জুম্মার দিন এর বিশেষত্ব কি?
 (26640 পয়েন্ট) 

জিজ্ঞাসার সময়

2 Answer

 (26640 পয়েন্ট) 

উত্তরের সময় 

এই দিনে প্রথম মানুষ হযরত আদম(আ) কে সৃষ্টি করা হয়েছে, এই দিনে তাকে বেহেশতে স্থান দেয়া হয়েছে, এই দিনেই তিনি পৃথিবীতে অবতরণ করেন এবং সপ্তাহের সাতটি দিনের মাঝে শুক্রবারই সে দিন যেদিন তিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন। শুক্রবার দু’আ কবুলেরও দিন,তবে দুয়ায় নিষিদ্ধ কিছু চাওয়া যাবে না।এই দিনেই সংঘটিত হবে কিয়ামত। আল্লাহ শুক্রবারকে অন্যান্য দিনের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন।রাসুলুল্লাহ(স) দিনটির এরকম আরো কিছু বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন। হযরত আবু হুরায়রা(রা) এবং হুযাইফা(রা) থেকে বর্ণিত : রাসুলুল্লাহ(স) বলেন : “আমাদের পূর্বে যারা এসেছিলেন আল্লাহ তাদেরকে শুক্রবার থেকে দূরে রেখেছিলেন।ইহুদীদের ছিল শনিবার এবং খ্রিস্টানদের ছিল রবিবার।অতঃপর আল্লাহ আমাদেরকে শুক্রবারের ব্যাপারে জ্ঞান দিলেন।তাই শুক্রবার, শনিবার, রবিবার যেভাবে ক্রমানুসারে আসে, হাশরের দিনেও তারা আমাদের অনুসরণ করবে।আমরা এই পৃথিবীর সর্বশেষ উম্মত কিন্তু হাশরেরে দিন আমরা সবার অগ্রে থাকব এবং আমাদের বিচার কার্যও অন্য সবার পূর্বে হবে।” (মুসলিম) আউস ইবন আউস (রা) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স) বলেন, “তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম শুক্রবার। এই দিনে আদম (আ)কে সৃষ্টি করা হয়েছিল; এই দিনেই তিনি মারা যান, এই দিনেই শিঙ্গায় ফু (কেয়ামত) হবে এবং সকল সৃষ্টিকূল ধ্বংশ হয়ে যাবে । কাজেই বেশি করে আমার নামে দরুদ পেশ কর এই দিনে, কারণ তোমাদের পেশকৃত দরুদ আমার কাছে দেখানো হবে।” তারা বললেন ,”ইয়া রাসুলুল্লাহ(স) যখন আপনি ধূলার সাথে মিশে যাবেন তখন কিভাবে আমাদের দরুদ আপনার কাছে পেশ করা হবে ?” প্রিয় নবীজী রাসুলুল্লাহ মুহাম্মদ(স) জবাবে বলেন, “আল্লাহ মাটিকে নিষেধ করেছেন নবীদের দেহ ভক্ষণ না করতে, তাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক” (আবু দাউদ, সুনান আবু দাউদ ৪/২৭৩) . আবু লুবাবাহ ইবন আল-মুনধির হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ(স) বলেন, “শুক্রবার সব দিনের সেরা,এবং আল্লাহর কাছে সর্বশ্রেষ্ঠ।ঈদুল আজহা এবং ঈদুল ফিতরের চেয়েও এই দিন আল্লাহর কাছে মহান।” এই দিন আল্লাহ আদম(আ) কে সৃষ্টি করেন, এই দিনেই পৃথিবীতে প্রেরণ করেন, এই দিনেই তিনি মারা যান, এই দিনে এমন একটি সময় আছে যখন কেউ আল্লাহর কাছে যা চায় , আল্লাহ তাকে তাই দেন, যতক্ষণ না হারাম কিছু চাওয়া হয়, এই দিনেই হবে কেয়ামত। এমন কোন ফেরেশতা নেই, নেই কোন আসমান, নেই কোন যমীন, নেই কোন পর্বত আর নেই কোন সাগর যে কিনা শুক্রবারের দিনটিকে ভয় করে না। ” (ইবন মাজাহ : ১০৮৪). বুখারী ও মুসলিম হতে বর্ণিত আছে, শুক্রবারের দিনটিতে এমন একটি নিদৃষ্ট সময় আছে যখন আমরা আল্লাহ তায়ালার কাছে যাই চাই না কেন আল্লাহ তা কবুল করেন যতক্ষণ পর্যন্ত না এমন কিছু চাওয়া হয় যা ইসলামে নিষিদ্ধ। এখানে হাদীসটি উল্লেখ করা হল, আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স) জুমার দিনের ফযিলত সম্পর্কে বলেন, ” শুক্রবারে এমন একটি ক্ষণ আছে যখন একজন মুসলিম, সে নামাজ আদায় করেছে এবং দুয়া করেছে, সেই দুয়া কবুল করা হয়ে থাকে”. তিনি(স) তাঁর হাতের দ্বারা ইশারা করে বোঝান যে, তা খুব অল্প একটি সময় । (বুখারি ও মুসলিম).শুক্রবারের আরেকটি ফযিলত হল জুমার নামায।এর গুরুত্ব এতই অধিক যে , পবিত্র কুরআনে আল-জুমুয়াহ নামে একটি পূর্ণ সুরা রয়েছে । আল্লাহ তায়ালা কুরআনে জুমার দিনের গুরুত্ব সম্পর্কে বলেন, “মুমিনগণ, জুমআর দিনে যখন নামাজের আযান দেয়া হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের পানে তাড়াতাড়ি করো এবং বেচাকেনা বন্ধ কর । এটা তোমাদের জন্যে উত্তম যদি তোমরা বুঝ ।” (আল-জুমুয়াহ ৬২:৯). এটি এমন একটি দিন যেদিন আল্লাহ তায়ালা, পরম করুনাময় আমাদের সগীরা(ছোট) গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দিয়ে থাকেন, শুধুমাত্র ঐ দিনেরই নয় বরং পুরো সপ্তাহের এবং সাথে অতিরিক্ত আরো তিন দিনের। সহীহ মুসলিমের হাদীসটি বর্ণিত হল : আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ(স) বলেন, যদি কেউ যথাযথভাবে ওযু (পবিত্রতা অর্জন) করল, এরপর জুমার নামাযে আসলো, মনোযোগের সাথে খুতবা শুনলো এবং নীরবতা পালন করে, তার ঐ শুক্রবার এবং পরবর্তী শুক্রবারের মধ্যবর্তী সকল ছোটোখাট গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেয়া হবে, সাথে অতিরিক্ত আরো তিনটি দিনেরও,…… ” (মুসলিম).জুমআর আজান হওয়ার পর নামাজের প্রস্তুতি ব্যাতিত সকল কাজ হারাম হয়ে যায়। আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে জুম্মার দিনের ফজিলত উপলব্ধি করার তাউফিক দিন।
 (59 পয়েন্ট) 

