বিস্ময় অ্যানসারস এ আপনাকে সুস্বাগতম। এখানে আপনি প্রশ্ন করতে পারবেন এবং বিস্ময় পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নিকট থেকে উত্তর পেতে পারবেন। বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন...
181 জন দেখেছেন
"ঈমান ও আক্বীদা" বিভাগে করেছেন (229 পয়েন্ট)
ইমাম আবু হানিফা(রহঃ) এর জীবনি সম্পর্কে রেফারেন্স সহ জানতে চাই।
করেছেন (4,777 পয়েন্ট)

বাকী অংশ-

ইমাম আবু ইউসুফ রঃ তাঁর সব আলোচনারই লিপিবদ্ধ করে রাখার চেষ্টা করতেন। ইমাম সাহেব বলতেন, আমার তকরীর শুনে তা অনুধাবন করতে বেশি যত্নবান হও। এমনও হতে পারে যে, আজকের এই কথাগুলি পরবর্তীতে ভুল প্রমাণিত হবে। (আবু যোহরা)

ইমাম সাহেব প্রথম যখন শিক্ষা দান শুরু করেন, তখন শুধুমাত্র ইমাম হাম্মাদের সাগরেদগণই তাতে শরীক হতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে তাতে কূফার সর্বস্তরের মানুষ, বিশিষ্ট জ্ঞানীগুনী, এমনকি ইমাম সাহেবের উস্তাদগণেরও কেউ কেউ এসে শরীক হতেন। বিখ্যাত তাবেয়ী মাসআব ইবনে কোদাম, ইমাম আমাশ প্রমুখ নিজে আসতেন এবং অন্যদেরকেও দরসে যোগ দিতে উৎসাহিত করতেন। একমাত্র স্পেন ব্যতীত তখনকার মুসলিম-বিশ্বের এমন কোন অঞ্চল ছিল না, যেখানকার শিক্ষার্থীগণ ইমাম আবু হানীফ রঃ এর দরসে সমবেত হননি।মক্কা- মদীনা, দামেস্ক, ওয়াসেত, মুসেল, জায়িরা, নসীবাইন, রামলা, মিসর, ফিলিস্তিন, ইয়ামান, ইয়ানামা, আহওয়ায, উস্তুর আবাদ, জুরজান, নিশাপুর, সমরকন্দ, বুখারা, কাবুল-হেমস প্রভৃতিসহ বিখ্যাত এমন কোন জনপদ ছিল না যেখান থেকে শিক্ষার্থীগণ এসে ইমাম আবু হানীফা রঃ এর নিকট শিক্ষা লাভ করেননি।  ইমাম সাহেবের সরাসরি সাগরেদগণের মধ্যে ২৮ ব্যক্তি বিভিন্ন সময়ে কাজী (বিচারক) এবং শতাধীক ব্যক্তি মুফতীর দায়িত্ব পালন করেছেন। ইসালামের ইতিহাসে এক ব্যক্তির প্রচেষ্টায় এত বিপুল সংখ্যক প্রাজ্ঞ ব্যক্তির আবির্ভাব আর কোথাও দেখা যায় না। স্বভাব-চরিত্র ও তাকওয়া ,গুণাবলীঃ ইমাম আবু হানিফা [রহঃ] এর উন্নত চরিত্র, আমানতদারী, উদারতা, বিশ্বস্ততা, মহানুভবতা ছিল সর্বস্বীকৃত। যার জীবনের এক অবিচ্ছিদ্য অংশ কেটে গেছে ইবাদত গোযারিতে। রাতের প্রহরগুলো যিনি মওলা পাকের দরবারে রোনাযারিতে কাটিয়ে দিতেন।ইশকে রাসূলের তাড়নায় যিনি ৫৫ বার রাসূলের রওযা মোবারকে ছুটে গিয়েছিলেন। শুধু এক রমজানেই ওমরা করেছেন ১২০ বার। চল্লিশ বছর তিনি এশার উযূতেই ফজরের নামাজ আদায় করেছেন। ইমাম আবু হানিফা অসংখ্য গুণের অধিকারী ছিলেন। তিনি একাধারে ৩০ বছর রোযা রেখেছেন এবং ৪০ বছর যাবৎ রাত্রে ঘুমাননি। প্রতি রমযানে ৬১ বার পবিত্র কুরআন মজিদ খতম করতেন।অনেক সময় এক রাকাতেই কুরআন মজিদ এক খতম দিতেন। তিনি ৫৫ বার হজ্জ করেছেন।  রচনাবলীঃ তিনি অসংখ্য গ্রন্থ রচনা করেছেন। এর মধ্যে প্রসিদ্ধ হলোঃ -মুসনাদে আবু হানিফা -আল ফিকহুল আকবর -ওয়াসিয়াতু আবু হানিফা -কিতাবুর আছার লি আবি হানিফা।

ক্বাযীর পদ গ্রহণে অস্বীকৃতি ও শাহাদাত বরন: তৎকালীন খলীফা মানসুরের সময় ইমাম আবু হানিফাকে প্রধান বিচারপতির পদ গ্রহনের জন্য আহবান জানানো হয়। তিনি উক্ত প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় খলিফা মনসুর কর্তৃক প্রয়োগকৃত বিষক্রিয়ার ফলে হিজরী ১৫০ সন মুতাবিক ৭৬৭ খ্রিঃ  কারাগারে ইন্তিকাল করেন। তাঁর প্রথম জানাজায় লোকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ৫০ হাজারেরও উপরে। ৫/৬ দফায় তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয় ৷ তার জানাজায় সর্বশেষ ইমামতি করেন তার পুত্র হাম্মাদ। তাকে খাজরান নামক স্থানে তার শিষ্য ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদের মাঝখানে সমাহিত করা হয়। দাফনের পরও বিশ দিন পর্যন্ত তাঁর কবরের পাশে জানাজার নামাজ আদায় করা হয়। তার জন্য লোকজন মৃত্যুর ২০ দিন পর্যন্ত প্রার্থনা করেছিল। পরবর্তীতে, অনেক বছর পর বাগদাদের পাশে আধামিয়াতে আবু হানিফ মসজিদ নামে একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করা হয় আবু হানিফার নামে।

করেছেন (229 পয়েন্ট)
কমেন্ট করার জন্য ধন্যবাদ।আমি আরো কিছু যোগ করছি।

ইমাম আবু হানিফা(রহঃ) এর  জীবনীঃ

দ্বীন প্রচারের  আলোকবর্তিকা নিয়ে যেসব মহামনীষিগন মানবজাতিকে হিদায়াতের পথ পদর্শন করেছেন,দুনিয়াবী লোভ লালসা ও পার্থিব মোহ যাদেরকে হকের আদর্শ থেকে কিছুমাত্র বিচ্যুত করতে পারেনি,যারা অন্যায় ও অসত্যের কাছে কোনদিন মাথা নত করেননি,ইসলাম ও মানুষের কল্যানে যারা জীবনকে আল্লাহর পথে উৎসর্গ করেছিলেন ইমাম আবু হানিফা(রহঃ) ছিলেন তাদেরই অন্যতম।

আশি হিজরী মুতাবিক সাতশত বার ঈসায়ীগনে কুফা নগরীতে তিনি জন্মলাভ করেন।তার পূর্বপুরুষগন ইরানের অধিবাসী ছিলেন।কৈশোরে তিনি লেখাপড়া করার তেমন সুযোগ পাননি।চৌদ্দ/পনের বছর বয়সে তিনি একদিন বাজারে যাওয়ার সময় পথিমধ্যে হযরত ইমাম শাবী(রহঃ) তাকে দেখে বলেন,বালক তুমি কোথায় এবং কি পড়াশোনা করো?আবু হানিফা উত্তরে বললেন,আমি কিছুই পড়িনা।ইমাম শাবী(রহঃ) বলেন,আমি তো তোমার মাঝে প্রতিভার চিহ্ন প্রত্যক্ষ করছি।ভাল আলেমের কাছে তোমার লেখাপড়া করা উচিত।এ কথায় অনুপ্রেরনা লাভ করে তিনি লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেন।তিনি ইমাম শাবী(রহঃ),ইমাম মোহাম্মদ ইবনে আতা ইবনে বরিয়া(রহঃ) এবং ইমাম জাফর সাদিক(রহঃ) এর মত তৎকালীন প্রখ্যাত আলেমগনের কাছে ইলম অর্জন করে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি কুরআন হাদীস,ফিকহ,ইলমে কালাম,আদব প্রভৃতি বিষয়ে পারদর্শিতা অর্জন করেন।তিনি মক্কা,মদীনা ও কুফায় অবস্থানকারী ওস্তাদগনের কাছে পাগলের মত ছুটে যেতেন ইলম হাসিল করার জন্য।তিনি প্রায় চার হাজার আলেমের কাছে জ্ঞান লাভ করেন।কারো কারো মতে তিনি তাবেয়ী ছিলেন।একশতদুই হিজরীতে তিনি যখন মদীনা গমন করেন তখন মদীনায় দুজন সাহাবী হযরত সুলাইমান(রাঃ) এবং হযরত সারেম ইবনে সুলাইমান(রাঃ) জীবিত ছিলেন।

তাফসীর ও হাদীস শাস্ত্রে তার অসাধারন অভিজ্ঞতা ও পান্ডিত্ব আয়ত্ব্যেও ফিকহ শাস্ত্রেই তিনি সর্বাধিক সুখ্যাতি অর্জন করেন।

রওযা জিয়ারতের জন্য মদীনা শরীফ পৌছে এর নিকটবর্তী হয়ে বললেনঃ(আসসালামু আলাইকুম ইয়া সায়্যেদুল মুরসালীন)।উত্তরে পেলেন(ওয়া আলাইকুমুসসালাম ইয়া ইমামাল মুসলিমীন)।

ইমাম আজম বাল্যকাল থেকে আল্লাহ প্রেমিক ও দুনিয়ার প্রতি বিমুখ ছিলেন।তিনি খুবই সাধারন পোষাক পরতেন।একরাত্রে তিনি স্বপ্নে দেখেন যে,তিনি মহানবী(সাঃ) এর পাক রওজা মোবারক হতে তার পাক হাড় মোবারক তুলছেন এবং এগুলোর মধ্যে একটি অপরটি থেকে পৃথক করছেন।এ স্বপ্ন দেখে তিনি ভয়ে অস্থির হয়ে জেগে উঠে বিখ্যাত স্বপ্ন ব্যাখ্যাকারী ইবনে সীরীনের এক শিষ্যের কাছে এর অর্থ জিজ্ঞেস করেন।শিষ্য এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা করেন যে,"আপনি নবী(সাঃ) এর ইলম এবং হাদীসে এতটাই জ্ঞানলাভ করবেনযে,এসব শাস্ত্রের বিস্তৃত ব্যাখ্যাকারী হিসেবে আপনার স্থান হবে এবং হককে না হক থেকে অর্থাৎ সত্যকে মিথ্যা থেকে পৃথক  করতে সক্ষম হবেন।"

