65 জন দেখেছেন
"ঈমান ও আক্বীদা" বিভাগে করেছেন (182 পয়েন্ট)
পূনঃতকমাযুক্ত করেছেন
হযরত ওয়াহেস আল কারনী(রহঃ) এর জীবনী সম্পর্কে বিস্তারিত রেফারেন্স সহ জানতে চাই।

2 উত্তর

2 পছন্দ 0 জনের অপছন্দ
করেছেন (4,426 পয়েন্ট)

৩৭ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগের হওয়া সত্ত্বেও তাঁর সাথে সাক্ষাতের সুযোগ তার হয়নি। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি তার অগাধ ভালবাসা ছিল। তার বৃদ্ধা মা ছিলেন। মায়ের সাথে তিনি সদাচরণ করতেন। মায়ের সেবাযত্ন করতেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে চিনতেন। হাদীস শরীফে এসেছে, ওমর রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ইয়ামান থেকে উয়াইস নামে এক ব্যক্তি তোমাদের কাছে আসবে। ইয়ামানে মা ছাড়া তার আর কেউ নেই। তার শ্বেত রোগ ছিল । সে আল্লাহর কাছে দুআ করলে আল্লাহ তার রোগ ভাল করে দেন, কিন্তু তার শরীরের একটি স্থানে এক দিনার অথবা এক দিরহাম পরিমাণ স্থান সাদাই থেকে যায়। তোমাদের কেউ যদি তার সাক্ষাৎ পায় সে যেন তাকে নিজের জন্য ইস্তেগফার করতে বলে। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৫৪২

ওয়ায়েস করনীর সাথে সাহাবীদের সাক্ষাতের ঘটনাও হাদীস শরীফে এসেছে। সহীহ মুসলিমে এসেছে, ওমর রা.-এর সাথে ওয়ায়েস করনীর সাক্ষাত হলে তাকে সনাক্ত করার জন্য তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের  বলে দেয়া সব আলামত জিজ্ঞাসা করেন। এ বর্ণনায় আছে ওমর রা. নবীজীর কথা অনুযায়ী তাকে নিজের জন্য ইস্তিগফার করতে বলেন, তিনি ওমর রা.-এর জন্য ইস্তিগফার করেন। পরবর্তী বছর হজ্বের মৌসুমে ওয়ায়েস করনী যে এলাকায় বসবাস করছিলেন সেখান থেকে এক ব্যক্তি এলে ওমর রা. তার (ওয়ায়েস করনীর) খোঁজ খবর নেন। (দ্র. সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৫৪২)

