ভালাে মানের কনটেন্ট রাইটার হওয়ার উপায়

অনলাইন দুনিয়ায় ওয়েবসাইটের পরিমাণ দিন দিন বেড়ে চলায় প্রয়োজন হচ্ছে ভালো মানের কনটেন্টের। আর এই ভালো মানের কনটেন্টের জন্য দরকার পরছে ভালো মানের কনটেন্ট রাইটারের। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও বিষয়টা ভিন্ন নয়। এমন ওয়েবসাইট পাওয়া যাবে, যারা তাদের সাইটের জন্য অভিজ্ঞ ও দক্ষ মানের কনটেন্ট রাইটার খুঁজছেন।


বর্তমান ফ্রীল্যান্সিং এর চাহিদার সাথে মিল রেখে আজ আমরা আলোচনা করবো কীভাবে একজন দক্ষ ও সফল কনটেন্ট রাইটার হওয়া যায়। আর এজন্য টিম কোর্সটিকা যোগাযোগ করেছিল বাংলাদেশের একজন প্রফেশনাল কনটেন্ট রাইটার আনিসুর রশিদ দিপু’র সাথে। কনটেন্ট রাইটিং সেক্টরে তার উত্থান এবং পথচলা নিয়ে আমরা বিশদ আলোচনা করার চেষ্টা করবো।


আমি তখন বেকার। বিভিন্ন জায়গায় সিভি দিয়ে বেড়াচ্ছি আর হতাশ হচ্ছি। এমন সময় আমি এক জায়গায় কন্টেন্ট রাইটার হিসেবে ইন্টারভিউ দেওয়ার জন্য ডাক পেলাম। তখন এই ব্যাপারটা সম্পর্কে আমার বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না। আমাকে রিসার্চ করে বায়োপোলার ডিসঅর্ডার সম্পর্কে লিখতে দেওয়া হল। আর আমিও চাকরিটা শুরু করলাম খুবই কম বেতনে।


বলছিলেন আনিসুর রশিদ দিপু। তাকে দিয়ে ভীষণ অমানুষিক পরিশ্রম করানো হতো। আর সেই তুলনায় খুবই হাস্যকর বেতন দেওয়া হত। ব্যপারটা তখন বুঝতে না পারলেও এখন তিনি উপলব্ধি করতে পারেন। অফিসে তার কোন ট্রেইনার ছিল না। এমনকি কনটেন্ট রাইটারও ছিলেন তিনি একাই। তাকে নিত্য-নতুন টপিক দেয়া হতো এবং তাকে প্রচুর পরিমাণে লিখতে হতো। তিনি প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০০০ শব্দ লিখতেন।


আমাকে বলতো, একজন ভালো কন্টেন্ট রাইটার দিনে এর চেয়ে বেশী লিখে। আমিও নিজেকে ছাড়িয়ে যেতে চেষ্টা করতাম। এভাবেই লিখতে লিখতে আর পড়তে পড়তে মাস ছয়েক পর আমি কিছুটা জাতের কন্টেন্ট রাইটার হয়ে উঠলাম।


নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করছিলেন তিনি। একজন ভালো কনটেন্ট রাইটার হতে হলে প্রথমত আপনার লেখার আগ্রহ থাকতে হবে এবং প্রচুর পড়তে হবে। যত পড়বেন তত বেশী ভাল লেখক হয়ে উঠতে পারবেন। এর বিকল্প নেই। তবে আপনি যদি কন্টেন্ট রাইটিংকে সাহিত্য মনে করেন, আর লাফ দিয়ে আসেন, যে হ্যাঁ কনটেন্ট লিখবো, এটাই আমার স্বপ্ন! তাহলে, একটু দাঁড়ান। এখানে আপনার সাহিত্যিক কিংবা কবি মনকে খুব একটা গোণায় ধরা হবে না। একটা সূচনা আপনি হয়তো মনের মাধুরী মিশিয়ে চমৎকার লিখেছেন। আপনার ক্লায়েন্ট সেটাকে নির্দয়ের মতো ফেলে দেবে। তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে গুগলে র‍্যাংক করা। আপনার সাহিত্য তাদের কাছে ম্যাটার করে না।


| আরো দেখুন: ফেসবুক মার্কেটিং কি? কেন করবো ফেসবুক মার্কেটিং?