আর একবার তিনি স্বপ্নে মহানবী(সাঃ) দেখেন,তিনি বলেন"হে আবু হানিফা,আল্লাহতায়ালা তোমাকে এজন্য সৃষ্টি করেছেন যে,তুমি যেন আমার সুন্নতকে জীবিত রাখবে।নির্জনতা অবলম্বন করনা"।তৎকালীন খলীফা আল মনসুর একদিন বাগদাদের প্রধান কাযী ও অন্যান্য খাস উলামাগনকে ডেকে কোতওয়ালকে বললেন,"আমার প্রত্যেক সহচরের নামে কিছু কিছু জমিজামা লিখে দাও"।কোতওয়াল হুকুমমত কাজ করে।সাক্ষীস্বরুপ দলিলে দস্তখত নেওয়ার জন্য খলীফার জৈনিক সহচরের মারফত দলিলগুলো প্রধানকাযী বৃদ্ধ শায়াবী ও অন্যান্য আলেমের কাছে পাঠিয়ে দেন।সর্বপ্রথম কাযী শায়াবী সাক্ষীস্বরুপ দলিলে দস্তখত দিলেন।তারপর অন্যান্য আলেমগনো দস্তখত করেন।কিন্তু ইমাম আবু হানিফা(রহঃ) দস্তখত না করে বরং তিনি খাদেমকে জিজ্ঞেস করেন,বলেন,"হযরত খলীফাকে আমার কাছে আসতে বলো,নতুবা আমাকে তার কাছে নিয়ে চলো,তাহলে সাক্ষ্য ঠিক হবে"।খাদেম বললো,"স্বয়ং প্রধান কাযী ও অন্যান্য বিজ্ঞ আলেম খলীফার অনুপস্থিতিতে এবং তার কথায় বিশ্বাস করে স্বাক্ষর দিয়েছেন।আপনি কেন অনর্থক তর্ক করছেন?"।যাহোক তার সাক্ষ্য না করার কথা খলীফার কাছে পৌছালো।খলীফা কাযীকে জিজ্ঞেস করেন"সাক্ষী দেওয়ার জন্য নিজে উপস্থিত থাকার প্রয়োজন কিনা?"কাযী সাহেব বললেন"হা প্রয়োজন"।খলীফা বললেন,"তোমাকে এই দলিলে স্বাক্ষর দিতে হুকুম করার সময় তুমি কি দেখেছো যে,আমি এতে দস্তখত করেছি?"।কাযী শায়াবী উত্তর দিলেন,"আমি বুজতে পেরেছি যে,এটা আপনার জানা মতেই লেখা হয়েছে,সে জন্য আমি আপনার মোকাবেলার প্রয়োজন মনে করিনি"।খলীফা বলেন,"এই কারনে আমি তোমাকে কাযীর পথ থেকে বরখাস্ত করলাম।"তারপর কাযীর পদে  কাকে নিযুক্ত করা হবে,সে বিষয়ে আমীর ওমরাহের সাথে আলোচনা করে আবু হানিফা,সুফিয়ান,শরীহ,মোশবার প্রমুখ প্রখ্যাত চারজন আলেমকে ডেকে পাঠান।তারা একইসময়ে এবং একই সাথে উপস্থিত হন।পথে ইমাম আবু হানিফা(রহঃ) বলেন,"আমি তোমাদের একটা সৎ পরামর্শ দিচ্ছি শোন"।তারা বলেন,"আচ্ছা বলুন"।আবু হানিফা বলেন,"আমি কৌশল অবলম্বন করে কাযীর পদ গ্রহন করবোনা,সুফিয়ান পলায়ন করুন,মোশহাব নিজেকে পাগল বলে ভান করুন,আর শরীহ কাযীর পদগ্রহন করুন"।তার এ পরামর্শ মতে সুফিয়ান আত্বগোপন করে একটি নৌকায় নিজেকে লুকিয়ে রাখেন।বাকি তিনজন খলীফার দরবারে হাজির হলে  সর্বপ্রথম খলীফা আবু হানিফাকেই এই পদ গ্রহন করার জন্য অনুরোধ করলে তিনি উত্তরে বলেন,"আমীরুল মুমিনীন,আমি আরবী নই,বরং তাদের গোলাম শ্রেনীর অন্তর্গত।আরবের প্রধানগন কিছুতেই আমার হুকুম মানতে বাধ্য হবেননা"।জাফর বারমেকী নামক একজন আমীর সেখানে উপস্থিত ছিলেন।তিনি বলেন,"বংশের সাথে এই পদের কি সম্পর্ক?বরং ইলমের সাথেই এর সম্পর্ক"।আবু হানিফা(রহঃ) আবার বলেন,"আমি এই পদের উপযুক্ত নই।আর যদি মিথ্যা বলি মনে করেন,তাহলে মিথ্যাবাদীকে কখনো এই উচ্চ পদে নিয়োগ করা উচিত নয়।আপনি বর্তমানে খলীফা,আপনার প্রতিনিধি মিথ্যাবাদী হওয়াও ঠিক নয়।কারন প্রানদন্ড ইত্যাদি গুরুতর ব্যপারে তার উপর আপনার নির্ভর ও বিশ্বাস করতে হবে"।এ কথা বলে ইমাম আবু হানিফা(রহঃ) মুক্তি পেলেন।তারপর মোশয়াব এগিয়ে গিয়ে খলীফার হাতধরে বললেন,"আপনি কেমন আছেন?আপনার পরিবারের সবাই কেমন আছেন?"খলীফা তার আচরন দেখে তাকে পাগল মনে করে বের করে দিতে আদেশ দিলেন।তারপর শরীহকে ডেকে আনলে তিনি বললেন,"আমি একজন পাগল ও আমার মাথা দুর্বল"।খলীফা বলেন,"তারজন্য চিকিৎসা করুন,তাহলে বুদ্ধি মজবুত হবে"।শেষ পর্যন্ত শরীহকেই কাযীর পদে নিযুক্ত করা হয়।কাযীর পদ গ্রহন না করার কারন এটাই ছিল যে,ইমাম আবু হানিফা(রহঃ) এবং তখনকার আলেমগন আযাদী কামনা করতেন।হযরত মুহাম্মদ(সাঃ) বলেছেন,"যাকে কাযী নির্বাচিত করা গিয়েছে।ছুরি দ্বারা তাকে কতল করা হয়েছে।"হযরত মুহাম্মদ(সাঃ) এর নসীহত তিদের অন্তরে জেগেছিল।প্রানদন্ডাদি-ফৌজদারি বিষয়ক গুরুতর মামলায় কাযীকেই আদেশ দিতে হতো।এজন্য আল্লাহওয়ালা লোক সহজে এ পদ গ্রহন করতেননা।বর্নিত আছে,একবার কিছু বালক বল খেলছিল।কাছেই ইমাম সাহেবের মজলিশ বসেছিল।ঘটনাক্রমে একবার বলটি মজলিশের মধ্যে এসে পড়ে।বালকদের কেউ সভার মধ্য হতে বলটি নিতে এতে সাহস  করলো না।একটি বালক বললো,"এটা অতি সাধারন কাজ,আমি বলটি আনছি"।এ বলে সে বেআদবের মত সভারমধ্য হতে বলটি নিয়ে আসে।ইমাম সাহেব ছেলেটির বেআদবি দেখে বলেন,"হয়ত এ বালকটি হারামজাদা হবে"।পরে লোকে খোজ নিয়ে জানতে পারে যে,বাস্তবিকই বালকটি হারামজাদা।লোকে ইমাম সাহেবকে এ সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলো,"ইমাম সাহেব,আপনি কিভাবে বুজতে পারলেন?"।তিনি বলেন,"যদি সে হারামজাদা না হতো তবে লজ্জা থাকে এতটুকু বেয়াদবি করতে বাধা দিত।মাননীয় বৃদ্ধ ও মুরুব্বীদের সামনে কখনো বেআদবি করতে সাহস করতো না"।

একব্যাক্তি ইমাম সাহেবের কাছ থেকে কিছু টাকা ধার নেয়।যে গ্রামে সে বাস করতো,ঘটনাক্রমে ইমাম সাহেবের একজন ছাত্র মারা যায়।ইমাম সাহেব তার জানাজা পড়ার জন্য সেখানে যান।তখন খুব রৌদ্র ছিল।সেখানে তার ঋনগ্রস্থ ব্যাক্তির দালানের দেয়ালের ছায়া ছাড়া কোন ছায়ার ব্যবস্থা ছিল না।লোকে তাকে বললো,"আপনি এই ছায়ায় কিছুক্ষন বিশ্রাম করুন।"তিনি বললেন,"না,কেননা,দেয়ালের মালিকের ছাদ থেকে কিছু উপকার গ্রহন করা আমার জন্য ঠিক নয়।হযরত(সাঃ) বলেছেন,"ঋনস্বরূপ কাউকে কিছু দিয়ে তা থেকে কোন উপকার গ্রহন করোনা।"অতএব আমি যদি কিছু উপকার গ্রহন করি,তবে তা সুদের সমতুল্য বলে গন্য হবে।"

দাউদ তায়ী(রহঃ) বলেন,"আমিশবিশ বছর যাবত ইমাম আবু হানিফা(রহঃ) এর খিদমতে ছিলাম।সবসময় তার উপর আমার নজর ছিল।তিনি কখনো প্রকাশ্যে বা গোপনে খালি মাথায় বসতেননা।পরিশ্রমের কষ্ট দূর করার জন্য কখনো পা ছড়িয়ে বসতেননা।একবার আমি বললাম,"ইমাম সাহেব,যেখানে কেউ নেই এরূপ জায়গায় পা ছড়িয়ে বসলে তাতে দোষ কি?"তিনি বললেন,"তেমন জায়াগায়ও আল্লাহপাকের সাথে আদব রক্ষা করা শ্রেয়।"

একবার ইমাম সাহেব কোন পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন।সে পথে একটি বালককে কাদাময় স্থান দিয়ে যেতে দেখে তিনি বলেন,"বাছা,সাবধানে যাও যেন পা পিছলিয়ে না যায়।"বালকটি উত্তর দিল,"আমার পড়া সহজ।আমি যদি পড়ি,তাহলে একাই পড়বো।কিন্তু আপনি সাবধানে চলবেন,কেননা আপনি পড়ে গেলে আপনার তাবেদার সব মুসলমানই পড়ে যাবে এবং তাদের উঠা অত্যন্ত কষ্টকর হবে"।বালকের এরকম জ্ঞানগর্ভ কথায় ইমাম সাহেব তাজ্জব হলেন এবং কাদতে কাদতে নিজ মুরিদগনকে বললেন,"সাবধান,যদি তোমাদের মনে কোন মাসাআলায় সন্দেহ উপস্থিত হয় এবং কোন দলীল না পাও;তাহলে সে মাসআলায় আমার মতামত অনুসারী থেকেও কিন্তু তত্বের অনুসন্ধান থেকে বিরত থাকবেনা।এটাই পূর্ন সুবিচারের লক্ষন"।এ কারনে ইমাম আবু ইউসুফ(রহঃ) ও ইমাম মুহাম্মদ(রহঃ) তার ছাত্র হয়েও বহু মাসআলায় তার বিরোধিতা করেছেন।

একবার ইমাম সাহেব শহরের গোসলখানায় গিয়ে এক ব্যাক্তিকে উলঙ্গ দেখতে পান।কেউ বললো,"সে ফাসিক,কেউ বললো সে কাফের"।ইমাম সাহেব তাকে দেখা মাত্রই চোখ বন্ধ করলে লোকটি তখন জিজ্ঞেস করলো,"ইমাম সাহেব কবে থেকে আপনার চোখের জ্যোতি গিয়েছে?"।তিনি বলেন,"যেদিন থেকে তোমার লজ্জা গিয়েছে"।একবার ইমাম সাহেব বাজারে যাচ্ছিলেন খুব সামান্য পরিমান কাদামাটি হঠাৎ তার জামায় লেগে যাওয়াতে তিনি তখনই নদীতে গিয়ে কাদা ধুয়ে ফেলেন।লোকে জিজ্ঞেস করলো,"ইমাম সাহেব,আপনি যে নির্দিষ্ট পরিমান নাপাক জায়েয রেখেছেন তা তো তার অনেক কম,তবুও কেন তা ধুচ্ছেন?"তিনি বলেন,"হা,ওটা ফতওয়া,আর এটা তাকওয়া"।

দাউদ তায়ী(রহঃ) খলীফার পদ পেয়ে ইমাম সাহেবকে জিজ্ঞেস করেন,"এখন আমার কি করা উচিত?ইমাম সাহেব বলেন,"এখন ইলম অনুসারে আমল করো;কেননা যে ইলম অনুসারে কাজ করেনা,তার দেহ প্রানশূন্য দেহের মত"।

তখনকার খলীফা একরাত্রে আযরাঈল(আঃ) কে স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞেস করেন,"আমার আয়ু কতকাল বাকী আছে?"আযরাইল(আঃ) পাচ আঙ্গুলের প্রতি ইশারা করেন।খলীফা অনেক আলেমকে এর ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করেন,কিন্তু কেউ পরিষ্কারভাবে এর অর্থ অনুধাবন করতে পারেননি।তারপর তিনি ইমাম সাহেবকে ঢেকে এর ব্যাখ্যা করতে বললেন।তিনি বলেন"পাচ আঙ্গুলি পাচ বিষয়ের জ্ঞান বুজায়।অর্থাৎ এ পাচ বিষয়ে জানা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারোর নেই।যথাঃআল্লাহপাক কুরআন মাজীদের বর্ননা করেন,অর্থাৎ-

(১)নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে রয়েছে হিকমতের জ্ঞান।

(২)কখন বৃষ্টি হবে তার জ্ঞান।

(৩)জরায়ুতে কি ভ্রন আছে তিনিই জানেন।

(৪)কাল কি হবে কেউ জানেনা;কেবল তিনিই জানেন।

(৫)কোন স্থানে তার মৃত্যু হবে তিনিই জানেন।নিশ্চয়ই তিনি সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান।(তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা এগুলো তাকে জানাতে পারেন)।

আল্লাহ ছাড়া এ পাচ বিষয়ের জ্ঞান কারো নেই।আপনার জীবন আর কতদিন আছে,তিনিই জানেন।আযরাঈল(আঃ) পাচ আঙ্গুলের ইশারার অর্থ এটাই"।

শেখ আবু আলী(রহঃ) বলেন,"একরাত্রে আমি হযরত(সাঃ) সময়কার মুয়াজজিন বিলালের(রাঃ) মাজারের পাশে শুয়ে ছিলাম।স্বপ্নে দেখি,আমি যেন মক্কা শরীফে আছি এবং হযরত(সাঃ) কোন একশিশুকে কোলে রাখার ন্যায় এক বৃদ্ধকে কোলে করে বনি শায়বা দরজা দিয়ে বের হলেন।আমি দৌড়ে এসে ভাবছিলাম,এ বৃদ্ধ লোকটি কে?রাসূলুল্লাহ(সাঃ) বলেন,"ইনিই মুসলমানদের নেতা ইমাম আবু হানিফা।"

