86 জন দেখেছেন
"ইসলাম" বিভাগে করেছেন (6,503 পয়েন্ট)

1 উত্তর

0 টি পছন্দ
করেছেন (6,503 পয়েন্ট)
হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, রামাযান বা রামাযানের বাইরে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) রাত্রির ছালাত এগার রাক‘আতের বেশী আদায় করেননি। তিনি প্রথমে (২+২) [1] চার রাক‘আত পড়েন। তুমি তার সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো না। অতঃপর তিনি (২+২) চার রাক‘আত পড়েন। তুমি তার সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো না। অতঃপর তিন রাক‘আত পড়েন। [2]

 

সম্ভবত: নব প্রতিষ্ঠিত ইসলামী খেলাফতের উপরে আপতিত যুদ্ধ-বিগ্রহ ও অন্যান্য ব্যস্ততার কারণে ১ম খলীফা হযরত আবুবকর ছিদ্দীক্ব (রাঃ)-এর সংক্ষিপ্ত খেলাফতকালে (১১-১৩ হিঃ) তারাবীহর জামা‘আত পুনরায় চালু করা সম্ভবপর হয়নি। ২য় খলীফা হযরত ওমর ফারূক (রাঃ) স্বীয় যুগে (১৩-২৩ হিঃ) রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কারণে এবং বহু সংখ্যক মুছল্লীকে মসজিদে বিক্ষিপ্তভাবে উক্ত ছালাত আদায় করতে দেখে রাসূল (ছাঃ)-এর রেখে যাওয়া সুন্নাত অনুসরণ করে তাঁর খেলাফতের ২য় বর্ষে ১৪ হিজরী সনে মসজিদে নববীতে ১১ রাক‘আতে তারাবীহর জামা‘আত পুনরায় চালু করেন।[3] যেমন সায়েব বিন ইয়াযীদ (রাঃ) বলেন,

 

‘খলীফা ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) হযরত উবাই ইবনু কা‘ব ও তামীম দারী (রাঃ)-কে রামাযানের রাত্রিতে ১১ রাক‘আত ছালাত জামা‘আত সহকারে আদায়ের নির্দেশ প্রদান করেন। এই ছালাত(إلي فُرُوْعِ الْفَجْرِ) ফজরের প্রাক্কাল (সাহারীর পূর্ব) পর্যন্ত দীর্ঘ হ’ত’।[4]

প্রকাশ থাকে যে, উক্ত রেওয়ায়াতের পরে ইয়াযীদ বিন রূমান থেকে ‘ওমরের যামানায় ২০ রাক‘আত তারাবীহ পড়া হ’ত’ বলে যে বর্ণনা এসেছে, তা ‘যঈফ’ এবং ২০ রাক‘আত সম্পর্কে ইবনু আববাস (রাঃ) থেকে ‘মরফূ’ সূত্রে যে বর্ণনা এসেছে, তা ‘মওযূ’ বা জাল।[5]

 

ভারত বিখ্যাত হানাফী মনীষী আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী (রহ:) বলেন, বিশ রাক‘আত সম্পর্কে যত হাদীছ এসেছে, তার সবগুলিই যঈফ (আরফুশ শাযী, তারাবীহ অধ্যায়, পৃঃ ৩০৯)। হেদায়া-র ভাষ্যকার ইবনুল হুমাম হানাফী বলেন,  তাবারানী ও ইবনে আবী শায়বার ২০রাকাতের হাদীস যঈফ এবং বুখারী ও মুসলিমে বর্নিত সহীহ হাদীসের বিরোধী ।(ফাৎহুল ক্বাদীর ১/২০৫ পৃঃ) ।

 

আল্লামা যায়লাঈ হানাফী বলেন, বিশ রাক‘আতের হাদীছ যঈফ এবং আয়েশা (রাঃ) বর্ণিত ছহীহ হাদীছের বিরোধী (নাছবুর রা’য়াহ ২/১৫৩ পৃ:)। । আব্দুল হক মুহাদ্দিছ দেহলভী হানাফী বলেন, রাসূল (ছাঃ) থেকে বিশ রাক‘আত তারাবীহ প্রমাণিত নয়, যা বাজারে প্রচলিত আছে। এছাড়া ইবনু আবী শায়বাহ বর্ণিত বিশ রাক‘আতের হাদীছ যঈফ এবং ছহীহ হাদীছের বিরোধী (ফাৎহু সির্রিল মান্নান লিতা’য়ীদি মাযহাবিন নু‘মান, পৃঃ ৩২৭) ।

