বিস্ময় অ্যানসারস এ আপনাকে সুস্বাগতম। এখানে আপনি প্রশ্ন করতে পারবেন এবং বিস্ময় পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নিকট থেকে উত্তর পেতে পারবেন। বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন...
499 জন দেখেছেন
"সিয়াম" বিভাগে করেছেন (216 পয়েন্ট)

গুগল থেকে পেষ্ট করবেন না।আগে গুগলে দেখেছি।মতবাদগুলি পছন্দ হয়নি তাই বিস্বয়ের শরনাপন্ন হয়েছি।

2 উত্তর

+1 টি পছন্দ
করেছেন (21,550 পয়েন্ট)

আপনি এটি পড়ুন এটাই সত্য, আমরা

মুসলিম হিসেবে আমাদের চার মাজহাব ও

এই বিষয়ে একমতঃ

তারাবীহ নামাজ ২০ রাকআত।

যারা বলে ৮ রাকাআত তাদের বক্তব্য সঠিক নয় । মুলত ধর্মপ্রান সাধারন মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির লক্ষে আহলে হাদীস বা লামাজহাবী সম্প্রদায় ৮ রাকাআত তারাবীহ এই মতামতের নেতৃত্ব দিয়ে থাকে ।¤ সংশয় নিরসনের জন্য ৮ রাকআত বা এসংক্রান্ত বুখারীও মুসলিম শরীফে বর্নিত হাদীস ও তার সঠিক মর্ম নিম্নে তুলে ধরা হল।¤প্রথম হাদীসঃ-আবু সালামা ইবনে আব্দুর রহমান থেকে বর্ণিত, তিনি আম্মাজান আয়েশা (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করলেন , রমজানে রাসুল (সাঃ) এর নামাজ কেমন ছিল? উত্তরে তিনি বললেন , রাসুল (সাঃ) রমজানে ও অন্যান্য মাসে বিতির সহ এগার রাকআতের বশী পড়তেন না।(বুখরী শরীফ হাঃ নং ১১৪৭)¤দ্বিতীয় হাদীসঃ-ইয়াহইয়া ইবনে আবু সালামা (রঃ) বলেন আমি রাসুল (সঃ) এর রাত্রী কালীন নামাজ সম্পর্কে আয়েশা (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করলাম । উত্তরে তিনি বললেন, রাসুল(সঃ) রাত্রে তের রাকআত নামাজ আদায় করতেন । প্রথমে আট রাকাত পড়তেন , এর পর বিতির পড়তেন, তার পর দুই রাকত নামাজ বসে আদায় করতেন ।( মুসলিম শরীফ- হাঃ নং ১৭২৪)এজাতীয় হাদীস দ্বারা লা মাজহাবী সম্প্রদায়- তারাবীহ ৮ রাকাত এর উপর দলীলপেশ করে থাকে।উপরোক্ত হাদীস সমূহের উত্তরঃ-¤প্রথম উত্তর: আয়েশা (রাঃ) থেকে উপরোক্ত হাদীস দুটি যেমনি ভাবে সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে ঠিক তেমনি মুসলিম শরীফেই আয়েশা (রাঃ) থেকে দশ রাকাতের হাদীস ও বর্ণিত আছে। যেমন:হাদীসঃ-কাসেম ইবনে মুহাম্মদ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন , আমি আয়েশা (রাঃ) কে বলতে শুনেছি যে, রাসুল (সাঃ) রাত্রিতে দশ রাকাত নামাজ, এক রাকাত বিতির,ও ফজরের দুই রাকাত সুন্নত সহ মোট ১৩ রাকাত পড়তেন।( মুসলিম শরীফ- হাঃ নং ১৭২৭)এমন কি আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হদীস গুলোর প্রতি লক্ষ করলে বোঝা যায় রাসুল (সাঃ) রাত্রীকালীন নামাজ- কোন রাত্রীতে ১১ রাকাত ,কখনো১৩ রাকাত কখনো ৯ রাকাত, আবার কখনো ৭ রাকাত ও, আদায় করতেন । সুতরাং আয়েশা (রাঃ) এর হাদীস দ্বারা কোন সংখ্যা নির্দিষ্ট করা সম্পুর্ন অযৌক্তিক।¤দ্বিতীয় উত্তরঃ-প্রকৃত পক্ষে আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীস গুলো তাহাজ্জুদ সম্পর্কিত , তারাবীহ সম্পর্কিত নয় । একারনেই হাদীস গ্রন্থাকারগনএজাতীয় হাদীসকে তাহাজ্জুদের অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন , তারাবীর অধ্যায়ে উল্লেখ করেননি।¤তৃতীয় উত্তরঃ-আহলে হাদীসগন তারাবী ৮ রাকাত হওয়ার স্বপক্ষে যে হাদীসগুলো পেশ করে থাকেন, সেঅনুযায়ী তারা নিজেরাই আমল করেন না। কেননা হাদীসে রমজান ও অন্যান্য মাসের কথাও উল্লেখ রয়েছে , অথচ তারা তাদের হাদীস অনুযায়ী অন্যান্য মাসে তারাবীহ পড়েনা।বিশ রাকাত তারাবীর দলীল সমুহ:১ নং হাদীসঃ-সায়ের ইবনে ইয়াজিদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন সাহাবা গন উমর (রাঃ) এর খেলাফত কালে রমজান মাসে বিশ রাকাত তারাবীহ পড়তেন ।(বাইহাকী শরীফ-খঃ ২/৪৯৬ হাঃ নং ৪৬১৭)২ নং হাদীসঃ-ইয়াজিদ ইবনে রুমান (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ- হযরত উমর (রাঃ) এর যুগে সাহাবারা বিতির সহ তেইশ রাকাত তারাবীহ পড়তেন । (মুয়াত্তা মালেক খঃ ১পৃঃ ১১৫)৩ নং হাদীসঃ-আতা ইবনে আবী রাবাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন আমি সাহাবাদেরকে বিতির সহ তেইশ রাকাত তারাবী পড়তে দেখেছি মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা – ৫/২২৪)(উল্লেখিত সবগুলো হাদীস সহীহ)এছাড়াও অসংখ্য হাদীস দ্বারা একথা সুস্পষ্ট রুপে প্রমানিত হয় যে, তারাবীহ নামাজ ২০ রাকাত যার উপর খোলাফয়ে রাশেদীন ,সমস্ত সাহাবা , তাবেই, তাবে তাবেই, সালফে সালেহীন গন, ঐক্যমতে আমল করেছেন। এবং চার মাজহাবের ইমাম গনও এ ব্যাপারে ঐক্যমত পোষন করেছেন ।সুতরাং যারা ৮ রাকাত তারাবীর কথা বলেন ,তারা মুলতসরলমনা মুসলমানদের অন্তরে বিভ্রান্তির বিষ ঢেলে ইসলামকে বিতর্কিত করতে চান।আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের সঠিক বুঝ দান করুক

করেছেন (21,550 পয়েন্ট)

ভাই, এর পরও আরো যানার থাকলে মন্তব্য

করবেন, আমি অবশ্যই উত্তর দিতে

প্রস্তুত।

করেছেন (216 পয়েন্ট)

ভাই আমাকে একজন বুখারী দলিল দেখিয়েছে।এটা কি সঠিক?

আর মাযাহাব মানেপথ।আমরা রাসূলের পথ না মেনে হানিফা,হাম্বেলি ও শাফি কেন মানি?


রাসুল (সঃ) রমযানে ৮ রাকাতের বেশি

তারাবী পড়েননি, উমার (রাঃ) ও ৮

রাকাতই চালু করেছেন (দেখুন, বুখারী ১ম

খন্ড ১৬৯ পৃঃ; আবু দাউদ ১ম খন্ড ১৮৯ পৃঃ;

নাসাঈ ২৪৮ পৃঃ; তিরমিযী ৯৯ পৃঃ; ইবনু

মাযাহ ৯৭-৯৮ পৃঃ; মেশকাত ১১৫ পৃঃ;

বাংলা বুখারী আঃ প্রঃ ১ম খন্ড ৪৭০

পৃঃ; ২য় খন্ড ২৬০ পৃঃ);

করেছেন (21,550 পয়েন্ট)

আসলে এই 8 রাকাতের ভুল সংস্কারটি

কিছু দিন যাবত ছড়িয়ে পড়ছে।

আগে এই নিয়ে কোন বিতর্ক ছিলনা।

আমি এ যাবত অনেক হাদিস পড়ে যানতে

পেরেছি, তারাবির নামাজ বিশ রাকাতই।

আর আমার যানামতে এটি কিছু,

মুসল্লিদের ভুল যানা থেকে এমনটা।

কোন মসজিদে ইমাম সাহেব 8 রাকাত

নামাজ পড়িয়ে শেষ করেছে এই রকম

আপনার যানা থাকলে বলবেন প্লিজ।

করেছেন (216 পয়েন্ট)

আর কোন মাযাহাব সঠিক তা বললেন না?আমরা কেন নবীকে বাদ দিয়ে অন্যদের পথে চলি?

0 টি পছন্দ
করেছেন (4,853 পয়েন্ট)
সম্পাদিত করেছেন

নিম্নের প্রবন্ধটি পাঠ করুন। আশা করি সঠিক উত্তর পাবেন।


তারাবীহ নামাজের রাকাআত সংখ্যা : একটি দালিলিক পর্যালোচনা

তারাবীহ নামাজ বিশ রাকাত। আট রাকাআত কিংবা বার রাকাতের সপক্ষে যৌক্তিক কোনো দলীল নেই। বিশ রাকাতের স্বপক্ষে কিছু তথ্য প্রমাণ নিম্নে তুলে ধরা হলো :

১.    ইরবাজ বিন সারিয়া রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমার তিরোধানের পর তোমরা যারা বেঁচে থাকবে তারা নানা ধরনের মতভিন্নতা দেখতে পাবে। সেক্ষেত্রে তোমরা আমার এবং আমার সত্যনিষ্ঠ সুপথ প্রাপ্ত প্রতিনিধিদের সুন্নাহ ও আদর্শকে গ্রহণ করবে। একে তোমরা আকড়ে ধরবে এবং দন্তমড়ির সাহায্যে কামড়ে ধরার ন্যায় প্রাণপনে আকড়ে ধরবে। …এবং তোমরা (ধর্মীয় বিষয়ে) নব আবিস্কৃত বিষয়াদি থেকে খুব সতর্কতার সাথে নিবৃত্ত থাকবে। কারণ প্রতিটি নব আবিস্কৃত বিষয়ই হলো বিদাত। আর প্রতিটি বিদাত হলো পথভ্রষ্টতা।  -সুনানে আবুদাউদ ৪৬০৭, সুনানে তিরমিযী ২৬৭৬, মুসনাদে আহমদ ১৬৬৯২, সুনানে ইবনে মাজাহ ৪২, সহীহ ইবনে হিব্বান ৫