ইমাম আবু হানিফা(রহঃ) প্রতি রাতে তিনশত রাকআত নামায পড়তেন।একবার তিনি একপথ দিয়ে যাওয়ার সময় শুনলেন,এক স্ত্রীলোক অন্য এক স্ত্রীলোককে বললো,"ইমাম সাহেব প্রতিরাতে পাচশত রাকআত নামায পড়েন।"ইমাম সাহেব একথা শুনে সংকল্প করেন,প্রতি রাত্রে আমিও পাচশত রাকআত নামায পড়বো,তাহলে স্ত্রীলোকটি মিথ্যাবাদিনী হবেনা।"অন্য একদিন শুনেন বালকেরা পরস্পর বলাবলি করছে"ইমাম সাহেব প্রতিরাতে একহাজার রাকআত নামায পড়েন।"ইমাম সাহেব তখন থেকে প্রতিরাতে হাজার রাকআত করে নামায পড়া আরম্ভ শুরু করলেন।একদিন তার একছাত্র বলেন"হুযুর,লোকে বলাবলি করে করেযে আপনি সারারাত জেগে নামায পড়েন।"।সেদিন থেকে ইমাম সাহেব রাত্রিতে আর শুতেননা।যেহেতু আল্লাহতায়ালা বলেছেন,"অনেক লোক আছে যে,তারা যা করেনি,তার তারিফ করতে ভালবাসে।সুতরাং এখন থেকে আমি আর রাতে শুবোনা।তাহলে যারা মিথ্যা তারিফ শুনতে ভালবাসে,আমি তাদের অন্তরভুক্ত হবনা"।তখন থেকে ইমাম সাহেব ত্রিশবছর ইশার নামাযের ওযু দিয়েই ফযরের নামায পড়েছেন।নামায পড়তে পড়তে তার হাটুর উপরিভাগ উটের হাটুর মত শক্ত হয়ে গিয়েছিল।

ইমাম সাহেব একবার একধনী ব্যাক্তিকে তার ধনের জন্য যথেষ্ট সম্মান করেছিলেন।পরে মনে মনে দুঃখিত হয়ে একহাজার বার কুরআনমজিদ খতম করে আল্লাহর দরবারে তওবা করেন।কখনও তিনি ৪০ বার কুরআনশরীফ খতম করে কঠিন মাসআলার মীমাংসা করেছেন।

কুফার জৈনিক ধনী ব্যাক্তি হযরত যুননূরাইনকে(রহঃ) হিংসাবশতঃইহুদী বলতো।সে বললো,"আপনি মুসলমানদের ইমাম হয়েও একজন মুসলমানের মেয়েকে ইহুদীর হাতে দিতে চাচ্ছেন?আমি তাতে কখনো রাজি হবোনা"।আবু হানীফা(রহঃ) বলেন,"সুবহানাল্লাহ,তুমি তোমার মেয়ে ইহুদীর সাথে বিয়ে দিতে রাজি হচ্ছোনা অথচ হযরত মুহাম্মদ(সাঃ) একজন ইহুদীর হাতে তার দুই মেয়েকে সোপর্দ করেছিলেন"।লোকটি ইমাম সাহেবের কথার মর্ম বুঝতে পেরে লজ্জিত হয় এবং সাথে সাথে তার মনোভাবের পরিবর্তন হয়।তখনই সে ইমাম সাহেবের হাত ধরে তওবা করে।

নওফেল ইবনে হাইয়ান(রহঃ) বলেন,"ইমাম আবু হানিফা(রহঃ) এর ইনতিকালের পর আমি এক রাতে স্বপ্নে দেখি কিয়ামত সংঘটিত হচ্ছে।সমস্ত লোক হাশরের ময়দানে উপস্থিত এবং মহানবী(সাঃ) হাউজে কাউসারের কাছে দাড়ানো আছেন।ইমাম সাহেব তার পাশেই দাড়ানো।আমি ইমাম সাহেবকে সালাম দিয়ে বললাম,"আমাকে কিছু পানি পান করতেদিন।"ইমাম সাহেব বলেন,"যে পর্যন্ত আমাকে হযরত(সাঃ) হুকুম না করবেন,সে পর্যন্ত আমি তোমাকে পানি দিতে পারবোনা"।তারপর হযরত(সাঃ) আমাকে পানি দিতে আদেশ দেন।ইমাম সাহেব আমাকে এক পেয়ালা পানি দিলেন।আমি ও আমার বন্ধু পানি পান করলাম।কিন্তু পেয়ালা আগের মতো পূর্ন রয়েগেল।"আমি জিজ্ঞেস করলাম,"হযরতের দক্ষিনপাশে এই সুদর্শন পুরুষ কে?"।আবু হানিফা(রহঃ) বলেন,"তিনি হযরত ইবরাহিম(আঃ) এবং বামে হযরত আবু বকর ছিদ্দিক(রাঃ)"।আমি একেককরে সকল বুযুর্গের পরিচয় করলাম এবং ইমাম সাহেব উত্তর দিচ্ছিলেন।আমি ১৭ব্যাক্তির নাম আঙ্গুলের করে গুনলাম।জেগে দেখি,আমার আঙ্গুলটি করের ১৭দাগেই রয়েছে"।

ইমাম আবু হানিফা(রহঃ) এর অন্য নাম নোমান।৭০বছর বয়সে  ১৫০হিজরীতে খলীফা মনসুর কর্তৃক বন্দীদশায় জেলখানাতেই তিনি ইনতেকাল করেন।রমজান মাসে তিনি ৬১বার কুরআনশরীফ খতম করতেন,অর্থাৎ খতমে তারাবিহ নামাযে একবার ও দৈনিক দুখতম করে ৬০খতম করতেন।

ইয়াহিয়া রাযী(রহঃ) বলেন,"আমি একরাতে হযরত মুহাম্মদ(সাঃ) কে স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞেস করলাম,"হযরত(সাঃ),আমি কোথায় আপনাকে তালাশ করবো?।হযরত(সাঃ) জবাবে বলেন,আবু হানিফার ইলম ও জ্ঞানরাশির মধ্যে"।

কিতাবঃতাযকেরাতুল আউলিয়া।

লেখকঃহযরত শেখ ফরীদউদ্দীন আত্তার(রহঃ)।

3 উত্তর

+3 টি পছন্দ
করেছেন (4,777 পয়েন্ট)

ইমামে আযম আবু হানিফা (রঃ) এর সংক্ষিপ্ত জিবনী

জন্ম ও বংশ পরিচয়ঃ তার পূর্ণ নাম হল- আবু হানীফা আন নু’মান ইবনি সাবিত নোমান {যুতি বা যাওতী } ইবনে মুরযেবান । প্রসিদ্ধ মতানুযায়ী ইমাম আবু হানিফা ইরাকের কুফায় ৫ সেপ্টেম্বর ৬৯৯ ইংরেজী মোতাবেক ৮০ হিজরীতে জন্ম গ্রহণ করেন ।এবং ১৪ জুন ৭৬৭ ইংরেজী ১৫০ হিজরীতে বাগদাদ শহরে মৃত্যুবরণ করেন  । নু‘মান,উপনাম-আবু হানিফা। এ নামেই তিনি পরিচিতি লাভ করেন। পিতার নাম- সাবিত। তিনি একজন তাবেয়ী ছিলেন।  সাহাবী আনাস ইবনে মালিক (রা) এর সাথে সাক্ষাত হওয়ার কারনে তিনি একজন তাবেঈ।ইমাম আবু হানীফা রহ. অন্যুন আটজন সাহাবীর সাক্ষাত লাভ করেছেন।  এরা হলেন- ১। হযরত আনাস ইবনে মালেক রা. (ওফাত ৯৩ হিজরী) ২। আব্দুল্লাহ ইবনে আবী আওফা রা. (ওফাত ৮৭ হিজরী)  ৩। সহল ইবনে সাআদ রা. (ওফাত ৮৮ হিজরী) ৪। আবু তোফায়ল রা. (ওফাত ১১০ হিজরী)  ৫। আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়দী রা. (ওফাত ৯৯ হিজরী) ৬। জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রা. (ওফাত ৯৪ হিজরী) ৭। ওয়াসেনা ইবনুল আসকা রা. (ওফাত ৮৫ হিজরী)

তাঁর দাদা ছিলেন কাবুলের অধিবাসী । তৎকালীন সময়ে কাবুল ও আফগানিস্তান ছিল ইরানেরই অর্ন্তভূক্ত । ‌‌তাঁর পিতা ছাবিত শৈশবে ইসলাম গ্রহণের পর হযরত আলী রাঃ এর দরবারে হাজির হলে তিনি তার ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য বরকতের দোয়া করেন । আর সেই দোয়ার বরকতে । ছাবিত পরিবারের কোল আলোকিত করে জন্ম গ্রহণ করেন জগদ্বিখ্যাত মণীষী নূমান বিন ছাবেত রহঃ ।  মুরযেবান ছিলেন পারস্য অঞ্চলের একজন বিশিষ্ট ভূম্যাতিপতি। তাঁর পুত্র যুতী যুদ্ধবন্দিরূপে কুফায় আসেন। ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার পর তাঁর নামকরণ করা হয় নোমান। তিনি কূফার একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ছিলেন।

শিক্ষাদান পদ্ধতী :  ১২০ হিজরীতে স্বীয় ওস্তাদ ‘হযরত হাম্মাদ ইমাম হাম্মাদের যখন ইন্তেকাল হয়, তখন আবু হানীফার বয়স ছিল চল্লিশ বছর। এ সময় তিনি উস্তাদের স্হলাভিষিক্ত হয়ে তাঁর শিক্ষাকেন্দ্রে কুফার ‘মাদ্রাসাতুর রায়’ এর পূর্ণদায়িত্ব গ্রহণ করেন ৷ এখানেই তিনি খ্যান্ত হননি বরং তিনি কুফা শহর থেকে সফর করে দীর্ঘ ছয়টি বছর মক্কা- মাদীনা অবস্থান করে সেখানকার সকল শাইখদের নিকট থেকে ইলম হাসিল করেন। আর মক্কা- মাদীনা যেহেতু স্থানীয়, বহিরাগত সকল উলামা, মাশায়েখ, মুহাদ্দিস ও ফকীহদের কেন্দ্রস্থল ছিল, কাজেই এক কথায় বলা চলে যে- মক্কা- মাদীনা ছিল ইলমের মারকায। আর তার মত অসাধারণ ধী- শক্তি সম্পন্ন, কর্মঠ ও মুজতাহিদ ইমামের জন্য দীর্ঘ ছয় বছর যাবত মক্কা- মাদীনার ইলম হাসিল করা নিংসন্দেহে সাধারণ ব্যাপার নয়।

এছাড়া তিনি ৫৫ বার পবিত্র হাজ্জব্রত পালন করেছেন বলে প্রমান পাওয়া যায় (উকূদুল জামান, পৃ- ২২০)। প্রত্যেক সফরেই তিনি মক্কা- মাদীনার স্থানীয় ও বহিরাগত উলামা, মাশায়েখ ও মুহাদ্দিসিনের সাথে সাক্ষাৎ করতেন।

আল্লামা আলী আল কারী, মুহাম্মাদ ইবনি সামায়াহ’র বরাত দিয়ে বলেছেন-

আবু হানীফা (রহ.) তার রচিত গ্রন্থগুলোতে সত্তর হাজারের উর্দ্ধে হাদীস বর্ননা করেছেন। আরالاثار গ্রন্থটি চল্লিাশ হাজার হাদীস থেকে বাছাই করে লিখেছেন’ (আল জাওয়াহিরুল মযিয়াহ, খ- ২, পৃ- ৪৭৩)।