করেছেন (182 পয়েন্ট)
কমেন্ট করার জন্য ধন্যবাদ।আমি আরো কিছু তথ্য দিতে চাই।

হযরত ওয়ায়েস আল কারনী(রহঃ) এর জীবনীঃ

হযরত ওয়ায়েস আল কারনী(রহঃ) একজন তাবেঈ ছিলেন।রাসূলেপাক(সাঃ) বলেছেন"ওয়ায়েস আল কারনী তাবেঈদের মধ্যে উত্তম"।একদিন রাসূলেপাক(সাঃ) বলেন"আমি বাস্তবিক আল্লাহতাআলার রহমতের সুগন্ধযুক্ত হাওয়া ইয়ামেনের থেকে পাচ্ছি"।রাসূলেপাক(সাঃ) আরো বলেন"কিয়ামতের দিন আল্লাহতাআলা সত্তর হাজার ফেরেশতাকে ওয়ায়েস আল কারনীর অনুরুপ চেহারা দিয়ে সৃষ্টি করবেন।হযরত ওয়ায়েস এ সকল ফেরেশতা দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে হাশরের ময়দানে উপস্থিত হবেন।তিনি দুনিয়াতে নির্জন স্থানে এবং লোকালয় থেকে দূরে থেকে ইবাদত বন্দেগী করতে ভালবাসতেন ও নিজেকে গোপন রাখতে চেষ্টা করতেন।তাই কিয়ামতের দিন আল্লাহতাআলা তাকে 'সিদক' স্থানে রাখবেন"।আল্লাহতাআলা বলেন"আউলিয়াগন আমার মিনারের নিচে,তাদেরকে আমি ছাড়া কেউ চিনতে পারেনা"।একদিন রাসূলেপাক(সাঃ) সাহাবাগনকে বলেন"আমার উম্মতের মধ্যে এমন এক ব্যাক্তি আছেন,রাবীয়া ও মোযার সম্প্রদায়ের ছাগপালের পশমের পরিমান গোনাহগারের জন্য তিনি সুপারিশ করবেন।"সেকালে দুটি সম্প্রদায়ের ছাগল দুনিয়ায় সুপ্রসিদ্ধ ছিল।সাহাবাগন জিজ্ঞেস করলেন"ইয়া রাসূল(সাঃ),তিনি কি আপনাকে দেখেছেন?"উত্তরে হযরত(সাঃ) বলেন" তিনি প্রত্যক্ষভাবে আমাকে দেখেননি বটে,কিন্তু অন্তরের চোখে আমাকে দেখেছেন"।সাহাবাগন আরজ করলেন" ইয়া রাসূল(সাঃ),আপনার আশেক হলে তিনি কেন আপনার খেদমতে আসেননা?"।রাসূলেপাক(সাঃ) উত্তরে বলেন,"তিনি দুটি কারনে আসতে অক্ষম।প্রথমত তিনি আল্লাহর ইশকে এবং তার রাসূলের(সাঃ) এর প্রতি ভক্তিতে মশগুল থাকেন।দ্বিতীয়ত শরীয়তের হুকুম একমনে পালন করেন।তার মা অন্ধ,হাতপা অচল।মাতার ভরনপোষনের ভার ওয়ায়েস কারনীর উপর।উট চরিয়ে তিনি নিজের ও মায়ের ভরনপোষনের ব্যবস্থা করেন"।অতঃপর রাসূলেপাক(সাঃ) বলেন,"আমি তাকে দেখবনা।হযরত আবু বকর ছিদ্দিক(রাঃ) কে লক্ষ্য করে বলেন"তুমিও তাকে জীবনকালে দেখবেনা,কিন্তু উমর(রাঃ) ওয়ায়েস কারনীকে দেখবেন"।রাসূলেপাক(সাঃ) পবিত্র ওফাতের সময় হযরত উমর(রাঃ) ও হযরত আলী(রাঃ) কে বলেন" তোমরা আমার ওফাতের পর আমার খেরকা ওয়ায়েস কারনীকে দিয়ে তাকে আমার সালাম পৌছাবে"।রাসূলেপাক(সাঃ) এর  পবিত্র ওফাতের অনেক পরে হযরত উমর(রাঃ)  এর খিলাফতের সময় হযরত উমর(রাঃ) ও হযরত আলী(রাঃ) কুফায় গিয়ে খুৎবার মধ্যে সমবেত লোকদের উদ্দেশ্যে বলেন,"হে কুফাবাসীগন ,তোমরা ওয়ায়েস কারনীর সন্ধান দিতে পারো?"।তারা উত্তরে বললেন,"সে একজন পাগল,লোকালয়ে বাস করেনা,জঙ্গলে উট চরিয়ে থাকে।দিনশেষে একবার শুকনা রুটি আহার করে।মানুষ যখন হাসে,সে তখন কাদে,মানুষ কাদলে সে হাসে"।এরপর হযরত উমর(রাঃ) ও হযরত আলী(রাঃ) একটি নির্জন স্থানের দিকে রওনা হয়ে তারা সেখানে গিয়ে তাকে প্রথমে নামাজরত দেখেন।তিনি লোক আগমনের শব্দে নামাজ সংক্ষেপ করে সাহাবাগনকে সালাম করেন।হযরত উমর(রাঃ) সালামের জবাব দিয়ে তার নাম জিজ্ঞেস করলে উত্তরে তিনি বলেন"আবদুল্লাহ(আল্লাহর বান্দা)"।তখন হযরত উমর(রাঃ) বলেন,"আমরা সবাই আল্লাহর বান্দা।আপনার মা আপনাকে কি বলে ডাকে?"।উত্তরে তিনি বলেন,"ওয়ায়েস"।হযরত উমর(রাঃ) বলেন,"আপনার ডান হাতখানা দেখান"।ওয়ায়েস নিজের ডানহাতখানা দেখালে রাসূলেপাক(সাঃ) এর নসীয়ত অনুযায়ী তার ডান হাতে সাদা চিহ্ন দেখতে পেয়ে হযরত উমর(রাঃ) তার হাতে চুমো খেয়ে বলেন,"রাসূলেপাক(সাঃ) আপনাকে সালাম জানিয়েছেন এবং নিজ খেরকা মুবারক আপনাকেই দান করেছেন এবঃ তার উম্মতের জন্য দোয়া করতে বলে গিয়েছেন।"।হযরত ওয়ায়েস বললেন,"দোয়ার জন্যতো আপনারাই সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ এবং উপযুক্ত।"হযরত উমর(রাঃ) বলেন,"আমরা তা করেছি।কিন্তু আপনি রাসূলেপাক(সাঃ) এর নির্দেশ পালন করুন"।হযরত ওয়ায়েস বলেন,"হযরত উমর(রাঃ),আপনি বিশেষভাবে বিবেচনা করে দেখুন।রাসূলেপাক(সাঃ) যার কথা বলেছেন তিনি অন্য কেউ হবেন"।হযরত উমর(রাঃ) বলেন,"আপনার হাতের যে চিহ্নের কথা রাসূলেপাক(সাঃ) বলে গেছেন,আমি সেই চিহ্ন দেখেছি"।হযরত ওয়ায়েস বলেন,"আগে রাসূলেপাক(সাঃ) এর খেরকাটি দিন,তারপর দোয়া করবো"।হযরত উমর(রাঃ) খেরকাটি প্রদান করলে ওয়ায়েস তা গ্রহন করে বলেন,"একটু অপেক্ষা করুন"।এ বলে তিনি সিজদায় গিয়ে বলেন,"হে আল্লাহ,যেহেতু রাসূলেপাক(সাঃ) এটি আমাকে দান করেছেন,যে পর্যন্ত উম্মতে মুহাম্মদিকে তুমি মাফ না করো,সে পর্যন্ত আমি পবিত্র খেরকা পরবো না।হযরত উমর(রাঃ) ও আলী(রাঃ) নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করেছেন।এখন কাজ বাকী আছে আমার।"।আওয়াজ হলো"তোমার দোয়ার উছিলায় কিছু সংখ্যক লোককে মাফ করবো"।হযরত ওয়ায়েস বলেন"যে পর্যন্ত সকলকে মাফ করা না হবে,সে পর্যন্ত তোমার এ হাবীবের খেরকা আমি পরিধান করবোনা।"আওয়াজ হলো,"কয়েক হাজার লোককে মাফ করা হবে"।ওয়ায়েস(রহঃ) সিজদায় থেকেই এভাবে আলাপচারিতায় রত ছিলেন।এমন সময় হযরত আলী মোরতাযা(রাঃ) তার সম্মুখে উপস্থিত হন।হযরত ওয়ায়েস জিজ্ঞেস করেন,"আপনারা এখানে কেন এসেছেন?যে পর্যন্ত সমস্ত উম্মতকে মাফ না করা হবে,সে পর্যন্ত খেরকা মোবারক আমি পরবোনা।আপনার এসে পড়াতে দোয়া সম্পন্ন করতে পারেনি"।হযরত উমর(রাঃ) ওয়ায়েসের পরনের জরাজীর্ন কম্বলের দিকে নজর করলেন এবং তাতে আঠারো হাজার আমলের ধনদৌলত দেখে এতই বিস্মিত  ও অবিভুত হলেন যে,খিলাফতের প্রতি তার ঘৃনা জন্মে।তিনি বলে উঠলেন,"এমন কেউ কি আছেন?যে একটুকরো রুটির বদলে এই অর্ধেক পৃথিবীর খিলাফত ক্রয় করবেন?"।হযরত ওয়ায়েস(রহঃ) বলেন,"যার বুদ্ধি নেই,একমাত্র সেই ব্যাক্তি তা ক্রয় করবে।দুরে ফেলে দিন,যার ইচ্ছা হয় কুড়িয়ে নিক।