
ডাস্ট মাইট, বাসাবাড়িতে বিশেষ করে শোবার ঘরের বিছানায় বসবাসকারী একটি অতি ক্ষুদ্র জীব। বিছানায় শুয়ে থাকলে বা ঘুমালে দিনে অন্ত:ত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা সময়, সে আমাদের সঙ্গী হিসেবে থাকে এবং অনেক সময় বিভিন্নভাবে অ্যালার্জির প্রাদুর্ভাব ঘটায়। ডাস্ট মাইট অ্যালার্জির ফলে হাঁচি, নাক দিয়ে পানি পড়া, মাঝে মাঝে নাক বা কান বন্ধ হয়ে থাকা, চোখ লাল হয়ে যাওয়া, একজিমা (চামড়ার রোগ), চোখ দিয়ে পানি পড়া এবং অনেক সময় এজমা (হাঁপানি বা শ্বাস কষ্ট) রোগীদের হাঁপানির উদ্রেগ হয়। হাঁপানি রোগীদের অনেকের কাছে ডাস্ট মাইট একটি পরিচিত নাম। এই পোকাগুলিকে ধুলোর পোকা বলা হয়, এবং তারা আকারে অণুবীক্ষণিক হয় এবং খালি চোখে দেখা যায় না। সারা বিশ্বে প্রায় ৮৫ শতাংশ এজমা রোগী (হাঁপানি রোগী) ডাস্ট মাইটসের অ্যালার্জিতে আক্রান্ত।

ডাস্ট অ্যালার্জির প্রধান লক্ষণ এবং উপসর্গগুলি কি কি?
ডাস্ট অ্যালার্জির অ্যালার্জেন বাড়িতে আর্দ্র পরিবেশে বড়ো হয় এবং ভিতরের পরিবেশের সাথে খুব ভালোভাবে মানিয়ে নেয়। যদি আপনার মধ্যে ডাস্ট অ্যালার্জিতে আক্রান্ত ব্যক্তি নিম্নলিখিত উপসর্গগুলির মধ্যে একটি বা একাধিক উপসর্গ অনুভব করতে পারেন:

  • হাঁচি
  • সর্দি বা নাক দিয়ে পানি পড়া
  • চোখে জ্বালা বা চুলকানি এবং পানিপূর্ণ চোখ
  • চামড়ায় জ্বালা বা চুলকানি
  • বন্ধ নাক।


ডাস্ট অ্যালার্জির দ্বারা সৃষ্টি করা এজমার (হাঁপানি রোগের) নিম্নলিখিত উপসর্গগুলি অনুভব করতে পারেন:

  • শ্বাস নিতে কষ্ট
  • বুক থেকে সাঁসাঁ করে নিঃশ্বাস ফেলার শব্দ
  • ঘুমানোর অসুবিধা।


ডাস্ট অ্যালার্জির প্রধান কারণগুলি কি কি?
ডাস্ট অ্যালার্জি হয় ডাস্ট মাইটসের আক্রমনে। ডাস্ট মাইটস বা ধুলোর পোকাগুলি মানুষের খসে পড়া মরা চামড়ার কোষগুলি ভোজন করে, যা দিয়েই প্রধানত বাড়ির ধুলো তৈরী হয়। ডাস্ট মাইটস বা ধুলোর পোকাদের, বাড়ির ডাস্ট মাইটস এবং স্টোরেজ মাইটস এই দুই শ্রেণীতে ভাগ করা যায় এবং এরা বাতাস চলাচল এবং নাকের ভিতরে জ্বালার জন্য দায়ী।

ডাস্ট মাইটের মতো অ্যালার্জেনের (অ্যালার্জি সৃষ্টিকারী জীবের) উপস্থিতিতে, আপনার শরীর অ্যান্টিবডি বা প্রতিরোধক (আইজিই) তৈরী করে যা আপনাকে এই প্রতিক্রিয়া থেকে বাঁচতে এবং নিজের প্রতিরক্ষা করতে সাহায্য করে। এই প্রতিক্রিয়া স্থানীয়ভাবে বা শরীরের কোনো একটি অংশকে নিয়ে হতে পারে।

কিছু বিরল ক্ষেত্রে, এই ডাস্ট অ্যালার্জি শরীরে অ্যানাফাইলেটিক শক তৈরী করতে পারে, যা এক ধরনের মারাত্মক অবস্থা যা শুধুমাত্র ডাস্ট মাইট খেয়ে ফেলার ফলে হতে পারে। এই ডাস্ট মাইট গদি, কার্পেট এবং আসবাবপত্রের উপর বাস করে। কিছু ক্ষেত্রে, ডাস্ট মাইট খাবারকে নষ্ট বা বিষাক্ত করে দিতে পারে। অল্পবয়সী শিশু, এজমা রোগী (হাঁপানি রোগী), এবং গর্ভবতী মহিলাদের এই ধরনের অ্যালার্জি হওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে।