উত্তরের সময় 

জুম’আর নামাজের ফযীলত ও তা আদায়কারীদের জন্য ঘোষিত পুরষ্কার:

১) কুরবানী করার সমান সওয়াব অর্জিত হয়ঃ

দিনে আগে ভাগে মসজিদে গেলে দান-খয়রাত বা পশু কুরবানী করার সমতুল্য সওয়াব পাওয়া যায়। 
আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণিত এক হাদীসে রাসুল (সাঃ) বলেছেন,

“যে ব্যাক্তি জু’আর দিন ফরজ গোসলের মত গোসল করে প্রথম দিকে মসজিদে হাজির হয়, সে যেন একটি উট কুরবানী করল, দ্বিতীয় সময়ে যে ব্যাক্তি মসজিদে প্রবেশ করে সে যেন একটি গরু কুরবানী করল, তৃতীয় সময়ে যে ব্যাক্তি মসজিদে প্রবেশ করল সে যেন একটি ছাগল কুরবানী করল। অতঃপর চতুর্থ সময়ে যে ব্যাক্তি মসজিদে গেল সে যেন একটি মুরগী কুরবানী করল। আর পঞ্চম সময়ে যে ব্যাক্তি মসজিদে প্রবেশ করল সে যেন একটি ডিম কুরবানী করল। অতঃপর ইমাম যখন বেরিয়ে এসে মিম্বরে বসে গেলেন খুৎবার জন্য, তখন ফেরেশতারা লেখা বন্ধ করে খুৎবা শুনতে বসে যায়।” (বুখারীঃ ৮৮১, ইফা ৮৩৭, আধুনিক ৮৩০)

২) মসজিদের দরজায় দাঁড়িয়ে ফেরেশতারা অগ্রগামীদের নাম তালিকাভুক্ত করেনঃ

জুম’আর সালাতে কারা অগ্রগামী, ফেরেশতারা এর তালিকা তৈরি করে থাকেন। 
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন,

“জুম’আর দিন মসজিদের দরজায় ফেরেশতা এসে হাজির হয়। সেখানে দাঁড়িয়ে তারা সর্বাগ্রে আগমনকারীদের নাম লিখতে থাকে। প্রথম ভাগে যারা মসজিদে ঢুকেন তাদের জন্য উট, দ্বিতীয়বারে যারা আসেন তাদের জন্য গরু, তৃতীয়বারে যারা আসেন তাদের জন্য ছাগল, চতুর্থবারে যারা আসেন তাদের জন্য মুরগী, ও সর্বশেষ পঞ্চমবারে যারা আগমন করেন তাদের জন্য ডিম কুরবানী বা দান করার সমান সওাব্ব লিখে থাকেন। আর যখন ইমাম খুৎবা দেওয়ার জন্য মিম্বরে উঠে পড়েন ফেরেশতারা তাদের এ খাতা বন্ধ করে খুৎবা শুনতে বসে যান।” (বুখারী ৯২৯, ইফা ৮৮২, আধুনিক ৮৭৬)