বেচাকিনার কি প্রয়োজন?"।তারপর ওয়ায়েস খেরকা মুবারক পরিধান করে বলেন,"হে আল্লাহ,এই খেরকা মোবারকের তোফায়েলে বনী রবীয়া ও মোযার সম্প্রদায় দুটির ছাগ সমূহের লোমরাশির অনুরুপ উম্মতি মুহাম্মদীকে আমার উপলক্ষে ক্ষমা করে দাও"।হযরত আলী(রাঃ) হযরত ওয়ায়েস(রহঃ) এর সব কথা শুনে বসে পড়েন।হযরত উমর(রাঃ) জিজ্ঞেস করেন,"হে ওয়ায়েস,আপনি কেন রাসূলেপাক(সাঃ) এর সাথে সাক্ষাও করেন না?"।তিনি উত্তরে বলেন,"আপনারা কি হযরত মুহাম্মদ(সাঃ) কে দেখেছেন?"।হযরত উমর "হা" বললে উত্তরে তিনি বলেন,"সম্ভবত আপনারা তার জুব্বা দেখেছেন।আচ্ছা,বলুন দেখি তার ভ্রু দুটি সংযুক্ত না পৃথক ছিল?"।আশ্চর্যের বিষয় এইযে,কেউ এ কথার সঠিক উত্তর প্রদান করতে পারলেননা।এর উত্তর হযরত ওয়ায়েস দিয়ে দিলেন,"রাসূলেপাক(সাঃ) এর ভ্রুদুটি জোড়াছিল"।এরপর হযরত ওয়ায়েস বলেন,"আপনারা কি হযরত মুহাম্মদ(সাঃ) এর বন্ধু সহচর?"।তারা উত্তরে "হা" বলেন।হযরত ওয়ায়েস বলেন,"যদি আপনারা প্রকৃত বন্ধুই হতে হতেন,তাহলে শত্রুরা যেদিন তার পবিত্র দাত ভেঙ্গে দেয়,সেদিন কেন আপনারা নিজেদের দাত ভেঙ্গে ফেললেন না?একি বন্ধুত্বের প্রকৃত পরিচয়?"।তিনি নিজের দাতগুলো তাদেরকে দেখালেন।তার সবকটি দাতই ভাঙ্গা ছিল।তিনি বলেন,"আমি রাসূলেপাক(সাঃ) কে চর্মচক্ষে না দেখে নিজের সবকটি দাত ভেঙ্গে ফেলেছি,কেননা;যখন আমি একটি দাত ভাংলাম,মনে সন্দেহ হলো,হযরত(সাঃ) এর হয়ত এই দাতটি নয় অন্য দাতটি ভেঙ্গেছে।এরূপ একে একে সমস্ত দাতই ভেঙ্গে ফেললাম"।এটি শুনে হযরত উমর(রাঃ) ,হযরত আলী(রাঃ) এর শরীর কেপে উঠলো।তারা বুজতে পারলেন,আল্লাহর রাসূলের প্রতি তার আশেকের প্রেমের অন্য রূপ।তখন তারা পরস্পর বলাবলি করতে লাগলেন,"ইনি রাসূলেপাক(সাঃ) কে সরাসরি দেখেননি,অথচ তার প্রতি কেমন প্রেম ও ভালবাসা"।হযরত উমর(রাঃ) বলেন,"আমার জন্য আপনি দোয়া করুন"।হযরত ওয়ায়েস(রহঃ) বলেন,"আমি প্রত্যেক নামাযের তাশাহুদে এই দুআই করি,"হে আল্লাহ,মুমিন নরনারীকে ক্ষমা করো।হে উমর(রাঃ),যদি আপনি কামেল অবস্থায় কবরে যেতে পারেন,তখন দোআ আপনাকে তালাশ করবে"।হযরত উমর(রাঃ) বলেন,"আমাকে আরো নসীয়ত করুন"।হযরত ওয়ায়েস বলেন,"হযরত উমর(রাঃ),আপনি কি আল্লাহকে চিনেছেন?"।হযরত উমর ফারুক(রাঃ) বলেন,"হা নিশ্চয়ই চিনেছি"।হযরত ওয়ায়েস বলেন,"যদি তাকে ব্যতিত অন্য কাউকে না জানেন(চিনেন),তাহলে সেটাই আপনার জন্য উত্তম"।হযরত উমর(রাঃ) বলেন," আরো কিছু নসীয়তের কথা বলুন"।হযরত ওয়ায়েস(রহঃ) বলেন,"আল্লাহ কি আপনাকে জানেন?"।হযরত ফারুকে আযম(রাঃ) বলেন,"হা জানেন"।হযরত ওয়ায়েস(রহঃ) বলেন,"যদি তিনি ছাড়া অন্য কেউ আপনাকে না জানে,তাও আপনার জন্য উত্তম।"(সহজ কথায়,তিনি ব্যতিত অন্য কেউ আপনাকে না চিনলেও কোন ক্ষতি নেই)।হযরত উমর(রাঃ) বলেন,"একটু অপেক্ষা করুন,আমি আপনার জন্য কিছু নিয়ে আসি,"হযরত ওয়ায়েস নিজের পকেট থেকে দুটি পয়সা বের করে বলেন,"আমি উট চরিয়ে যা উপার্জন করেছি,যদি আপনি এটা নিশ্চিত করে বলতে পারেন যে;এটা খরচ না করা পর্যন্ত আপনি জীবিত থাকবেন,তাহলে আপনি আরো গ্রহন করতে পারেন"।(অর্থাৎ হাতে এখন যা আছে তা শেষ না করা পর্যন্ত আর কিছু গ্রহন করা অনর্থক)।হযরত ওয়ায়েস তারপর বলেন,"অনেক কষ্ট পেয়েছেন,এখন ফিরে যেতে পারেন।কিয়ামত খুব কাছে,সেখানে পুনরায় আপনার সাথে সাক্ষাৎ হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।আমি এখন কিয়ামতের পাথেয় সংগ্রহে ব্যস্ত"।এ বলে হযরত ওয়ায়েস আল কারনী(রহঃ) তাদেরকে বিদায় দেন।হযরত উমর(রাঃ) ও হযরত আলী(রাঃ) বিদায় হলে হযরত ওয়ায়েসের ইজ্জত ও হুরমতের কথা চারদিকে প্রকাশ হয়ে পড়ে।তখন তিনি সেখান থেকে পালিয়ে কুফা গমন করেন।তারপর হারম ইবনে জাবাল(রাঃ) ব্যাতীত আর কেউ তার সাক্ষাত পাননি।হযরত ইবনে জাবান(রাঃ) বলেন,"যখন আমি হযরত ওয়ায়েসের কথা শুনলাম,তখন তাকে দেখার আকাঙ্খা প্রবল হলো।আমি কুফায় এসেই তার অনুসন্ধান করতে লাগলাম।হঠাৎ একদিন তাকে ফোরাত নদীতে অযু করতে ও কাপড় ধৌত করতে দেখলাম।পূর্বে তার যেসব লক্ষ্যনের কথা শুনেছিলাম,সে অনুসারে তাকে চিনে সালাম দিলাম।তিনি সালামের জবাব দিয়ে আমার দিকে চাইলেন।আমি তার হাতে হাত মিলাতে চাইলে তিনি হাত বাড়িয়ে দিলেননা।আমি বললাম "হযরত ওয়ায়েস!আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন ও আপনাকে ক্ষমা করুন"।হযরত ওয়ায়েসের প্রতি আমার বিশেষ শ্রদ্ধা ও ভালবাসার দরুন তার দীনতা দেখে আমি কেদে ফেললাম।হযরত ওয়ায়েস ও কেদে বলেন,"হে হারম ইবনে জাবান,আল্লাহ তোমার হায়াত দারাজ করুন।তুমি কি জন্যে এসেছো এবং কে তোমাকে আমার সন্ধান দিয়েছে?"।আমি বললাম,"আপনি আমার ও আমার পিতার নাম কিভাবে জানলেন?আপনিতো কখনো আমাকে দেখেননি।"তিনি উত্তরে বলেন,"যার জ্ঞানের অগোচরে কিছুই নেই,তিনিই আমাকে তোমার সন্ধান জানিয়েছেন,আমার রূহ তোমার রূহকে চিনেছে।কেননা কামেলদের রূহ আল্লাহপাকের সাথে সংযুক্ত থাকে"।এরপর আমি বললাম,"রাসূলেপাক(সাঃ) সম্পর্কে কিছু বলুন"।তিনি উত্তরে বলেন,"আমি ওনাকে সরাসরি দেখেনি।তার পবিত্রবানী অন্যদের কাছে শুনেছি মাত্র।আমি বক্তা,মুফতি বা মুহাদ্দিস হতে চাইনা।আমার অন্য কাজ আছে,সুতরাং আমি এই ব্যাপারে লিপ্ত হতে পারিনা"।তা শুনে আমি বললাম,"তাহলে একটু কোরআন পাঠ করুন,আমি শুনি"।উত্তরে একটি আয়াত পড়ে কাদতে লাগলেন।তারপর বলেন,"আল্লাহতাআলা বলেন,আমি জ্বীন ও মানব জাতিকে শুধু আমার ইবাদত করার জন্যই সৃষ্টি করেছি।আমি আসমান ও জমীন এবং তাদের মাঝে যা কিছু আছে সে সবকে খেলার বস্তু হিসেবে তৈরি করিনি।এদের উভয়টিকে সত্য ছাড়া অন্য কিছু সৃষ্টি করিনি।কিন্তু অধিকাংশ(মানুষ) তা জানেনা"।তারপর তিনি এমন জোরে চিৎকার করেন যে,আমি ভাবলাম তিনি বেহুশ হয়ে গেছেন।