ইসলামে ঘুষ খাওয়া হারাম কেনো? কুরআন-হাদীস কী বলে?

ইসলামে ঘুষ খাওয়া হারাম কেনো? কুরআন-হাদীস কী বলে?
বিভাগ: 

2 টি উত্তর

ঘুষ একটি অন্যায় কাজ- একথা সকলে একবাক্যে স্বীকার করেন। অথচ দুঃখজনক যে, এটি দেশের সর্বত্র বহাল তবিয়তে চালু রয়েছে। এতে একজনের প্রাপ্তি এবং অন্যজনের ক্ষতি ও মনঃকষ্ট, মানুষে মানুষে ঘৃণা, ক্ষোভ, আইনের প্রতি অশ্রদ্ধা ইত্যাদি নৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়ের মধ্য দিয়ে পুরো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ক্রমে বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হয়। অপরদিকে সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ অখুশি হন। এর অশুভ পরিণতি এক সময় নিজের উপর ও পরবর্তী প্রজন্মের উপর বর্তায়। তাই স্বভাবতঃই এর নগ্ন চেহারা ও অশুভ পরিণতি নিয়ে আলোচনা এখন খুবই প্রাসঙ্গিক এবং সময়ের অনিবার্য দাবী। ঘুষের প্রকৃতি : সাধারণভাবে ঘুষের প্রকৃতি ও পরিচয় প্রায় সকলেরই জানা। কিন্তু এর সবচেয়ে বড় যাদুকরি দিক হ’ল- এর সাথে সংশ্লি¬ষ্ট ব্যক্তিরা কেউই এটিকে ঘুষ বলতে চান না। তারা বরং এটিকে ৫%, ১০% অফিস খরচ, বখ্শিশ, চা-মিষ্টি, হাদিয়া এসব নামে অভিহিত করতে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। একেকটি অফিস বা প্রতিষ্ঠানে এক এক নামে এটি পরিচিত। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, নাম বদল করে তারা এ অপরাধকে কিছুটা হালকাভাবে দেখতে চান। এজন্যই বুঝি ওমর বিন আব্দুল আযীয [রহঃ] বলেছিলেন, ﻛﺎﻧﺔ ﺍﻟﻬﺪﻳﺔ ﻓﻰ ﺯﻣﻦ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﻫﺪﻳﺔ، ﻭﺍﻟﻴﻮﻡ ﺭﺷﻮﺓ. ‘রাসূলুল্লাহ [সা.]-এর যুগে উপঢৌকন হাদিয়া ছিল। আর এখন তা ঘুষ’। [১. বুখারী, ‘হেবা ও তার ফযীলত’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১৭।] কিন্তু অহী-র জ্ঞানের ফায়ছালার দিকে লক্ষ্য করলে আমরা দেখতে পাই, রাসূলুল্লাহ [সা.]-এর দরবারে একজন কর্মচারী কিছু মাল এনে বলল, এটা আপনাদের [সরকারী] মাল, আর এটা আমাকে দেয়া হাদিয়া। রাসূলুল্লাহ [সা.] এতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, সে তার বাবা-মার ঘরে বসে থাকল না কেন, তখন সে দেখতে পেত, তাকে কেউ হাদিয়া দেয় কি-না? [ঐ, হা/২৫৯৭ ‘হেবা ও তার ফযীলত’ অধ্যায়।] অতঃপর এর মন্দ দিক তুলে ধরে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করলেন। এ থেকে বুঝা যায়, যত সুন্দর নামেই এর নামকরণ করা হৌক কিংবা জনগণ খুশি হয়ে প্রদান করুক অথবা কাজের বিনিময় হিসাবে দিয়ে থাকুক, অর্পিত দায়িত্ব পালনের বিনিময়ে বেতন-ভাতা বাদে অন্যের কাছ থেকে যে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করা হয় তার সবই ঘুষ এবং অন্যায়। এতে একপক্ষ অধিক লাভবান হয় এবং অন্যপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা ইসলাম ও সাধারণ বিবেক কোনটিই সমর্থন করে না। আপাতদৃষ্টিতে ঘুষকে একটি মাত্র অপরাধ মনে করা হ’লেও বস্ত্তত এটি বিভিন্ন পথ ও পন্থায় অসংখ্য অপরাধের দায়ে ঘুষখোরকে অভিযুক্ত করে কীভাবে তার ধ্বংস সুনিশ্চিত করে পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে সে সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হল।