৩) দশ দিনের গুনাহ মাফ হয়ঃ

জুম’আর দিনের আদব যারা রক্ষা করে তাদের দশ দিনের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়। 
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন,

‘যে ব্যাক্তি ভালভাবে পবিত্র হল অতঃপর মসজিদে এলো, মনোযোগ দিয়ে খুৎবা শুনতে চুপচাপ বসে রইল, তার জন্য দুই জুম’আর মধ্যবর্তী এ সাত দিনের সাথে আরও তিনদিন যোগ করে মোট দশ দিনের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়। পক্ষান্তরে খুৎবার সময় যে ব্যক্তি পাথর, নুড়িকণা বা অন্য কিছু নাড়াচাড়া করল সে যেন অনর্থক কাজ করল।’ (মুসলিমঃ ৮৫৭)

৪) জুম’আর আদব রক্ষাকারীর দশ দিনের গুনাহ মুছে যায়ঃ

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন,

“জুম’আর সালাতে তিন ধরনের লোক হাজির হয়। (ক) এক ধরনের লোক আছে যারা মসজিদে প্রবেশের পর তামাশা করে, তারা বিনিময়ে তামাশা ছাড়া কিছুই পাবে না। (খ) দ্বিতীয় আরেক ধরনের লোক আছে যারা জুম’আয় হাজির হয় সেখানে দু’আ মুনাজাত করে, ফলে আল্লাহ যাকে চান তাকে কিছু দেন আর যাকে ইচ্ছা দেন না। (গ) তৃতীয় প্রকার লোক হল যারা জুম’আয় হাজির হয়, চুপচাপ থাকে, মনোযোগ দিয়ে খুৎবা শোনে, কারও ঘাড় ডিঙ্গিয়ে সামনে আগায় না, কাউকে কষ্ট দেয় না, তার দুই জুম’আর মধ্যবর্তী ৭ দিন সহ আরও তিনদিন যোগ করে মোট দশ দিনের গুনাহ খাতা আল্লাহ তায়ালা মাফ করে দেন।” (আবু দাউদঃ ১১১৩)

৫) প্রতি পদক্ষেপে এক বছরের নফল রোজা ও এক বছরের সারারাত তাহাজ্জুদ পড়ার সওয়াব অর্জিত হয়ঃ

যে ব্যাক্তি আদব রক্ষা করে জুম’আর সালাত আদায় করে তার প্রতিটি পদক্ষেপের বিনিময়ে তার জন্য পুরো এক বছরের রোজা পালন এবং রাত জেগে তাহাজ্জুদ পড়ার সওয়াব লিখা হয়।

আউস বিন আউস আস সাকাফী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন,

“জুমা’আর দিন যে ব্যাক্তি গোসল করায় (অর্থাৎ সহবাস করে, ফলে স্ত্রী ফরজ গোসল করে এবং) নিজেও ফরজ গোসল করে, পূর্বাহ্ণে মসজিদে আগমন করে এবং নিজেও প্রথম ভাগে মসজিদে গমন করে, পায়ে হেঁটে মসজিদে যায় (অর্থাৎ কোন কিছুতে আরোহণ করে নয়), ইমামের কাছাকাছি গিয়ে বসে, মনোযোগ দিয়ে খুৎবা শোনে, কোন কিছু নিয়ে খেল তামাশা করে না; সে ব্যাক্তির প্রতিটি পদক্ষেপের জন্য রয়েছে বছরব্যাপী রোজা পালন ও সারা বছর রাত জেগে ইবাদত করার সমতুল্য সওয়াব।” (মুসনাদে আহমাদঃ ৬৯৫৪, ১৬২১৮)

৬) দুই জুম’আর মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহের কাফফারাঃ

জুম’আর সালাত জুম’আ আদায়কারীদের জন্য দুই জুম’আর মধ্যবর্তী গুনাহের কাফফারা স্বরূপ। 
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন,

“পাঁচ বেলা সালাত আদায়, এক জুম’আ থেকে পরবর্তী জুম’আ, এক রমজান থেকে পরবর্তী রমজানের মধ্যবর্তী সময়ে হয়ে যাওয়া সকল (সগীরা) গুনাহের কাফফারা স্বরূপ, এই শর্তে যে, বান্দা কবীরা গুনাহ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখবে।” (মুসলিমঃ ২৩৩)

লেখকঃ অধ্যাপক মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম

সূত্রঃ বই-প্রশ্নোত্তরে জুমু’আ ও খুৎবা

পরিমার্জনেঃ ডঃ মোহাম্মদ মনজুরে ইলাহী,

ডঃ আবু বকর মুহাম্মদ জাকারিয়া মজুমদার,

ডঃ মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ।

Recent Questions
Loading interface...