সেই সাথে ‘ইরাক’ এর অনন্য ইমাম বলে বিবেচিত হন এবং অসাধারণ খ্যাতি লাভ করেন এবং ‘বসরাহ’, ‘মক্কা’, ‘মাদীনা’ ও ‘বাগদাদ’ এর তদানীšতন সকল প্রসিদ্ধ ও শীর্ষস্থানীয় উলামায়ে কিরামের সাথে সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় করেন এবং একে অপর থেকে উপকৃত হতে থাকেন। এভাবেই ক্রমশ তার সুখ্যাতি বৃদ্ধি পেতে থাকে। ইলমী ময়দানে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।তিনি ‘‘হানাফী মাযহাবে’’র প্রবর্তক ছিলেন।যে মাযহাবের গুরুত্ব ও জনপ্রীয়তা এত অধিক হয়ে গিয়েছিল যার জন্য আজো তিনি ‘‘ইমাম আযম’’ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন এবং প্রসিদ্ধ চার ইমামের মাঝে তাঁকেই শ্রেষ্ঠ ইমাম হিসেবে অভিহিত করা হয়। তিনি হাদীস শাস্ত্রেও অতুলনীয় জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। তিনি চার হাজার শাইখ থেকে হাদীস সংগ্রহ করেছেন বলে বিভিন্ন লেখক মন্তব্য করেছেন (আস সুন্নাহ, পৃ- ৪১৩, উকূদুল জামান, পৃ- ৬৩, খইরতুল হিসান, পৃ- ২৩। ইমাম মুহাম্মাদ ইবনি ইউসূফ আস সালেহী ‘উকূদুল জামান গ্রন্থে দীর্ঘ ২৪ পৃষ্ঠায় ইমাম সাহেবের মাশায়েখদের একটা ফিরিস্ত পেশ করেছেন, উকূদুল জামান, পৃ- ৬৩- ৮৭)।  সে জামানার দরসের হালকা বা শিক্ষাঙ্গনের চিত্র ছিল, উস্তাদ কোন একটি উচ্চ আসনে বসে তকরীর করতেন। ছাত্রগণ চারদিকে হাঁটু গেড়ে বসে নিতান্ত নিবিষ্টতার সাথে তকরীর শ্রবণ করতেন। অনেকেই তকরীর শুনে তা আয়ত্ব করার পাশাপাশি লিপিবদ্ধ করে রাখতেন। এসব তকরীর উস্তাদ কর্তৃক অনুমোদিত হলে যিনি তকরীর করতেন তাঁর নামেই সেগুলো গ্রন্হাকারে প্রকাশিত হতো। হিজরী প্রথম ও দ্বিতীয় শতাব্দির সংকলিত হয়েছে। ইমাম আবু হানীফার রঃ শিক্ষাদান কার্যক্রমেও সে পদ্ধতিই অনুসরণ করা হতো। কোন কোন মাসআলায় তর্ক শুরু হয়ে যেত। সে তর্ক কয়েকদিন পর্যন্তও চলতো। শেষ পর্যন্ত কুরআন ও সুন্নাহর দৃষ্টিতে যা সাব্যস্ত হতো সেটাই লিপিবদ্ধ হতো। কোন কোন মাসআলায় উস্তাদ ও সাগরেতের মধ্যকার মতভেদ অমীমাংসিতই থেকে যেত। সেই মত পার্থক্যগুলিও স্ব স্ব যুক্তি সহকারেই কিতাব লিপিবদ্ধ করা হতো। এভাবেই হানাফী মাযহাবের মৌলিক গ্রন্হগুলি সংকলিত হয়েছে।  ইমাম সাহেবের দরছগাহ সপ্তাহে দুইদিন ছুটি থাকতো। শুক্রবার ও শনিবার। শনিবার দিনটি তিনি ব্যবসায়িক কাজকর্ম এবং পারিবারিক ব্যস্ততার জন্য নির্দিষ্ট করে রাখতেন। শুক্রবার দিন জুমার প্রস্তুতি এবং জুমাবাদ তার বাসস্হানে বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনেরা সমবেত হতেন। এ দিন বিশেষ যত্নের সাথে অপেক্ষাকৃত উন্নতমানের খানা প্রস্তুত হতো। ইমাম সাহেব সমবেত সবাইকে নিয়ে খানা খেতেন।  কর্মদিবস গুলিতে তিনি এশরাক থেকে চাশতের সময় পর্যন্ত ব্যবসায়িক কাজকর্ম করতেন। জোহরের পর থেকে সন্ধা পর্যন্ত শিক্ষাদান কার্যে নিয়োজিত থাকতেন। ফতোয়া দানের জন্যও এ সময়টাই নির্ধারিত ছিল। তবে অবস্হা ভেদে এ সময়সূচীর মধ্যে পরিবর্তনও হতো।  দরসের মজলিসে শিক্ষার্থীগণের সাথে অনেক সাধারণ লোকও শরীক হতেন। তর্কচ্ছলে অনেকে আপত্তিকর মন্তব্যও করত। কিন্তু কারো প্রতি বিরক্তি প্রকাশ না করে পরম ধৈর্যের সাথে জবাব দিতেন। চরম ধৃষ্ঠতা প্রদর্শনের মোকাবেলাতেও তাঁর ধৈর্যচ্যুতি ঘটত না। প্রায সময়ই তিনি একটা কবিতাংশ আবৃত্তি করতেন। যা অর্থ ছিলো- ইয়া আল্লাহ ! যাদের অন্তর আমাদের দিক থেকে সংকুচিত হয়ে আছে, আমাদের অন্তর তাদের প্রতি প্রশস্ত করে দাও। (আবু যোহরা)

প্রতিটি তকরীরের শেষে তিনি বলতেন, এটি আমার অভিমত। যতটুকু সম্ভব হয়েছে, তা আমি বললাম। কেউ যদি আমার চাইতেও মজবুত দলীল ও যুক্তির অবতারনা করতে পারেন, তবে তাই অধিকতর গ্রহণযোগ্য হবে। (আবু যোহরা) 

কোন একটি বিষয় আলোচনার সময় একবার একজন ছাত্র বলেছিলেন, আপনার এই অভিমতটি খুবই চমৎকার। জবাবে তিনি বলেছিলেন, এমনও তো হতে পারে যে, এক পর্যায়ে এটি ভুল প্রমাণিত হবে। (আবু যোহরা)



বাকী অংশ মন্তব্যে দেখুন-

 

করেছেন (229 পয়েন্ট)
আপনার উত্তরের জন্য কৃতজ্ঞ।আমি আরো কিছু যোগ করছি।

ইমাম আবু হানিফা(রহঃ) এর  জীবনীঃ

দ্বীন প্রচারের  আলোকবর্তিকা নিয়ে যেসব মহামনীষিগন মানবজাতিকে হিদায়াতের পথ পদর্শন করেছেন,দুনিয়াবী লোভ লালসা ও পার্থিব মোহ যাদেরকে হকের আদর্শ থেকে কিছুমাত্র বিচ্যুত করতে পারেনি,যারা অন্যায় ও অসত্যের কাছে কোনদিন মাথা নত করেননি,ইসলাম ও মানুষের কল্যানে যারা জীবনকে আল্লাহর পথে উৎসর্গ করেছিলেন ইমাম আবু হানিফা(রহঃ) ছিলেন তাদেরই অন্যতম।

আশি হিজরী মুতাবিক সাতশত বার ঈসায়ীগনে কুফা নগরীতে তিনি জন্মলাভ করেন।তার পূর্বপুরুষগন ইরানের অধিবাসী ছিলেন।কৈশোরে তিনি লেখাপড়া করার তেমন সুযোগ পাননি।চৌদ্দ/পনের বছর বয়সে তিনি একদিন বাজারে যাওয়ার সময় পথিমধ্যে হযরত ইমাম শাবী(রহঃ) তাকে দেখে বলেন,বালক তুমি কোথায় এবং কি পড়াশোনা করো?আবু হানিফা উত্তরে বললেন,আমি কিছুই পড়িনা।ইমাম শাবী(রহঃ) বলেন,আমি তো তোমার মাঝে প্রতিভার চিহ্ন প্রত্যক্ষ করছি।ভাল আলেমের কাছে তোমার লেখাপড়া করা উচিত।এ কথায় অনুপ্রেরনা লাভ করে তিনি লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেন।তিনি ইমাম শাবী(রহঃ),ইমাম মোহাম্মদ ইবনে আতা ইবনে বরিয়া(রহঃ) এবং ইমাম জাফর সাদিক(রহঃ) এর মত তৎকালীন প্রখ্যাত আলেমগনের কাছে ইলম অর্জন করে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি কুরআন হাদীস,ফিকহ,ইলমে কালাম,আদব প্রভৃতি বিষয়ে পারদর্শিতা অর্জন করেন।তিনি মক্কা,মদীনা ও কুফায় অবস্থানকারী ওস্তাদগনের কাছে পাগলের মত ছুটে যেতেন ইলম হাসিল করার জন্য।তিনি প্রায় চার হাজার আলেমের কাছে জ্ঞান লাভ করেন।কারো কারো মতে তিনি তাবেয়ী ছিলেন।একশতদুই হিজরীতে তিনি যখন মদীনা গমন করেন তখন মদীনায় দুজন সাহাবী হযরত সুলাইমান(রাঃ) এবং হযরত সারেম ইবনে সুলাইমান(রাঃ) জীবিত ছিলেন।

তাফসীর ও হাদীস শাস্ত্রে তার অসাধারন অভিজ্ঞতা ও পান্ডিত্ব আয়ত্ব্যেও ফিকহ শাস্ত্রেই তিনি সর্বাধিক সুখ্যাতি অর্জন করেন।

রওযা জিয়ারতের জন্য মদীনা শরীফ পৌছে এর নিকটবর্তী হয়ে বললেনঃ(আসসালামু আলাইকুম ইয়া সায়্যেদুল মুরসালীন)।উত্তরে পেলেন(ওয়া আলাইকুমুসসালাম ইয়া ইমামাল মুসলিমীন)।

ইমাম আজম বাল্যকাল থেকে আল্লাহ প্রেমিক ও দুনিয়ার প্রতি বিমুখ ছিলেন।তিনি খুবই সাধারন পোষাক পরতেন।একরাত্রে তিনি স্বপ্নে দেখেন যে,তিনি মহানবী(সাঃ) এর পাক রওজা মোবারক হতে তার পাক হাড় মোবারক তুলছেন এবং এগুলোর মধ্যে একটি অপরটি থেকে পৃথক করছেন।এ স্বপ্ন দেখে তিনি ভয়ে অস্থির হয়ে জেগে উঠে বিখ্যাত স্বপ্ন ব্যাখ্যাকারী ইবনে সীরীনের এক শিষ্যের কাছে এর অর্থ জিজ্ঞেস করেন।শিষ্য এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা করেন যে,"আপনি নবী(সাঃ) এর ইলম এবং হাদীসে এতটাই জ্ঞানলাভ করবেনযে,এসব শাস্ত্রের বিস্তৃত ব্যাখ্যাকারী হিসেবে আপনার স্থান হবে এবং হককে না হক থেকে অর্থাৎ সত্যকে মিথ্যা থেকে পৃথক  করতে সক্ষম হবেন।"

