বিস্ময় অ্যানসারস এ আপনাকে সুস্বাগতম। এখানে আপনি প্রশ্ন করতে পারবেন এবং বিস্ময় পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নিকট থেকে উত্তর পেতে পারবেন। বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন...
69 জন দেখেছেন
"সাধারণ" বিভাগে করেছেন (510 পয়েন্ট)
ভাষার তো কোন ধর্ম নেই। তাহলে জল আর পানি নিয়ে এত মাতামাতি কেন?

1 উত্তর

+4 টি পছন্দ
করেছেন (6,280 পয়েন্ট)
'জল' খাঁটি বাংলা শব্দ। ভারতীয় বাঙ্গালীরা খাঁটি বাংলায় কথা বলে। তাই তারা 'জল' বলে। 'পানি' উর্দু শব্দ। আর বাংলাদেশীরা পাকিস্তানীদের কাছ থেকে 'পানি' শব্দটি শিখেছে।
করেছেন (510 পয়েন্ট)
ধরে নিচ্ছি আপনার কথাই সঠিক। তাহলে ১৯৪৭ এ দেশভাগের পুর্বে কি বাংলাদেশিরা জল বলত?
করেছেন (6,280 পয়েন্ট)
বাঙ্গালি মুসলমানরা পানি ই বলত।
করেছেন (510 পয়েন্ট)
সম্পাদিত করেছেন
তাহলে নিশ্চয়ই আপনার উত্তরের  কোনো  অংশই সঠিক নয়?
করেছেন (48 পয়েন্ট)
তাহলে ভারতের হিন্দি ভাষাভাষীরাও তো পানীয় জলকে পানি বলে।তারা তো মুসলমান নয়।
করেছেন (510 পয়েন্ট)
কিয়দাংশ মুসলিম।
করেছেন (6,280 পয়েন্ট)
আমি বলেছিঃ বাঙ্গালি মুসলিমরা পানি বলে। হিন্দী ভাষাভাষিরাও পানি বলে না, সেটা তো বলিনি।
করেছেন (510 পয়েন্ট)
‘জল’ ও ‘পানি’ দুটোই সংস্কৃতজাত শব্দ– প্রথমটি তৎসম এবং দ্বিতীয়টি তদ্ভব। সংস্কৃত ‘জল (=√জল্+অ)’ শব্দের বহুল প্রচলিত অর্থ পানি, বারি, সলিল প্রভৃতি। অন্যদিকে, সংস্কৃত ‘পানীয়’ শব্দ থেকে উদ্ভূত তদ্ভব ‘পানি’ শব্দের অর্থ জল, বারি, সলিল প্রভৃতি। বাংলায় ব্যবহৃত ‘পানি’ শব্দটি সংস্কৃত ‘পানীয়’ শব্দের পরিবর্তিত রূপ। এবার পরিবর্তনটি কীভাবে হয়েছে দেখা যাক : (সংস্কৃত) পানীয়> (পালি) পানীয়> (প্রাকৃত) পাণিঅ> (বাংলা) পাণি/পাণী> পানি। প্রাকৃত শব্দ “পাণিঅ” থেকে হিন্দি, উর্দু, মারাঠি, গুজরাটি, মৈথিলী ও ওড়িয়া ভাষাও ‘বারি’ অর্থ প্রকাশে পানি শব্দটির ব্যবহার প্রচলিত হয়েছে।

এবার পর্যালোচনা করে দেখি, বাংলা সাহিত্যে প্রথমে ‘পানি’ না কি ‘জল’ শব্দটির ব্যবহার চালু হয়েছিল। গবেষণায় দেখা যায়, বাংলা সাহিত্যে ‘পানি’ শব্দের ব্যবহার সুপ্রাচীন, কিন্তু ‘জল’ শব্দের প্রচলন হয়েছে পরে। বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদে ‘পানি’ শব্দটির প্রয়োগ পাওয়া যায়, কিন্তু ‘জল’ শব্দের প্রয়োগ পাওয়া যায় না। চর্যাপদে ভুসুক পা লিখেছেন:
“তিণ ন চছুপইী হরিণা পিবই ন পাণী ।
হরিণা হরিণির নিলঅ ণ জাণী ।।”
অর্থাৎ ‘ধৃত হরিণ প্রাণভয়ের হতভম্বতায় ঘাসও খায় না, ‘পাণী (পানি)’ পানও করে না।” অতএব, বলা যায় – বাংলা সাহিত্যে ‘পানি’ শব্দটি ‘জল’ শব্দের আগে এসেছে।

সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ও প্রবোধচন্দ্র বাগচীর অভিমত, চর্যার পদগুলো খ্রিস্টীয় দশম থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যবর্তী সময়ে রচিত হয়েছে।ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও রাহুল সাংকৃত্যায়নের মতে খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতকে চর্যাপদ লিখিত হয়। আধুনিক গবেষণায় দেখা যায়, চর্যা এরও আগে রচিত হয়েছে। সে হিসেবে এখন থেকে কমপক্ষে দেড় হাজার বছর বা তারও পূর্বে বাংলায় ‘পানি’ শব্দের প্রচলন শুরু হয়েছিল; তখন জল শব্দের ব্যবহার বাংলা সাহিত্যে ছিল না।সংগতকারণে, বাঙালির মুখেও ‘জল’ ছিল না, ‘পানি’ ছিল। এর থেকে প্রমাণিত হয়ে যে, ‘পানি’ ‘জল’-এর আগে; যদিও ‘প’ বর্ণটি বর্গীয়-জ বর্ণের পরে।