২.    উরওয়া রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন আয়িশা রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা গভীর রাতে রুম থেকে বের হলেন। এরপর মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় করলেন। অন্যান্য লোকজনও তার সাথে সে নামাজ আদায় করলো। ভোর বেলা লোকজন এবিষয়টি নিয়ে কথা বার্তা বলতে শুরু করলো। পরদিন রাতে গত রাতের তুলনায় আরো বেশি লোকজন একত্রিত হয়ে গেল। এবং তারা রাসূল  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে নামাজ পড়লো। দ্বিতীয় দিন ভোর বেলা সবাই এবিষয় নিয়ে আবার পরস্পরের সাথে আলোচনা শুরু করে দিলো। ফলে তৃতীয় দিন রাতে লোকের সংখ্যা আরো বেড়ে গেলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়লেন। তাঁর সাথে আগত সাহাবায়ে কেরাম সে নামাজ আদায় করলেন। চতুর্থ দিন রাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে যেতে অপারগতা প্রকাশ করলেন। ফজরের নামাজে মসজিদে গিয়ে যখন নামাজ আদায় শেষ করলেন তখন সাহাবাদের দিকে মুখ করে বসলেন। এরপর আল্লাহর একত্ববাদ এবং আল্লাহর রাসূল হওয়ার ব্যাপারে সাক্ষ্য পাঠ করলেন। এরপর বললেন, আজ রাতে তোমাদের মসজিদে উপস্থিত হওয়ার ব্যাপারটি আমার কাছে অজ্ঞাত ছিল না। তবে আমি আশঙ্কা বোধ করছিলাম, না জানি তোমাদের উপর এ নামাজ ফরজ হয়ে যায়। এরপর সাহাবায়ে কেরাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অক্ষমতার ব্যাপারটি সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নিলেন। একসময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এন্তেকাল করেন। আর গভীর রাতের নামাজের ব্যাপারটি সেভাবেই থেকে যায়। -সহীহ বুখারী ২০১২

৩.   আব্দুর রহমান বিন আব্দুল কারী রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রমাযানের এক রাতে আমি উমর রা. এর সাথে মসজিদে গেলাম। তখন আমরা দেখতে পেলাম কেউ একাকি নামাজ পড়ছে, কেউ গুটি কয়েকজন লোক নিয়ে জামাতের সাথে নামাজ পড়ছে। তখন উমর রা. বললেন, আমার মনে হয যদি সকলে একজন ইমামের পেছনে নামাজ আদায় করতো তাহলে বিষয়টি শ্রেষ্ঠতর হতো। এরপর তিনি দৃঢ়ভাবে সংকল্পবদ্ধ হলেন। এবং সবাইকে উবাই ইবনে কাব রা. এর পেছনে একত্রিত করলেন। এরপর অন্য একদিন রাতে আমি উমর রা. এর সাথে মসজিদে গেলাম তখন দেখতে পেলাম সকল লোক তাদের এক ইমামের পেছনে নমাজ আদায় করছে। তখন উমর রা. বললেন, এটা কত সুন্দর একটি নতুন বিষয়! শুরু রাতে যে নামাজ পড়া হয় তার তুলনায় শেষ রাতের নামাজ উত্তম। লোকজন তখন শুরু রাত্রে নামাজ আদায় করতো। -সহীহ বুখারী ২০১০

৪.    ইবনে আব্দুল বার রা. বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব রা. নতুন কিছু করেন নি। তিনি তাই করেছেন যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পছন্দ করতেন। কিন্তু নিয়মিত জামাতের কারণে তারাবীহ নামাজ উম্মতের উপর ফরজ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিয়মিত জামাতের ব্যবস্থা করেন নি। কারণ নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুমিনদের ব্যাপারে ছিলেন খুবই দয়াবান এবং যারপরনাই অনুগ্রহশীল। উমর রা. বিষয়টি জানতেন। তিনি দেখলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এন্তেকালের পর ফরজের মাঝে কোনো রূপ সংজোযন বিয়োজন হবে না। তাই তিনি নবী-পছন্দের প্রতি লক্ষ্য করে ১৪ হিজরীতে তারাবীহ নামাজের একটি জামাতবদ্ধ রূপ দান করলেন। আল্লাহ তাআলা যেন তার জন্যই এ মর্যাদার আসনটি নির্ধারিত করে রেখেছিলেন। আবু বকর রা. এর মনে এ চিন্তা উদগত হয় নি। যদিও সামগ্রিকভাবে তিনিই উত্তম ও অগ্রগণ্য ছিলেন। আলী রা. উমর রা. এ উদ্যোগটিকে উত্তম বিবেচনা করেন। এবং এটিকে প্রাধান্য দিলেন। এবং বলেন এটি হলো রমাযন মাসের জ্যোতির্ময় আলো। -ইবনে আব্দুল বার, আত তামহীদ লিমা ফিল মুয়াত্তা মিনাল মায়ানী ওয়াল আসানীদ ৮/১০৮

৫.    সায়িব বিন ইয়াজিদ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, তাঁরা (সাহাবা এবং তাবিয়ীন) উমর রা. এর যুগে রমাযান মাসে বিশ রাকাত পড়তেন। তিনি আরো বলেন, তাঁরা নামাজে শতাধিক আয়াত বিশিষ্ট সূরা পাঠ করতেন। এবং উসমান রা. এর যুগে তাদের কেউ কেউ নামাজ দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে লাঠি ভর করে দাঁড়াতেন। -ইমাম বাইহাকী, আস-সুনানুল কুবরা ২/৪৯৬/৪৮০১

৬.   সায়িব বিন ইয়াজিদ রা. থেকে আরো বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, আমরা উমর রা. এর যুগে বিশ রাকাত এবং বিতির পড়তাম। -ইমাম বাইহাকী, মারিফাতুস সুনান ওয়াল আসার ২/২২৭

হাদীসটি সনদ বিবেচনায় সহীহ। হাদীস এবং ফিকহের অনেক ইমাম এই হাদীস দ্বারা প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন। যথা ইমাম নববী, তাকিউদ্দীন সুবকী, ওয়ালিউদ্দীন ইরাকী, বদরুদ্দীন আইনী এবং জালালুদ্দীন সুয়ূতী প্রমুখ। প্রয়োজনে দেখুন- আল-মাজমু শরহুল মুহাযযাব ৩/৫২৭, নাসবুর রায়াহ ২/১৫৪, উমদাতুল কারী শরহু সহীহিল বুখারী ৭/১৭৮, ইরশাদুস সারী শারহু সহীহিল বুখারী ৪/৫৭৮, আল মাসাবীহ ফি সালাতিত তারাবীহ ২/৭৪ ইত্যাদি

সায়িদ বিন ইয়াজিদ রা. এর উপরোক্ত হাদীসটিকে সায়খ নাসিরুদ্দীন আলবানী এবং আব্দুর রাহমান মুবারকপুরী রা. জয়ীফ বলতে চেষ্টা করেছেন। আমাদের জানা মতে ইতিপূর্বে হাদীস বা ফিকহের কোনো ইমাম কিংবা কোনো একজন মুহাদ্দিস মাহাক্কিক আলিম হাদীসটিকে জয়ীফ বলেন নি। এ বিষয়ে শায়খ আলবানী রা. যেসব স্থানে অসাধুতার পরিচয় দিয়েছে কিংবা ত্রুটি বিচ্চুতিতে আক্রান্ত হয়েছেন তার মধ্য হতে বেশ কিছু জায়গা দলীল প্রমাণের আলোকে চিনহিত করেছেন সৌদি আরবের কেন্দ্রীয় দারুল ইফতার প্রাক্তন গবেষক বিদগ্ধ মুহাদ্দিস ইসমাইল বিন আনসারী তার অনবদ্য গ্রন্থ তাসহীহু সালাতিত তারাবীহ ইশরীনা রাকআতান ওয়ার রদ্দু আলাল আলবানী ফি তাযয়ীফিহী। আর মুবারকপুরী রা. যেসব ত্রুটি বিচ্চুতির শিকার হয়েছেন তার স্বরূপ চিনহিত করেছেন মাওলানা হাবীবুর রহমান আজমী রা. তার রাকাআতে তারাবীহ গ্রন্থে।

৭.   ইয়াজিদ বিন রুমান রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সাহাবা এবং তাবিয়ীগণ উমর রা. এর যুগে রমাযান মাসে তেইশ রাকাত পড়তেন। মুয়াত্তা মালিক ২/১৫৯/৩৮০

৮.   আব্দুল আযীয বিন রুফাই রা. বলেন, উবাই বিন কাব রা. রমাযান মাসে মসজিদে নববীতে লোকদের নিয়ে বিশ রাকাত পড়তেন এবং তিন রাকাত বিতর পড়তেন। -মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ হাদীস নং ৭৭৬৬

উপরোক্ত হাদীসগুলো বর্ণনাগত দিক থেকে মুরসাল। আর পূর্বসূরি ইমামদের মতানুসারে তাবিয়ী ইমামদের মুরসাল বর্ণনা প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য। বিশেষত একই বিষয়ে যদি একাধিক মুরসাল বর্ণনা থাকে কিংবা মুরসাল বর্ণনার সমর্থনে উম্মাহর অবিচ্ছিন্ন সম্মিলিত কর্মধারা বিদ্যমান থাকে তবে তো তার প্রামাণিকতার বিষয়ে কারো কোনো দ্বিমত নেই। ইমাম ইবনে তাইমিয়া রা. বলেন, যে মুরসাল বর্ণনার অনুকূলে অন্য কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় কিংবা পূর্বসূরিগণ যার অনসরণ করেছেন তা ফকীহগণের সর্বসম্মতিক্রমে দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য। -ইকামাতুদ দলীল আলা ইবতালিত তাহলীল ১/৭৫

৯.    ইমাম ইবনে তাইমিয়া রা. বলেন, …এবিষয়টি প্রমাণিত, উবাই বিন কাব রা. রমাযান মাসে মুসল্লীদের নিয়ে বিশ রাকাত (তারাবীহ) পড়তেন এবং তিন রাকাত বিতর পড়তেন।Ñ ইমাম ইবতে তাইমিয়া, মাজমুউল ফাতাওয়া ২৩/১১২

১০.  বিশ রাকাত তারাবীহ সম্বন্ধে অন্যত্র ইবনে তাইমিয়া রা. বলেন, খুলাফায়ে রাশিদীনের সুন্নাহ এবং মুসলিম জাতির সম্মিলিত কর্ম দ্বারা এটি প্রমাণিত।- ইমাম ইবনে তাইমিয়া, মাজমুউল ফাতাওয়া ২৩/১১৩

১১.  আবু আব্দুর রাহমান সুলামী রা. বলেন, আলী রা. এক রমাযানে কারীদেরকে ডাকলেন। তাদের মধ্য হতে একজনকে লোকদের নিয়ে বিশ রাকাত নামাজ পড়াতে বললেন। বর্ণনা কারী আরো বলেন, আলী রা. তাদের নিয়ে বিতর পড়তেন। হাদীসটি আলী রা. থেকে অন্য একটি সূত্রেও বর্ণিত হয়েছে। -ইমাম বাইহাকী রা., আসসুনানুল কুবরা (আলজাওহারুন নাকী সংযুক্ত)২/৪৯৬/৪৮০৪

১২.  আবুল হাসনা রা. থেকে বর্ণিত, আলী রা. এক রমাযানে এক ব্যক্তিকে লোকদের নিয়ে বিশ রাকাত নামাজ পড়ার নির্দেশ দিলেন। ১৫/৪২৯/২২৭

উপরোক্ত হাদীস দুটি দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য। কারণ দুটি হাদীসই হাসান পর্যায়ভুক্ত।  দেখুন আলজাওহারুন নাকী, ইবনুত তুরকুমানী ২/৪৯৫

উপরন্তু, ১১তম হাদীসটি শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রা. মিনহাজুস সুন্নাতিন নাবাবিয়্যাহ গ্রন্থে (২/২২৪) এবং ইমাম শামসুদ্দীন যাহাবী রা. আলমুনতাকা গ্রন্থে (৫৪২) দলীল হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং এর মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন, আলী রা. তারাবীহের জামাত এবং রাকাত সংখ্যা বিষয়ে দ্বিতীয় খলীফা উমর ফারুক রা. এর নীতির উপরই ছিলেন।