 

দেওবন্দ মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা ক্বাসিম নানুতুবী বলেন, বিতরসহ ১১ রাক‘আত তারাবীহ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) থেকে প্রমাণিত, যা বিশ রাক‘আতের চাইতে যোরদার (ফুয়ূযে ক্বাসিমিয়াহ, পৃঃ১৮)। হানাফী ফিক্বহ কানযুদ দাক্বায়েক্ব-এর টীকাকার আহসান নানুতুবী বলেন, নবী করীম (ছাঃ) বিশ রাক‘আত তারাবীহ পড়েননি; বরং আট রাক‘আত পড়েছেন (হাশিয়া কানযুদ দাক্বায়েক্ব, পৃঃ৩৬)।

 

শাহ অলিউল্লাহ মুহাদ্দীছ দেহলভী 'মুওয়াত্ত্বা মালেক' এর ভাষ্যগ্রন্থ 'আল-মুছাফফা' তে ঘোষণা করেন যে, 'রাসূল (ছাঃ) এর আমল দ্বারা তারাবীহর ছালাত বিতরসহ ১১ রাকাতই প্রমানিত" (পৃঃ ১৭৭)

 

বাংলাদেশের সনামমধন্য মুহাদ্দীছ মাওলানা মু. আব্দুর রহীম, বুখারী মুসলিম ও মুসনাদে আহমাদ থেকে আয়েশা (রাঃ) বর্ণিত ৮রাকাতের হাদীছ উল্লেখ করে বলেন, 'এই হাদীছ হইতে বুঝা যায় যে, নবী করীম (ছাঃ) তারাবীর নামায মাত্র আট রাকাত পড়িতেন ইহার পয় বিতরের ছালাত পড়িতেন... ইহা হইতেও তারাবীহ নামায আট রাকাতই প্রমানিত হয়" (হাদীস শরীফ, ২য় খণ্ড, পৃঃ ২১৮)

 

বঙ্গানুবাদ মিশকাতে মাওলানা নূর মোহাম্মদ আজমী মুওয়াত্ত্বা মালেক বর্ণিত উক্ত হাদীছের ব্যাখ্যায় দু’কুল বাঁচিয়ে লিখেছেন, ‘সম্ভবতঃ হযরত ওমর (রাঃ) প্রথমে বিতর সহ এগার রাকাত পড়ারই ব্যবস্থা করিয়াছিলেন। পরে তাঁহার আমলেই তারাবীহ বিশ রাকাত স্থির হয়, অথবা স্থায়ীভাবে ২০ রাকাতই স্থির হয়, কিন্তু কখনও আট রাকাত পড়া হইত’ (মিশকাত হা/১৩০২ বঙ্গানুবাদ হা/১২২৮, ৩/১৯৯)। উক্ত দাবী যে ভিত্তিহীন তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

 

তিরমিযীর ভাষ্যকার খ্যাতনামা ভারতীয় হানাফী মনীষী দারুল উলূম দেউবন্দ-এর তৎকালীন সময়ের মুহতামিম (অধ্যক্ষ) আনোয়ার শাহ কাষ্মীরী (১২৯২-১৩৫২/১৮৭৫-১৯৩৩ খৃঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) হতে কেবলমাত্র ৮ রাকাত তারাবীহর হাদীসটি সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে । ২০ রাকাতের হাদীস যঈফ, এ ব্যাপারে সকলে একমত । একথা না মেনে উপায় নেই যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর তারাবীহ ৮ রাক‘আত ছিল। [6]

 

এটা স্পষ্ট যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ও খুলাফায়ে রাশেদীন থেকে এবং রাসূল (ছাঃ)-এর অন্য কোন স্ত্রী ও ছাহাবী থেকে ১১ বা ১৩ রাক‘আতের ঊর্ধ্বে তারাবীহ কোন বিশুদ্ধ প্রমাণ নেই। [7] বর্ধিত রাক‘আত সমূহ পরবর্তীকালে সৃষ্ট। ইমাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) রাত্রির ছালাত ১১ বা ১৩ রাক‘আত আদায় করতেন। পরবর্তীকালে মদীনার লোকেরা দীর্ঘ ক্বিয়ামে দুর্বলতা বোধ করে। ফলে তারা রাক‘আত সংখ্যা বৃদ্ধি করতে থাকে, যা ৩৯ রাক‘আত পর্যন্ত পৌঁছে যায়’।[8]