চর্যা-পরবর্তী বাংলা সাহিত্যের আর একটি উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম হচ্ছে, ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’। এখানেও ‘জল’ শব্দটি পাওয়া যায় না, পাওয়া যায় পানি। ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে আছে:
“কে না বাঁশী বাএ বড়ায়ি কালিনী নই কূলে।
কে না বাঁশী বাএ বড়ায়ি এ গোঠ গোকুলে।
আকুল শরীর মোর বেয়াকুল মন।
বাঁশীর শবদেঁ মো আউলাইলোঁ বান্ধন।
কে না বাঁশী বাএ বড়ায়ি সে না কোন জনা।
দাসী হুআঁ তার পাএ নিশিবোঁ আপনা।
কে না বাঁশী বাএ বড়ায়ি চিত্তের হরিষে।
তার পাএ বড়ায়ি মোঁ কৈলোঁ কোন দোষে।
আঝর ঝরএ মোর নয়নের পাণী।
বাঁশীর শবদেঁ বড়ায়ি হারায়িলোঁ পরাণী।”

চর্যাপদ এবং শ্রীকৃষ্ণকীর্তন বিশ্লেষণ করে বলা যায়, সেকালে বাংলা সাহিত্যে ‘জল’-এর বড়ো অভাব ছিল, কিন্তু ‘পানি’র অভাব ছিল না। ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ রচনার যুগেও মুসলিম-অমুসলিম সব বাঙালি একসঙ্গে কেবল ‘পানি’ই পান করে গেছেন, জলের দেখা দীর্ঘ কাল পাননি। অতএব, প্রাচীন বাংলায়, তদ্ভব ‘পানি’ শব্দের ব্যবহার ছিল, কিন্তু তৎসম ‘জল’ এর ব্যবহার ছিল কি না তার প্রমাণ পাওয়া যায় না।

অনেক হিন্দু এবং একই সঙ্গে বহু মুসলিম মনে করেন, ‘পানি’ আরবি বা ফার্সি-জাত শব্দ। আবার অনেকে বলেন, এটি উর্দু। গবেষণায় দেখা যায়, ব্যাবহারিক প্রাচীনত্বের কারণে ‘পানি’ শব্দটি অপেক্ষাকৃত গরিব এবং অশিক্ষিত বাঙালি মুসলিম শ্রমজীবীগণ অধিক হারে ব্যবহার করায় এবং তার বিপরীতে আর একটি সহজবোধ্য সংস্কৃত শব্দ (জল) থাকায় সংস্কৃত পণ্ডিতবর্গ ‘পানি’ শব্দটিকে ইসলামি শব্দ এবং অস্পৃশ্যদের ব্যবহার্য শব্দ হিসেবে প্রচার করতে শুরু করেন। এভাবে বাংলা সাহিত্যে মুসলিম-অমুসলিম উভয়ের কাছে প্রাচীন কাল হতে ব্যবহৃত হয়ে আসা ‘পানি’ শব্দটি সংস্কৃত হতে আগত হয়েও হিন্দুত্ব হারিয়ে ফেলে। এজন্য হিন্দুরা ‘পানি’ শব্দের পরিবর্তে ‘জল’ ব্যবহার করতে শুরু করেন। ফলে ‘জল’ হয়ে যায় হিন্দুয়ানি শব্দ। প্রকৃতপক্ষে, ‘পানি’ শব্দের সঙ্গে আরবি বা ফারসি ভাষার কোনো সম্পর্ক নেই। আরবি ভাষায় ‘পানি’ অর্থ ‘মাউন’। অন্যদিকে, ফারসি ভাষায় পানিকে বলা হয় ‘আব’। সুতরাং ‘পানি’ শব্দকে ইসলামি শব্দ বলে বাঙালি হিন্দুদের তা ব্যবহার না-করার কথাটি সত্য হলেও ‘পানি’ আরবি বা ফার্সি শব্দ- এটি ঠিক নয়। যদিও উভয় পক্ষের অনেকে এমন দাবি করে থাকেন। অধিকন্তু, হিন্দুরা ছাড়াও অধিকাংশ বাঙালি অমুসলিম সাধারণত ‘পানি’ শব্দের পরিবর্তে ‘জল’ ব্যবহার করে থাকেন।