আর একবার তিনি স্বপ্নে মহানবী(সাঃ) দেখেন,তিনি বলেন"হে আবু হানিফা,আল্লাহতায়ালা তোমাকে এজন্য সৃষ্টি করেছেন যে,তুমি যেন আমার সুন্নতকে জীবিত রাখবে।নির্জনতা অবলম্বন করনা"।তৎকালীন খলীফা আল মনসুর একদিন বাগদাদের প্রধান কাযী ও অন্যান্য খাস উলামাগনকে ডেকে কোতওয়ালকে বললেন,"আমার প্রত্যেক সহচরের নামে কিছু কিছু জমিজামা লিখে দাও"।কোতওয়াল হুকুমমত কাজ করে।সাক্ষীস্বরুপ দলিলে দস্তখত নেওয়ার জন্য খলীফার জৈনিক সহচরের মারফত দলিলগুলো প্রধানকাযী বৃদ্ধ শায়াবী ও অন্যান্য আলেমের কাছে পাঠিয়ে দেন।সর্বপ্রথম কাযী শায়াবী সাক্ষীস্বরুপ দলিলে দস্তখত দিলেন।তারপর অন্যান্য আলেমগনো দস্তখত করেন।কিন্তু ইমাম আবু হানিফা(রহঃ) দস্তখত না করে বরং তিনি খাদেমকে জিজ্ঞেস করেন,বলেন,"হযরত খলীফাকে আমার কাছে আসতে বলো,নতুবা আমাকে তার কাছে নিয়ে চলো,তাহলে সাক্ষ্য ঠিক হবে"।খাদেম বললো,"স্বয়ং প্রধান কাযী ও অন্যান্য বিজ্ঞ আলেম খলীফার অনুপস্থিতিতে এবং তার কথায় বিশ্বাস করে স্বাক্ষর দিয়েছেন।আপনি কেন অনর্থক তর্ক করছেন?"।যাহোক তার সাক্ষ্য না করার কথা খলীফার কাছে পৌছালো।খলীফা কাযীকে জিজ্ঞেস করেন"সাক্ষী দেওয়ার জন্য নিজে উপস্থিত থাকার প্রয়োজন কিনা?"কাযী সাহেব বললেন"হা প্রয়োজন"।খলীফা বললেন,"তোমাকে এই দলিলে স্বাক্ষর দিতে হুকুম করার সময় তুমি কি দেখেছো যে,আমি এতে দস্তখত করেছি?"।কাযী শায়াবী উত্তর দিলেন,"আমি বুজতে পেরেছি যে,এটা আপনার জানা মতেই লেখা হয়েছে,সে জন্য আমি আপনার মোকাবেলার প্রয়োজন মনে করিনি"।খলীফা বলেন,"এই কারনে আমি তোমাকে কাযীর পথ থেকে বরখাস্ত করলাম।"তারপর কাযীর পদে  কাকে নিযুক্ত করা হবে,সে বিষয়ে আমীর ওমরাহের সাথে আলোচনা করে আবু হানিফা,সুফিয়ান,শরীহ,মোশবার প্রমুখ প্রখ্যাত চারজন আলেমকে ডেকে পাঠান।তারা একইসময়ে এবং একই সাথে উপস্থিত হন।পথে ইমাম আবু হানিফা(রহঃ) বলেন,"আমি তোমাদের একটা সৎ পরামর্শ দিচ্ছি শোন"।তারা বলেন,"আচ্ছা বলুন"।আবু হানিফা বলেন,"আমি কৌশল অবলম্বন করে কাযীর পদ গ্রহন করবোনা,সুফিয়ান পলায়ন করুন,মোশহাব নিজেকে পাগল বলে ভান করুন,আর শরীহ কাযীর পদগ্রহন করুন"।তার এ পরামর্শ মতে সুফিয়ান আত্বগোপন করে একটি নৌকায় নিজেকে লুকিয়ে রাখেন।বাকি তিনজন খলীফার দরবারে হাজির হলে  সর্বপ্রথম খলীফা আবু হানিফাকেই এই পদ গ্রহন করার জন্য অনুরোধ করলে তিনি উত্তরে বলেন,"আমীরুল মুমিনীন,আমি আরবী নই,বরং তাদের গোলাম শ্রেনীর অন্তর্গত।আরবের প্রধানগন কিছুতেই আমার হুকুম মানতে বাধ্য হবেননা"।জাফর বারমেকী নামক একজন আমীর সেখানে উপস্থিত ছিলেন।তিনি বলেন,"বংশের সাথে এই পদের কি সম্পর্ক?বরং ইলমের সাথেই এর সম্পর্ক"।আবু হানিফা(রহঃ) আবার বলেন,"আমি এই পদের উপযুক্ত নই।আর যদি মিথ্যা বলি মনে করেন,তাহলে মিথ্যাবাদীকে কখনো এই উচ্চ পদে নিয়োগ করা উচিত নয়।আপনি বর্তমানে খলীফা,আপনার প্রতিনিধি মিথ্যাবাদী হওয়াও ঠিক নয়।কারন প্রানদন্ড ইত্যাদি গুরুতর ব্যপারে তার উপর আপনার নির্ভর ও বিশ্বাস করতে হবে"।এ কথা বলে ইমাম আবু হানিফা(রহঃ) মুক্তি পেলেন।তারপর মোশয়াব এগিয়ে গিয়ে খলীফার হাতধরে বললেন,"আপনি কেমন আছেন?আপনার পরিবারের সবাই কেমন আছেন?"খলীফা তার আচরন দেখে তাকে পাগল মনে করে বের করে দিতে আদেশ দিলেন।তারপর শরীহকে ডেকে আনলে তিনি বললেন,"আমি একজন পাগল ও আমার মাথা দুর্বল"।খলীফা বলেন,"তারজন্য চিকিৎসা করুন,তাহলে বুদ্ধি মজবুত হবে"।শেষ পর্যন্ত শরীহকেই কাযীর পদে নিযুক্ত করা হয়।কাযীর পদ গ্রহন না করার কারন এটাই ছিল যে,ইমাম আবু হানিফা(রহঃ) এবং তখনকার আলেমগন আযাদী কামনা করতেন।হযরত মুহাম্মদ(সাঃ) বলেছেন,"যাকে কাযী নির্বাচিত করা গিয়েছে।ছুরি দ্বারা তাকে কতল করা হয়েছে।"হযরত মুহাম্মদ(সাঃ) এর নসীহত তিদের অন্তরে জেগেছিল।প্রানদন্ডাদি-ফৌজদারি বিষয়ক গুরুতর মামলায় কাযীকেই আদেশ দিতে হতো।এজন্য আল্লাহওয়ালা লোক সহজে এ পদ গ্রহন করতেননা।বর্নিত আছে,একবার কিছু বালক বল খেলছিল।কাছেই ইমাম সাহেবের মজলিশ বসেছিল।ঘটনাক্রমে একবার বলটি মজলিশের মধ্যে এসে পড়ে।বালকদের কেউ সভার মধ্য হতে বলটি নিতে এতে সাহস  করলো না।একটি বালক বললো,"এটা অতি সাধারন কাজ,আমি বলটি আনছি"।এ বলে সে বেআদবের মত সভারমধ্য হতে বলটি নিয়ে আসে।ইমাম সাহেব ছেলেটির বেআদবি দেখে বলেন,"হয়ত এ বালকটি হারামজাদা হবে"।পরে লোকে খোজ নিয়ে জানতে পারে যে,বাস্তবিকই বালকটি হারামজাদা।লোকে ইমাম সাহেবকে এ সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলো,"ইমাম সাহেব,আপনি কিভাবে বুজতে পারলেন?"।তিনি বলেন,"যদি সে হারামজাদা না হতো তবে লজ্জা থাকে এতটুকু বেয়াদবি করতে বাধা দিত।মাননীয় বৃদ্ধ ও মুরুব্বীদের সামনে কখনো বেআদবি করতে সাহস করতো না"।

একব্যাক্তি ইমাম সাহেবের কাছ থেকে কিছু টাকা ধার নেয়।যে গ্রামে সে বাস করতো,ঘটনাক্রমে ইমাম সাহেবের একজন ছাত্র মারা যায়।ইমাম সাহেব তার জানাজা পড়ার জন্য সেখানে যান।তখন খুব রৌদ্র ছিল।সেখানে তার ঋনগ্রস্থ ব্যাক্তির দালানের দেয়ালের ছায়া ছাড়া কোন ছায়ার ব্যবস্থা ছিল না।লোকে তাকে বললো,"আপনি এই ছায়ায় কিছুক্ষন বিশ্রাম করুন।"তিনি বললেন,"না,কেননা,দেয়ালের মালিকের ছাদ থেকে কিছু উপকার গ্রহন করা আমার জন্য ঠিক নয়।হযরত(সাঃ) বলেছেন,"ঋনস্বরূপ কাউকে কিছু দিয়ে তা থেকে কোন উপকার গ্রহন করোনা।"অতএব আমি যদি কিছু উপকার গ্রহন করি,তবে তা সুদের সমতুল্য বলে গন্য হবে।"

দাউদ তায়ী(রহঃ) বলেন,"আমিশবিশ বছর যাবত ইমাম আবু হানিফা(রহঃ) এর খিদমতে ছিলাম।সবসময় তার উপর আমার নজর ছিল।তিনি কখনো প্রকাশ্যে বা গোপনে খালি মাথায় বসতেননা।পরিশ্রমের কষ্ট দূর করার জন্য কখনো পা ছড়িয়ে বসতেননা।একবার আমি বললাম,"ইমাম সাহেব,যেখানে কেউ নেই এরূপ জায়গায় পা ছড়িয়ে বসলে তাতে দোষ কি?"তিনি বললেন,"তেমন জায়াগায়ও আল্লাহপাকের সাথে আদব রক্ষা করা শ্রেয়।"

একবার ইমাম সাহেব কোন পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন।সে পথে একটি বালককে কাদাময় স্থান দিয়ে যেতে দেখে তিনি বলেন,"বাছা,সাবধানে যাও যেন পা পিছলিয়ে না যায়।"বালকটি উত্তর দিল,"আমার পড়া সহজ।আমি যদি পড়ি,তাহলে একাই পড়বো।কিন্তু আপনি সাবধানে চলবেন,কেননা আপনি পড়ে গেলে আপনার তাবেদার সব মুসলমানই পড়ে যাবে এবং তাদের উঠা অত্যন্ত কষ্টকর হবে"।বালকের এরকম জ্ঞানগর্ভ কথায় ইমাম সাহেব তাজ্জব হলেন এবং কাদতে কাদতে নিজ মুরিদগনকে বললেন,"সাবধান,যদি তোমাদের মনে কোন মাসাআলায় সন্দেহ উপস্থিত হয় এবং কোন দলীল না পাও;তাহলে সে মাসআলায় আমার মতামত অনুসারী থেকেও কিন্তু তত্বের অনুসন্ধান থেকে বিরত থাকবেনা।এটাই পূর্ন সুবিচারের লক্ষন"।এ কারনে ইমাম আবু ইউসুফ(রহঃ) ও ইমাম মুহাম্মদ(রহঃ) তার ছাত্র হয়েও বহু মাসআলায় তার বিরোধিতা করেছেন।

একবার ইমাম সাহেব শহরের গোসলখানায় গিয়ে এক ব্যাক্তিকে উলঙ্গ দেখতে পান।কেউ বললো,"সে ফাসিক,কেউ বললো সে কাফের"।ইমাম সাহেব তাকে দেখা মাত্রই চোখ বন্ধ করলে লোকটি তখন জিজ্ঞেস করলো,"ইমাম সাহেব কবে থেকে আপনার চোখের জ্যোতি গিয়েছে?"।তিনি বলেন,"যেদিন থেকে তোমার লজ্জা গিয়েছে"।একবার ইমাম সাহেব বাজারে যাচ্ছিলেন খুব সামান্য পরিমান কাদামাটি হঠাৎ তার জামায় লেগে যাওয়াতে তিনি তখনই নদীতে গিয়ে কাদা ধুয়ে ফেলেন।লোকে জিজ্ঞেস করলো,"ইমাম সাহেব,আপনি যে নির্দিষ্ট পরিমান নাপাক জায়েয রেখেছেন তা তো তার অনেক কম,তবুও কেন তা ধুচ্ছেন?"তিনি বলেন,"হা,ওটা ফতওয়া,আর এটা তাকওয়া"।

দাউদ তায়ী(রহঃ) খলীফার পদ পেয়ে ইমাম সাহেবকে জিজ্ঞেস করেন,"এখন আমার কি করা উচিত?ইমাম সাহেব বলেন,"এখন ইলম অনুসারে আমল করো;কেননা যে ইলম অনুসারে কাজ করেনা,তার দেহ প্রানশূন্য দেহের মত"।

তখনকার খলীফা একরাত্রে আযরাঈল(আঃ) কে স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞেস করেন,"আমার আয়ু কতকাল বাকী আছে?"আযরাইল(আঃ) পাচ আঙ্গুলের প্রতি ইশারা করেন।খলীফা অনেক আলেমকে এর ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করেন,কিন্তু কেউ পরিষ্কারভাবে এর অর্থ অনুধাবন করতে পারেননি।তারপর তিনি ইমাম সাহেবকে ঢেকে এর ব্যাখ্যা করতে বললেন।তিনি বলেন"পাচ আঙ্গুলি পাচ বিষয়ের জ্ঞান বুজায়।অর্থাৎ এ পাচ বিষয়ে জানা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারোর নেই।যথাঃআল্লাহপাক কুরআন মাজীদের বর্ননা করেন,অর্থাৎ-

(১)নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে রয়েছে হিকমতের জ্ঞান।

(২)কখন বৃষ্টি হবে তার জ্ঞান।

(৩)জরায়ুতে কি ভ্রন আছে তিনিই জানেন।

(৪)কাল কি হবে কেউ জানেনা;কেবল তিনিই জানেন।

(৫)কোন স্থানে তার মৃত্যু হবে তিনিই জানেন।নিশ্চয়ই তিনি সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান।(তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা এগুলো তাকে জানাতে পারেন)।

আল্লাহ ছাড়া এ পাচ বিষয়ের জ্ঞান কারো নেই।আপনার জীবন আর কতদিন আছে,তিনিই জানেন।আযরাঈল(আঃ) পাচ আঙ্গুলের ইশারার অর্থ এটাই"।

শেখ আবু আলী(রহঃ) বলেন,"একরাত্রে আমি হযরত(সাঃ) সময়কার মুয়াজজিন বিলালের(রাঃ) মাজারের পাশে শুয়ে ছিলাম।স্বপ্নে দেখি,আমি যেন মক্কা শরীফে আছি এবং হযরত(সাঃ) কোন একশিশুকে কোলে রাখার ন্যায় এক বৃদ্ধকে কোলে করে বনি শায়বা দরজা দিয়ে বের হলেন।আমি দৌড়ে এসে ভাবছিলাম,এ বৃদ্ধ লোকটি কে?রাসূলুল্লাহ(সাঃ) বলেন,"ইনিই মুসলমানদের নেতা ইমাম আবু হানিফা।"

ইমাম আবু হানিফা(রহঃ) প্রতি রাতে তিনশত রাকআত নামায পড়তেন।একবার তিনি একপথ দিয়ে যাওয়ার সময় শুনলেন,এক স্ত্রীলোক অন্য এক স্ত্রীলোককে বললো,"ইমাম সাহেব প্রতিরাতে পাচশত রাকআত নামায পড়েন।"ইমাম সাহেব একথা শুনে সংকল্প করেন,প্রতি রাত্রে আমিও পাচশত রাকআত নামায পড়বো,তাহলে স্ত্রীলোকটি মিথ্যাবাদিনী হবেনা।"অন্য একদিন শুনেন বালকেরা পরস্পর বলাবলি করছে"ইমাম সাহেব প্রতিরাতে একহাজার রাকআত নামায পড়েন।"ইমাম সাহেব তখন থেকে প্রতিরাতে হাজার রাকআত করে নামায পড়া আরম্ভ শুরু করলেন।একদিন তার একছাত্র বলেন"হুযুর,লোকে বলাবলি করে করেযে আপনি সারারাত জেগে নামায পড়েন।"।সেদিন থেকে ইমাম সাহেব রাত্রিতে আর শুতেননা।যেহেতু আল্লাহতায়ালা বলেছেন,"অনেক লোক আছে যে,তারা যা করেনি,তার তারিফ করতে ভালবাসে।সুতরাং এখন থেকে আমি আর রাতে শুবোনা।তাহলে যারা মিথ্যা তারিফ শুনতে ভালবাসে,আমি তাদের অন্তরভুক্ত হবনা"।তখন থেকে ইমাম সাহেব ত্রিশবছর ইশার নামাযের ওযু দিয়েই ফযরের নামায পড়েছেন।নামায পড়তে পড়তে তার হাটুর উপরিভাগ উটের হাটুর মত শক্ত হয়ে গিয়েছিল।