 

ইবনু ওমর (রাঃ) বর্ণিত অপর একটি হাদীছে রাসূল (ছাঃ) বলেন ‘রাত্রির ছালাত দুই দুই (مَثْنَى مَثْنَى) করে। অতঃপর ফজর হয়ে যাবার আশংকা হ’লে এক রাক‘আত পড়। তাতে পিছনের সব ছালাত বিতরে (বেজোড়ে) পরিণত হবে’।[9] অত্র হাদীছে যেহেতু রাক‘আতের কোন সংখ্যাসীমা নেই অতএব যত রাক‘আত খুশী পড়া যাবে। যেহেতু তারাবীহ নফল ছালাত তাই এটা নিয়ে বেশি বারাবারি করা উচিত নয় । যারা ১১ রাকাত পড়বেন তারা সুন্নাহ পালনের জন্য সওয়াব পাবেন, আর যারা ২০ কিংবা আরো অধিক রাকাত পড়বেন তারা বেশী রাকাতের সওয়াব পাবেন । এটা নিয়ে বিতর্ক করা অনর্থক ।

 

এক্ষণে যখন সকল বিদ্বান এ বিষয়ে একমত যে, আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) ১১ রাক‘আত পড়তেন এবং কখনো এর ঊর্ধ্বে পড়েননি এবং এটা পড়াই উত্তম, তখন তারা কেন ১১ রাক‘আতের উপর আমলের ব্যাপারে একমত হ’তে পারেন না? কেন তারা শতাধিক রাক‘আত পড়ার ব্যাপারে উদারতা দেখিয়ে ফের ২৩ রাক‘আতে সীমাবদ্ধ থাকেন? এটা উম্মতকে ছহীহ হাদীছের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়া থেকে বিরত রাখার নামান্তর বৈ-কি! অতএব রাতের নফল ছালাত ১১ বা ১৩ রাক‘আতই সর্বাধিক বিশুদ্ধ ও সর্বোত্তম। আল্লাহ সর্বাধিক অবগত।

 

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) প্রতি দু’রাক‘আত অন্তর সালাম ফিরিয়ে আট রাক‘আত তারাবীহ শেষে কখনও এক, কখনও তিন, কখনও পাঁচ রাক‘আত বিতর এক সালামে পড়তেন। [10] জেনে রাখা ভাল যে, রাক‘আত গণনার চেয়ে ছালাতের খুশূ-খুযূ ও দীর্ঘ সময় ক্বিয়াম, কু‘ঊদ, রুকূ, সুজূদ অধিক যরূরী। যা আজকের মুসলিম সমাজে প্রায় লোপ পেতে বসেছে। ফলে রাত্রির নিভৃত ছালাতের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে।

 

পরিশেষে রাসূল (ছা) এর কয়েকটি বাণী দিয়ে শেষ করছি...

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) স্বীয় উম্মতকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা ছালাত আদায় কর, যেভাবে আমাকে ছালাত আদায় করতে দেখছ’।[11]

 

'যে ব্যক্তি মুহাম্মাদের আনুগত্য করল, সে আল্লাহর আনুগত্য করল । যে ব্যক্তি মুহাম্মাদের অবাধ্যতা করল, সে আল্লাহর অবাধ্যতা করল । মুহাম্মাদ হলেন লোকদের মধ্যে হক ও বাতিলের পার্থক্যকারী মানদণ্ড (বুখারী)

 

'যদি তোমরা কোন বিষয়ে ঝগড়া কর তাহলে তোমরা বিষয়টিকে আল্লাহ ও তার রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও । সেটাই হবে উত্তম ও পরিণামের দিক দিয়ে সুন্দরতম (নিসা ৫৯)

 