বাঙালি হিন্দুদের জল ব্যবহারের আর একটি উল্লেখযোগ্য কারণ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় ধর্মীয় প্রাবল্য। সংস্কৃত ব্যাকরণের প্রাতিষ্ঠানিক অধ্যয়নের সূচনালগ্নে হিন্দুদের দ্বারা এবং হিন্দুদের জন্য প্রতিষ্ঠিত টোল-পাঠশালা প্রভৃতির প্রসার দীর্ঘকাল যাবৎ হিন্দু-প্রধান এলাকায় প্রাধান্য বিস্তার করেছিল। বিশেষ করে, ইংরেজ আমলে মুসলিমরা আধুনিক শিক্ষা গ্রহণে অনীহা প্রকাশ করায় মুসলিমরা আধুনিক শিক্ষা হতে পিছিয়ে পড়তে শুরু করে। এগিয়ে যেতে থাকে হিন্দুরা। সাধারণ মুসলিমরা মোঘল আমলের ন্যায় আরবি-ফারসি প্রভৃতি ভাষাতে এবতেদায়ি শিক্ষা গ্রহণ করে যেতে থাকে। মাদ্রাসায় পাঠদানকালে মৌলবিরা বাংলা শব্দ হিসেবে প্রাচীন কাল থেকে চলে আসা শব্দরাশিই ব্যবহার করতেন। বাঙালি কবি-সাহিত্যিকগণের সাহিত্যকর্মেও হিন্দু কবি-সাহিত্যিকগণের তুলনায় আরবি-ফার্সি ভাষার প্রাধান্য ছিল। সংস্কৃত-প্রধান টোল বা পাঠশালার সঙ্গে মুসলিমদের এবতেদায়ি বা মাদ্রাসা শিক্ষার বৈপরীত্য ছিল প্রচুর। ফলে, মুসলিমরা প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা সংস্কৃত হতে আগত তদ্ভব তথা প্রাকৃত পানি’ শব্দের ব্যবহারে সমধিক অভ্যস্থ হয়ে উঠে।

অধিকন্তু, তখন বাংলা ভাষার প্রচার হিন্দু-প্রধান এলাকার বিদ্যালয়সমূহে যত ভালোভাবে করা হয়েছিল, মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় করা হয়নি; মুসলিমরাও প্রথমদিকে এদিকটাকে গুরুত্ব সহকারে নেননি। ফলে, মুসলিমরা আঞ্চলিক বা কথ্য ভাষায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেন।অন্যদিকে হিন্দুরা হয়ে উঠেন অধিকমাত্রায় সংস্কৃত-অনুসারী। বাংলা ব্যাকরণে সংস্কৃতের প্রভাবও এর অন্যতম একটি কারণ। কাজেই মুসলিমদের কাছে ‘পানি’ এবং শিক্ষিত হিন্দুদের কাছে ‘জল’ বহুল প্রচলিত হয়ে যায়। এভাবে শিক্ষিত হিন্দুদের ব্যবহারের কারণে সব হিন্দু এবং অমুসলিমরা জল শব্দ ব্যবহারে অভ্যস্থ হয়ে যায়।

উপরের আলোচনা হতে দেখা যায়, ‘পানি’ ও ‘জল’ দুটোই সংস্কৃতজাত শব্দ। সংস্কৃত ‘পানীয়’ শব্দটি একটু পরিবর্তন হয়ে ‘পানি’ হয়েছে বলে হয়তো মুসলিমরা সরাসরি সংস্কৃত ‘জল’ না-বলে ‘পানি’ বলে থাকেন। হিন্দিভাষীগণ ‘পানি’ বলেন। বেশির ভাগ হিন্দিভাষী অমুসলিম। মুসলিমরাও বলে থাকেন পানি। সুতরাং উপমহাদেশে, ‘জল’ এর চেয়ে ‘পানি’ বলা লোকের সংখ্যা অধিক। তবে বাংলায় বিভিন্ন শব্দ ও প্রবাদ-প্রবচনে পানির চেয়ে জলের আধিক্য বেশি। ‘পানি’ দিয়ে গঠিত এবং বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে অন্তর্ভূক্ত শব্দের সংখ্যা মাত্র পাঁচ, কিন্তু ‘জল’ দিয়ে গঠিত শব্দের সংখ্যা একশ একচল্লিশ।এটিও বাংলা ব্যাকরণে সংস্কৃতের একছত্র প্রভাবের কারণে ঘটেছে।
পাদটীকা: ভাষাবিদ মুহম্মদ আমিন।

সম্পর্কিত প্রশ্নগুচ্ছ

1 উত্তর
2 টি উত্তর
30 সেপ্টেম্বর "সাধারণ" বিভাগে জিজ্ঞাসা করেছেন Md. Siyam Hossen (4,510 পয়েন্ট)

341,527 টি প্রশ্ন

434,707 টি উত্তর

135,919 টি মন্তব্য

184,266 জন নিবন্ধিত সদস্য

বিস্ময় বাংলা ভাষায় সমস্যা সমাধানের একটি নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। এখানে আপনি আপনার প্রশ্ন করার পাশাপাশি অন্যদের প্রশ্নে উত্তর প্রদান করে অবদান রাখতে পারেন অনলাইনে বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের জন্য সবথেকে বড় এবং উন্মুক্ত তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলার কাজে।
...