ইমাম সাহেব একবার একধনী ব্যাক্তিকে তার ধনের জন্য যথেষ্ট সম্মান করেছিলেন।পরে মনে মনে দুঃখিত হয়ে একহাজার বার কুরআনমজিদ খতম করে আল্লাহর দরবারে তওবা করেন।কখনও তিনি ৪০ বার কুরআনশরীফ খতম করে কঠিন মাসআলার মীমাংসা করেছেন।

কুফার জৈনিক ধনী ব্যাক্তি হযরত যুননূরাইনকে(রহঃ) হিংসাবশতঃইহুদী বলতো।সে বললো,"আপনি মুসলমানদের ইমাম হয়েও একজন মুসলমানের মেয়েকে ইহুদীর হাতে দিতে চাচ্ছেন?আমি তাতে কখনো রাজি হবোনা"।আবু হানীফা(রহঃ) বলেন,"সুবহানাল্লাহ,তুমি তোমার মেয়ে ইহুদীর সাথে বিয়ে দিতে রাজি হচ্ছোনা অথচ হযরত মুহাম্মদ(সাঃ) একজন ইহুদীর হাতে তার দুই মেয়েকে সোপর্দ করেছিলেন"।লোকটি ইমাম সাহেবের কথার মর্ম বুঝতে পেরে লজ্জিত হয় এবং সাথে সাথে তার মনোভাবের পরিবর্তন হয়।তখনই সে ইমাম সাহেবের হাত ধরে তওবা করে।

নওফেল ইবনে হাইয়ান(রহঃ) বলেন,"ইমাম আবু হানিফা(রহঃ) এর ইনতিকালের পর আমি এক রাতে স্বপ্নে দেখি কিয়ামত সংঘটিত হচ্ছে।সমস্ত লোক হাশরের ময়দানে উপস্থিত এবং মহানবী(সাঃ) হাউজে কাউসারের কাছে দাড়ানো আছেন।ইমাম সাহেব তার পাশেই দাড়ানো।আমি ইমাম সাহেবকে সালাম দিয়ে বললাম,"আমাকে কিছু পানি পান করতেদিন।"ইমাম সাহেব বলেন,"যে পর্যন্ত আমাকে হযরত(সাঃ) হুকুম না করবেন,সে পর্যন্ত আমি তোমাকে পানি দিতে পারবোনা"।তারপর হযরত(সাঃ) আমাকে পানি দিতে আদেশ দেন।ইমাম সাহেব আমাকে এক পেয়ালা পানি দিলেন।আমি ও আমার বন্ধু পানি পান করলাম।কিন্তু পেয়ালা আগের মতো পূর্ন রয়েগেল।"আমি জিজ্ঞেস করলাম,"হযরতের দক্ষিনপাশে এই সুদর্শন পুরুষ কে?"।আবু হানিফা(রহঃ) বলেন,"তিনি হযরত ইবরাহিম(আঃ) এবং বামে হযরত আবু বকর ছিদ্দিক(রাঃ)"।আমি একেককরে সকল বুযুর্গের পরিচয় করলাম এবং ইমাম সাহেব উত্তর দিচ্ছিলেন।আমি ১৭ব্যাক্তির নাম আঙ্গুলের করে গুনলাম।জেগে দেখি,আমার আঙ্গুলটি করের ১৭দাগেই রয়েছে"।

ইমাম আবু হানিফা(রহঃ) এর অন্য নাম নোমান।৭০বছর বয়সে  ১৫০হিজরীতে খলীফা মনসুর কর্তৃক বন্দীদশায় জেলখানাতেই তিনি ইনতেকাল করেন।রমজান মাসে তিনি ৬১বার কুরআনশরীফ খতম করতেন,অর্থাৎ খতমে তারাবিহ নামাযে একবার ও দৈনিক দুখতম করে ৬০খতম করতেন।

ইয়াহিয়া রাযী(রহঃ) বলেন,"আমি একরাতে হযরত মুহাম্মদ(সাঃ) কে স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞেস করলাম,"হযরত(সাঃ),আমি কোথায় আপনাকে তালাশ করবো?।হযরত(সাঃ) জবাবে বলেন,আবু হানিফার ইলম ও জ্ঞানরাশির মধ্যে"।

কিতাবঃতাযকেরাতুল আউলিয়া।

লেখকঃহযরত শেখ ফরীদউদ্দীন আত্তার(রহঃ)।
0 টি পছন্দ
করেছেন (918 পয়েন্ট)

ইমাম আবু হানিফা(রহঃ) এর জীবনি

জন্ম, নাম ও বংশধর

উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের রাজত্বকালে ইমাম আবু হানিফা ইরাকের কুফা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ছয় বছর বয়সে আবদুল মালিক মৃত্যুবরণ করেন। ষোল বছর বয়সে তিনি পিতার সাথে হজ্জে গিয়েছিলেন তার পিতা সাবিত বিন যুতা কাবুল, আফগানিস্তানের একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। তার পিতার বয়স যখন ৪০ বছর তখন আবু হানিফা জন্মগ্রহণ করেন। বংশধরের দিক থেকে তাকে অ-আরবীয় বলে ধরা হয়ে থাকে কারণ তার দাদার নামের শেষে যুতা। প্রখ্যাত মুসলিম ইতিহাসবিদ খতীবে বাগদাদী আবু হানিফার নাতি ইসমাইল বিন হামাদের বক্তব্য থেকে আবু হানিফার বংশ ব্যাখা দেন। অন্য আরেক ইতিহাসবিদ হামাদ আবু হানিফাকে পারসিক বংশ্বদ্ভূত বলে দাবি করেন।আবু হানিফার বংশ নিয়ে অনেক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় তবে সবচেয়ে বেশি পরিচিত ও নির্ভরযোগ্য মত হলো তিনি কাবুলের পারসিক বংশদ্ভূত।

শিক্ষা

আবু হানিফা তার শিক্ষা জীবনের শুরুতে কুরআন কারিম মুখস্থ করেন । পরবর্তী সময়ে তিনি ইসলামি জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় বুত্পত্তি অর্জন করেন ।

কাজীর পদ প্রত্যাখান ও মৃত্যু

৭৬৩ আব্বাসীয় বংশের আল-মনসুর আবু হানিফাকে রাজ্যের প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগের প্রস্তাব দেন কিন্তু স্বাধীনভাবে থাকার জন্য তিনি প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন। তার পরীবর্তে তার ছাত্র আবু ইউসুফকে প্রধান বিচারপতির দ্বায়িত দেওয়া হয়। প্রস্তাব প্রত্যাখানের ব্যাপারে আবু ইউসুফ আল মনসুরকে ব্যাখা দেন তিনি নিজেকে এই পদের জন্য উপযুক্ত মনে করছেন না। আল-মনসুরের এই পদ প্রস্তাব দেওয়ার পেছেনে তার নিজস্ব কারণ ছিল, আবু হানিফা প্রস্তাব প্রত্যাখান করার পর মনসুর তাকে মিথ্যাবাদী হিসেবে অভিযুক্ত করেন। এই অভিযোগের ব্যাখ্যায় আবু হানিফা বলেন, “আমি যদি মিথ্যাবাদী হই তাহলে প্রস্তাব প্রত্যাখান করার ব্যাপারে আমার মতামত সঠিক, কারণ কিভাবে আপনি প্রধান বিচারপতির পদে একজন মিথ্যাবাদিকে বসাবেন।” এই ব্যাখার উত্তরে আল-মনসুর আবু হানিফাকে গ্রেফতার করেন ও তাকে নির্যাতন করে কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়। এমনকি বিচারকরা সিদ্ধান্ত নিতেন কে তার সাথে দেখা করতে পারবে।


মৃত্যু

৭৬৭ সালে আবু হানিফা কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর কারণ পরিষ্কার নয়। কেউ কেউ বলেন আবু হানিফা আল মনসুরের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহের চেষ্ঠা করেন এ জন্য তাকে জেলখানার ভেতর মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়। এটা বলা হয়ে থাকে যে, আবু হানিফার জানাযায় অনেক লোক সমাগম হয়েছিল। ইতিহাসবিদ খাতিবের পক্ষে বলা হয় তার জন্য লোকজন মৃত্যুর ২০ দিন পর্যন্ত প্রার্থনা করেছিল। পরবর্তীতে, অনেক বছর পর বাগদাদের পাশে আধামিয়াতে আবু হানিফ মসজিদ নামে একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করা হয় আবু হানিফার নামে।

১৫০৮ সালে সাফাভি সম্রাজ্যের শাহ ইসমাইল আবু হানিফা ও আব্দুল কাদের জিলানীর মাজার এবং অন্যান্য সুন্নি নিদর্শন ধ্বংস করে দেন১৫৩৩ সালে উসমানীয়রা পুনরায় ইরাক দখল করে ও মাজারসহ অন্যান্য সুন্নি নিদর্শন পুনর্নির্মাণ করে।