কিন্তু তিনি বলেন,"ওহে ইবনে জাবান,কিসে তোমাকে এখানে নিয়ে এসেছে?"।আমি বললাম,"আপনার বন্ধুত্ব ও সোহবতের শান্তি আমাকে এখানে টেনে এনেছে"।তিনি বলেন,"যে আল্লাহকে চিনেছে,সে ছাড়া আর কারো সাথে আল্লাহ ছাড়া বন্ধুত্ব  করে আরাম পেয়েছে বলে আমি জানিনা।যে ব্যাক্তি আল্লাহকে সত্যিকার অর্থে চিনেছে,সে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে কখনও সুখী হতে পারেনা"।প্রসঙ্গক্রমে আমি বললাম,"আমাকে কিছু উপদেশ প্রদান করুন"।তিন বলেন,"যখন নিদ্রা যাবে,তখন মৃত্যুকে শিয়রে রাখবে,আর জাগ্রত অবস্থায় মৃত্যুকে চোখের সামনে রাখবে।কোন গোনাহকে ছোট বলে মনে করোনা,বরং বড় বলে জানো।গুনাহকে ছোট মনে করাও(বড়) গুনাহ।যদি তুমি গুনাহকে ছোট বলে মনে করো,তাহলে তুমি যেন আল্লাহকে মিথ্যা বলে প্রতিপন্ন করলে"।"আচ্ছা আমি কোথায় বাস করবো?" জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন,"শাম(সিরিয়া) দেশে"।আবার প্রশ্ন করলাম,"সেখানে আমি কিভাবে জীবিকা নির্বাহ করবো?"।তিনি আফসোস করে বলেন,"যে হৃদয় এত সন্দেহপ্রবন,উপদেশ তার ফল হবেনা"।বললাম"আরো কিছু উপদেশ প্রদান করুন,"।তিনি বলেন,"হে ইবনে জাবান,'তোমার পিতার ইনতেকাল  হয়েছে,এমনকি রাসূলেপাক(সাঃ) এরো পবিত্র ওফাত হয়েছে।আমার ভ্রাতা হযরত উমর(রাঃ) ও ইনতেকাল করেছেন"।আমি বললাম,"আল্লাহতাআলা তার মৃত্যু সংবাদ আমাকে জানিয়েছেন"।এরপর বলেন,"এখন তুমি ও আমি মৃতদের দলভুক্ত"।হযরত ওয়ায়েস তারপর নামায পড়ে দুআ করে নসীয়ত স্বরুপ বলেন,"তুমি আল্লাহর কোরআন ও আউলিয়াগনের পথ অনুসরন করো।এক মুহুর্তের জন্য মৃত্যুর কথা বিস্মৃত হবেনা।যখন তুমি নিজ মাযহাবের কাছে যাবে,তখন তাদের এই উপদেশই দিবে।হে জাবানের পুত্র,আমি তোমার জন্য দোয়া করবো,তুমিও আমার জন্য দোয়া করবে।খাটি মুসলমানের যা কর্তব্য,তার বিপরীত কিছু করোনা,কারন তেমন কিছু করলে পথভ্রষ্ট হওয়ার ও জাহান্নামে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।এখন তুমি এপথে যাও,আর আমি এপথে যাই"।আমি তার সাথে কিছু দুর যেতে চাইলে নিজেও কাদলেন,আমাকেও কাদালেন।তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম।কাদতে কাদতে তিনি অদৃশ্য হয়ে গেলেন।বর্ননাকারী বলেন,"আমি একদিন হযরত ওয়ায়েসের সাক্ষাত লাভের আশায় তার খিদমতে হাজির হয়ে দেখলাম,তিনি ফযরের নামায পড়ছেন।নামায শেষে তাসবীহ পড়তে লাগলেন ও যোহরের সময় পর্যন্ত তা পড়লেন।যোহরের নামাজের পর থেকে আছর পর্যন্ত তাসবীহ পাঠ করে সে নামায ও শেষ করলেন।এভাবে তিনদিন পর্যন্ত কিছুই খেলেননা এবং শয়ন ও করলেননা।চতুর্থ রাত্রিতে দেখলাম,তিনি সামান্য কিছু সময় ঘুমালেন।ঘুম ভাঙ্গার পর মোনাজাত করতে লাগলেন,"ইলাহী তৃপ্তির ঘুম এবং পেট পুরে খাওয়ার ত্রুটি থেকে তোমার কাছে আমি আশ্রয় চাইছি।"এ বাক্য শুনে আমি অবাক হয়ে ফিরে এলাম"।উল্ল্যেখ রয়েছে যে,তিনি রাতে শুতেন না,এবং বলতেন,"এ রাত রুকুর জন্য,এ রাত সিজদার জন্য,এই রাত দাড়িয়ে থাকার জন্য"।এভাবে তিনি প্রতিটি রাত জেগে কাটিয়ে দিতেন।মানুষ তাকে জিজ্ঞেস করতেন,"হযরত ওয়ায়েস,কেমন আছেন?"উত্তরে তিনি বলতেন,"রাতে সিজদায় গিয়ে(সুবহানা রাব্বিয়াল আলা) বলতে না বলতেই প্রভাত হয়ে যায়,আমি ফেরেশতাদের মত ইবাদত করতে চাই,কিন্তু পারছিনা"।একদিন হযরত ওয়ায়েস কে জিজ্ঞেস করা হলো,"নামাযে একাগ্রতা কি রুপ?"প্রতি উত্তরে তিনি বলেন,"নামাযরত থাকা অবস্থায় নামাযিকে তীর মারলেও যদি বোধ না হয়,তাহলে সে একমনে নামায পড়ছে বলে মনে করতে হবে"।একব্যাক্তি জিজ্ঞেস করে,"কেমন আছেন?"।উত্তরে বলেন,"আচ্ছা বলুনতো,তার অবস্থা আবার কেমন-যে প্রাতে উঠে জানতে পারেনা যে,মৃত্যু সন্ধা পর্যন্ত তার অবকাশ দিবে কিনা?"।লোকটি আবার বললো,"তবুও বলুন কি অবস্থা?"।তিনি বলেন,"তিনি পথের সম্বলহীন এবং তার পথ ও সুদীর্ঘ"।একদিন ওয়ায়েস(রহঃ) কে লোকে জানালো,"কাছেই একব্যাক্তি ত্রিশ বছর যাবৎ কবরে বসে গলায় কাফন ঝুলিয়ে কান্নাকাটি করে দিনযাপন করছেন"।তিনি বলেন,"আমাকে সেই স্থানে নিয়ে চলো,আমি তাকে দেখবো"।তারা হযরত ওয়ায়েসকে তার কাছে নিয়ে গেলে তিনি দেখেন যে,সে লোকটি জীর্ন শীর্ন ও বিবর্ন হয়ে গেছেন এবং কাদতে কাদতে পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছেন।তখন তিনি বলেন,"হে ফালানা।কবর ও কাফন তোমাকে আল্লাহ থেকে সরিয়ে নিয়েছে।এ দুটিই তোমার গন্তব্যের পথে বাধা হয়ে দাড়িয়েছে"।হযরত ওয়ায়েসের কথায়,লোকটি নিজের ভুল বুজতে পেরে চিৎকার করে এবং সেই অবস্থায়ই কবরেই তার ইনতেকাল হয়।কোন এক সময় হযরত ওয়ায়েস(রহঃ) তিন দিন অনাহারে ছিলেন।চতুর্থদিন খাদ্যের সন্ধানে বের  হয়ে পথে একটি দীনার দেখতে পেলেন।কেউ তা হারিয়েছে ভেবে তিনি তা নিলেন না।অগত্যা শাক লতাপাতা আহার করবেন বলে ঠিক করলেন।ঠিক তখনই একটি ছাগ একটি গরম রুটি মুখে করে এনে তার সামনে রেখে দিল।রুটিখানি অন্যকারো ভেবে হযরত ওয়ায়েস তা গ্রহন করলেননা।ছাগটি তাকে সেটি গ্রহন করতে ইঙ্গিত করে বললো,"আপনি যে আল্লাহর বান্দা,আমি তারই বান্দা"।হযরত ওয়ায়েস রুটিখানা গ্রহন করা মাত্রই ছাগটি অদৃশ্য হয়ে গেল।বর্নিত আছে,বৃদ্ধ বয়সে তিনি হযরত আলী(রাঃ) এর সাথে সিফফীনের যুদ্ধে যোগদান করে সে যুদ্ধে শাহাদাত বরন করেন।বর্নিত আছে,হযরত ওয়ায়েস একব্যাক্তিকে নসীয়ত করে বলেন,"তুমি যদি আসমান ও যমীন পরিমান ইবাদত করো,কিন্তু আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি পূর্নাঙ্গ ঈমান না আনো,তাহলে তা কবুল হবেনা"।লোকটি জানতে চাইলো,"আচ্ছা কিভাবে আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি ইমান আনবো?"তিনি বলেন,"তোমার যা আছে তাতেই তুমি তুষ্ট এবং নিশ্চিন্ত থাকবে,যেন অন্যকোন বস্তুর প্রতি তুমি আকৃষ্ট না হও"।