১৩.  ইমাম আতা বিন আবী রাবাহ রা. বলেন, আমি লোকদেরকে (সাহাবা এবং প্রথম সারির তাবিয়ী) দেখেছি, তাঁরা বিতরসহ তেইশ রাকাত পড়তেন। মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা ২/২৮৫। আর আতা বিন আবি রাবাহ রা. তো নিজেই বলেছেন, আমি দুই শত জন সাহাবীর সাক্ষাৎ লাভ করেছি। তাহযীবুল কামাল ১৩/৪৯

১৪.  ইমাম ইবনে তাইমিয়া রাহ. বলেন, এটা প্রমাণিত, উবাই বিন কাব রা. রমাযান মাসের তারাবীহতে লোকদের নিয়ে বিশ রাকাত পড়তেন এবং তিন রাকাত বিতর পড়তেন। তাই বহু আলেমের সিদ্ধান্ত, এটিই সুন্নত। কারণ উবাই বিন কাব রা. মুহাজির এবং আনসার সাহাবীদের উপস্থিতিতেই বিশ রাকাত পড়িয়েছেন। এবং তাতে কেউ কোনো ধরণের আপত্তি তোলে নি। ইমাম ইবনে তাইমিয়া, মাজমুউল ফাতাওয়া ২৩/১১২

১৫.  ইমাম আবু ইউসুফ রাহ. বলেন, আমি ইমাম আবু হানীফা রাহ. কে তারাবীহ এবং এবিষয়ে উমর রা. এর কর্মপদ্ধতি সম্বন্ধে প্রশ্ন করি। তিনি প্রতি উত্তরে বলেছেন, তারাবীহ হলো, সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ বা গুরুত্বপূর্ণ একটি সুন্নত। উমর রা. নিজের পক্ষ থেকে অনুমান করে একে নির্ধারণ করেন নি। এবং তিনি এব্যাপারে নতুন কিছু আবিস্কারও করেন নি। তিনি দলীলের ভিত্তিতে এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রাপ্ত কোনো নির্দেশনার ভিত্তিতেই এই আদেশ দান করেছিলেন। তাছাড়া উমর রা. যখন এই নিয়ম চালু করেন এবং উবাই বিন কাব রা. এর ইমামতিতে লোক সকলকে একত্রিত করেন এবং লোকজনও স্বতস্ফূর্তভাবে জামাতবদ্ধভাবে এ নামাজ আদায় করতে থাকেন তখন সাহাবায়ে কেরামের সংখ্যা ছিল প্রচুর। যাদের মধ্যে উসমান, আলী, আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ, আব্বাস, আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস, তালহা, যুবায়ের, মুআজ ও উবাই রা. প্রমুখ বড় বড় মুহাজির এবং আনসার সাহাবী বিদ্যমান ছিলেন। তাঁদের কেউ এ ব্যাপারটি প্রত্যাখান করেন নি। বরং সবাই তাকে সমর্থন করেছেন, তার সাথে একমত হয়েছেন এবং অন্যদেরকে এ ব্যাপারে আদেশ করেছেন। -আল ইখতিয়ার লি তালীলিল মুখতার, ইমাম আবুল ফজল মাজদদ্দীন আল মাওসিলী ১/৭০

১৬.  বিশিষ্ট তাবিয়ী আবুল আলিয়া উবাই বিন কাব রা. এর উদ্ধৃতিতে বর্ণনা করেন, উমর রা. উবাই বিন কাব রা. কে রমযান মাসে লোকদের নিয়ে নামাজ পড়ার আদেশ করতে গিয়ে বলেন, লোকজন দিনের বেলা রোজা রাখে। কিন্তু রাতের বেলা উত্তমরূপে কুরআন পড়তে পারে না। আপনি যদি তাদের সামনে কুরআন পড়তেন! তখন উবাই বিন কাব রা. উত্তরে বলেন, আমীরুল মুমিনীন এ বিষয়টি তো পূর্বে ছিল না। উত্তরে তিনি বলেন, তা আমি জানি। তবে এ বিষয়টি সর্বাধিক উত্তম। এরপর উবাই রা. লোকজন নিয়ে বিশ রাকাত নামাজ পড়েন।- আলআহাদীসুল মুখতারা, ইমাম জিয়াউদ্দীন মাকদেসী ১/৪৮১/১১৬১

হাদীসটিতে লক্ষনীয় বিষয় হলো, ছোট ছোট কয়েকটি জামাতকে একত্র করে একজন ইমামের পেছনে একটি বড় সড় জামাতের রূপ একটি ব্যবস্থাপনাগত বিষয়। শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে তা নিষিদ্ধ হওয়ার কোনো কথা নয়। বাস্তবে নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে কোনো দলীল প্রমাণও নেই। বরং বিষয়টি শরীয়তের রুচির সাথে বেশ সাযুজ্যপূর্ণ। তথাপি উবাই বিন কাব রা. এ ব্যাপারে নিজের সংশয়ের কথা উল্লেখ করে বলেন, এভাবে এক জামাতে তারাবীহ পড়ার ব্যবস্থা তো আগে ছিল না।  উমর রা. তাকে বিষয়টি বুঝিয়ে দিলে তিনি সম্মত হন। কিন্তু তারাবীহ এর রাকাআত সংখ্যার ব্যাপারে তাকে কিছু বলতে হয় নি। তিনি বিনা দ্বিধায় বিশ রাকাআত তারাবীহ পড়িয়েছেন। এটা কিভাবে সম্ভব হলো? যদি বিশ রাকাআত তারাবীহ এর ব্যাপারে তাঁর কাছে নববী আদর্শ বিদ্যমান না থাকত তাহলে তো তিনি আরো শক্ত করে বলতেন, এবিষয়টি তো পূর্বে ছিল না।

১৭.  ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাযান মাসে বিশ রাকাআত তারাবীহ ও বিতর পড়তেন। মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা ২/২৮৮, আস সুনানুল কুবরা, বাইহাকী,২/৪৯৬, আল মুজামুল কাবীর, তাবারানী ১১/৩১১ হাদীস নং ১২১০২, আল মুন্তাখাব মিন মুসনাদি আব্দ ইবনে হুমাইদ ২১৮/৬৫৩, হাদীসটি ইবনে আব্দুল বার রা. তার আত-তামহীদ গ্রন্থে (৮/১১৫) এবং আল-ইসতিজকার (৫/১৫৬) গ্রন্থে এনেছেন।

কোনো কোনো সতীর্থ এ হাদীসটিকে মওজু বলতে চেষ্টা করেন। কিন্তু যখন তাদেরকে বলা হয়, হাদীসের কোনো ইমাম কিংবা অন্তত কোনো নির্ভরযোগ্য মুহাদ্দিসের উদ্ধৃতিতে হাদীসটি মওজু বলে প্রমাণ করুন তখন তারা এ ব্যাপারে কোনো উদ্ধৃতি দিতে সক্ষমতা দেখাতে পারেন না। এটা সত্য, কোনো কোনো মুহাদ্দিস হাদীসটির সনদকে জয়ীফ বলেছেন। কারণ হাদীসটির সূত্র পরম্পরায় ইবরাহীম বিন উসমান নামের একজন বর্ণনাকারী রয়েছেন। ইনি জয়ীফ পর্যায়ের রাবী। তবে স্মরণ রাখা প্রয়োজন, অগ্রগণ্য মতানুসারে ইবরাহম বিন উসমানকে চরম পর্যায়ের যয়ীফ বা মাতরুক-পরিত্যাজ্য বলা যথাযথ নয়। দেখুন আল-কামিল, ইবনে আদী ১/৩৮৯, তাহযীবুত তাহযীব, ইবনে হাজার আসকালানী ১/১৪৪, ইলাউস সুনান, যফর আহমদ উসমানী ৭/৮২, রাকাআতে তারাবী, হাবীবুর রহমান আজমী ৬৩, রিসালায়ে তারাবীহ, মাওলানা গোলাম রাসূল (আহলে হাদীস আলেম) ২৪

উপরন্তু মওযু এবং যয়ীফ হাদীসের মাঝে আকাশ জমিন ব্যবধান রয়েছে। মওযু তো হাদীসই নয়। মিথ্যুকেরা একে হাদীস নামে চালিয়ে দেয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করেছে মাত্র। জয়ীফ অর্থ হলো, বিবরণটির সনদে কিছুটা দুর্বলতা রয়েছে। বলা বাহুল্য, সনদের কিছুটা দুর্বলতার কারণে বিবরণটিকে মিথ্যা, ভিত্তিহীন বলে দেয়া যায় না। হাদীস শাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য মূলনীতি হলো, যয়ীফ হাদীস দুই শ্রেণীতে বিভক্ত। ১. যয়ীফ সনদে বর্ণিত বর্ণনাটির বক্তব্য শরীয়তের দৃষ্টিতে আপত্তিজনক। এ বিবরণের অনুকূলে শরয়ী কোনো দলীলের সমর্থন তো নেই-ই; বরং তার বিপরীতে দলীল বিদ্যমান রয়েছে। এ ধরনের যয়ীফ কোনো ক্রমেই আমলযোগ্য নয়। ২. বর্ণনাটি যয়ীফ সনদে বর্ণিত, কিন্তু তার বক্তব্যে ও সমর্থনে শরীয়তের অন্যান্য দলীল প্রমাণ বিদ্যমান রয়েছে। মুহাক্কিক মুহাদ্দিস ও ফকীহগণের সিদ্ধান্ত হলো, এ ধরনের বর্ণনাকে যয়ীফ বলা হলে তা হবে শুধু সনদের বিবেচনা এবং নিছক নিয়মের বক্তব্য। অন্যথায় বক্তব্য ও মর্মের বিচারে এটি সহীহ।

আলোচিত হাদীসটি তেমনি একটি বর্ণনা। একে সনদের বিবেচনায় শুধু দুর্বল বলা যায়; কিন্তু এর বক্তব্যে ও সমর্থনে ইতিপূর্বে উল্লেখিত পাঁচ ধরনের দলীলের শক্তিশালী সমর্থন বিদ্যমান রয়েছে। হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষায় একে الضعيف المتلقى بالقبول বলা হয়। অর্থাৎ এমন হাদীস যার সনদ যয়ীফ। কিন্তু এর বক্তব্য অনুযায়ী সাহাবা যুগ থেকে গোটা উম্মতের আমল চলে আসছে। এ ধরনের যয়ীফ সম্পর্কে উসূলে হাদীসের সিদ্ধান্ত হলো, তা সহীহ এবং দু এক সূত্রে বর্ণিত সাধারণ সহীহ হাদীসের তুলনায় এর মান ও গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেশি। উসূলে হাদীসের এনীতি সম্বন্ধে হাজারো উদ্ধৃতি রয়েছে। তন্মধ্য হতে দু একটি উদাহরনস্বরূপ উপস্থাপন করা হলো,

১। ইমাম বদরুদ্দীন যারকাশী রহ. বলেন, যয়ীফ হাদীস যখন ব্যাপকভাবে উম্মাহর (মুহাদ্দিস ও ফকীহগণের) কাছে সমাদৃত হয় তখন সে হাদীস অনুযায়ী আমল করা হবে। এটাই বিশুদ্ধ কথা। এমন কি তখন তা হাদীসে মুতাওয়াতির (বিপুল সংখ্যক সূত্রে বর্ণিত) হাদীসের পর্যায়ে পৌঁছে যায়। আননুকাত আলা মুকাদ্দিমাতি ইবনিস সালাহ ১/৩৯০

২। ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বলেন, হাদীস গ্রহণযোগ্য হওয়ার একটি নিদর্শন হলো, ইমামগণ সে হাদীসের বক্তব্যের উপর আমল করতে একমত পোষণ করেছেন। এক্ষেত্রে হাদীসটি গৃহীত হবে। এবং এর উপর আমল করা অপরিহার্য হয়ে পড়বে। উসূলের অনেক ইমাম এ মূলনীতিটি উল্লেখ করেছেন। আননুকাত আলা কিতাবি ইবনিস সালাহ ১/১১৯

অনেক ভাই তাহাজ্জুদ বিষয়ক একটি সহীহ হাদীসকে আট রাকাত তারাবীহ এর স্বপক্ষে ব্যবহার করে থাকেন। আর এ প্রয়োগকে বৈধতা দেয়ার জন্য বলে থাকেন তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ এক নামাজেরই দুই নাম। যে নামাজ এগারো মাস তাহাজ্জুদ থাকে তা রমাযানে এসে তারাবীহ হয়ে যায়। তাদেরকে যখন বিনীত সুরে বলা হয়, তারাবীহ তাহাজ্জুদ এক নামাজ সহীহ হাদীসের আলোকে প্রমাণ করুন। সাথে সাথে এ কথাও প্রমাণ করুন তাহাজ্জুদের নামাজ আট রাকাতের চেয়ে বেশি পড়া যায় না তখন তাদের পক্ষ থেকে কোনো হাদীসই প্রমাণস্বরূপ উপস্থাপন করা সম্ভব হয় না। অথচ তারা বলে থাকেন তারাবীহ আট রাকাআতের বেশি পড়া নাজায়েজ বা বিদআত। কিন্তু সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত, তাহাজ্জুদের রাকাত সংখ্যা নির্ধারিত নয়। দুই রাকাআত করে যত ইচ্ছা পড়তে থাকুন। যখন সুবহে সাদিক হওয়ার আশঙ্কা হবে তখন বিতর পড়ে নিন। হাদীসে এসেছে, তোমরা (তাহাজ্জুদ) ও বিতর পাঁচ রাকাআত পড়, সাত রাকাআত পড়, নয় রাকাআত পড়, এগারো রাকাআত পড় কিংবা তার চেয়ে বেশি পড়। সহীহ ইবনে হিব্বান হাদীস নং২৪২৯, মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদীস নং ১১৭৮,ইমাম যাইনুদ্দীন ইরাকী রহ. প্রমুখ বলেছে, হাদীসটি সহীহ। নাইলুল আওতার, শাওকানী ৩/৪৩, আত-তালখীসুল হাবীর, ইবনে হাজার আসকালানী ২/১৪

  তাদের আট রাকআত বিষয়ক প্রমাণাদি

১.    তাহাজ্জুদের যে হাদীসটি সালাফী ভাইয়েরা তারাবীহ এর ব্যাপারে প্রয়োগ করেন তা সহীহ বুখারী ও হাদীসের অন্যান্য কিতাবে উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাযান মাসে এবং অন্যান্য মাসে চার রাকাআত করে আট রাকাআত এবং তিন রাকাআত বিতরÑসর্বমোট এগারো রাকাআতের চেয়ে বেশি পড়তেন না। অথচ এটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সার্বক্ষণিক আমল ছিল না। কারণ খোদ আম্মাজান আয়েশা রা. এর সূত্রেই তাহাজ্জুদের নামাজ ফজরের সুন্নত ব্যতিরেকে তের রাকাআত হওয়াও প্রমাণিত আছে। দেখুন সহীহ বুখারী হাদীস নং ১১৬৪; ফাতহুল বারী ৩/২৬; কিতাবুত তাহাজ্জুদ, অধ্যায় ১০।

অন্যান্য সহীহ হাদীস দ্বারা এটাও প্রমাণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রাত্রের নামাজ  ঈশার দুই রাকাআত সুন্নত ও বিতর ছাড়া কখনো কখনো সর্বমোট চৌদ্দ রাকাআত বা ষোল রাকাআত হতো; বরং কোনো বর্ণনামতে আঠারো রাকাআতও প্রমাণিত হয়। নাইলুল আওতার, শাওকানী ৩/২১, হাদীস নাম্বার ৮৯৭; আত-তারাবীহু আকসারা মিন আলফি আম ফিল মাসজিদিন নাবাবী, আতিয়্যা মুহাম্মদ সালেম, সৌদি আরব ২১

উম্মুল মুমিনীন আয়িশা রা. এর হাদীসটি যদি তারাবীহ বিষয়ক হতো তাহলে স্বয়ং উম্মুল মুমিনীন মসজিদে নববীর বিশ রাকাআত তারাবীহ এর উপর আপত্তি করতেন। ১৪ হিজরী থেকে নিয়ে উম্মুল মুমিনীনের মৃত্যু সন ৫৭ হিজরী সন পর্যন্ত অবিরাম চল্লিশ বছর তাঁর হুজরা সংলগ্ন মসজিদে নববীতে বিশ রাকাআত তারাবীহ হয়েছে। উম্মুল মুমিনীন কি কখনো এর উপর আপত্তি করেছেন? তার কাছে তারাবীহ এর রাকাআত সংখ্যার ব্যাপারে একটি অকাট্য হাদীস রয়েছে আর তাঁর সামনে চল্লিশ বছর পর্যন্ত এই হাদীসের বিরোধিতা হচ্ছে, তারপরও তিনি নীরব নিশ্চুপ থাকবেন? এটা কি কখনো সম্ভব?

২.    তাদের উপস্থাপিত দ্বিতীয় দলীলটি হলো, ইসা বিন জারিয়া রা. জাবের রা. এর উদ্ধৃতিতে বর্ণনা করেন, রমাযানের এক রাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিয়ে আট রাকাআত এবং বিতর পড়লেন। পরদিন আমরা মসজিদে একত্রিত হলাম। আশা করছিলাম তিনি আমাদের মাঝে উপস্থিত হবেন। সকাল গড়িয়ে গেল কিন্তু তিনি আসলেন না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি আশঙ্কা করেছিলাম, তোমাদের উপর বিতর ফরজ করে দেয়া হবে। সহীহ ইবনে খুজাইমা ২/১৩৮/১০৭০

হাদীসটির সনদ-সূত্রে ইসা বিন জারিয়া নামের একজন বর্ণনা কারী রয়েছেন। হাদীস শাস্ত্রের কতিপয় ইমাম তাকে মাতরুক এবং মুনকারুল হাদীস বলে অভিহিত করেছেন। মাতরূক অর্থ, পরিত্যাজ্য; যার বর্ণনা দলীল বা সমর্থক দলীল কোনো ক্ষেত্রেই গ্রহণযোগ্য নয়। মুনকারুল হাদীস হলো, এমন একজন বর্ণনা কারী যে ভুল বা আপত্তিকর কথাকে ভুলক্রমে বা ইচ্ছাকৃতভাবে হাদীস হিসেবে বর্ণনা করে।

ইমাম ইবনে আদী রহ. উপরোক্ত হাদীসটিকে গায়রে মাহফুজ সাব্যস্ত করেছেন। ইবনে আদী রহ. এর পরিভাষায় গায়রে মাহফুজ শব্দটি মুনকার বা বাতিল বর্ণনার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। ইমাম আবু দাউদ রাহ. বলেন, তাঁর বর্ণনায় বহু মুনকার হাদীস রয়েছে। মুনকার যয়ীফ হাদীসেরই একটি প্রকার। তবে তা এতটাই দুর্বল যে, এর দ্বারা প্রমাণ উপস্থাপন করা বিধিত নয়। বিস্তারিত জানতে দেখুন, তাহযীবুল কামাল ১৪/৫৩৩, আল-কামিল, ইবনে আদী ৬/৪৩৬, আয-যুআফাউল কাবীর, উকাইলী ৩/৩৮৩; ইতহাফুল মাহারাহ বি আতরাফিল আশারাহ, ইবনে হাজার আসকালানী ৩/৩০৯।  যদিও হাদীসটিকে শায়খ আলাবানী রাহ. হাসান বলে অভিহিত করতে দ্বিধা করেন নি। অথচ তিনি অসংখ্য সহীহ হাদীসকেও মওযু বা যয়ীফ বলতে সামান্যতমও কার্পণ্য করেন নি!

তাছাড়া হাদীসটিতে বলা হয়েছে, এটি রমাযানের এক রাতের ঘটনা। আর সে সময় জামাতবদ্ধ তারাবীহ এর প্রচলন ছিল না। সে হিসেবে বর্ণনাটি সহীহ ধরে নেয়া হলেও একথা বলার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে, অবশিষ্ট রাকাআতগুলো একাকি পড়ে নেয়া হয়েছে। আর এটা নিছক কোনো অনুমান বা সম্ভাবনা নয়; সহীহ মুসলিমে এধরনের একটি ঘটনা রয়েছে। ঘটনাটিতে বলা হয়েছে, আনাস রা. বলেন, রমাযানের এক রাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজ পড়ছিলেন। আমি এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পেছনে দাঁড়িয়ে যাই। এরপর আরেকজন আসে। সে এসে আমার পাশে দাঁড়ায়। এরপর আরেকজন আসে। এভাবে একটি জামাতে পরিণত হয়ে যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন অনুধাবন করতে পারলেন, আমরা তাঁর পেছনে দাঁড়িয়েছি তখন নমাজকে সংক্ষেপ করে দাঁড়িয়ে গেলেন। এরপর নিজ গৃহে গিয়ে আরো কিছু নামাজ পড়লেন যা আমাদের কাছে পড়েন নি। ভোর হলে আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করলাম, গত রাতে কি আপনি আমাদের উপস্থিতি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যা। এবং তোমাদের এব্যাপারটিই আমাকে আমার কৃত কার্যের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছে। সহীহ মুসলিম ৩/১৩৪/২৬২৫

হাদীসটিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, এরপর নিজ গৃহে গিয়ে আরো কিছু নামাজ পড়লেন যা আমাদের কাছে পড়েন নি।

সার কথা, বিচ্ছিন্ন ঘটনা ও অস্পষ্ট বক্তব্য সম্বলিত একটি মুনকার ও অতি দুর্বল বর্ণনাকে উপরোক্ত অকাট্য দলীলসমৃদ্ধ এবং সর্বসম্মত একটি বক্তব্যের বিপক্ষে দাঁড় করানো আদৌ যথার্থ নয়। উপরন্তু যদি হাদীসটি সহীহ হতো এবং এর দ্বারা আট রাকাআত তারাবীহ প্রমাণিত হতো তাহলে উবাই ইবনে কাব রা. ই তো সর্বপ্রথম বিশ রাকাতের বিপক্ষে এই হাদীসটি পেশ করতেন।

৩.   তারা নিজেদের মতের স্বপক্ষে তৃতীয় যে বর্ণনাটি উপস্থাপন করে থাকেন তাও সে ইসা বিন জারিয়া রা. এর বর্ণনা। তিনি উবাই বিন কাব রা. এর উদ্ধৃতিতে বর্ণনা করেছেন। নিতান্ত একজন দুর্বল বর্ণনা কারীর বর্ণনা দ্বারা প্রমাণ উপস্থাপন করা আদৌ সমীচীন নয়। তদুপরি এটি যে একটি তারাবীহ সংক্রান্ত হাদীস তারও কোনো প্রামাণ্য ভিত্তি নেই। আর ঘটনা কাল রমাযান মাস কি না তাও সন্দেহপূর্ণ। বিস্তারিত জানতে অধ্যয়ন করা যেতে পারে হাবীবুর রহমান আজমী রহ. রচিত রাকাআতে তারাবীহ ৪০। তাছাড়া যদি উপরোক্ত বর্ণনাটি সহীহ হতো এবং তাতে তারাবীহ এর রাকাআত সংখ্যা উল্লেখ থাকত তাহলে উবাই বিন কাব রা. যখন তারাবীহ এর ইমাম হলেন তখন আট রাকাতই পড়াতেন; বিশ রাকাআত পড়াতেন না।