ইমাম আবু হানিফা(রহঃ) এর জীবনি সম্পর্কে রেফারেন্স

0 টি পছন্দ
করেছেন (1,234 পয়েন্ট)
ইমাম আবু হানিফা (র:) জিবনীঃ- ইমাম আবু হানিফা ইরাকের কুফায় ৫ সেপ্টেম্বর ৬৯৯ ইংরেজী মোতাবেক ৮০ হিজরীতে জন্ম গ্রহণ করেন।এবং ১৪ জুন ৭৬৭ ইংরেজী ১৫০ হিজরী ইন্তেকাল করেন। সাহাবী আনাস ইবনে মালিক (রা) এর সাথে সাক্ষাত হওয়ার কারনে তিনি একজন তাবেঈ।ইমাম আবু হানীফা রহ. অন্যুন আটজন সাহাবীর সাক্ষাত লাভ করেছেন। এঁরা হচ্ছেন- ১) হযরত আনাস ইবনে মালেক রা. (ওফাত ৯৩ হিজরী) ২) আব্দুল্লাহ ইবনে আবী আওফা রা. (ওফাত ৮৭ হিজরী) ৩) সহল ইবনে সাআদ রা. (ওফাত ৮৮ হিজরী) ৪) আবু তোফায়ল রা. (ওফাত ১১০ হিজরী) ৫) আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়দী রা. (ওফাত ৯৯ হিজরী) ৬) জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রা. (ওফাত ৯৪ হিজরী) ৭) ওয়াসেনা ইবনুল আসকা রা. (ওফাত ৮৫ হিজরী) ইমাম সাহেবের শিক্ষা জীবনঃ সে সময়কার রাজনৈতিক পরিস্হিতি ইমাম আবু হানীফা রহ. যখন জন্ম গ্রহণ করেন তখন আলমে আসলামের খেলাফতের মনসদে অধিষ্ঠিত ছিলেন আবদুল মালেক ইবনে মারওয়ান। ইরাকের শাসন কর্তৃত্ব ছিল হাজ্জান ইবনে ইউসুফের হাতে। সাহাবী এবং যুগশ্রষ্ঠ জ্ঞানীগুনিগণের শহর কুফা ছিল তার রাজধানী। হাজ্জাজকে ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে জালেম প্রশাসকরূপে আখ্যায়িত করা হয়। শুধুমাত্র রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে কয়েকজন বিশিষ্ট সাহাবীসহ অগণিত সংখ্যক জ্ঞানী গুনীকে তার জুলুম অত্যাচরের কবলে প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়েছিল। খলীফা ওমর ইবনে আবদুল আযীয বলতেন, পূর্ববর্তী উম্মতগণের সকল জালেমকে এক পাল্লায় এবং আমাদের হাজ্জাজকে যদি আর এক পাল্লায় তোলা হয় তবে নিঃসন্দেহে হাজ্জাজের জুলুমের পাল্লা অনেক ভারি হবে। ইবরাহীম নখয়ীর রহ. ন্যায় সাধক ব্যক্তি হাজ্জাজের মৃত্যুসংবাদ শুনে সেজদায় পড়ে অশ্রুভারাক্রান্ত চোখে আল্লাহর শুকুর আদায় করেছিলেন। জুলুম-অত্যাচরের বিভীষিকাময় পরিস্হিতিতে আলেম-সাধক এবং দীনদার শ্রেণীর লোকেরা অনেকটা নিষ্ক্রীয়তা এবং নির্জনবাস বেছে নিয়েছিলেন। যারাই একটু সাহসের সাথে অগ্রসর হয়েছেন, তাদের কেউ এই জালেমের কবল থেকে নিষ্কৃতি পাননি। খলীফা আবদুল মালেকের ইন্তেকাল হয় হিজরী ৮৬ সনে। দুর্দন্তপ্রতাপ এই খলিফার শাসনামলে ইসলামী খেলাফতের সীমান্ত পূর্বে কাবুল-কান্দাহার এবং সিন্ধু-পান্জাব পর্যন্ত এবং পশ্চিমে স্পেন পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করেছিল। কিন্তু এলমে-দীনের বড় বড় কেন্দ্রগুলি ছিল স্তব্ধ। আলেমগণ নিজেদের নির্জন হুজরায় বরে দীনি এলেমের চর্চা নামেমাত্র বাঁচিয়ে রেখেছিলেন সত্য, কিন্তু বৃহত্তর জনগণের মধ্যে এলেমের চর্চা প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। হিজরী ৯৫ সনে হাজ্জাজ মৃত্যু মুখে পতিত হয়। পরবর্তী বছর আব্দুল মালেকের পুত্র ওলীদেরও মৃত্যু হয়। ওলীদের মৃত্যুর পর সুলায়মান ইবনে আবদুল মালেক খেলাফতের দায়িত্ব লাভ করেন। ইতিহাসবিদগণের বিবেচনায় সুলায়মান ছিলেন উমাইয়া বংশীয় খলীফাদণের মধ্যে অন্যতম সেরা সৎ শাসক। হিজরী প্রথম শতাব্দির মুজাদ্দেদ রূপে পরিচিত ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ রহ. নিযুক্ত হন তার প্রধান উপদেস্টারূপে। মত্র পৌনে তিন বৎসর খেলাফতের দায়িত্ব পালন করার পর যখন তার ইন্তেকাল হয়, তখন খলিফার অসিয়্যত অনুযায়ী ওমর ইবনে আবদুল আজীজ পরবর্তী খলিফা নির্বাচিত হন। (হিজরী ৯৯ সন) ওমর ইবনে আবদুল আজীজ রহ. স্বয়ং একজন সাধক প্রকৃতির আলেম ছিলেন। তাঁর ব্যক্তিগত আগ্রহ ও যত্নে সে যুগের বিশিষ্ট আলেমগণ হাদিস, তফসীর ও ফেকাহশাস্ত্রের চর্চায় ব্যাপকভাবে আত্মনিয়োগ করেন। ইমাম বুখারী লিখেছেন, ওমর ইবনে আবদুল আজীজ রহ. আবু বকর ইবনে হাদম এর বরাবরে লিখিত এক পত্রে এ মর্মে আদেশ প্রদান করেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদিস সুমূহ যত্নের সাথে সংগ্রহ ও তা লিপিবদ্ধ করার ব্যবস্হা কর। আমার আশঙ্কা হয় (বিরাজমান অবস্হায়) এলেম চর্চা এবং আলেমগণের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে না যায়! (সহীহ আল বুখারী) আল্লামা বদরুদ্দিন আইনী বহ. বলেন ওমর ইবনে আবদুল আজীজ উপরোক্ত মর্মের আদেশনামাটি সে যুগের সব বিশিষ্ট আলেমের নিকট প্রেরণ করেছিলেন। যার ফলশ্রুতিতে হিজরী ১০০ সন থেকে হাদিস সংকলনের কাজ ব্যাপকভাবে শুরু হয়ে যায়। তা না হলে আজ আমাদের নিকট হাদিসের যে বিরাট ভান্ডার মজুদ আছে, তা হয়ত থাকতো না। (ওমদাতুল-ক্বারী, ১ম খন্ড) ওলীদের যখন মৃত্যু হয় (হিজরী ৯৬) তখন আবু হানীফা রহ. ষোল বছরের তরুণ। এ পর্যন্ত তাঁর লেখাপড়া পারিবারিক পরিবেশেই সীমিত ছিল। সে বছরই পিতার সাথে হজ্বে গমন করে মসজিদুল-হারামের দরছের হালকায় বসে আল্লাহর নবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একজন সাহাবীর জবানী হাদিস শ্রবণ করার মাধ্যমে এলমে-হাদিসের সাথে তাঁর সরাসরি পরিচিতি ঘটে। প্রথম যৌবনের সীমিত কিছুদিন ছাড়া ইমাম আবু হানীফার জীবনের শেষ মুহূর্তটি পর্যন্তটি ছিল ভয়াবহ রাজনৈতিক সংকটে কন্টকিত। তাঁর কর্মজীবনের শুরুতেই উমাইয়া শাসনের পতন এবং আব্বাসীয়দের খেলাফতের উত্থান ঘটে। আব্বাসীয়দের দাবী ছিল খোলাফায়ে-রাশেদীনের শাসন ব্যবস্হা পূনঃপ্রতিষ্ঠা এবং শাসন ক্ষমতায় আহলে-বাইতের প্রাধান্য স্হাপন। যে কারণে সমসাময়িক বিশিষ্ট আলেম ওলামাগণের পাশাপাশি ইমাম আবু হানীফাও রাষ্ট্রবিপ্লব ঘটানোর বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় শরীক হয়েছিলেন। সেই বিস্ফোরণমূথী রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পরিবেশের মধ্যেই ইমাম আবু হনীফা কুরআন-সুন্নাহ এবং সাহাবীগণের জীবনপদ্ধতি মন্হন করে এলমে-ফেকাহ বা বিধান শাস্ত্র রচনা করে গেছেন। সর্বকালের মুসলমানদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য বিজ্ঞান সম্মত বিধিবিধান সম্বলিত এগরো লক্ষাধীক মাসআলা সংকলিত করে গেছেন তিনি। তাঁর সংকলিত মৌলিক মাসআলা-মাসায়েলের সুত্রগুলির মধ্যে এমন একটিও খুঁজে পাওয়া যাবে না, যার সমর্থনে কুরআন, হাদিস বা সাহাবীগণের আছার এর সমর্থন নাই। এর দ্বারাই অনুমিত হয় যে, তাঁর জ্ঞানের পরিধি কতটুকু বিস্তৃত ছিল। ইমাম আবু হানীফার পৈত্রিক পেশা ছিল কাপড়ের ব্যবসা। ইরান থেকে শুরু করে ইরাক, সিরিয়া ও হেজায পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলব্যপী বিপুল পরিমণ মুল্যবান রেশমী কাপড়ের আমদানী ও রফতানী হতো। পৈত্রিক এই ব্যবসার সুবাদেই তিনি প্রচুর বিত্তের মালিক ছিলেন। বিশিষ্ট ওলামাগণের মধ্যে সম্ভবত তিনিই ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি রাস্ট্রীয় প্রষ্ঠপোষকতা বা বিত্তবানদের হাদীয়-তোহফা প্রাপ্তির পরোয়া না করে নিজ উপার্জনের দ্বারা জীবিকা নির্বাহ, এলেমের সেবা এবং তাঁর নিকট সমবেত গরীব শিক্ষার্থীদের যাবতীয় ব্যয়ভার নির্বাহ করার ব্যবস্হা করতেন। তাঁর অন্যতম বিশিষ্ট সাগরেদ ইমাম মুহম্মদকে তিনি বাল্যকাল থেকেই লালন-পালন করে প্রতিষ্ঠার চুড়ান্ত শিখরে পৌছে দিয়েছিলেন। তাঁর অর্থ সাহায্যে লালিত এবং জ্ঞান চর্চার বিভিন্ন শাখায় সুপ্রতিষ্ঠিত মনীষীবর্গের তালিকা অনেক দীর্ঘ। কিশোর বয়স থেকেই ইমাম সাহেব পিতার ব্যবসার কাজে যোগ দিয়েছিলেন। ব্যবসায়ীক কাজেই তাঁকে বিভিন্ন বাজার ওবাং বাণিজ্য কেন্দ্রে যাতায়াত করতে হতো। ঘটনাচক্রে একদিন ইমাম শা’বীর সাথে তাঁর সাক্ষাত হয়ে যায়। প্রথম দর্শনেই ইমাম শা’বী আবু হনীফার নিষ্পাপ চেহারার মধ্যে প্রতিভার স্ফুরণ লক্ষ করেছিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, বৎস! তুমি কি কর? এ পথে তোমাকে সব সময় যাতায়াত করতে দেখি! তুমি কোথায় যাওয়া-আসা কর? ইমাম সাহেব জবাব দিলেন, আমি ব্যবসা করি। ব্যবসার দায়িত্ব পালনার্থেই ব্যবাসায়ীদের দোকানে দোকানে আমাকে যাওয়া-আসা করতে হয়। ইমাম শা’বী পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, এটা তো তোমার লেখাপড়ার বয়স। কোন আলেমের শিক্ষায়তনেও কি তোমার যাতায়াত আছে? আবু হানীফা রহ. সরলভাবেই জবাব দিলেন, সেরূপ সুযোগ আমার খুব কমই হয়। কিছুক্ষন আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই ইমাম শা’বী আবু হানীফাকে জ্ঞানার্জনে মনোযোগী হওয়ার প্রতি আগ্রহী করে তুললেন। ইমাম সাহেব বলেন, ইমাম শা’বীর সেই আন্তরিকতাপূর্ণ উপদেশবাণী গুলো আমার অন্তরে গভীরভাবে রেখাপাত করল এবং এরপর থেকেই আমি বিপনীকেন্দ্রগুলোতে আসা-যাওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষা কেন্দ্রেও যাতায়াত শুরু করলাম। (মুয়াফেক, আবু জোহরা) এ সময় আবু হানীফার রহ. বয়স ছিল উনিশ বা বিশ বছর। তিনি দীর্ঘ আঠারো বছর কাল ইমাম হাম্মাদের একান্ত সান্নিধ্যে জ্ঞানার্জনে নিমগ্ন থাকেন। ইমাম হাম্মাদের যখন ইন্তেকাল হয়, তখন আবু হানীফার বয়স ছিল চল্লিশ বছর। এ সময় তিনি উস্তাদের স্হলাভিষিক্ত হয়ে তাঁর শিক্ষাকেন্দ্রের পূর্ণদায়িত্ব গ্রহণ করেন। ফাতাওয়ার ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানীফার রঃ অনুসৃত নীতিঃ যে কোন সমস্যার সমাধান অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানীফার রঃ অনুসৃত নীতি ছিল, প্রথমে কুরআনের শরণাপন্ন হওয়া। কুরআনের পর হাদিস শরীফের আশ্রয় গ্রহণ করা। হাদিসের পর সাহাবায়ে কেরাম গৃহীত নীতির উপর গুরুত্ব দেওয়া। উপরোক্ত তিনটি উৎসের মধ্যে সরাসরি সামাধান পাওয়া না গেলে তিনটি উৎসের আলোকে বিচার-বুদ্ধির (কেয়াসের) প্রয়োগ করা। তাঁর সুস্পস্ট বক্তব্য ছিল, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে কোন ধরনের হাদিস বা সাহাবীগণের অভিমতের সাথে যদি আমার কোন বক্তব্যকে সাংঘর্ষিক মনে