ট্যাটু হারাম হলে প্লাস্টিক সার্জারী হারাম নয় কেন?
 (26714 পয়েন্ট)

জিজ্ঞাসার সময়

1 Answer

 (26714 পয়েন্ট) 

উত্তরের সময় 

ট্যাটুর বিধান : ট্যাটুর বিধান বর্ণনার পূর্বে ট্যাটু বলতে আমরা কী বুঝি তা পরিস্কার করে নিই। বাংলা একাডেমীর অভিধানে Tattoo শব্দটিকে ‘উল্কি আঁকা’ অর্থ করা হয়েছে। উইকিশনারী মতে ট্যাটু হলো, tattoo (plural tattoos) 1. An image made in the skin with ink and a needle 2. A method of decorating the skin by inserting colored substances under the surface. The skin is punctured with a sharp instrument, which now is usually a solenoid-driven needle, that carries the inks to lower layers of the skin. আর ট্যাটুর আরবী শব্দ হলো وشم. আরবী অভিধানগুলোতে এর পরিচয় এভাবে দেয়া হয়েছে, هُوَ غَرْزُ الْجِلْدِ بِإِبْرَةٍ حَتَّى يَخْرُجَ الدَّمُ ، ثُمَّ يُذَرُّ عَلَيْهِ نِيلَةٌ أَوْ كُحْلٌ لِيَزْرَقَّ أَوْ يَخْضَرَّ . - رَدّ الْمُحْتَارِ عَلَى الدَّرِّ الْمُخْتَارِ 5 / 239 ، وَالْفَوَاكِه الدَّوَانِي 2 / 411 ، وَحَاشِيَة الْجُمَل عَلَى شَرْحِ الْمَنْهَجِ 1 / 416 ، 417 وَالْمُغْنِي مَعَ الشَّرْحِ الْكَبِيرِ 1 / 77 . الموسوعة الفقهية الكويتية – (43 / 157) সবমিলিয়ে যা স্পষ্ট হয় তা হলো, শরীরের চামড়ায় সুঁই বা এ জাতীয় কোনো কিছু দিয়ে ক্ষত করে তাতে বাহারি রং দিয়ে নকশা করা। এ রকম ট্যাটু বা উল্কি সাধারণত পার্মানেন্ট বা স্থায়ী হয়ে থাকে। এবং সহজে ওঠানো যায় না। এ ধরণের ট্যাটু বা উল্কি অধিকাংশ ফকীহদের নিকট হারাম। কেননা সহীহ হাদীসে এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। ১. ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, لَعَنَ رَسُول اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْوَاصِلَةَ وَالْمُسْتَوْصِلَةَ وَالْوَاشِمَةَ وَالْمُسْتَوْشِمَةَ যেসব মহিলা নকল চুল ব্যবহার করে এবং যারা অন্য মহিলাকে নকল চুল এনে দেয়, যেসব মহিলা উল্কি অঙ্কন করে এবং যাদের জন্য করে, রাসূল স. তাদের অভিশাপ দিয়েছেন। (বুখারী : ৫৫৯৮, মুসলিম : ৫৬৯৩) ২. ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, لعن الله الواشمات والمستوشمات والمتنمصات والمتفلجات للحسن المغيرات خلق الله যেসব মহিলা সৌন্দর্য্যের জন্য উল্কি অঙ্কন করে এবং যাদের জন্য করে, যেসব মহিলা ভ্রু উৎপাটন করে এবং দাঁত ফাঁকা করে, আল্লাহ তা’আলা তাদের অভিসম্পাত করেছেন। (বুখারী : ৫৬০৪) ট্যাটুর মাধ্যমে আল্লাহর সৃষ্টিতে পরিবর্তন করা হয়। যা আল্লাহ অপছন্দ করেন। ক্বিয়ামতের দিন তিনি এসব লোককে তাঁর সামনে তাঁর সৃষ্টিতে পরিবর্তন করতে বলবেন। তিনি বলেন, إِن يَدْعُونَ مِن دُونِهِ إِلَّا إِنَاثًا وَإِن يَدْعُونَ إِلَّا شَيْطَانًا مَّرِيدًا – لَّعَنَهُ اللَّهُ ۘ وَقَالَ لَأَتَّخِذَنَّ مِنْ عِبَادِكَ نَصِيبًا مَّفْرُوضًا – وَلَأُضِلَّنَّهُمْ وَلَأُمَنِّيَنَّهُمْ وَلَآمُرَنَّهُمْ فَلَيُبَتِّكُنَّ آذَانَ الْأَنْعَامِ وَلَآمُرَنَّهُمْ فَلَيُغَيِّرُنَّ خَلْقَ اللَّهِ ۚ وَمَن يَتَّخِذِ الشَّيْطَانَ وَلِيًّا مِّن دُونِ اللَّهِ فَقَدْ خَسِرَ خُسْرَانًا مُّبِينًا - তারা আল্লাহকে পরিত্যাগ করে শুধু নারীর আরাধনা করে এবং শুধু অবাধ্য শয়তানের পূজা করে। যার প্রতি আল্লাহ অভিসম্পাত করেছেন। শয়তান বললঃ আমি অবশ্যই তোমার বান্দাদের মধ্য থেকে নির্দিষ্ট অংশ গ্রহণ করব। তাদেরকে পথভ্রষ্ট করব, তাদেরকে আশ্বাস দেব; তাদেরকে পশুদের কর্ণ ছেদন করতে বলব এবং তাদেরকে আল্লাহর সৃষ্ট আকৃতি পরিবর্তন করতে আদেশ দেব। যে কেউ আল্লাহকে ছেড়ে শয়তানকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, সে প্রকাশ্য ক্ষতিতে পতিত হয়। (৪:১১৭-১১৯) এসব হাদীসের আলোকে অধিকাংশ ফকীহদের মতে ট্যাটু হারাম। পুরুষ ও মহিলা উভয়ের জন্যই। (আল মাউসুয়াতিল ফিকহিয়্যাহ আল কুয়েইতিয়্যাহ তে وشم শব্দের অধীনে বর্ণিত এবং নিম্নোক্ত সূত্র সম্বলিত। حَاشِيَة ابْن عَابِدِينَ 5 / 239 ، وَالْفَوَاكِه الدَّوَانِي 2 / 411 ، وَالْمَجْمُوع 1 / 296 ، وَكَشَّاف الْقِنَاع 1 / 81 ، وَفَتْح الْبَارِي 10 / 306 ، وَدَلِيل الْفَالِحِينَ 4 / 493 .) অতএব সৌন্দর্য্যের জন্য ট্যাটু আঁকা হারাম। কেননা এতে আল্লাহর সৃষ্টিতে হস্তক্ষেপ ও পরিবর্তন করা হয়। মানুষের দেহের মালিক মূলত আল্লাহ তা’আলা। মানুষ তার দেহের মালিক নয়। তবে যদি কখনো চিকিৎসার জন্য ট্যাটু আঁকার প্রয়োজন পড়ে, তখন চিকিৎসার জন্যই কেবল তা বৈধ হবে। উল্লেখ্য যে, স্থায়ী ট্যাটুর সাথে সাদৃশ্য থাকায় অনেকে চামড়ার ক্ষত ছাড়া কৃত বিভিন্ন অঙ্কনকেও ট্যাটু বলে থাকেন। এগুলো অস্থায়ী এবং কয়েক দিন বা সপ্তাহ পর এমনিতেই মুছে যায়। হাদীস ও ফকীহদের ভাষ্য অনুযায় যা বোঝা যায় তা হলো, এগুলো হারাম নয়। তবে যদি এমন হয় যাতে চামড়ায় পানি ঢুকতে বাধা সৃষ্টি হয়, তাহলে তা অঙ্কন করা অনুচিৎ। কেননা