৪.    তারা চতুর্থ যে বর্ণনাটি উপস্থাপন করে থাকেন তাও একটি ত্রুটিপূর্ণ বিবরণ। একজন বর্ণনাকারী উমর রা. এর যুগের নামাজের বিবরণ দিতে গিয়ে ভুলক্রমে বিশের স্থলে এগারো রাকাআত উল্লেখ করেন। আর একেই তারা দলীল হিসেবে লুফে নিলেন। অথচ উমর রা. এর যুগে তারাবীহ এর নামাজ যে বিশ রাকাআত হতো এতে সংশয়ের কোনো অবকাশ নেই। ইমাম ইবনে আব্দুল বার রহ.সহ অনেক মুহাক্কিক আলেম বিশের স্থলে এগারো উল্লেখ করাকে বর্ণনাকারীর ভুল বলে অভিহিত করেছেন। দেখুন, আল-ইসতিযকার ৫/১৫৭, রাকাআতে তারাবীহ ১২।

আট রাকাতের পক্ষে আমাদের ভাইদের সবচেয়ে শক্তিশালী (?) যুক্তিঅস্ত্র হলো, তারাবীহ এবং তাহাজ্জুদ একই নামাজ। আমাদের কাছে মনে হচ্ছে, তারা আট রাকাতের স্বপক্ষে শক্তিশালী কোনো দলীল না পেয়েই এই যু্ক্তির আশ্রয় নিয়েছেন। নতুবা এটা ঢোপে টেকার মত কোনো যুক্তি নয়। কারণ এ যে তারাবীহ এবং তাহাজ্জুদকে একাকার করে দেখানো হচ্ছে এর স্বপক্ষে কি কোনো হাদীস আছে? সাহাবী উক্তি কিংবা তাবিয়ী উক্তি আছে? অন্য কোনো মাসে শেষ নিশিথে দাঁড়িয়ে কেউ কি কোনো কালে বলেছে আমি তারাবীহ পড়ছি। রামাযান মাসে ঈশার নামাজের পরে তারাবীহতে দাঁড়িয়ে কেউ কি বলছে আমি তাহাজ্জুদ পড়ছি। দুটি নামাজ এক হলে একথা কেউ বলেন নি কেন? বাধা কোথায়? প্রশ্ন হতে পারে একটি বিষয়ের দুটি নাম হতে পারে। উত্তরে আমরাও বলি একটি বিষয়ের দুটি নাম হতে পারে; বরং দুটি কেন একাধিক নামও হতে পারে। তবে তার জন্য শর্ত হলো যে কোনো নামে যখন তখন সম্বোধন করা বিধিত থাকতে হবে। এক সময় এক নাম অন্য সময় ভিন্ন নাম এমনটি হলে এটা ঐবিষয়ের একাধিক নাম হলো না। তাহাজ্জুদের জায়গায় তারাবীহ, তারাবীহের জায়গায় তাহাজ্জুদ বলার বৈধতা এবং অনুমোদন থাকলেই কেবল বলা যাবে দুটো একই বিষয়। এবার আমরা তাহাজ্জুদ এবং তারাবীহ শব্দ দুটির আভিধানিক অর্থের দিকে লক্ষ করি। অভিধান এবং পরিভাষা এদুটো নামাজকে একই নামাজ হিসেবে অভিহিত করে কি না?

নিচে বিখ্যাত কিছু আরবী অভিধান গ্রন্থের বক্তব্য তুলে ধরছি।

তাহাজ্জুদ :

১.    তাহাজ্জুদ অর্থ রাতে ঘুমানো, ঘুম থেকে উঠে নামাজ আদায় করা। তাহাজ্জুদ শব্দটি স্ববিরোধী অর্থবহ একটি শব্দ। (অর্থাৎ শব্দটি একই সাথে ঘুমানো এবং ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার অর্থ প্রদান করে।) আলমুনাবী, আত্তাউকীফ আলা মুহিম্মাতিত তাআরিফ ১/২১১

২.    তাহাজ্জুদ অর্থ : রাতে ঘুমানো, ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়া। ইসমাইল বিন হাম্মাদ আলজাউহারী, আসসিহাহ ফিললুগাহ ২/২৪৩

৩.   তাহাজ্জুদ অর্থ : রাতে ঘুমানোর পর জাগ্রত হওয়া। ড. জাউয়াদ আলী, আলমুফাসসাল ফি তারিখিল আরব ১২/৪২৪

৪.    وتَهَجَّدَ القوم استيقظوا للصلاة  তাহাজ্জাদাল কাউমু অর্থ মানুষ নামাজের জন্য জাগ্রত হয়েছে। ইবনে মানযুর, লিসানুল আরব ৩/৪৩১

৫.    তাহাজ্জুদ অর্থ : রাতে নিদ্রা যাওয়া, নিদ্রা থেকে জাগ্রত হওয়া। সালাতুত তাহাজ্জুদ অর্থ ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে নফল নামাজ আদায় করা।  صلاة التهجد: التنفل بعد النوم…ঝঢ়বহফ ঃযব হরমযঃ রহ ঢ়ৎধুবৎ

মুহাম্মদ কালআজী, মুজামু লুগাতিল ফুকাহা ১/১৮১

 

তারাবীহ :

১.    তারাবীহ অর্থ : রমাযান মাসে দশ সালামে বিশ রাকাত নামাজ আদায় করা। তারাবীহকে তারাবীহ বলে নাম করণের কারণ হলো, মানুষ তারাবীহ নামাজের ভিতরে প্রত্যেক চার রাকাত অন্তর বসে এবং বিশ্রাম গ্রহণ করে। (তারাবীহ এটা আরবী তারবীহাহ এর বহুবচন। তারবীহাহ অর্থ বিশ্রাম গ্রহণ করা।) মুহাম্মদ বিন আবুল ফাতহ আলহাম্বলী, আলমাতলা আলা আবওয়াবিল ফিকহ ১/৯৫

২.    আমি তাদের নিয়ে তারাবীহ নামাজ আদায় করেছি এখানে তারাবীহ শব্দটি তারবীহাহ এর বহুবচন। আবু সাঈদ রা. থেকে বর্ণিত, প্রত্যেক চার রাকাত অন্তর মুসল্লীরা বিশ্রাম গ্রহণ করে থাকে বলে তারবীহাহকে তারবীহাহ বলা হয়। আল্লামা মুতাররিযী, আলমুগরিব ২/৪০৯

৩.   তারাবীহকে তারাবীহ নামে নাম করণ করা হয়েছে। কারণ মুসল্লীরা প্রত্যেক চার রাকাত অন্তর বিশ্রাম গ্রহণ করে থাকে। মুরতাযা আযযাবিদী, তাজুল আরুস ১/১৬০৪

৪.      তারাবীহ এর একবচন হলো, তারবিহাহ। অর্থ, বিশ্রাম গ্রহণ করা Recreation । তারাবীহকে তারাবীহ নামে নাম করণ করা হয়েছে। কারণ মুসল্লীরা প্রত্যেক চার রাকাত অন্তর বিশ্রাম গ্রহণ করে থাকে। The long prayers in nights of Ramadan  মুহাম্মদ কালআজী, মুজামু লুগাতিল ফুকাহা ১/১২৭

৫.    সালাতুত তারাবীহ অর্থ, রমাযান মাসে রাতে ঈশার নামাজের পর বিশ রাকাত নামাজ আদায় করা। A prayer performed during the nights of Ramadan

মুহাম্মদ কালআজী, মুজামু লুগাতিল ফুকাহা ১/১৭৫

উপরোক্ত অভিধানগুলোতে তাহাজ্জুদ এবং তারাবীহ এর স্পষ্ট সংজ্ঞা উল্লেখ করা হয়েছে। তাতে কোথাও তাহাজ্জুদ এবং তারাবীহকে একাকার করে দেখানো হয় নি। উল্লেখ করার মত বিষয় হলো, তাহাজ্জুদের ধাতুগত অর্থই হলো, ঘুমানো বা ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়া। এতে প্রতীয়মান হয়, তাহাজ্জুদের ব্যাপারটি ঘুমোত্তর সময়ের সাথে সংশ্লিষ্ট।

তাহাজ্জুদের বিষয়টি সরাসরি পবিত্র কুরআনে কারীমে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, এবং রাত্রির কিছু অংশে তাহাজ্জুদ নামাজ আদয় করবে। এটা আপনার এক অতিরিক্ত কর্তব্য। আশা করা যায়, আপনার প্রতিপালক আপনাকে প্রতিষ্ঠিত করবেন প্রশংসিত স্থানে। সূরা বানী ইসরাইল ৭৮

এবার লক্ষ করা যাক, মহান মুফাসসিরীনে কেরাম তথা কুরআন বিশেষজ্ঞগণ উপরোল্লিখত আয়াতের তাহাজ্জুদের কি ব্যাখ্যা করেছেন।

১.    তাহাজ্জুদের ব্যাপারে তিনটি উক্তি রয়েছে। ১. নিদ্রা যাওয়া এরপর নামাজ আদয় করা এরপর আবার নিদ্রা যাওয়া এরপর আবার নামজ পড়া। ২. ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে নামাজ আদায় করা ৩. ঈশার নামাজের পর নামাজ আদায় করা। এগুলো হলো তাবিয়ীনে কেরামের বিভিন্ন উক্তি। সম্ভবত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেহেতু ঘুমাতেন এরপর ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে নামাজ পড়তেন এরপর আবার ঘুমাতেন এরপর আবার নামাজ আদায় করতেন তাই তাবিয়ীনে কেরাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নামাজের এ পদ্ধতির অনুসরণে ঘুমোত্তর নামাজকে তাহাজ্জুদ বলে অভিহিত করেছেন। যদি ব্যাপারটি একারণেই হয়ে থাকে তাহলে এটিই ঘনিষ্ঠ যথোপযুক্ত অভিমত। ইবনুল আরাবী, আহকামুল কুরআন ৫/২৮৬

২.    হাজ্জাজ বিন আমর আনসারী রা. বলেন, তোমাদের অনেকে ধারনা করে, শেষ রাত অবধি নামাজ পড়া হলেই তা তাহাজ্জুদ নামাজ হয়ে গেল। না ব্যাপারটি এমন নয়।  বরং তাহাজ্জুদ হলো ঘুম থেকে উঠে নামাজ আদায় করা এরপর আবার ঘুমিয়ে তারপর নামাজ আদায় করা এরপর আবার ঘুমিয়ে জাগ্রত হয়ে নামাজ আদায় করা। এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর তাহাজ্জুদ নামাজ এমনি ছিল। আসওয়াদ এবং আলকামা রা. বলেন, তাহাজ্জুদ হলো, ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে নামাজ আদায় করার নাম। মুজামে কাবীর তাবারানী, হাদীস ৩২১৬, মাজামাউয যাওয়ায়েদ, হাদীস ৩৬১৬, হাইসামী রা. এর সনদ সহীহ এবং এসনদের বর্ণনাকারীগণ সহীহ বুখারীর বর্ণনাকারী।, আবু বাকার জাসসাস, আহকামুল কুরআন ৫/৩২