[1] . (১) বুখারী ১/১৫৪ পৃঃ, হা/১১৪৭; (২) মুসলিম ১/২৫৪ পৃঃ, হা/১৭২৩; (৩) তিরমিযী হা/৪৩৯; (৪) আবুদাঊদ হা/১৩৪১; (৫) নাসাঈ হা/১৬৯৭; (৬) মুওয়াত্ত্বা, পৃঃ ৭৪, হা/২৬৩; (৭) আহমাদ হা/২৪৮০১; (৮) ছহীহ ইবনু খুযায়মা হা/১১৬৬; (৯) বুলূগুল মারাম হা/৩৬৭; (১০) তুহফাতুল আহওয়াযী হা/৪৩৭; (১১) বায়হাক্বী ২/৪৯৬ পৃঃ, হা/৪৩৯০; (১২) ইরওয়াউল গালীল হা/৪৪৫-এর ভাষ্য, ২/১৯১-১৯২; (১৩) মির‘আতুল মাফাতীহ হা/১৩০৬-এর ভাষ্য, ৪/৩২০-২১।

 [2] . মির‘আত ২/২৩২ পৃঃ; ঐ, ৪/৩১৫-১৬ ও ৩২৬ পৃঃ।

 [3] . (১) মুওয়াত্ত্বা (মুলতান, পাকিস্তান: ১৪০৭/১৯৮৬) ৭১ পৃঃ, ‘রামাযানে রাত্রি জাগরণ’ অনুচ্ছেদ; মুওয়াত্ত্বা, মিশকাত হা/১৩০২ ‘রামাযান মাসে রাত্রি জাগরণ’ অনুচ্ছেদ-৩৭; মির‘আত হা/১৩১০, ৪/৩২৯-৩০, ৩১৫ পৃঃ; (২) বায়হাক্বী ২/৪৯৬, হা/৪৩৯২; (৩) মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ (বোম্বাই, ১৩৯৯/১৯৭৯) ২/৩৯১ পৃঃ, হা/৭৭৫৩; (৪) ত্বাহাভী শরহ মা‘আনিল আছার হা/১৬১০।

 [4] . আলবানী, হাশিয়া মিশকাত হা/১৩০২, ১/৪০৮ পৃঃ; ইরওয়া হা/৪৪৬, ৪৪৫, ২/১৯৩, ১৯১ পৃ:।

 [5] . كَانَتْ ثَمَانِيَةَ رَكْعَاتٍ) r (وَلاَ مَنَاصَ مِنْ تَسْلِيْمٍ أَنَّ تَرَاوِيْحَهُ আল-‘আরফুশ শাযী শরহ তিরমিযী হা/৮০৬-এর আলোচনা, দ্রঃ ২/২০৮ পৃঃ; মির‘আত ৪/৩২১।

 [6] . মুওয়াত্ত্বা, ৭১ পৃঃ, টীকা-৮ দ্রষ্টব্য।

 [7] . ইবনু তায়মিয়াহ, মাজমূ‘ ফাতাওয়া (মক্কা: আননাহযাতুল হাদীছাহ ১৪০৪/১৯৮৪), ২৩/১১৩।

[8] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১২৫৪, ‘বিতর’ অনুচ্ছেদ-৩৫।

[9] . আবুদাঊদ, নাসাঈ, ইবনু মাজাহ, মিশকাত হা/১২৬৪-৬৫ ‘বিতর’ অনুচ্ছেদ-৩৫।
টি উত্তর
২১ জানুয়ারি ২০১৯ "ক্যারিয়ার" বিভাগে উত্তর দিয়েছেন Ariful (৬৩৭৩ পয়েন্ট )
টি উত্তর

সম্পর্কিত প্রশ্নগুচ্ছ

1 উত্তর
28 ফেব্রুয়ারি "পবিত্র কুরআন" বিভাগে জিজ্ঞাসা করেছেন অংকন ইসলাম শেখ (10 পয়েন্ট)

289,192 টি প্রশ্ন

374,732 টি উত্তর

113,349 টি মন্তব্য

157,714 জন নিবন্ধিত সদস্য



বিস্ময় বাংলা ভাষায় সমস্যা সমাধানের একটি নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। এখানে আপনি আপনার প্রশ্ন করার পাশাপাশি অন্যদের প্রশ্নে উত্তর প্রদান করে অবদান রাখতে পারেন অনলাইনে বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের জন্য সবথেকে বড় এবং উন্মুক্ত তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলার কাজে।
* বিস্ময়ে প্রকাশিত সকল প্রশ্ন বা উত্তরের দায়ভার একান্তই ব্যবহারকারীর নিজের, এক্ষেত্রে কোন প্রশ্নোত্তর কোনভাবেই বিস্ময় এর মতামত নয়।
...