হয়, তবে আমার বক্তব্য অবশ্য পরিত্যাজ্য হবে। হাদিস এবং আছারে সাহাবা দ্বারা যা প্রমাণিত সেটাই আমার মাযহাব। (তাফসীরে মাযহারী, খায়রাতুল-হেসান) ইমাম ইবনে হাযম রঃ বলেন, আবু হানীফার রঃ সকল ছাত্রই এ ব্যাপারে একমত যে, নিতান্ত দূর্বল সনদযুক্ত একখানা হাদিসও তাঁর নিকট কেয়াসের তুলনায় অনেক বেশী মুল্যবান দলিলরূপে বিবেচিত হবে। (খায়রাতুল-হেসান) সম্ভবতঃ এ কারণেই পরবর্তী যুগে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে যে সব কালজয়ী প্রতিভার জন্ম হয়েছে, তাঁদের অধিকাংশ ইমাম আবু হানীফার রঃ মাযহাব অনুসরণ করেছেন। হযরত মোজাদ্দেদ আলফেসানী রঃ বক্তব্য হচ্ছে- এই ফকীরের উপর প্রকাশিত হয়েছে যে, এলমে-কালামের বিতর্কিত বিষয়গুলি মধ্যে হক হানাফী মাযহাবের দিকে এবং ফেকাহর বিতর্কিত মাসআলাগুলির অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হক হানাফী মাযহাবের দিকে এবং খুব কম সংখ্যক মাসআলাই সন্দেহযুক্ত। (মাবদা ও মাআদ) শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দেস দেহলভী রঃ হারামাইন শরীফে কাশফ যুগে যে সব তথ্য অবগত হয়েছেন, সে সবের আলোকে লিখেছেন- হযরত নবী করিম সাল্লাল্লাহু আমাকে অবগত করেছেনযে, হানাফী মাযহাব একটি সর্বোত্তম তরিকা। ইমাম বুখারীর সময়ে যেসব হাদিস সংকলিত হয়েছে, সেগুলোর তুলনায় আবু হানীফার রঃ সিদ্ধান্তগুলি সুন্নতে-নববীর সাথে অনেক বেশী সামন্জস্যপূর্ণ। (ফুযুলুল-হারামাইন) সুতরাং যারা এ কথা বলতে চায় যে, হানাফী মাযহাব সহীহ হাদীসের সাথে সামন্জস্যপূর্ণ নয় বা ইমাম আবু হানীফা রঃ বহু ক্ষেত্রে হাদিসের প্রতিকূলে অবস্হান গ্রহণ করেছেন, তাদের বক্তব্য যে নিতান্তই উদ্ভট তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। বরং হানাফী মাযহাব হচ্ছে কুরআন-সুন্নাহর এমন এক যুক্তিগ্রাহ্য ও সুবিন্যস্ত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ যা সর্বযুগের মানুষের নিকটই সমভাবে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছে। শিক্ষাদান পদ্ধতিঃ সে জামানার দরসের হালকা বা শিক্ষাঙ্গনের চিত্র ছিল, উস্তাদ কোন একটি উচ্চ আসনে বসে তকরীর করতেন। ছাত্রগণ চারদিকে হাঁটু গেড়ে বসে নিতান্ত নিবিষ্টতার সাথে তকরীর শ্রবণ করতেন। অনেকেই তকরীর শুনে তা আয়ত্ব করার পাশাপাশি লিপিবদ্ধ করে রাখতেন। এসব তকরীর উস্তাদ কর্তৃক অনুমোদিত হলে যিনি তকরীর করতেন তাঁর নামেই সেগুলো গ্রন্হাকারে প্রকাশিত হতো। হিজরী প্রথম ও দ্বিতীয় শতাব্দির সংকলিত হয়েছে। ইমাম আবু হানীফার রঃ শিক্ষাদান কার্যক্রমেও সে পদ্ধতিই অনুসরণ করা হতো। কোন কোন মাসআলায় তর্ক শুরু হয়ে যেত। সে তর্ক কয়েকদিন পর্যন্তও চলতো। শেষ পর্যন্ত কুরআন ও সুন্নাহর দৃষ্টিতে যা সাব্যস্ত হতো সেটাই লিপিবদ্ধ হতো। কোন কোন মাসআলায় উস্তাদ ও সাগরেতের মধ্যকার মতভেদ অমীমাংসিতই থেকে যেত। সেই মত পার্থক্যগুলিও স্ব স্ব যুক্তি সহকারেই কিতাব লিপিবদ্ধ করা হতো। এভাবেই হানাফী মাযহাবের মৌলিক গ্রন্হগুলি সংকলিত হয়েছে। ইমাম সাহেবের দরছগাহ সপ্তাহে দুইদিন ছুটি থাকতো। শুক্রবার ও শনিবার। শনিবার দিনটি তিনি ব্যবসায়িক কাজকর্ম এবং পারিবারিক ব্যস্ততার জন্য নির্দিষ্ট করে রাখতেন। শুক্রবার দিন জুমার প্রস্তুতি এবং জুমাবাদ তার বাসস্হানে বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনেরা সমবেত হতেন। এ দিন বিশেষ যত্নের সাথে অপেক্ষাকৃত উন্নতমানের খানা প্রস্তুত হতো। ইমাম সাহেব সমবেত সবাইকে নিয়ে খানা খেতেন। কর্মদিবস গুলিতে তিনি এশরাক থেকে চাশতের সময় পর্যন্ত ব্যবসায়িক কাজকর্ম করতেন। জোহরের পর থেকে সন্ধা পর্যন্ত শিক্ষাদান কার্যে নিয়োজিত থাকতেন। ফতোয়া দানের জন্যও এ সময়টাই নির্ধারিত ছিল। তবে অবস্হা ভেদে এ সময়সূচীর মধ্যে পরিবর্তনও হতো। দরসের মজলিসে শিক্ষার্থীগণের সাথে অনেক সাধারণ লোকও শরীক হতেন। তর্কচ্ছলে অনেকে আপত্তিকর মন্তব্যও করত। কিন্তু কারো প্রতি বিরক্তি প্রকাশ না করে পরম ধৈর্যের সাথে জবাব দিতেন। চরম ধৃষ্ঠতা প্রদর্শনের মোকাবেলাতেও তাঁর ধৈর্যচ্যুতি ঘটত না। প্রায সময়ই তিনি একটা কবিতাংশ আবৃত্তি করতেন। যা অর্থ ছিলো- ইয়া আল্লাহ ! যাদের অন্তর আমাদের দিক থেকে সংকুচিত হয়ে আছে, আমাদের অন্তর তাদের প্রতি প্রশস্ত করে দাও। (আবু যোহরা) প্রতিটি তকরীরের শেষে তিনি বলতেন, এটি আমার অভিমত। যতটুকু সম্ভব হয়েছে, তা আমি বললাম। কেউ যদি আমার চাইতেও মজবুত দলীল ও যুক্তির অবতারনা করতে পারেন, তবে তাই অধিকতর গ্রহণযোগ্য হবে। (আবু যোহরা) কোন একটি বিষয় আলোচনার সময় একবার একজন ছাত্র বলেছিলেন, আপনার এই অভিমতটি খুবই চমৎকার। জবাবে তিনি বলেছিলেন, এমনও তো হতে পারে যে, এক পর্যায়ে এটি ভুল প্রমাণিত হবে। (আবু যোহরা) ইমাম আবু ইউসুফ রঃ তাঁর সব আলোচনারই লিপিবদ্ধ করে রাখার চেষ্টা করতেন। ইমাম সাহেব বলতেন, আমার তকরীর শুনে তা অনুধাবন করতে বেশি যত্নবান হও। এমনও হতে পারে যে, আজকের এই কথাগুলি পরবর্তীতে ভুল প্রমাণিত হবে। (আবু যোহরা) যারা বিরূপ মন্তব্য করতো, তাদের সম্পর্কে ইমাম সাহেবের মন্তব্য ছিল- যদি কেউ আমার সম্পর্কে এমন কথা বলে, যা আমার মধ্যে নাই, তবে সে ভুল বলছে। আর আলেমদের কিছু না কিছু দোষ চর্চা তো তাদের মৃত্যুর পরও অব্যাহত থাকে। ইমাম সাহেব প্রথম যখন শিক্ষা দান শুরু করেন, তখন শুধুমাত্র ইমাম হাম্মাদের সাগরেদগণই তাতে শরীক হতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে তাতে কূফার সর্বস্তরের মানুষ, বিশিষ্ট জ্ঞানীগুনী, এমনকি ইমাম সাহেবের উস্তাদগণেরও কেউ কেউ এসে শরীক হতেন। বিখ্যাত তাবেয়ী মাসআব ইবনে কোদাম, ইমাম আমাশ প্রমুখ নিজে আসতেন এবং অন্যদেরকেও দরসে যোগ দিতে উৎসাহিত করতেন। একমাত্র স্পেন ব্যতীত তখনকার মুসলিম-বিশ্বের এমন কোন অঞ্চল ছিল না, যেখানকার শিক্ষার্থীগণ ইমাম আবু হানীফ রঃ এর দরসে সমবেত হননি। মক্কা-মদীনা, দামেস্ক, ওয়াসেত, মুসেল, জায়িরা, নসীবাইন, রামলা, মিসর, ফিলিস্তিন, ইয়ামান, ইয়ানামা, আহওয়ায, উস্তুর আবাদ, জুরজান, নিশাপুর, সমরকন্দ, বুখারা, কাবুল-হেমস প্রভৃতিসহ বিখ্যাত এমন কোন জনপদ ছিল না যেখান থেকে শিক্ষার্থীগণ এসে ইমাম আবু হানীফা রঃ এর নিকট শিক্ষা লাভ করেননি। মুসলিম-বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে জ্ঞানতৃষ্ঞা মিটানোর লক্ষ্যে সমবেত শিক্ষার্থীগণের বিচারেও ইমাম আবু হানীফা রঃ ছিলেন তাবেয়ীগণের মধ্যে কুরআন-হাদীস এবং আনুষঙ্গিক বিষয়ে সর্বাধিক জ্ঞানী এবং তাকওয়া পরহেজগারীতে অনন্য ব্যক্তিত্ব। ইমাম সাহেবের অনুপম শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের বদৌলতে সে যুগে এমন কিছু সংখ্যক উজ্জল ব্যক্তিত্বের সৃষ্টি হয়েছিল, যাঁরা মুসলিম উম্মাহর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার আকাশে এক একজন জ্যোতিষ্ক হয়ে রয়েছেন। ইমাম সাহেবের সরাসরি সাগরেদগণের মধ্যে ২৮ ব্যক্তি বিভিন্ন সময়ে কাজী (বিচারক) এবং শতাধীক ব্যক্তি মুফতীর দায়িত্ব পালন করেছেন। ইসালামের ইতিহাসে এক ব্যক্তির প্রচেষ্টায় এত বিপুল সংখ্যক প্রাজ্ঞ ব্যক্তির আবির্ভাব আর কোথাও দেখা যায় না। খলীফা মানসুরের সময় ইমাম আবু হানিফাকে প্রধান বিচারপতির পদ গ্রহনের জন্য আহবান জানানো হয়। তিনি উক্ত প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে খলীফাকে সম্বোধন করে বলেন, ’’ আল্লাহর শপথ , কোন ব্যাপারে আমার ফয়সালা যদি আপনার বিরুদ্ধে যায় এবং আপনি আমাকে হুকুম দেন যে হয়ত সিদ্বান্ত পাল্টাও না হলে তোমাকে ফোরাত নদীদে ডুবিয়ে মারা হবে। তখন আমি ডুবে মরতে প্রস্তুত থাকব তবু নিজের সিদ্বান্ত পাল্টাতে পারবনা। তা ছাড়া আপনার দরবারে এমন অনেক লোক রয়েছে যাদের মনতুষ্টি করার মত কাজীর প্রয়োজন।’’ ইমাম আবু হানিফা খলীফার প্রস্তাব প্রত্যখ্যান করার পর তাকে ত্রিশটি বেত্রাঘাত করা হয় । যারফলে তাঁর সারা শরীর রক্কাক্ত হয়ে পড়ে। তখন খলীফা মানসুরের চাচা আব্দুস সামাদ ইবন আলী তাকে এজন্য খুবই তিরিষ্ড়্গার করে বলেন , ’’ ইনি শুধু ইরাকের ফকীহ নন। সমগ্র প্রাচ্যবাসীর ফকীহ।’’ এতে মনসুর লজ্জিত হয়ে প্রত্যেক চাবুঘাতের বদলে এক হাজার দিরহাম ইমাম আবু হানিফার কাছে পাঠান। কিন্তু ইমাম উক্ত দিরহাম গ্রহনে অস্বীকৃতি জানান। তখন তাকে বলা হয় তিনি এ অর্থ গ্রহন করে নিজের জন্য না রাখলেও দুঃখী-গরীবদের মাঝে বিলিয়ে দেন। এর জবাবে ইমাম বলেণ ’’ তার কাছে কি কোন হালাল অর্থও রয়েছে’’?। মানসুর এরপর আরও প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে উঠে। ইমামকে আরও চাবুকাঘাত করা হয়। কারারুদ্ধ করে পানাহারে নানাভাবে কষ্ট দেয়া হয়। তারপর একটা বাড়ীতে নজরবন্দী করে রাখা হয়। সেখানেই ইমাম আবু হানিফার মৃত্যূ হয়। কারো কারো মতে তাঁকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়। নির্মম নির্যাতনের শিকার ইমাম আবু হানিফা মৃত্যুর আগে অসিয়ত করে যান যে খলীফা মানুসর জনগনের অর্থ অন্যায়ভাবে দখল করে বাগদাদের যেই এলাকায় শহর নির্মান করেছে সে এলাকায় যেন এন্তেকালের পর তাঁকে দাফন করা না হয়।

সম্পর্কিত প্রশ্নগুচ্ছ

1 উত্তর
19 জানুয়ারি 2014 "জনক/প্রবক্তা/আবিষ্কারক" বিভাগে জিজ্ঞাসা করেছেন sobuj (347 পয়েন্ট)
3 টি উত্তর
19 জুলাই "ইসলাম" বিভাগে জিজ্ঞাসা করেছেন নুর আলম (806 পয়েন্ট)

323,340 টি প্রশ্ন

413,962 টি উত্তর

128,275 টি মন্তব্য

178,040 জন নিবন্ধিত সদস্য

বিস্ময় বাংলা ভাষায় সমস্যা সমাধানের একটি নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। এখানে আপনি আপনার প্রশ্ন করার পাশাপাশি অন্যদের প্রশ্নে উত্তর প্রদান করে অবদান রাখতে পারেন অনলাইনে বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের জন্য সবথেকে বড় এবং উন্মুক্ত তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলার কাজে।
...