৩.   তাহাজ্জুদ অর্থ ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়া। এখন এটা একটি নামাজের নাম হয়ে গেছে। কারণ এ নামাজের জন্য জাগ্রত হতে হয়। সুতরাং তাহাজ্জুদ নামাজের পারিভাষিক অর্থ হলো, ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে নামাজ আদায় করা। আসওয়াদ, আলকামাহ এবং আব্দুর রহমান ইবনুল আসওয়াদ রাহ. তাহাজ্জুদের এ অর্থই করেছেন। এরপর কুরতুবী রাহ. হাজ্জাজ বিন আমরের হাদীসটি উল্লেখ করেন। সুতরাং আয়াতের অর্থ হলো, রাতের একটা সময় নামাজের জন্য জাগ্রত হও। ইমাম কুরতুবী, আলজামি লিআকামিল কুরআন ১০/৩০৮

৪.    ইবনে জারীর, ইবনে মুনযির এবং মুহাম্মদ বিন নাসর আলকামা এবং আসওয়াদ রা. থেকে বর্ণনা করেন, তাহাজ্জুদ অর্থ, ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে নামাজ আদায় করা।Ñ ইমাম সুয়ূতী রাহ., আদদুররুল মানসূর ৯/৭৬

৫.    আয়াতটির অর্থ হলো, ঘুম থেকে জাগ্রত হও এবং নামাজ আদায় করো। মুফাসসিরীনে কেরাম বলেন, ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়া ব্যতীত তাহাজ্জুদের নামাজ হয় না। জনৈক আনসার সাহাবী সম্বন্ধে বর্ণিত হয়েছে, একদা তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে এক সফরে ছিলেন। তখন সে বলল, আজ আমি দেখবো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিভাবে নামাজ আদায় করেন। তিনি বলেন, আমি দেখলাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুমালেন। এরপর ঘুম থেকে জাগ্রত হলেন। এরপর মস্তক মোবারক আকাশ পানে উত্তোলন করলেন, এরপর সূরা আলে ইমরানের চারটি আয়াত পাঠ করলেন। এরপর হাত দ্বারা কোনো ইবাদত করার ইচ্ছা করলেন এবং একটি মিসওয়াক হাতে নিলেন। এরপর তার দ্বারা দাঁত মাজলেন। এরপর উযু করলেন এরপর নামাজ পড়লেন। এরপর ঘুমালেন। এরপর আবার জাগ্রত হলেন এবং পূর্বোক্ত কাজগুলো আবার করলেন। উলামায়ে কেরাম মনে করেন এই নামাজই সেই তাহাজ্জুদের নামাজ যে নামাজ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নির্দেশ দিয়েছেন। -সুনানে নাসয়ী কুবরা, হাদীস ১০১৩৯, আবু ইসহাক নিশাপুরী, আলকাশফু ওয়াল বায়ান ৬/১২৩

৬.   আয়াতটির অর্থ হলো, ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে আপনি নামাজের জন্য দণ্ডায়মান হোন। আর তাহাজ্জুদ অর্থ হলো, ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে নামাজ আদায় করা। -আবুল লাইস সামারকান্দী, বাহরুল উলূম ৩/২৩

৭.   তাহাজ্জুদ ঐ নামাজকে বলা হয় যা ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে আদায় করা হয়। আলকামা আসওয়াদ,  ইবরাহীম নাখায়ী প্রমুখ তাহাজ্জুদের এ অর্থ করেছেন। আরবী ভাষায় তাহাজ্জুদের এ অর্থটিই প্রশিদ্ধ। তেমনিভাবে বিভিন্ন হাদীসের আলোকে প্রমাণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করতেন। ইবনে আব্বাস, আয়িশা রা.সহ অন্যান্য সাহাবী থেকে এ বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে। যেমনটি যথাস্থানে সুবিস্তর আলোচিত হয়েছে। যাবতীয় প্রশংসা এবং অনুগ্রহ আল্লাহ তাআলার জন্য। তবে হাসান বসরী রা. বলেন, তাহাজ্জুদ ঐ নামাজ যা ঈশার নামাজের পর আদায় করা হয়। তার একথার মর্মার্থ হবে, ঈশার নামাজের পর ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে যে নামাজ আদায় করা হয় তাই তাহাজ্জুদের নামাজ। তাফসীরে ইবনে কাসীর ৪/১৫০

৮.   অধিকাংশ মুফাসসিরীনে কেরামের মতে ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়া ব্যতীত তাহাজ্জুদ নামাজ হয় না। -তাফসীরুল আকাম ১/৩৭২

৯.    আয়াতটির অর্থ হলো, তুমি রাতের কিছু সময় নামাজের জন্য জাগ্রত হও। আলকামা রা.সহ অন্যান্য তাবিয়ীগণ বলেন, তাহাজ্জুদ হলো ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে আদায় করার নামাজ। হাসান বসরী রা. বলেন, ঈশার শেষ সময়ের পরে যে নামাজ আদায় করা হয় তাই তাহাজ্জুদ। -আব্দুর রহমান বিন মুহাম্মদ সাআলাবী, জাওয়াহিরুল হিসান ২/৩৫৫

১০.  আয়াতটির অর্থ তুমি ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে নামাজের জন্য দাঁড়াও। তাহাজ্জুদ অর্থই হলো, ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে নামাজ আদায় করা। -আলাউদ্দীন আলবাগদাদী, তাফসীরুল খাযিন ৪/১৭৪

১১.  আল্লামা আযহারী রাহ. বলেন, আরবী ভাষায় প্রশিদ্ধ হলো, সেখানে ঘুমন্ত ব্যক্তিকে হাজিদ বলা হয়। এরপর আমরা দেখলাম, শরয়ী পরিভাষায় যে ব্যক্তি ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে নামাজ আদায় করে তাকে মুতাহাজ্জিদ বলা হয়। সুতরাং এখন একথা মেনে নেয়া আবশ্যক হয়ে গেল যে, ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে নামাজ আদায়কারী ব্যক্তিকে মুতাহাজ্জিদ করে নাম করণ করা হয়েছে নিজের ঘুমকে দূরীভুত করার কারণে। আমি বলি, এখানে আরো একটি সম্ভাবনা রয়েছে। আর তা হলো, মানুষ সাধের ঘুমকে পরিত্যাগ করে এবং নামাজের জন্য ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার কষ্টকে স্বীকার করে নেয় যাতে সে মৃত্যুকালীন ঘুমকে আনন্দময় করে তুলতে পারে। সুতরাং এই ঘুম পরিত্যাগের মূল উদ্দেশ্য যেহেতু মৃত্যুকালীন স্বাচ্ছন্দ্যময় নিদ্রাজীবন লাভ করা তাই গভীর রাত্রের এই বিনিদ্র নামাজকে তাহাজ্জুদ করে নাম করণ করা হয়েছে। এখানে তাহাজ্জুদ নাম করণের তৃতীয় আরো একটি কারণ রয়েছে। আর তা হলো, হাজ্জাজ বিন আমর আনসারী রা. বলেন, তোমাদের অনেকে ধারনা করে, শেষ রাত অবধি নামাজ পড়া হলেই তা তাহাজ্জুদ নামাজ হয়ে গেল। না ব্যাপারটি এমন নয়।  বরং তাহাজ্জুদ হলো ঘুম থেকে উঠে নামাজ আদায় করা এরপর আবার ঘুমিয়ে তারপর নামাজ আদায় করা এরপর আবার ঘুমিয়ে জাগ্রত হয়ে নামাজ আদায় করা। এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর তাহাজ্জুদ নামাজ এমনি ছিল। -তাফসীরে রাযী ১০/১০৮

১২.  তাহাজ্জুদকে তাহাজ্জুদ বলে নাম করণ করা হয়েছে। কারণ এর মূল বিষয়টি হলো, ঘুমিয়ে যাওয়া এরপর জাগ্রত হয়ে নামাজ আদায় করা। এরপর আবার ঘুমিয়ে যাওয়া এরপর আবার জাগ্রত হয়ে নামাজ আদায় করা। সুতরাং তাহাজ্জুদ অর্থ হলো ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে নামাজ আদায় করা। যেমনটি ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং দাউদ আলাইহিস সালাম এর নামাজ। আব্দুল্লাহ বিন আমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তাআলার নিকট সবচে প্রিয় রোযা দাউদ আ. এর রোযা এবং আল্লাহ তালার নিকট প্রিয় নামাজ হলো, দাউদ আ. এর নামাজ। দাউদ আ. অর্ধ রাত্রি ঘুমাতেন এবং এক তৃতীয়াংশ রাত্রি নামাজ পড়তেন এরপর এক ষষ্ঠমাংশ রাত্রি ঘুমাতেন এবং তিনি একদিন রোযা রাখতেন এবং একদিন রোযাবিহীন থাকতেন। সাহীহ মুসলিম, হাদীস ২৭৯৬, নিযামুদ্দীন নিশাপুরী, তাফসীরু গারাইবিল কুরআন ৮/১৯৭

১৩.  আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবীকে বলেন, আপনি রাতে ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে কুরআনের মাধ্যমে নামাজ আদায় করুন। আর তাহাজ্জুদ অর্থ রাতের বেলা ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়া। হাজ্জাজ বিন আমর, আলকামা, আলআসওয়াদ, আব্দুর রহমান ইবনুল আসওয়াদ রা. বলেন, তাহাজ্জুদ হলো ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে আদায় করার নামাজ। হাসান বসরী রা. বলেন, তাহাজ্জুদ হলো, ঈশার শেষ সময়ের পর আদায় করা নামাজ। জনৈক আনসার সাহাবী সম্বন্ধে বর্ণিত হয়েছে, একদা তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে এক সফরে ছিলেন। তখন সে বলল, আজ আমি দেখবো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিভাবে নামাজ আদায় করেন। তিনি বলেন, আমি দেখলাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুমালেন। এরপর ঘুম থেকে জাগ্রত হলেন। এরপর মস্তক মোবারক আকাশ পানে উত্তোলন করলেন, এরপর সূরা আলে ইমরানের চারটি আয়াত পাঠ করলেন। এরপর হাত দ্বারা কোনো ইবাদত করার ইচ্ছা করলেন এবং একটি মিসওয়াক হাতে নিলেন। এরপর তার দ্বারা দাঁত মাজলেন। এরপর উযু করলেন এরপর নামাজ পড়লেন। এরপর ঘুমালেন। এরপর আবার জাগ্রত হলেন এবং পূর্বোক্ত কাজগুলো আবার করলেন। উলামায়ে কেরাম মনে করেন এই নামাজই সেই তাহাজ্জুদের নামাজ যে নামাজ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নির্দেশ দিয়েছেন। -আবু জাফর তাবারী, জামিউল বায়ান ৯/২৪৫-২৪৬

১৪.  আয়াতটির অর্থ, আপনি রাতের বেলা ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে নামাজ এবং কুরআন পাঠের মাধ্যমে আপনার প্রভুর উদ্দেশে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায়কারী হোন। -মুহাম্মদ সাবুনী, সফওয়াতুত তাফাসীর ২/১৩৮

১৫.  প্রথম রাত্রে ঘুমিয়ে এরপর জাগ্রত হয়ে নামাজ আদায় করা হলো তাহাজ্জুদের নামাজ। -সাইয়িদ কুতুব শহীদ, ফি জিলালি কুরআন ৬৫/৫৫