কিতাবঃতাযকেরাতুল আউলিয়া।
লেখকঃহযরত শেখ ফরীদউদ্দীন আত্তার(রহঃ)।
1 টি পছন্দ 0 জনের অপছন্দ
করেছেন (2,327 পয়েন্ট)
হযরত ওয়ায়েস কারনী(রঃ) যিনি ছিলেন স্বনামধন্য এক তাবেয়ী। তিনি তখন ইয়েমেনে থাকতেন এবং তাঁর সাথে রাসূলপাক(সাঃ) এর কখনো দেখা হয়নি। রাসূলপাক(সাঃ) যখন দ্বীন ইসলাম প্রচারে নিজের জীবনের প্রতিটি ক্ষন-মুহুর্ত অতিবাহিত করছেন তখন এ মহান সাধক তাঁর হৃদয়-মন সর্বস্ব মহানবী(সাঃ) - এর আদর্শে সঁপে দিয়ে গভীর সাধনায় নিমগ্ন। মানুষ তাঁর খবর রাখেনি, কিন্ত রাসূলপাক(সাঃ) ঠিকই জানতেন। এটাইতো মহানবী(সাঃ) -এর মহিমা, তিনি বিশ্বনবী, তাঁর কাছে সবকিছুর খবর থাকাটা স্বাভাবিক। বিশ্বনবী(সাঃ) একদিন তাঁর সাহাবায়ে কেরামদের বলেছিলেন, “তোমরা জেনে রাখ, আমার এমন একজন ভক্ত আছেন, যিনি শেষ বিচারের দিনে রাবী ও মোজার গোত্রে ছাগপালের পশম সংখ্যাতুল্য আমার পাপী উম্মতের জন্য আল্লাহর কাছে সুপারিশ করবেন।” সবাই অবাক, কে এই সৌভাগ্যবান পুরুষ ? নবী করিম(সাঃ) জানালেন তিনি আল্লাহর একজন প্রিয় বান্দা, যাঁর নাম ওয়ায়েস কারনী। তিনি কি আপনাকে দেখেছেন ? - এই ছিল সাহাবায়ে কেরামের প্রশ্ন। না, চর্মচক্ষু দিয়ে দেখেননি; তবে দেখেছেন নয়ন দিয়ে। তিনি যদি আপনার এতই গুণ মুগ্ধ তবে আপনার সমীপে উপস্থিত হন না কেন ? আল্লাহর নবী বললেন, দুটো কারণে। প্রথমত, আল্লাহ ও আল্লাহর নবীর প্রেমে তিনি এমনই বিভোর যে, তাঁর কোথাও যাওয়ার অবস্থা নেই। দ্বিতীয়ত, বাড়ীতে থাকা বৃদ্ধা অন্ধ মায়ের দেখভাল করার জন্য তাঁকে সেখানে থাকতে হয় এবং জীবিকার তাগিদে উটও চরাতে হয়। সাহাবীরা এই মহান ব্যাক্তিকে দেখার ইচ্ছে জানালে মহানবী(সাঃ) জানালেন হযরত উমর (রাঃ) ও হযরত আলী (রাঃ) ছাড়া আর কারো সঙ্গে তাঁর দেখা হবে না। অতঃপর তিনি ওয়ায়েস কারনী (রঃ) -এর দৈহিক বর্ণনা দিলেন, তাঁর সারা দেহ বড় বড় লোমে ঢাকা এবং দু'হাতের বাম দিকে একটা করে সাদা দাগ আছে যা শ্বেতী নয়। আসন্ন মৃত্যুর প্রাক্কালে রাসূল(সাঃ) তাঁর সর্বক্ষণের সঙ্গী হযরত উমর (রাঃ) ও হযরত আলী (রাঃ) কে বললেন- আমার মৃত্যুর পর আমার খেরকা ওয়ায়েস কারনীকে দেবে। তাঁকে আমার সালাম জানিয়ে বলবে তিনি যেন আমার গুনাহগার উম্মতের জন্য দোয়া করেন। নবীজির এ আদেশ যথাসময়ে পালিত হয়। হযরত ওমর (রাঃ)- এর শাসনকাল, একদিন হযরত আলী (রাঃ) কে সাথে নিয়ে মহানবী (সাঃ) -এর নির্দেশ পালনের জন্য বেরিয়ে পড়লেন কুফার পথে । কুফার মসজিদে খুতবা পাঠকালে হযরত ওমর (রাঃ) উপস্থিত লোকদের কাছে জানতে চাইলেন ওয়ায়েস কারনী সম্পর্কে । লোকজন তেমন তথ্য দিতে পারল না । জানা গেল ওয়ায়েস কারনী লোকালয় ছেড়ে জনবিরল এলাকায় বাস করে, মাঠে উট চরায়, দিনের শেষে শুকনো রুটি খায় । লোকে যখন হাসে, সে তখন কাঁদে । আবার লোক যখন কাঁদে, সে তখন হাসে । খাপছাড়া টাইপের মানুষ । এ সংবাদের উপর ভিত্তি করে দুই খলীফা কারন এলাকায় গেলেন । ওয়ায়েস তখন নামায পড়ছিলেন, মাঠে তাঁর উটের পাল চরছিল যার দেখাশোনা করছিল আল্লাহর ফেরেশতারা । নামায শেষে তিনি অতিথিদের সালাম দিলেন । হযরত ওমর (রাঃ) তাঁর নাম জানতে চাইলে তিনি জানালেন আব্দুল্লাহ । আসল নাম জানতে চাইলে তিনি জানালেন ওয়ায়েস । হযরত ওমর (রাঃ) তাঁর হাত পরীক্ষা করে রাসূলপাক (সাঃ) - এর বর্ণনার সাথে মিল খুঁজে পেলেন । তিনি ওয়ায়েস কারনী (রঃ) - এর হাতে চুমো খেলেন । তারপর তাঁর হাতে তুলে দেয়া হল রাসূলুল্লাহ (সাঃ) - এ পবিত্র খেরকা । আর তিনি যেন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) - এর উম্মতের জন্য দোয়া করেন সে কথাও তাঁর কাছে নিবেদন করা হল । কিন্তু ওয়ায়েস (রঃ) বললেন, আপনারা ভাল করে খোঁজ নিন । সম্ভবতঃ তিনি অন্য কারো কথা বলেছেন । তখন ওমর (রাঃ) জানালেন তাঁরা ভালো করে খবর নিয়ে নিশ্চিত হয়েছেন তিনিই রাসূলপাক (সাঃ) -এর পরম প্রিয় ওয়ায়েস কারনী (রঃ) । এতক্ষণে ওয়ায়েস আগন্তুকদের পরিচয় জানতে চাইলেন । পরিচয় পেয়ে তাঁদের হাতে চুমো খেলেন, বললেন নবীজির গুনাহগার উম্মতের মুক্তির জন্য দোয়া করার যোগ্যতা তাঁদেরই বেশী । ওমর (রাঃ) বললেন, আমরা তা করছি । আপনিও রাসূলুল্লাহ (সাঃ) - এর নির্দেশ পালন করুন । মহানবী (সাঃ) - এর পবিত্র খেরকাটি নিয়ে ওয়ায়েস কারনী (রঃ) সেজদায় লুটিয়ে পড়লেন । তিনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা জানালেন, প্রভূ গো ! রাসূলুল্লাহর উম্মতদের গুনাহ মাফ না করলে আমি খেরকা পরব না । নবী মুস্তফা (সাঃ) হযরত ওমর ও হযরত আলীর প্রতি যে দায়িত্ব ন্যস্ত করেছিলেন তা তাঁরা পালন করেছেন, এখন আপনার কাজ বাকী । আপনি আপনার প্রিয় বন্ধুর উম্মতের পাপ মাফ করে দিন । দৈববাণী হল, হে ওয়ায়েস ! তোমার দোয়ার কারণে কিছু সংখ্যক উম্মতকে মাফ করা হল । কিন্তু তিনি শুনলেন না । বললেন, যতক্ষণ না সমস্ত উম্মতকে মাফ করা না হয় ততক্ষণ আমি নবীজির দেওয়া খেরকা পরব না । ইলহাম এল- তোমার দোয়ার জন্য কয়েক হাজার মানুষকে মার্জনা করা হবে । তখন সেখানে হযরত ওমর (রাঃ) উপস্থিত হলেন । তাঁকে দেখে তিনি বললেন যতক্ষণ পর্যন্ত সকল উম্মতকে মাফ করাতে না পারছি সে পর্যন্ত আমি রাসূলপাক (সাঃ) - এর খেরকা গায়ে তুলব না । ছিন্ন বস্ত্র পরিহিত এ মানুষটির অন্তর্জোতি দেখে হযরত ওমর (রাঃ) অভিভূত হয়ে পড়লেন । তাঁর কাছে খিলাফত তুচ্ছ মনে হল । তিনি বললেন, এমন কেউ আছ যে, একখানি রুটির বিনিময়ে খেলাফতের দায়িত্ব নিতে পার ? তাঁর এই স্বগতোক্তি শুনে ওয়ায়েস (রঃ) বললেন, যে বোকা সেই তা নেবে । মন না চাইলে ছুঁড়ে ফেলুন, যার মন চায় সে কুড়িয়ে নেবে । এই কথা বলে তিনি রাসূলপাক (সাঃ) -এর প্রদত্ত পোশাক পরম ভক্তিভরে পরলেন । তারপর বললেন, আল্লাহ এ অধমের প্রার্থনায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, রাবী ও মোজার কবিলার ছাগ লোমের তুল্য নবীজীর উম্মতকে মার্জনা করবেন । হযরত ওমর (রাঃ) ও হযরত আলী (রাঃ) এ কথা শুনে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেলেন । কিছুক্ষণ পরে ওমর (রাঃ) জানতে চাইলেন কেন তিনি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) - এর সাথে সাক্ষাত করেননি । তিনি এ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে উলটো প্রশ্ন করলেন, আপনারা তো তাঁকে দেখেছেন; বলুন তো তাঁর পবিত্র ভুরু দুটো জোড়া ছিল, না আলাদা ? প্রশ্ন শুনে তাঁরা অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন । আশ্চর্যের কথা , তাঁরা কেউই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলেন না । ওয়ায়েস কারনী (রঃ) জানালেন ওহোদের যুদ্ধে রাসূলপাক (সাঃ) -এর পবিত্র দাঁত শহীদের খবর শুনে তিনি নিজের সকল দাঁত ভেঙে ফেলেছেন । কারন তিনি জানতেন না রাসূলুল্লাহ (সাঃ)- এর কোন দাঁত শহীদ হয়েছে । হযরত ওমর (রাঃ) তাঁকে কিছু দিতে চাইলেন । তখন ওয়ায়েস কারনী (রঃ) জামার পকেট থেকে দুটো পয়সা বের করে বললেন, আমি উট চরিয়ে এ পয়সা রোজগার করেছি । আপনি যদি বলতে পারেন এ পয়সা খরচ করার পরেও আমি বেঁচে থাকব তাহলে আমার কিছু জিনিষের প্রয়োজন হবে । তারমানে, জীবন কখন ফুরায় কেউ জানে না । সুতরাং কোন কিছু সঞ্চয়ের প্রশ্ন আসে না । এরপর তিনি অতিথিদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিলেন এবং বললেন কিয়ামতের দিন তাঁদের সাথে আবার দেখা হবে । তাঁদের বিদায় জানিয়ে তিনি নিজেও সেখান থেকে চলে গেলেন । এরপর ওয়ায়েস কারনী (রঃ) - এর নাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে । এরপর তিনি ঐ এলাকা ছেড়ে কুফায় চলে যান । শোনা যায় হারম ইবনে জামান ছাড়া আর কারো সাথে তাঁর দেখা হয়নি ।
করেছেন (182 পয়েন্ট)