সবার প্রথম জানা দরকার, আপনি কি লিখছেন? কেন লিখছেন? এবং কাদের জন্য লিখছেন? যদি নিজের সাইটের জন্য লেখেন, তাহলে প্রতিটা উত্তর আপনার জানা। আর কনটেন্ট যদি ক্লায়েন্টের হয়, তাহলে তার কাছ থেকে খুব ভালোভাবে জেনে নেয়াটা জরুরি। এর ফলে আপনার রিভিশনের পরিমাণ কমবে। আপনার পরিশ্রম কম হবে।


কনটেন্ট অনেক ধরনের হতে পারে। আর অনেকভাবেই তা লেখা যেতে পারে। যেমন আপনি নিজের একটা ব্লগে নিজের জন্য লিখতে পারেন। তখন আপনি আপনার ইচ্ছেমত লিখবেন। কিন্তু যখন আপনি আপনার ক্লায়েন্টের জন্য কাজ করবেন, তখন তার হিসেব মতো এবং চাহিদা বিবেচনা করে লিখতে হবে। এটা অনেক সময় বিরক্তিকর মনে হতে পারে। তবে আপনার যদি উদ্দেশ্য থাকে কনটেন্ট লিখে উপার্জন করার, তাহলে এই বিরক্তিকর কাজটাই আপনাকে করতে হবে।


আপনার নিজের লেখার ব্যাপারে আপনি স্বাধীন। তবে যদি সেটা অন্যের জন্য লেখা হয় তখন আপনাকে একটা কীওয়ার্ড সহকারে সূচনা লিখতে হবে। একটা সাব হেডিং দিতে হবে। প্রাসঙ্গিক কিছু পয়েন্ট তৈরি করতে হবে এবং শেষে ক্লায়েন্টের ইচ্ছে অনুযায়ী একটা উপসংহার দিতে হবে।


একজন কনটেন্ট রাইটারের অবশ্যই উচিত নিজের একটি ব্লগ করে রাখা। ক্লায়েন্ট আপনার কাজের স্যাম্পল দেখতে চাইবে। আর তখন আপনার নিজের একটা ব্লগ থাকলে লিংকটা দিয়ে দেবেন।

আপনি যদি কনটেন্ট রাইটিং শুরু করতে চান, তবে ব্লগিং একটা চমৎকার জায়গা। ব্লগারে একটা ফ্রি ব্লগ করে ফেলুন। আপনার জানা একটা বিষয়বস্তু ঠিক করুন। ৩০ টি টাইটেল ঠিক করুন। ভালমতো রিসার্চ করে ৩০ দিনে ৩০ টি কনটেন্ট লিখুন। এবার প্রথম কনটেন্টের সাথে ৩০ নম্বর কনটেন্ট মিলিয়ে দেখুন। ম্যাজিক! আপনি কনটেন্ট রাইটার হয়ে গিয়েছেন। ৩০ টি কন্টেন্ট লিখতে আপনার আরো অন্তত ৩০০ টি কনটেন্ট পড়তে হয়েছে। আর এভাবেই আপনি খুব সহজেই হয়ে উঠছেন একজন চমৎকার কনটেন্ট রাইটার। এখন যত দিন যাবে, আপনি যত পড়বেন আর লিখবেন তত ভাল হয়ে উঠবেন।


| আরো দেখুন: কেন শিখবেন গ্রাফিক্স ডিজাইন? বাংলাদেশে গ্রাফিক্স ডিজাইনের ভবিষ‌্যৎ


আপনাকে কিওয়ার্ড এবং তার ব্যবহার সম্পর্কে কিছুটা ধারণা অর্জন করতে হবে। খুব কঠিন কিছু না। একটু সার্চ করলে সহজেই শিখে ফেলতে পারবেন এই বিষয়গুলো। সাধারণত একটা ওয়েবসাইটে আমরা বিভিন্ন আর্টিকেল ওপেন করি, একটু স্কিমিং করি। এরপর আরেকটা সাইটে চলে যাই। পুরোটা পড়ি তখনই যখন আমাকে সূচনায় তেমন কিছু দেওয়া হয়। তাই শুরুটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। শুরুর দশ সেকেন্ডে একজন পাঠক সিদ্ধান্ত নেবেন তিনি আগে আপনার কনটেন্টটি পুরোটা পড়বেন নাকি অন্য সাইটে যাবেন। ভাষাটা সহজ এবং সাজানো হলে ভাল হয়। আর চেষ্টা থাকতে হবে প্রথম অনুচ্ছেদে পাঠককে আটকে ফেলার। এছাড়া আপনি যদি ক্লাইন্টের জন্য লিখে থাকেন সেক্ষেত্রে তার নির্দেশনা থাকবে।


আপনার কনটেন্টকে কিভাবে সাজাবেন?