সার কথা, তাহাজ্জুদ এটি ইসলামের প্রথম যুগের বিধান। রমাযানের রোযা ফরজ হওয়ার অনেক আগে ইসলামের প্রথম যুগে মক্কায় তাহাজ্জুদ বিষয়ে সূরা মুয্যাম্মিল অবতীর্ণ হয়। আর রমাযানের রোযা ফরজ হয় হিজরতের পর মদীনায় দ্বিতীয় হিজরীতে। আর তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তালা রমাযানের রোযা তোমাদের উপর ফরজ করেছেন এবং এই মাসে রাত জেগে নামাজ পড়াকে সুন্নত করেছি। সুনানে নাসায়ী, হাদীস ২২০৯, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ১৩২৮

এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপরোক্ত হাদীসে রমাযানের রাতে যে নামাজকে সুন্নত করেছে তা দ্বারা যদি তাহাজ্জুদ উদ্দেশ্য হয় তাহলে তো হাদীসটি অনর্থক সাব্যস্ত হয়ে যায়। কারণ তাহাজ্জুদ নামাজের বিধান তো আগে থেকেই পুরো বছরের জন্য প্রবর্তিত হয়ে আছে। তো এখন নতুন করে তাহাজ্জুদকে সুন্নত হিসেবে প্রবর্তন করার কি মানে হতে পারে? তাছাড়া রোযার বিধান প্রবর্তিত হওয়ার আগে তো বহু রমাযান অতীত হয়েছে সেসব রমাযানে কি রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরাম তাহাজ্জুদ আদায় করেন নি? আদায় করে থাকলে এখন নতুন করে তাহাজ্জুদের বিধান প্রণয়নের কি স্বার্থকতা থাকতে পারে। তাছাড়া তাহাজ্জুদের বিধানটি সরাসরি কুরআনে পাকে অবতীর্ণ করেছেন। তাহলে এব্যাপারে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপরোক্ত বাণীটি কি করে প্রযোজ্য হতে পারে? যদি বলা হয় রাসূল সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ প্রদত্ত তাহাজ্জুদের বিধানটিরই সীমাহীন গুরুত্ব বুঝানোর জন্য উক্ত উক্তি করেছেন। তাহলে বলব, আল্লাহ প্রদত্ত তাহাজ্জুদের বিধানটি তো সারা বছরের জন্য ব্যপৃত ছিল। এবং রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাণীতে তো রমাযানের মাঝে সীমিত করে দেয়া হয়েছে। দুটি বিষয়ের সীমানা পরিধি তো এক হওয়া চাই। তা না হলে গুরুত্ব বর্ণনার কোনো সুযোগ থাকে না। বরং তা আলাদা দুটি বিষয়ে পরিণত হয়ে যায়। বরং রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাণীটি এমন নামাজের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে যার বিধান কুরআন মাজীদের মাধ্যমে নয়, হাদীসের মাধ্যমে প্রবর্তিত হয়েছে। আর তা হলো তারাবীহ নামাজ। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণীয় বিষয় হলো, গাইরে মুকাল্লিদ ভাইয়েরা আট রাকাত তারাবীহ এর সপক্ষে ইমাম বুখারী রাহ. এর তাহাজ্জুদ বিষয়ক নির্দিষ্ট হাদীসটি দ্বারা প্রমাণ উপস্থাপন করে থাকেন। এবং ইমাম বুখারী রাহ. এর অনুসরণের খুব আগ্রহ ও উদ্দীপনা প্রকাশ থাকেন। কিন্তু ইমাম বুখারী রাহ. কি আট রাকাত তারাবীহ এর সপক্ষে ছিলেন কি না? বা তারাবীহ নামাজ আদায়ের ব্যাপারে তাঁর কর্মপন্থা কি ছিল? ইতিহাস বলে, ইমাম বুখারী রাহ. তারাবীহ এবং তাহাজ্জুদকে এক নামাজ মনে করতেন না; বরং দুটি নামাজকে ভিন্ন ভিন্ন নামাজ মনে করতেন। এবং তিনি রাতের প্রথম ভাগে তারাবীহ পড়তেন এবং শেষ ভাগে তাহাজ্জুদ পড়তেন। আর তারাবীহের প্রতি রাকাতে বিশ আয়াত করে পাঠ করতেন। এবং এভাবেই কুরআন খতম করতেন। ঘটনাটি ইবনে হাজার আসকালানী ফাতহুল বারীর ভূমিকা গ্রন্থ হাদইউস সারীতে, ইউসুফ আলমিযযী তাহযীবুল কামাল গ্রন্থে এবং খতীবে বাগদাদী তাঁর রিজাল গ্রন্থ তারিখে বাগদাদে এবং অন্যান্য রিজালবিদ ইমামগণ নিজ নিজ গ্রন্থে নির্ভরযোগ্য সূত্রে এনেছেন। বিষয়টি আরবী পাঠ নিম্নরূপ :

قال الحاكم أبو عبد الله الحافظ أخبرني محمد بن خالد حدثنا مقسم بن سعد قال كان محمد بن إسماعيل البخاري إذا كان أول ليلة من شهر رمضان يجتمع إليه أصحابه فيصلى بهم ويقرأ في كل ركعة عشرين آية وكذلك إلى أن يختم القرآن وكان يقرأ في السحر ما بين النصف إلى الثلث من القرآن فيختم عند السحر في كل ثلاث ليال- هدى السارى مقدمة فتح البارى

অর্থ : মাকসাম বিন সাদ রাহ. বলেন, রমাযান মাসে রাতের প্রথম ভাগে মুহাম্মদ বিন ইসমাঈল বুখারীর নিকট তাঁর শিষ্যবৃন্দ জড়ো হয়ে যেত। তখন তিনি তাদের নিয়ে নামাজ পড়তেন। এবং প্রত্যেক রাকাআতে বিশ আয়াত করে পাঠ করতেন।  এবং এভাবে তিনি কুরআন খতম করতেন।  আর সাহরীর সময় নামাজে কুরআনের অর্ধাংশ থেকে নিয়ে এক তৃতীয়াংশ পর্যন্ত পাঠ করতেন। এভাবে তিন রাতে সাহরীর সময় কুরআন খতম করতেন। -হাদইউস সারী ৫৬৩, ইউসুফ আলমিযযী, তারীখে বাগদাদ ২/১২, তাহযীবুল কামাল ২৪/৪৪৬, ইবনে আসাকির, তারিখু মাদীনাতি দিমাশক ৫২/৭৯, আবুল ফারজ ইবনুল জাওযী, সিফাতুস সাফওয়াহ ৩/১৯, আবু ইয়ালা হাম্বালী, তাবাকাতুল হানাবিলাহ ১/১৯৬

এ ঘটনা থেকে প্রতীয়মান হয় ইমাম বুখারী রাহ. অন্যান্য উলামায়ে সালাফের মত তারাবীহকে তাহাজ্জুদ থেকে ভিন্ন নামাজ মনে করতেন। সাথে সাথে এটাও প্রমাণ হয়, ইমাম বুখারী রাহ. তারাবীহ আট রাকাআত নয় বেশি পড়তেন। কারণ তারাবীহ আট রাকাআত পড়লে রমাযান মাস ত্রিশ দিনের হলেও প্রতি রাকাআতে বিশ আয়াত করে পড়ে কুরআন খতম করা সম্ভব নয়। -মাওলানা আব্দুল মালেক দা. বা., তারাবীহ বিষয়ক দুটি প্রশ্ন ও তার উত্তর, মাজাল্লাতুল কাউসার সেপ্টেম্বর ০৮, ১৮

তাহাজ্জুদ ইসলামের শুরু যুগে সবার উপর ফরজ ছিল। এক বছর পর তাহাজ্জুদের ফরজ বিধান রহিত হয়ে রমাযান এবং অন্যান্য মাসে নফল হিসেবে চলমান থাকে। সাদ বিন হিশাম রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আয়িশা রা. কে জিজ্ঞেস করলাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রাতের নামাজ সম্বন্ধে। তখন তিনি বললেন, তুমি কি পাঠ করো নি { يا أيها المزمل } ? তিনি বললেন, হ্যা, পাঠ করেছি। আয়িশা রা. বললেন যখন এ সূরাটির প্রথম অংশ অবতীর্ণ হয় তখন সাহাবায়ে কেরাম রাতে নামাজ পড়তে শুরু করেন। ফলে তাঁদের পদদ্বয় ফুলে যায়। সূরার শেষ অংশ এগারো মাস আকাশে আবদ্ধ থাকে। এক বছর পর তা অবতীর্ণ হয়। সুতরাং রাতের নামাজ ফরজ হওয়ার পর নফলে পরিণত হয়ে যায়। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৩৪২

আয়িশা রা. এর হাদীস দৃষ্টে ইমাম বাগাভী রাহ. বলেন, এই আয়াতের আলোকে তাহাজ্জুদ অর্থাৎ রাত্রির নামাজ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সমগ্র উম্মতের উপর ফরজ ছিল। এটা পাঞ্জেগানা নামাজ ফরজ হওয়ার পূর্বের কথা। এই আয়াতে তাহাজ্জুদের নামাজ কেবল ফরজই করা হয় নি; বরং তাতে রাত্রির কমপক্ষে এক চতুর্থাংশ নিযুক্ত থাকাও ফরজ করা হয়েছে। কারণ আয়াতের মূল আদেশ হচ্ছে, কিছু অংশ বাদে সমস্ত রাত্রি নামাজে রত থাকা। উক্ত আয়াতের আদেশ পালনার্থে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরাম অধিকাংশ রাত্রি তাহাজ্জুদের নামাজে ব্যয় করতেন। ফলে তাঁদের পদদ্বয় ফলে যেত এবং আদেশটি বেশ কষ্টসাধ্য প্রতীয়মান হত। পূর্ণ এক বছর পর সূরার শেষাংশ فاقرءوا ماتيسر منه  অবতীর্ণ হলে দীর্ঘক্ষণ নামাজে দণ্ডায়মান থাকার বাধ্যবাধকতা রহিত করে দেয়া হয় এবং বিষয়টি ইচ্ছার উপর ছেড়ে দিয়ে  ব্যক্ত করা হয় যে, যতক্ষণ নামাজ পড়া সহজ মনে হয়, ততক্ষণ নামাজ পড়াই তাহাজ্জুদের জন্য যথেষ্ট। এই বিষয়বস্তু সুনানে আবুদাউদ ও নাসয়ীতে আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত আছে। ইবনে আব্বাস রা. বলেন, মিরাজ রাত্রিতে পাঞ্জেগানা নামাজ ফরজ হওয়ার আদেশ অবতীর্ণ হলে তাহাজ্জুদের আদেশ রহিত হয়ে যায়। তবে এরপরও তাহাজ্জুদ সুন্নত থেকে যায়। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও অধিকাংশ সাহাবায়ে কেরাম সর্বদা নিয়মতান্ত্রিকভাবে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়তেন। -মাআরিফুল কুরআন (বাংলা) ১৪১৪

হাদীসটির পরিপ্রেক্ষিতে একটি প্রশ্ন সৃষ্টি হয়। প্রশ্নটি হলো, তাহাজ্জুদ প্রথমে ফরজ ছিল। এরপর তা নফল করা হয়। অন্য দিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তারাবীহ নামাজ ফরজ হয়ে যাওয়ার ভয়ে জামাতবদ্ধভাবে নিয়মতান্ত্রিক পড়েন নি। এখন যদি বলা হয়, তাহাজ্জুদ এবং তারাবীহ একই নামাজ তাহলে প্রশ্ন হয়, একই নামাজকে একবার ফরজ করলেন এরপর আবার তার ফরজ বিধান রহিত করে নফল করে দিলেন। সেই নামাজের নফল বিধান রহিত করে দিয়ে আবার ফরজ করে দিবেন বা দিতেন? ইসলামী শরীয়ার কোনো বিধানের ক্ষেত্রে কি এমনটি হয়েছে যে, একবার ফরজ করে আবার নফল করা হয়েছে। এরপর আবার ফরজ করা হয়েছে বা ফরজ করার আশংকা বা আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে?