– ১. যুলুমের দায়ে অভিযুক্ত : ঘুষের মাধ্যমে অন্যের প্রতি আর্থিক ও মানসিক যুলুম করা হয় বলে ঘুষখোররা যালেম হিসাবে অপরাধী। যুলুমের শাস্তি সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে, ‘কেবল তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অবলম্বন করা হবে, যারা মানুষের প্রতি যুলুম করে এবং পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে বিদ্রোহ করে বেড়ায়। তাদের জন্য রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি’ [শূরা ৪২/৪২]। আরো এরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ যালিমদেরকে পসন্দ করেন না’ [শূরা ৪২/৪০]। মহান আল্লাহ অন্যত্র বলেন, ‘যারা যুলুম করে তোমরা তাদের দিকে ঝুঁকে পড় না। পড়লে তোমাদেরকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে। এমতাবস্থায় আল্লাহ ব্যতীত তোমাদের কোন অভিভাবক থাকবে না এবং তোমাদের সাহায্য করা হবে না’ [হূদ ১১/১১৩]। তিনি আরো বলেন, ‘আর আল্লাহ যালিম সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালনা করেন না’ [জুম‘আ ৬২/৫]। রাসূলুল্লাহ [সা.] বলেন, ﺍَﻟﻈُّﻠْﻢُ ﻇُﻠُﻤَﺎﺕٌ ﻳَﻮْﻡَ ﺍﻟْﻘِﻴَﺎﻣَﺔِ . ‘যুলুম ক্বিয়ামতের দিন অন্ধকার হয়ে আচ্ছন্ন করবে’। [বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৫১২৩ ‘যুলুম’ অনুচ্ছেদ।] হাদীছে কুদসীতে এসেছে, আল্লাহ বলেন, ﻳَﺎ ﻋِﺒَﺎﺩِﻯْ ! ﺇِﻧِّﻰْ ﺣَﺮَّﻣْﺖُ ﺍﻟﻈُّﻠْﻢَ ﻋَﻠَﻰ ﻧَﻔْﺴِﻲْ ﻭَﺟَﻌَﻠْﺘُﻪُ ﺑَﻴْﻨَﻜُﻢْ ﻣُﺤَﺮَّﻣًﺎ ﻓَﻼَ ﺗَﻈَﺎﻟَﻤُﻮْﺍ . ‘হে আমার বান্দারা! আমি আমার নিজের জন্য যুলুমকে হারাম করেছি এবং তোমাদের মধ্যেও সেটিকে হারাম গণ্য করেছি। সুতরাং তোমরা পরস্পর যুলুম কর না’। [মুসলিম হা/২৫৭৭।] ২. ঘুষখোর হারাম ভক্ষণকারী হিসাবে শাস্তিযোগ্য : এরশাদ হচ্ছে, ‘তোমরা একে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না’ [বাক্বারাহ ২/১৮৮]। রাসূলুল্লাহ [সা.] বলেন, ﺇِﻥَّ ﺭِﺟَﺎﻻً ﻳَﺘَﺨَﻮَّﺿُﻮْﻥَ ﻓِﻰْ ﻣَﺎﻝِ ﺍﻟﻠﻪِ ﺑِﻐَﻴْﺮِ ﺣَﻖٍّ ﻓَﻠَﻬُﻢُ ﺍﻟﻨَّﺎﺭُ ﻳَﻮْﻡَ ﺍﻟْﻘِﻴَﺎﻣَﺔِ . ‘নিশ্চয়ই যারা অন্যায়ভাবে আল্লাহর সম্পদ আত্মসাৎ করবে, ক্বিয়ামতের দিন তাদের জন্য নির্ধারিত রয়েছে জাহান্নাম’। [বুখারী, মিশকাত হা/৩৯৯৫, ‘নেতৃত্ব ও বিচার-ফায়ছালা’ অধ্যায়, ‘কর্মচারীদের বেতন নেওয়া ও উপঢৌকন গ্রহণ করা’ অনুচ্ছেদ, হা/৩৭৪৬ ‘গনীমতের মাল বিতরণ ও তাতে খেয়ানত করা’ অনুচ্ছেদ।] তিনি আরো বলেন, ﻻَ ﻳَﺪْﺧُﻞُ ﺍﻟْﺠَﻨَّﺔَ ﺟَﺴَﺪٌ ﻏُﺬِّﻯَ ﺑِﺎْﻟﺤَﺮَﺍﻡِ . ‘হারাম খাদ্য দ্বারা গঠিত শরীর জান্নাতে প্রবেশ করবে না’। [শুআবুল ঈমান, মিশকাত হা/২৭৮৭, হাদীছ ছহীহ।] ৩. আমানতের খিয়ানতকারী : রাসূল [সা.] বলেন, ﻣَﻦِ ﺍﺳْﺘَﻌْﻤَﻠْﻨَﺎﻩُ ﻋَﻠَﻰ ﻋَﻤَﻞٍ، ﻓَﺮَﺯَﻗْﻨَﺎﻩُ ﺭِﺯْﻗًﺎ، ﻓَﻤَﺎ ﺃَﺧَﺬَ ﺑَﻌْﺪَ ﺫَﺍﻟِﻚَ ﻓَﻬُﻮَ ﻏُﻠُﻮْﻝٌ. ‘আমি যাকে ভাতা দিয়ে কোন কাজের দায়িত্ব প্রদান করেছি, সে যদি ভাতা ব্যতীত অন্য কিছু গ্রহণ করে তাহ’লে তা হবে আমানতের খিয়ানত’। [৭. আবূদাউদ হা/২৯৪৩, মিশকাত/৩৭৪৮, হাদীছ ছহীহ।] আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ আমানতের খিয়ানতকারীদের পসন্দ করেন না’ [আনফাল ৮/৫৮]। আমানতের খিয়ানত মুনাফেকীর একটি অন্যতম আলামত’। [৮. বুখারী হা/৩৩ ‘ঈমান’ অধ্যায়, ‘মুনাফিকের আলামত’ অনুচ্ছেদ।] আর মুনাফিকের শাস্তি জাহান্নাম। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই মুনাফিকরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে অবস্থান করবে। আর তুমি তাদের কোন সাহায্যকারী পাবে না’ [নিসা ৪/১৪৫]।
ইসলাম ঘুষকে সমর্থ করে না।এ প্রসঙ্গে মহানবি (সঃ) বলেছেন:- ঘুষ দাতা ও ঘুষ গ্রিহীতা(খোর) উভয়ে জাহান্নামি। (দলিল:-তাবারানি)

সাম্প্রতিক প্রশ্নসমূহ