অযুর অঙ্গতে হলে এগুলো সহ অযু করা যাবে না। আর অন্য কোথাও হলে ফরয গোসল আদায় করা যাবে না। ফলে সবসময় অপবিত্র শরীর বয়ে বেড়াতে হবে। আর ট্যাটুর সাথে বিভিন্ন ধর্মীয় অনুভূতি, অশ্লীল ফ্যাশন ইত্যাদি যুক্ত থাকায় একজন পরহেযগার মুসলিম হিসেবে সম্পূর্ণভাবে এসব পরিত্যাগ করা উচিৎ। আল্লাহ তাওফীক দিন। আমীন। প্লাস্টিক সার্জারীর বিধান : ট্যাটুর আলোচনা প্রসঙ্গে আমরা যেমনটি বলেছি, যে, কোনো রোগের চিকিৎসায় ট্যাটু করলে তা বৈধ হবে। তেমনি প্লাস্টিক সার্জারী বেলায় আমরা একই কথা বলব। প্লাস্টিক সার্জারী মূলত দুই কারণে করা হয়। এক. চিকিৎসার জন্য। যেমন জন্মগত কোনো শিশুর নাক কাটা, ঠোঁট কাটা, মেয়েদের দাড়ি-মোচ ইত্যাদি। এসব সমস্যা নিয়ে তার চলতে অসুবিধা হয়। তাই চিকিৎসার জন্য তার প্লাস্টিক সার্জারী করা বৈধ। দুই. সৌন্দর্য্য বর্ধনের জন্য। একে কসমেটিক সার্জারীও বলা হয়। কারণ কসমেটিকের ন্যায় সৌন্দর্য্য বৃদ্ধির জন্যই এটি করা হয়। যেমন, নারীর চেহারায় প্লাস্টিক সার্জারী করে অল্প বয়স্কা ইমেজ আনা হল। বা অন্য কোনো অঙ্গের সৌন্দর্য্যের জন্য করা হলো। এই দ্বিতীয় প্রকারটি অধিকাংশ ফকীহদের মতে হারাম। কারণ একই। এতে আল্লাহর সৃষ্টিতে হস্তক্ষেপ ও পরিবর্তন করা হয়। যা তিনি অপছন্দ করেন। প্রশ্ন হলো, চিকিৎসার জন্য হলে কেন তা সৃষ্টির পরিবর্তন বলে গণ্য হয় না? এর উত্তর হলো, সেটাও সৃষ্টির পরিবর্তন বলে গণ্য হয়। কিন্তু ইসলামের একটি সুন্দর দিক হলো, ইসলাম যা কিছু হারাম বা নিষেধ করে, তার সবকিছুই প্রয়োজনের খাতিরে প্রয়োজন অনুপাতে করার অনুমতি দেয়। যেমন কেউ খুব ক্ষুধার্ত। আশে পাশে খাওয়ার কিছু নেই। না খেলে মৃত্যু নিশ্চিত। সামনে একটি মৃত পশু পড়ে রয়েছে। স্বাভাবিক অবস্থায় যা খাওয়া হারাম। কিন্তু এ অবস্থায় যতটুকু খেলে তার জীবন বাঁচবে, ততটুকু তার জন্য খাওয়া বৈধ। একই ভাবে অন্যান্য হারাম কাজের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কাজেই স্বাভাবিক অবস্থায় সৌন্দর্য্যের জন্য যদিও প্লাস্টিক সার্জারী করা হারাম, কিন্তু প্রয়োজনের খাতিরে চিকিৎসার জন্য তা বৈধ হবে। আরো পড়ুন : http://www.islamqa.com/en/ref/47694 বুঝতেই পারছেন, বুঝতে ভুল হওয়ায় তিনি এমনটি লিখেছেন। নতুবা ট্যাটু আর প্লাস্টিক সার্জারীর বিধান একই। চিকিৎসার জন্য বৈধ, সৌন্দর্য্যের জন্য অবৈধ। -ইঊসুফ সুলতান
সম্পর্কিত প্রশ্নসমূহ
Loading interface...
জনপ্রিয় টপিকসমূহ
Loading interface...