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিদিন তাহাজ্জুদ শেষ রাতে পড়তেন। মাসরুক রা. বলেন, আমি আয়িশা রা. কে জিজ্ঞেস করলাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে কখন নামাজ আদায় করতেন? উত্তরে তিনি বললেন, যখন গভীর রজনীতে মোরগের ডাক শুনতেন তখন নামাজ আদায় করতেন। -সহীহ বুখারী, হাদীস ১১৩২

অন্য দিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তারাবীহ নামাজ শুরু রাত্রে পড়তেন। আবুযর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে রোযা রাখতাম। তিনি আমাদের নিয়ে রমাযান মাসে রাতের নামাজ পড়েন নি। তবে রমাযানের সাত দিন অবশিষ্ট থাকতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিয়ে রাতের এক তৃতীয়াংশ পর্যন্ত নামাজ পড়লেন। রমাযানের ছয় দিন বাকি থাকতে আমাদের নিয়ে নামাজ পড়লেন না। আবার রমাযানের পাঁচ দিন বাকি থাকতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অর্ধ রাত্র পর্যন্ত আমাদের নিয়ে নামাজ পড়লেন। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! যদি আমাদের সারা রাত নামাজ পড়ার সুযোগ দিতেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যখন কোনো ব্যক্তি ইমামের নামাজ শেষ পর্যন্ত তার সাথে নামাজ পড়ে তাহলে তখন তার আমল নামায় সারা রাত নামাজ পড়ার পূণ্য লিপিবদ্ধ হয়ে যায়। এরপর রমাযানের চার দিন বাকি থাকতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিয়ে নামাজ পড়লেন না। তবে রমাযানের তিন দিন বাকি থাকতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের পরিবার, স্ত্রী এবং অন্যান্য লোকদের একত্রিত করলেন এবং আমাদের নিয়ে সফলতা ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হওয়া পর্যন্ত নামাজ পড়লেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, সফলতা কি? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সাহরীর সময়। এরপর রমাযানের অন্যান্য দিনগুলোতে আমাদের নিয়ে রাতের নামাজ পড়েন নি। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৩৭৭, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ১০৯২

সাহাবায়ে কেরাম এবং তাবিয়ীগণও শুরু রাত্র থেকে তারাবীহ পড়া আরম্ভ করতেন।

হাসান রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মানুষ রমাযান মাসে নামাজ পড়ত। যখন রাতের এক চতুর্থাংশ গত হয়ে যেত তখন ঈশার নামাজ পড়ত। এবং যখন নামাজ থেকে ফিরে আসত তখন রাতের এক চতুর্থাংশ অবশিষ্ট থেকে যেত। -মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, হাদীস ৭৭৪০

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবসময় তাহাজ্জুদ একাকী পড়তেন। কখনো লোকজন ডেকে জামাত করতেন না। তবে যদি কেউ এসে দাঁড়িয়ে যেত তবে তিনি কিছু বলতেন না। যেমন ইবনে আব্বাস রা. নিজে একবার তাহাজ্জুদের সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পিছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তবে তারাবীহ এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। এর জন্য কয়েকবার ডেকে ডেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জামাত করেছেন। অন্য দিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাহাজ্জুদের জন্য পুরো রাত কখনো জাগ্রত থাকেন নি। আয়িশা রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভোর পর্যন্ত পূর্ণ রাত নামাজ পড়েন নি এবং কোনো রাত্রে পূর্ণ কুরআন শরীফ পড়েন নি। -সুনানে আবুদাউদ, হাদীস ১৩৪২

আয়িশা রা. এর এ বক্তব্য ছিল তাহাজ্জুদ বিষয়ে। নতুবা উপরে আবযর রা. এর বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে,  রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুবহে সাদিক পর্যন্ত তারাবীহ নামাজ পড়েছেন। আর আয়িশা রা. এর আবু যর রা. এর বর্ণনা সম্পর্কে সম্যক ধারনা ছিল। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ স্ত্রীদেরকে একত্রিত করে তারাবীহ নামাজ পড়েছেন। সুতরাং এবিষয়টি আয়িশা রা. এর অগোচরে থাকার কোনো প্রশ্নই উঠে না। …..ফাতাওয়া রাশীদিয়া ৩৫২….

এখানে উল্লেখ করার মত বিষয় হলো, আমাদের গাইরে মুকাল্লিদ ভাইরা তারাবীহ এবং তাহাজ্জুদ নামাজকে এক বলছেন এবং তা লোক সমাজে প্রচার করে চলছেন। অথচ তাদের দায়িত্বশীল আলেমগণ মনে করেন, তারাবীহ এবং তাহাজ্জুদ ভিন্ন দু শ্রেণীর নামাজ। এক্ষেত্রে প্রশিদ্ধ গাইরে মুকাল্লিদ আলেম মাওলানা সানাউল্লাহ অমৃতসরীর একটি আলোচনা প্রনিধানযোগ্য। মাওলানা আব্দুল্লাহ চকরালভী যখন তারাবীহ তাহাজ্জুদ নামাজ এক হওয়ার কথা প্রচার করতে আরম্ভ করে তখন মাওলানা সানাউল্লাহ অমৃতসরী লিখেন… এই সুস্পষ্ট জবাব পেয়েও ওই মৌলভী সাহেব (চকরালভী) তা মানতে রাজি হন নি; বরং জবাবের জবাব তৈরির অনেক চেষ্টা করেছেন। তার সকল চেষ্টার সারকথা এই যে, প্রথম রাতের নামাজ এবং শেষ রাতের নামাজ বস্তুত একই নামাজ, দুই নামাজ নয়। তারাবীহ যা প্রথম রাতে পড়া হয় তার অপর নাম তাহাজ্জুদ। একথার জবাবে এটুকু বলাই যথেষ্ট যে, এ দাবির সপক্ষে কোনো দলীল নেই। বরং বিপক্ষে দলীল রয়েছে। কেননা তাহাজ্জুদ শব্দের অর্থই হলো, ঘুম থেকে জেগে নামাজ আদায় করা। কামূসে রয়েছে, تهجد-استيقظ   অর্থ : সে ঘুম থেকে জাগ্রত হলো। রাসূল সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাযানে এবং রমাযানের বাইরে এগারো রাকাতের বেশি পড়তেন না। এ থেকে প্রমাণিত হয় না যে, প্রথম রাত এবং শেষ রাতের নামাজ একই নামাজ; বরং এ হাদীস থেকে শুধু এটুকুই প্রমাণ হয় যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এগারো রাকাআত নামাজ পড়তেন। সানাউল্লাহ অমৃতসরী, আহলে হাদীস কা মাযহাব : পৃ. ৯২-৯৩

অন্য দিকে রমাযান মাসে ঈশার সাথে তারাবীহ নামাজ পড়ার পর তাহাজ্জুদ পড়া যাবে কি না এ প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়েছে :

প্রশ্ন : যে ব্যক্তি রমাযান মাসে ঈশার সময় তারাবীহ নামাজ পড়ল সে শেষ রাতে তারাবীহ নামাজ পড়তে পারবে কি না?

উত্তর : পারবে। কেননা তাহাজ্জুদের সময়ই হচ্ছে সুবহে সাদিকের আগে। প্রথম রাতে তাহাজ্জুদ হয় না।

প্রশ্ন : রমাযান মাসে তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ দুই নামাজ থাকে, না তারাবীহ নামাজই তাহাজ্জুদের স্থলবর্তী হয়ে যায়?

উত্তর : যদি তারাবীহ প্রথম রাতে আদায় করা হয় তবে তা শুধু তারাবীহ বলে গণ্য হয়। আর শেষ রাতে পড়লে তা তাহাজ্জুদেরও স্থলবর্তী হয়। -সানাউল্লাহ অমৃতসরী, ফাতাওয়া সানাইয়্যাহ : ১/৬৮২-৬৫৪

উপরোক্ত প্রশ্নোত্তর থেকে যে বিষয়গুলো উপলব্ধ হয় :

১.    যে ব্যক্তি প্রথম রাতে তারাবীহ পড়ে সে শেষ রাতে তাহাজ্জুদও পড়তে পারে। যেহেতু আজকাল সকল মানুষ প্রথম রাতেই তারাবীহ পড়ে থাকে তাই তাদের শেষ রাতে তাহাজ্জুদ পড়া উচিত।

২.    তাহাজ্জুদের সময় হলো রাতের শেষ ভাগে।

৩.   প্রথম রাতের ইবাদতকে তাহাজ্জুদের স্থলবর্তী বলা যায় না।

৪.    কেউ যদি কখনো শেষ রাে তারাবীহ পড়ে তবে তা তাহজ্জুদেরও স্থলবর্তী হবে। এ কথার আরও স্পষ্ট ব্যাখ্যা মাওলানা সানউল্লাহ অমৃতসরীর দিয়েছেন। তিনি বলেন, তারাবীহ তাহাজ্জুদের স্থলবর্তী হওয়ার কারণে এই দুইটি এক নামাজ হওয়া প্রমাণিত হয় না। যেমন জুমআর নামাজ জোহরের স্থলবর্তী হওয়ায় জুমআ- জোহর এক নামাজ প্রমাণিত হয় না। আহলে হাদীস কা মাযহাব : পৃ. ৯৩

মাওলানা যাকারিয়া আব্দুল্লাহ অনুদিত ড. শায়খ মুহাম্মদ ইলয়াস ফয়সাল রচিত নবীজীর নামাজ ৩৭০-৩৭৩

আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে চার রাকাত নামাজ পড়তেন এরপর তারাওউহ করতেন। অর্থাৎ বিশ্রাম গ্রহণ করতেন। এরপর আবার দীর্ঘক্ষণ নামাজ আদায় করতেন। ফলে আমার তাঁর উপর খুব মায়া হতো। আমি বলতাম, আল্লাহর রাসূল! আপনার উপর আমার বাবা মা উৎসর্গিত হোক আল্লাহ তাআলা তো আপনার অতীতের যাবতীয় গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন! তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি কি আল্লাহ তাআলার কৃতজ্ঞ বান্দাহ হবো না! ইমাম বাইহাকী রাহ. বলেন, যদি ব্যাপারটি প্রমাণিত হয়ে থাকে তাহলে সেটা হলো ইমাম সাহেব তারাবীহ নামাজে যে চার রাকাত পর বিশ্রাম গ্রহণ করে থাকেন সে বিশ্রাম। সুনানে বাইহাকী, হাদীস ৪৮০৭

সম্পর্কিত প্রশ্নগুচ্ছ

322,785 টি প্রশ্ন

413,316 টি উত্তর

128,074 টি মন্তব্য

177,751 জন নিবন্ধিত সদস্য

বিস্ময় বাংলা ভাষায় সমস্যা সমাধানের একটি নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। এখানে আপনি আপনার প্রশ্ন করার পাশাপাশি অন্যদের প্রশ্নে উত্তর প্রদান করে অবদান রাখতে পারেন অনলাইনে বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের জন্য সবথেকে বড় এবং উন্মুক্ত তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলার কাজে।
...