অসাধারন বলেছেন,আমি আরো কিছু তথ্য দিতে চাই।

হযরত ওয়ায়েস আল কারনী(রহঃ) এর জীবনীঃ
হযরত ওয়ায়েস আল কারনী(রহঃ) একজন তাবেঈ ছিলেন।রাসূলেপাক(সাঃ) বলেছেন"ওয়ায়েস আল কারনী তাবেঈদের মধ্যে উত্তম"।একদিন রাসূলেপাক(সাঃ) বলেন"আমি বাস্তবিক আল্লাহতাআলার রহমতের সুগন্ধযুক্ত হাওয়া ইয়ামেনের থেকে পাচ্ছি"।রাসূলেপাক(সাঃ) আরো বলেন"কিয়ামতের দিন আল্লাহতাআলা সত্তর হাজার ফেরেশতাকে ওয়ায়েস আল কারনীর অনুরুপ চেহারা দিয়ে সৃষ্টি করবেন।হযরত ওয়ায়েস এ সকল ফেরেশতা দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে হাশরের ময়দানে উপস্থিত হবেন।তিনি দুনিয়াতে নির্জন স্থানে এবং লোকালয় থেকে দূরে থেকে ইবাদত বন্দেগী করতে ভালবাসতেন ও নিজেকে গোপন রাখতে চেষ্টা করতেন।তাই কিয়ামতের দিন আল্লাহতাআলা তাকে 'সিদক' স্থানে রাখবেন।"।আল্লাহতাআলা বলেন"আউলিয়াগন আমার মিনারের নিচে,তাদেরকে আমি ছাড়া কেউ চিনতে পারেনা"।একদিন রাসূলেপাক(সাঃ) সাহাবাগনকে বলেন"আমার উম্মতের মধ্যে এমন এক ব্যাক্তি আছেন,রাবীয়া ও মোযার সম্প্রদায়ের ছাগপালের পশমের পরিমান গোনাহগারের জন্য তিনি সুপারিশ করবেন।"সেকালে দুটি সম্প্রদায়ের ছাগল দুনিয়ায় সুপ্রসিদ্ধ ছিল।সাহাবাগন জিজ্ঞেস করলেন"ইয়া রাসূল(সাঃ),তিনি কি আপনাকে দেখেছেন?"উত্তরে হযরত(সাঃ) বলেন" তিনি প্রত্যক্ষভাবে আমাকে দেখেননি বটে,কিন্তু অন্তরের চোখে আমাকে দেখেছেন"।সাহাবাগন আরজ করলেন" ইয়া রাসূল(সাঃ),আপনার আশেক হলে তিনি কেন আপনার খেদমতে আসেননা?"।রাসূলেপাক(সাঃ) উত্তরে বলেন,"তিনি দুটি কারনে আসতে অক্ষম।প্রথমত তিনি আল্লাহর ইশকে এবং তার রাসূলের(সাঃ) এর প্রতি ভক্তিতে মশগুল থাকেন।দ্বিতীয়ত শরীয়তের হুকুম একমনে পালন করেন।তার মা অন্ধ,হাতপা অচল।মাতার ভরনপোষনের ভার ওয়ায়েস কারনীর উপর।উট চরিয়ে তিনি নিজের ও মায়ের ভরনপোষনের ব্যবস্থা করেন"।অতঃপর রাসূলেপাক(সাঃ) বলেন,"আমি তাকে দেখবনা।হযরত আবু বকর ছিদ্দিক(রাঃ) কে লক্ষ্য করে বলেন"তুমিও তাকে জীবনকালে দেখবেনা,কিন্তু উমর(রাঃ) ওয়ায়েস কারনীকে দেখবেন"।রাসূলেপাক(সাঃ) পবিত্র ওফাতের সময় হযরত উমর(রাঃ) ও হযরত আলী(রাঃ) কে বলেন" তোমরা আমার ওফাতের পর আমার খেরকা ওয়ায়েস কারনীকে দিয়ে তাকে আমার সালাম পৌছাবে"।রাসূলেপাক(সাঃ) এর  পবিত্র ওফাতের অনেক পরে হযরত উমর(রাঃ)  এর খিলাফতের সময় হযরত উমর(রাঃ) ও হযরত আলী(রাঃ) কুফায় গিয়ে খুৎবার মধ্যে সমবেত লোকদের উদ্দেশ্যে বলেন,"হে কুফাবাসীগন ,তোমরা ওয়ায়েস কারনীর সন্ধান দিতে পারো?"।তারা উত্তরে বললেন,"সে একজন পাগল,লোকালয়ে বাস করেনা,জঙ্গলে উট চরিয়ে থাকে।দিনশেষে একবার শুকনা রুটি আহার করে।মানুষ যখন হাসে,সে তখন কাদে,মানুষ কাদলে সে হাসে"।এরপর হযরত উমর(রাঃ) ও হযরত আলী(রাঃ) একটি নির্জন স্থানের দিকে রওনা হয়ে তারা সেখানে গিয়ে তাকে প্রথমে নামাজরত দেখেন।তিনি লোক আগমনের শব্দে নামাজ সংক্ষেপ করে সাহাবাগনকে সালাম করেন।হযরত উমর(রাঃ) সালামের জবাব দিয়ে তার নাম জিজ্ঞেস করলে উত্তরে তিনি বলেন"আবদুল্লাহ(আল্লাহর বান্দা)"।তখন হযরত উমর(রাঃ) বলেন,"আমরা সবাই আল্লাহর বান্দা।আপনার মা আপনাকে কি বলে ডাকে?"।উত্তরে তিনি বলেন,"ওয়ায়েস"।হযরত উমর(রাঃ) বলেন,"আপনার ডান হাতখানা দেখান"।ওয়ায়েস নিজের ডানহাতখানা দেখালে রাসূলেপাক(সাঃ) এর নসীয়ত অনুযায়ী তার ডান হাতে সাদা চিহ্ন দেখতে পেয়ে হযরত উমর(রাঃ) তার হাতে চুমো খেয়ে বলেন,"রাসূলেপাক(সাঃ) আপনাকে সালাম জানিয়েছেন এবং নিজ খেরকা মুবারক আপনাকেই দান করেছেন এবঃ তার উম্মতের জন্য দোয়া করতে বলে গিয়েছেন।"।হযরত ওয়ায়েস বললেন,"দোয়ার জন্যতো আপনারাই সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ এবং উপযুক্ত।"হযরত উমর(রাঃ) বলেন,"আমরা তা করেছি।কিন্তু আপনি রাসূলেপাক(সাঃ) এর নির্দেশ পালন করুন"।হযরত ওয়ায়েস বলেন,"হযরত উমর(রাঃ),আপনি বিশেষভাবে বিবেচনা করে দেখুন।রাসূলেপাক(সাঃ) যার কথা বলেছেন তিনি অন্য কেউ হবেন"।হযরত উমর(রাঃ) বলেন,"আপনার হাতের যে চিহ্নের কথা রাসূলেপাক(সাঃ) বলে গেছেন,আমি সেই চিহ্ন দেখেছি"।হযরত ওয়ায়েস বলেন,"আগে রাসূলেপাক(সাঃ) এর খেরকাটি দিন,তারপর দোয়া করবো"।হযরত উমর(রাঃ) খেরকাটি প্রদান করলে ওয়ায়েস তা গ্রহন করে বলেন,"একটু অপেক্ষা করুন"।এ বলে তিনি সিজদায় গিয়ে বলেন,"হে আল্লাহ,যেহেতু রাসূলেপাক(সাঃ) এটি আমাকে দান করেছেন,যে পর্যন্ত উম্মতে মুহাম্মদিকে তুমি মাফ না করো,সে পর্যন্ত আমি পবিত্র খেরকা পরবো না।হযরত উমর(রাঃ) ও আলী(রাঃ) নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করেছেন।এখন কাজ বাকী আছে আমার।"।আওয়াজ হলো"তোমার দোয়ার উছিলায় কিছু সংখ্যক লোককে মাফ করবো"।হযরত ওয়ায়েস বলেন"যে পর্যন্ত সকলকে মাফ করা না হবে,সে পর্যন্ত তোমার এ হাবীবের খেরকা আমি পরিধান করবোনা।"আওয়াজ হলো,"কয়েক হাজার লোককে মাফ করা হবে"।ওয়ায়েস(রহঃ) সিজদায় থেকেই এভাবে আলাপচারিতায় রত ছিলেন।এমন সময় হযরত আলী মোরতাযা(রাঃ) তার সম্মুখে উপস্থিত হন।হযরত ওয়ায়েস জিজ্ঞেস করেন,"আপনারা এখানে কেন এসেছেন?যে পর্যন্ত সমস্ত উম্মতকে মাফ না করা হবে,সে পর্যন্ত খেরকা মোবারক আমি পরবোনা।আপনার এসে পড়াতে দোয়া সম্পন্ন করতে পারেনি"।হযরত উমর(রাঃ) ওয়ায়েসের পরনের জরাজীর্ন কম্বলের দিকে নজর করলেন এবং তাতে আঠারো হাজার আমলের ধনদৌলত দেখে এতই বিস্মিত  ও অবিভুত হলেন যে,খিলাফতের প্রতি তার ঘৃনা জন্মে।তিনি বলে উঠলেন,"এমন কেউ কি আছেন?যে একটুকরো রুটির বদলে এই অর্ধেক পৃথিবীর খিলাফত ক্রয় করবেন?"।হযরত ওয়ায়েস(রহঃ) বলেন,"যার বুদ্ধি নেই,একমাত্র সেই ব্যাক্তি তা ক্রয় করবে।দুরে ফেলে দিন,যার ইচ্ছা হয় কুড়িয়ে নিক।বেচাকিনার কি প্রয়োজন?"।তারপর ওয়ায়েস খেরকা মুবারক পরিধান করে বলেন,"হে আল্লাহ,এই খেরকা মোবারকের তোফায়েলে বনী রবীয়া ও মোযার সম্প্রদায় দুটির ছাগ সমূহের লোমরাশির অনুরুপ উম্মতি মুহাম্মদীকে আমার উপলক্ষে ক্ষমা করে দাও"।হযরত আলী(রাঃ) হযরত ওয়ায়েস(রহঃ) এর সব কথা শুনে বসে পড়েন।হযরত উমর(রাঃ) জিজ্ঞেস করেন,"হে ওয়ায়েস,আপনি কেন রাসূলেপাক(সাঃ) এর সাথে সাক্ষাও করেন না?"।তিনি উত্তরে বলেন,"আপনারা কি হযরত মুহাম্মদ(সাঃ) কে দেখেছেন?"।হযরত উমর "হা" বললে উত্তরে তিনি বলেন,"সম্ভবত আপনারা তার জুব্বা দেখেছেন।আচ্ছা,বলুন দেখি তার ভ্রু দুটি সংযুক্ত না পৃথক ছিল?"।আশ্চর্যের বিষয় এইযে,কেউ এ কথার সঠিক উত্তর প্রদান করতে পারলেননা।এর উত্তর হযরত ওয়ায়েস দিয়ে দিলেন,"রাসূলেপাক(সাঃ) এর ভ্রুদুটি জোড়াছিল"।এরপর হযরত ওয়ায়েস বলেন,"আপনারা কি হযরত মুহাম্মদ(সাঃ) এর বন্ধু সহচর?"।তারা উত্তরে "হা" বলেন।হযরত ওয়ায়েস বলেন,"যদি আপনারা প্রকৃত বন্ধুই হতে হতেন,তাহলে শত্রুরা যেদিন তার পবিত্র দাত ভেঙ্গে দেয়,সেদিন কেন আপনারা নিজেদের দাত ভেঙ্গে ফেললেন না?একি বন্ধুত্বের প্রকৃত পরিচয়?"।তিনি নিজের দাতগুলো তাদেরকে দেখালেন।তার সবকটি দাতই ভাঙ্গা ছিল।তিনি বলেন,"আমি রাসূলেপাক(সাঃ) কে চর্মচক্ষে না দেখে নিজের সবকটি দাত ভেঙ্গে ফেলেছি,কেননা;যখন আমি একটি দাত ভাংলাম,মনে সন্দেহ হলো,হযরত(সাঃ) এর হয়ত এই দাতটি নয় অন্য দাতটি ভেঙ্গেছে।এরূপ একে একে সমস্ত দাতই ভেঙ্গে ফেললাম"।এটি শুনে হযরত উমর(রাঃ) ,হযরত আলী(রাঃ) এর শরীর কেপে উঠলো।তারা বুজতে পারলেন,আল্লাহর রাসূলের প্রতি তার আশেকের প্রেমের অন্য রূপ।তখন তারা পরস্পর বলাবলি করতে লাগলেন,"ইনি রাসূলেপাক(সাঃ) কে সরাসরি দেখেননি,অথচ তার প্রতি কেমন প্রেম ও ভালবাসা"।হযরত উমর(রাঃ) বলেন,"আমার জন্য আপনি দোয়া করুন"।হযরত ওয়ায়েস(রহঃ) বলেন,"আমি প্রত্যেক নামাযের তাশাহুদে এই দুআই করি,"হে আল্লাহ,মুমিন নরনারীকে ক্ষমা করো।হে উমর(রাঃ),যদি আপনি কামেল অবস্থায় কবরে যেতে পারেন,তখন দোআ আপনাকে তালাশ করবে"।হযরত উমর(রাঃ) বলেন,"আমাকে আরো নসীয়ত করুন"।হযরত ওয়ায়েস বলেন,"হযরত উমর(রাঃ),আপনি কি আল্লাহকে চিনেছেন?"।হযরত উমর ফারুক(রাঃ) বলেন,"হা নিশ্চয়ই চিনেছি"।হযরত ওয়ায়েস বলেন,"যদি তাকে ব্যতিত অন্য কাউকে না জানেন(চিনেন),তাহলে সেটাই আপনার জন্য উত্তম"।হযরত উমর(রাঃ) বলেন," আরো কিছু নসীয়তের কথা বলুন"।হযরত ওয়ায়েস(রহঃ) বলেন,"আল্লাহ কি আপনাকে জানেন?"।হযরত ফারুকে আযম(রাঃ) বলেন,"হা জানেন"।হযরত ওয়ায়েস(রহঃ) বলেন,"যদি তিনি ছাড়া অন্য কেউ আপনাকে না জানে,তাও আপনার জন্য উত্তম।"(সহজ কথায়,তিনি ব্যতিত অন্য কেউ আপনাকে না চিনলেও কোন ক্ষতি নেই)।