কনটেন্ট লেখার ক্ষেত্রে আনিসুর রশিদ দিপু নিজের কিছু কৌশল অবলম্বন করেন। তিনি তার পুরো কনটেন্টকে বিশেষ কিছু ফরমেটে ভাগ করেন। নতুন হয়ে থাকলে এভাবে আপনার ব্লগে লিখে প্র্যাকটিস করতে পারেন।


প্রথমত সূচনা অংশ: আপনার লেখা কনটেন্টের সূচনা বা ভূমিকা ১, ২ অথবা ৩ টি প্যারাগ্রাফে হতে পারে। প্রতিটি প্যারাগ্রাফ হবে তিন-চার লাইন। সব মিলিয়ে আপনার সূচনা ১০০ বা ২০০ শব্দের মধ্যে রাখতে চেষ্টা করুন। আপনার টাইটেলটি প্রথম প্যারাগ্রাফে ব্যবহারের চেষ্টা করুন। যদি কাওয়ার্ড বুঝে থাকেন তবে কিওয়ার্ডটা ব্যবহারের চেষ্টা করুন। আপনার টাইটেলই যদি কিওয়ার্ড হয়ে থাকে তবে টাইটেলই ব্যবহার করুন।


দ্বিতীয়ত সাবটাইটেল অংশ: প্রথম ও দ্বিতীয় প্যারাগ্রাফে ১০০-১৫০ শব্দ লিখতে পারেন। একবার কিওয়ার্ড ব্যবহারের চেষ্টা করতে পারেন। এই অংশটি হচ্ছে মূল আলোচনা শুরুর আগের অংশ। অর্থাৎ এরপর আপনি মূল আলোচনায় যাবেন।


মূল বডি অংশ: এখানে কয়েকটি পয়েন্ট বা টাইটেল করে আলোচনা করতে পারেন। সাধারণত ক্লাইন্টরা এমনই চায়। ধরুন, এখানে ৫ টি পয়েন্ট দিলেন। এবার শুরু করতে পারেন বিস্তারিত আলোচনা। ৫ টি পয়েন্টে আপনি যত ইচ্ছে লিখুন।


তবে অনুচ্ছেদ ভাগ ভাগ করে লিখতে চেষ্টা করবেন। মনে করুন, আপনার প্রথম পয়েন্টে আপনি লিখবেন ৫০০ শব্দ। সেক্ষেত্রে প্রতিটি পয়েন্ট ৫ টি অনুচ্ছেদে বিভক্ত করে লেখার চেষ্টা করুন। ছোট ছোট অনুচ্ছেদ এবং বাক্য পড়তে সুবিধা হয় পাঠকের।


শেষে উপসংহার অংশ: এখানে আপনি ১০০ থেকে ৩০০ শব্দের মধ্যে ১ থেকে ৩ অনুচ্ছেদে এতক্ষণের আলোচনার প্রেক্ষিতে একটি উপসংহার দিতে পারেন। চেষ্টা করবেন এখানেও একবার কীওয়ার্ড ব্যবহার করার।


আপনি চাইলে এই ফরমেটগুলো নিজের মত করে সাজিয়ে নিতে পারেন। তবে প্যারাগ্রাফ করে পয়েন্ট করে প্র্যাকটিস করুন। আশা করি ৩০ নম্বর কন্টেন্ট লেখার পর আপনি নিজেই পরিবর্তনটা ধরতে পারবেন।


কাজ কীভাবে পাবেন?

কাজ পাওয়ার জন্য আপনি বিভিন্ন মার্কেটপ্লেসে পোর্টফোলিও সাবমিট করতে পারেন। ইচ্ছে করলে ফাইভারেও গিগ তৈরি করতে পারেন। তবে সেখান থেকে প্রাথমিকভাবে খুব কম রেসপন্স পাবেন। তবে দুশ্চিন্তার কোন কারণ নেই। কাজ পাওয়ার জন্য আপনি অনেক ফেসবুক গ্রুপ পাবেন। সেখানে নিয়মিত চেষ্টা করতে থাকুন। আপনার ব্লগেও লিখতে থাকুন। এই ব্লগে অ্যাডসেন্সের মাধ্যমে টাকা আসতে পারে। এছাড়া এটা আপনার পরিচিতিও বটে।


সবশেষে একটা বিষয় মাথায় রাখবেন, ভাষার জ্ঞান আবশ্যিক। যে ভাষাতেই লিখবেন তা যেন সুন্দর ও সহজবোধ্য হয়। এ কারণে একটা কনটেন্ট লিখতে আপনাকে আপনাকে প্রচুর পড়তে হবে এবং রিসার্চ করতে হবে। আর তখন নিজেই বুঝে যাবেন কোন লেখাটা আপনার কাছে ভালো লেগেছে। অনলাইনে যাদের লেখা আপনার ভালো লাগবে সেই লেখকের লেখা অনুসরণ করুন। যে বিষয় নিয়ে লিখতে চান, সে সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান রাখুন। আপনার সাফল্য নিশ্চিত।


► ক্রেডিট: কোর্সটিকা