ডাস্ট অ্যালার্জির নির্ণয় এবং চিকিৎসা কিভাবে করা হয়?
ঠিক কোন অ্যালার্জেন বা জীবটি ডাস্ট অ্যালার্জির জন্য দায়ী তা সঠিকভাবে নির্ণয় করতে, কিছু রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা করা প্রয়োজন। প্রচলিত পরীক্ষার সময় ত্বকে ছিদ্র করে পরীক্ষা করা হয় যেখানে অ্যালার্জিকে ধরতে বাড়ির ডাস্ট মাইটের একটি নির্যাস ব্যবহার করা হয় এবং কতক্ষণ পর ওই জায়গায় অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া শুরু হচ্ছে তা পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং কতটা জায়গা ফুলে গেছে বা লাল হয়ে গেছে তা মাপা হয়। যদি আক্রান্ত ব্যক্তি ত্বকের বা চামড়ার পরীক্ষা করতে সংবেদনশীল হন তবে রক্ত পরীক্ষা করানো সুবিধাজনক হয়। রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমেও অ্যালার্জির নির্দেশক কিছু অ্যান্টিবডি সনাক্ত করা যেতে পারে। নাকের ভিতরের মিউকোসাল বা চোখের লালভাবের পরীক্ষা করেও অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করা যেতে পারে।

কোন অ্যালার্জেন ডাস্ট অ্যালার্জির কারণ তা জানতে পারলে ডাস্ট অ্যালার্জির চিকিৎসা খুব সহজ হয়ে যায়। শরীরের মধ্যস্থতাকারীর উপর চিকিৎসা নির্ভর করে, যেমন হিস্টামাইন এবং লিউকোট্রাইন, যা অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া ঘটাতে সাহায্য করে।

  • এন্টিহিস্টামিনিক এবং মাস্ট সেল ইনহিবিটর্স
  • লিউকোট্রাইন ইনহিবিটর্স
  • ইমিউনোথেরাপি বা রোগপ্রতিরোধক থেরাপি- এটি চিকিৎসার আরেকটি নতুন পদ্ধতি যেখানে রোগীর অ্যালার্জির সংবেদনশীলতা পরিচালিত হয়। এটি দীর্ঘস্থায়ী এবং ভালো ফলাফল দেখায়।
  • ঔপসর্গিক চিকিৎসা - অ্যালার্জি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ওরাল স্টেরয়েডের মত ওষুধগুলি দেওয়া হতে পারে।


ডাস্ট অ্যালার্জি প্রতিরোধের উপায় কি?
ডাস্ট মাইটস অ্যালার্জি না হওয়ার জন্য সবচেয়ে ভালো উপায় হলো ধুলাবালি থেকে দূরে থাকা। এজন্য প্রয়োজনীয় উপায়গুলো অবলম্বন করা যেতে পারে—

  • বাসাবাড়িতে যথাসম্ভব কম ফার্নিচার রাখা। ফার্নিচারে দ্রুতই ধুলাবালি জমতে শুরু করে। নিয়মিত পরিষ্কার না করলে এগুলোই বিপদ বাড়িয়ে দেয়।
  • বিছানায় সুতির চাদর ও বালিশের কভার ব্যবহার করা যেতে পারে। ম্যাট্রেস, তোশক ও বালিশের বাইরের অংশে মাইটস প্রতিরোধক সিনথেটিক কভারের ব্যবস্থা করা উত্তম। যাদের ডাস্ট অ্যালার্জি বেশি তাদের উচিৎ হবে প্রয়োজন ছাড়া বাকি সময়ে পুরো বিছানা আলাদা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা।
  • প্রতিদিনের ব্যবহার্য কাপড় , চাদর, বালিশ ইত্যাদি মাঝেমাঝে কয়েক ঘণ্টা রোদে দিতে পারলে কাপড়ের আর্দ্রভাব চলে যায় এবং রোগ-জীবাণুও অনেকটা নির্মূল হয়। কেননা কাপড়ের আর্দ্রতা রোগজীবাণুর বংশবিস্তারের জন্য সহায়ক।
  • শোবার ঘরে বই এর তাক, ম্যাগাজিন, খবরের কাগজ না রাখা। এগুলোর ওপর সহজেই ধুলা জমতে পারে। পরে সে ধুলাই হতে পারে আপনার ব্যাধির কারণ।
  • ডাস্ট মাইটস ঠাণ্ডা ও শুকনো জায়গায় টিকে থাকতে পারে না। তাই বাসায় যথেষ্ট বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা থাকা দরকার।
  • দেয়াল, কাঠের আসবাবপত্র, জানালা, কার্নিশ ও অন্যান্য স্থান থেকে মাঝে মাঝে ধুলা পরিষ্কার করা প্রয়োজন। ঘরবাড়ি পরিষ্কার থাকলে যেমন মানসিকভাবে শান্তি পাবেন তেমনি রোগবালাই থেকেও দূরে থাকবেন।
  • ধুলা পরিষ্কারের সময় নাক ঢেকে নেওয়া বা মাস্ক পরা উচিত। কারণ ধুলাবালি পরিষ্কারের সময়ে সেগুলো বাতাসে ভেসে বেড়ায়। যা সহজেই নাকের মাধ্যমে আমাদের শরীরের ভেতরে প্রবেশ করতে পারে।
  • সম্ভব হলে বাসায় কার্পেট না রাখাই ভালো। কার্পেট ধুলাবালির জন্য আদর্শ এক উত্‍স।
  • বাসায় লোমশ ও পালকযুক্ত প্রাণী না পোষা। এসব প্রাণীর শরীরে অ্যালার্জেন থাকে যা আমাদের শরীরে অ্যালার্জির সৃষ্টি করে।