হযরত উমর(রাঃ) বলেন,"একটু অপেক্ষা করুন,আমি আপনার জন্য কিছু নিয়ে আসি,"হযরত ওয়ায়েস নিজের পকেট থেকে দুটি পয়সা বের করে বলেন,"আমি উট চরিয়ে যা উপার্জন করেছি,যদি আপনি এটা নিশ্চিত করে বলতে পারেন যে;এটা খরচ না করা পর্যন্ত আপনি জীবিত থাকবেন,তাহলে আপনি আরো গ্রহন করতে পারেন"।(অর্থাৎ হাতে এখন যা আছে তা শেষ না করা পর্যন্ত আর কিছু গ্রহন করা অনর্থক)।হযরত ওয়ায়েস তারপর বলেন,"অনেক কষ্ট পেয়েছেন,এখন ফিরে যেতে পারেন।কিয়ামত খুব কাছে,সেখানে পুনরায় আপনার সাথে সাক্ষাৎ হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।আমি এখন কিয়ামতের পাথেয় সংগ্রহে ব্যস্ত"।এ বলে হযরত ওয়ায়েস আল কারনী(রহঃ) তাদেরকে বিদায় দেন।হযরত উমর(রাঃ) ও হযরত আলী(রাঃ) বিদায় হলে হযরত ওয়ায়েসের ইজ্জত ও হুরমতের কথা চারদিকে প্রকাশ হয়ে পড়ে।তখন তিনি সেখান থেকে পালিয়ে কুফা গমন করেন।তারপর হারম ইবনে জাবাল(রাঃ) ব্যাতীত আর কেউ তার সাক্ষাত পাননি।হযরত ইবনে জাবান(রাঃ) বলেন,"যখন আমি হযরত ওয়ায়েসের কথা শুনলাম,তখন তাকে দেখার আকাঙ্খা প্রবল হলো।আমি কুফায় এসেই তার অনুসন্ধান করতে লাগলাম।হঠাৎ একদিন তাকে ফোরাত নদীতে অযু করতে ও কাপড় ধৌত করতে দেখলাম।পূর্বে তার যেসব লক্ষ্যনের কথা শুনেছিলাম,সে অনুসারে তাকে চিনে সালাম দিলাম।তিনি সালামের জবাব দিয়ে আমার দিকে চাইলেন।আমি তার হাতে হাত মিলাতে চাইলে তিনি হাত বাড়িয়ে দিলেননা।আমি বললাম "হযরত ওয়ায়েস!আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন ও আপনাকে ক্ষমা করুন"।হযরত ওয়ায়েসের প্রতি আমার বিশেষ শ্রদ্ধা ও ভালবাসার দরুন তার দীনতা দেখে আমি কেদে ফেললাম।হযরত ওয়ায়েস ও কেদে বলেন,"হে হারম ইবনে জাবান,আল্লাহ তোমার হায়াত দারাজ করুন।তুমি কি জন্যে এসেছো এবং কে তোমাকে আমার সন্ধান দিয়েছে?"।আমি বললাম,"আপনি আমার ও আমার পিতার নাম কিভাবে জানলেন?আপনিতো কখনো আমাকে দেখেননি।"তিনি উত্তরে বলেন,"যার জ্ঞানের অগোচরে কিছুই নেই,তিনিই আমাকে তোমার সন্ধান জানিয়েছেন,আমার রূহ তোমার রূহকে চিনেছে।কেননা কামেলদের রূহ আল্লাহপাকের সাথে সংযুক্ত থাকে"।এরপর আমি বললাম,"রাসূলেপাক(সাঃ) সম্পর্কে কিছু বলুন"।তিনি উত্তরে বলেন,"আমি ওনাকে সরাসরি দেখেনি।তার পবিত্রবানী অন্যদের কাছে শুনেছি মাত্র।আমি বক্তা,মুফতি বা মুহাদ্দিস হতে চাইনা।আমার অন্য কাজ আছে,সুতরাং আমি এই ব্যাপারে লিপ্ত হতে পারিনা"।তা শুনে আমি বললাম,"তাহলে একটু কোরআন পাঠ করুন,আমি শুনি"।উত্তরে একটি আয়াত পড়ে কাদতে লাগলেন।তারপর বলেন,"আল্লাহতাআলা বলেন,আমি জ্বীন ও মানব জাতিকে শুধু আমার ইবাদত করার জন্যই সৃষ্টি করেছি।আমি আসমান ও জমীন এবং তাদের মাঝে যা কিছু আছে সে সবকে খেলার বস্তু হিসেবে তৈরি করিনি।এদের উভয়টিকে সত্য ছাড়া অন্য কিছু সৃষ্টি করিনি।কিন্তু অধিকাংশ(মানুষ) তা জানেনা"।তারপর তিনি এমন জোরে চিৎকার করেন যে,আমি ভাবলাম তিনি বেহুশ হয়ে গেছেন।কিন্তু তিনি বলেন,"ওহে ইবনে জাবান,কিসে তোমাকে এখানে নিয়ে এসেছে?"।আমি বললাম,"আপনার বন্ধুত্ব ও সোহবতের শান্তি আমাকে এখানে টেনে এনেছে"।তিনি বলেন,"যে আল্লাহকে চিনেছে,সে ছাড়া আর কারো সাথে আল্লাহ ছাড়া বন্ধুত্ব  করে আরাম পেয়েছে বলে আমি জানিনা।যে ব্যাক্তি আল্লাহকে সত্যিকার অর্থে চিনেছে,সে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে কখনও সুখী হতে পারেনা"।প্রসঙ্গক্রমে আমি বললাম,"আমাকে কিছু উপদেশ প্রদান করুন"।তিন বলেন,"যখন নিদ্রা যাবে,তখন মৃত্যুকে শিয়রে রাখবে,আর জাগ্রত অবস্থায় মৃত্যুকে চোখের সামনে রাখবে।কোন গোনাহকে ছোট বলে মনে করোনা,বরং বড় বলে জানো।গুনাহকে ছোট মনে করাও(বড়) গুনাহ।যদি তুমি গুনাহকে ছোট বলে মনে করো,তাহলে তুমি যেন আল্লাহকে মিথ্যা বলে প্রতিপন্ন করলে"।"আচ্ছা আমি কোথায় বাস করবো?" জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন,"শাম(সিরিয়া) দেশে"।আবার প্রশ্ন করলাম,"সেখানে আমি কিভাবে জীবিকা নির্বাহ করবো?"।তিনি আফসোস করে বলেন,"যে হৃদয় এত সন্দেহপ্রবন,উপদেশ তার ফল হবেনা"।বললাম"আরো কিছু উপদেশ প্রদান করুন,"।তিনি বলেন,"হে ইবনে জাবান,'তোমার পিতার ইনতেকাল  হয়েছে,এমনকি রাসূলেপাক(সাঃ) এরো পবিত্র ওফাত হয়েছে।আমার ভ্রাতা হযরত উমর(রাঃ) ও ইনতেকাল করেছেন"।আমি বললাম,"আল্লাহতাআলা তার মৃত্যু সংবাদ আমাকে জানিয়েছেন"।এরপর বলেন,"এখন তুমি ও আমি মৃতদের দলভুক্ত"।হযরত ওয়ায়েস তারপর নামায পড়ে দুআ করে নসীয়ত স্বরুপ বলেন,"তুমি আল্লাহর কোরআন ও আউলিয়াগনের পথ অনুসরন করো।এক মুহুর্তের জন্য মৃত্যুর কথা বিস্মৃত হবেনা।যখন তুমি নিজ মাযহাবের কাছে যাবে,তখন তাদের এই উপদেশই দিবে।হে জাবানের পুত্র,আমি তোমার জন্য দোয়া করবো,তুমিও আমার জন্য দোয়া করবে।খাটি মুসলমানের যা কর্তব্য,তার বিপরীত কিছু করোনা,কারন তেমন কিছু করলে পথভ্রষ্ট হওয়ার ও জাহান্নামে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।এখন তুমি এপথে যাও,আর আমি এপথে যাই"।আমি তার সাথে কিছু দুর যেতে চাইলে নিজেও কাদলেন,আমাকেও কাদালেন।তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম।কাদতে কাদতে তিনি অদৃশ্য হয়ে গেলেন।বর্ননাকারী বলেন,"আমি একদিন হযরত ওয়ায়েসের সাক্ষাত লাভের আশায় তার খিদমতে হাজির হয়ে দেখলাম,তিনি ফযরের নামায পড়ছেন।নামায শেষে তাসবীহ পড়তে লাগলেন ও যোহরের সময় পর্যন্ত তা পড়লেন।যোহরের নামাজের পর থেকে আছর পর্যন্ত তাসবীহ পাঠ করে সে নামায ও শেষ করলেন।এভাবে তিনদিন পর্যন্ত কিছুই খেলেননা এবং শয়ন ও করলেননা।চতুর্থ রাত্রিতে দেখলাম,তিনি সামান্য কিছু সময় ঘুমালেন।ঘুম ভাঙ্গার পর মোনাজাত করতে লাগলেন,"ইলাহী তৃপ্তির ঘুম এবং পেট পুরে খাওয়ার ত্রুটি থেকে তোমার কাছে আমি আশ্রয় চাইছি।"এ বাক্য শুনে আমি অবাক হয়ে ফিরে এলাম"।উল্ল্যেখ রয়েছে যে,তিনি রাতে শুতেন না,এবং বলতেন,"এ রাত রুকুর জন্য,এ রাত সিজদার জন্য,এই রাত দাড়িয়ে থাকার জন্য"।এভাবে তিনি প্রতিটি রাত জেগে কাটিয়ে দিতেন।মানুষ তাকে জিজ্ঞেস করতেন,"হযরত ওয়ায়েস,কেমন আছেন?"উত্তরে তিনি বলতেন,"রাতে সিজদায় গিয়ে(সুবহানা রাব্বিয়াল আলা) বলতে না বলতেই প্রভাত হয়ে যায়,আমি ফেরেশতাদের মত ইবাদত করতে চাই,কিন্তু পারছিনা"।একদিন হযরত ওয়ায়েস কে জিজ্ঞেস করা হলো,"নামাযে একাগ্রতা কি রুপ?"প্রতি উত্তরে তিনি বলেন,"নামাযরত থাকা অবস্থায় নামাযিকে তীর মারলেও যদি বোধ না হয়,তাহলে সে একমনে নামায পড়ছে বলে মনে করতে হবে"।একব্যাক্তি জিজ্ঞেস করে,"কেমন আছেন?"।উত্তরে বলেন,"আচ্ছা বলুনতো,তার অবস্থা আবার কেমন-যে প্রাতে উঠে জানতে পারেনা যে,মৃত্যু সন্ধা পর্যন্ত তার অবকাশ দিবে কিনা?"।লোকটি আবার বললো,"তবুও বলুন কি অবস্থা?"।তিনি বলেন,"তিনি পথের সম্বলহীন এবং তার পথ ও সুদীর্ঘ"।একদিন ওয়ায়েস(রহঃ) কে লোকে জানালো,"কাছেই একব্যাক্তি ত্রিশ বছর যাবৎ কবরে বসে গলায় কাফন ঝুলিয়ে কান্নাকাটি করে দিনযাপন করছেন"।তিনি বলেন,"আমাকে সেই স্থানে নিয়ে চলো,আমি তাকে দেখবো"।তারা হযরত ওয়ায়েসকে তার কাছে নিয়ে গেলে তিনি দেখেন যে,সে লোকটি জীর্ন শীর্ন ও বিবর্ন হয়ে গেছেন এবং কাদতে কাদতে পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছেন।তখন তিনি বলেন,"হে ফালানা।কবর ও কাফন তোমাকে আল্লাহ থেকে সরিয়ে নিয়েছে।এ দুটিই তোমার গন্তব্যের পথে বাধা হয়ে দাড়িয়েছে"।হযরত ওয়ায়েসের কথায়,লোকটি নিজের ভুল বুজতে পেরে চিৎকার করে এবং সেই অবস্থায়ই কবরেই তার ইনতেকাল হয়।কোন এক সময় হযরত ওয়ায়েস(রহঃ) তিন দিন অনাহারে ছিলেন।চতুর্থদিন খাদ্যের সন্ধানে বের  হয়ে পথে একটি দীনার দেখতে পেলেন।কেউ তা হারিয়েছে ভেবে তিনি তা নিলেন না।অগত্যা শাক লতাপাতা আহার করবেন বলে ঠিক করলেন।ঠিক তখনই একটি ছাগ একটি গরম রুটি মুখে করে এনে তার সামনে রেখে দিল।রুটিখানি অন্যকারো ভেবে হযরত ওয়ায়েস তা গ্রহন করলেননা।ছাগটি তাকে সেটি গ্রহন করতে ইঙ্গিত করে বললো,"আপনি যে আল্লাহর বান্দা,আমি তারই বান্দা"।হযরত ওয়ায়েস রুটিখানা গ্রহন করা মাত্রই ছাগটি অদৃশ্য হয়ে গেল।বর্নিত আছে,বৃদ্ধ বয়সে তিনি হযরত আলী(রাঃ) এর সাথে সিফফীনের যুদ্ধে যোগদান করে সে যুদ্ধে শাহাদাত বরন করেন।বর্নিত আছে,হযরত ওয়ায়েস একব্যাক্তিকে নসীয়ত করে বলেন,"তুমি যদি আসমান ও যমীন পরিমান ইবাদত করো,কিন্তু আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি পূর্নাঙ্গ ঈমান না আনো,তাহলে তা কবুল হবেনা"।লোকটি জানতে চাইলো,"আচ্ছা কিভাবে আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি ইমান আনবো?"তিনি বলেন,"তোমার যা আছে তাতেই তুমি তুষ্ট এবং নিশ্চিন্ত থাকবে,যেন অন্যকোন বস্তুর প্রতি তুমি আকৃষ্ট না হও"।

কিতাবঃতাযকেরাতুল আউলিয়া।
লেখকঃহযরত শেখ ফরীদউদ্দীন আত্তার(রহঃ)।
টি উত্তর
২১ জানুয়ারি ২০১৯ "ক্যারিয়ার" বিভাগে উত্তর দিয়েছেন Ariful (৬৩৭৩ পয়েন্ট )
টি উত্তর

সম্পর্কিত প্রশ্নগুচ্ছ

1 উত্তর

282,864 টি প্রশ্ন

367,153 টি উত্তর

110,540 টি মন্তব্য

152,543 জন নিবন্ধিত সদস্য



বিস্ময় বাংলা ভাষায় সমস্যা সমাধানের একটি নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। এখানে আপনি আপনার প্রশ্ন করার পাশাপাশি অন্যদের প্রশ্নে উত্তর প্রদান করে অবদান রাখতে পারেন অনলাইনে বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের জন্য সবথেকে বড় এবং উন্মুক্ত তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলার কাজে।
* বিস্ময়ে প্রকাশিত সকল প্রশ্ন বা উত্তরের দায়ভার একান্তই ব্যবহারকারীর নিজের, এক্ষেত্রে কোন প্রশ্নোত্তর কোনভাবেই বিস্ময় এর মতামত নয়।
...